দীপন পাচন শোধন, আয়ুর্বেদে হজম ঠিক করে শরীর শুদ্ধ করার তিন ধাপ
দীপন পাচন শোধন কী, আয়ুর্বেদে অগ্নি জ্বালিয়ে আম হজম করে শরীর শুদ্ধ করার তিন ধাপ, দীপন ও পাচনের পার্থক্য, রান্নাঘরের ভেষজ ও কারা সতর্ক থাকবেন, বাংলায় গাইড।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

সূচিপত্র
আজকাল ডিটক্স শব্দটা সবখানে, ডিটক্স চা, ডিটক্স জুস, তিন দিনের ক্লিনজ। শরীর থেকে বিষ বের করার এই তাড়াহুড়ো দেখে মনে হয়, ব্যাপারটা বুঝি এক গ্লাসেই সেরে ফেলা যায়। আয়ুর্বেদ শরীর শুদ্ধ করার কথা হাজার বছর ধরে বলে আসছে, তবে একটু অন্যভাবে, এক লাফে নয়, ধাপে ধাপে। সেই ধাপগুলোর নাম দীপন, পাচন আর শোধন।
দীপন পাচন শোধন হলো আয়ুর্বেদে হজম ঠিক করে শরীর শুদ্ধ করার তিন ধাপের একটা ক্রম। প্রথমে দীপন, অর্থাৎ হজম-আগুন বা অগ্নিকে জ্বালিয়ে তোলা; তারপর পাচন, অর্থাৎ জমে থাকা অপাচিত আম হজম করানো; আর সবশেষে শোধন, অর্থাৎ শরীর থেকে দোষ বের করে দেওয়া। এই লেখায় থাকছে প্রতিটি ধাপ কী, দীপন ও পাচনের পার্থক্য, রান্নাঘরের কোন ভেষজ কোন কাজে লাগে, আর কারা সতর্ক থাকবেন। মনে রাখবেন, এটি কৌতূহলী পাঠকের জন্য তথ্য, কোনো চিকিৎসা পরামর্শ নয়।
এক নজরে
- দীপন মানে অগ্নি জ্বালানো, খিদে ও হজম বাড়ানো, কিন্তু এটি আম সরাসরি হজম করে না
- পাচন মানে জমে থাকা আম হজম করানো
- শোধন মানে শরীর থেকে জমা দোষ বের করা, যার বড় প্রয়োগ পঞ্চকর্ম
- ক্রমটা হলো আগে দীপন-পাচন, তারপর স্নেহন-স্বেদন, সবশেষে শোধন
- সতর্কতা লাগে অম্লপিত্ত বা তীক্ষ্ণাগ্নি, গর্ভাবস্থা ও আলসারে, আর শোধন বৈদ্যের তত্ত্বাবধানে
দীপন পাচন শোধন মানে কী
দীপন পাচন শোধন হলো আয়ুর্বেদের একটা ধাপে-সাজানো চিকিৎসা-ক্রম, যেখানে আগে হজম ঠিক করা হয়, তারপর শরীর শুদ্ধ করা হয়। যুক্তিটা সহজ। ঘর ঝাঁট দেওয়ার আগে যেমন আলো জ্বালাতে হয় আর জঞ্জাল এক জায়গায় করতে হয়, তেমনি শরীর থেকে দোষ বের করার আগে অগ্নিকে জ্বালিয়ে জমে থাকা আম গলিয়ে নরম করে নেওয়া দরকার, নইলে গোটা শোধন আধা-খেঁচড়া থেকে যায়।
তিনটে ধাপ আলাদা করে দেখলে বোঝা সহজ। দীপন হলো প্রথম ধাপ, যেখানে দুর্বল হজম-আগুন বা অগ্নিকে আবার জ্বালিয়ে তোলা হয়, যাতে খিদে ফেরে আর খাবার ঠিকমতো পোড়ে। পাচন দ্বিতীয় ধাপ, যেখানে আগের অসম্পূর্ণ হজম থেকে জমে থাকা আম হজম করিয়ে ফেলা হয়। আর শোধন তৃতীয় ধাপ, যেখানে বাড়তি দোষকে শরীর থেকে বের করে দেওয়া হয়, যার সবচেয়ে চেনা রূপ পঞ্চকর্ম।
এই ক্রমটাই আসল কথা। আয়ুর্বেদের সুরটা এখানে উল্টো, আগে জমা বিষ বের করার কথা না ভেবে সে বলে আগে হজম ঠিক করো, তারপর ধীরে দোষ বের করো। আমার নিজের পড়ে যা মনে হয়েছে, এই ধৈর্যটুকুই দীপন-পাচন-শোধনকে আজকের এক-গ্লাস ডিটক্স-ভাবনার থেকে আলাদা করে, এখানে তাড়াহুড়োর জায়গা কম।
দীপন ও পাচনের পার্থক্য কী
দীপন ও পাচন শুনতে কাছাকাছি হলেও কাজে আলাদা, আর এই পার্থক্যটাই আয়ুর্বেদে গুরুত্বপূর্ণ। শার্ঙ্গধর সংহিতার পূর্বখণ্ডে (৪ অধ্যায়) এই দুটোকে আলাদা করে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
সহজ করে বললে, পার্থক্যটা আগুন নিয়ে। দীপন অগ্নিকে জ্বালিয়ে তোলে অর্থাৎ খিদে ও হজম-ক্ষমতা বাড়ায়, কিন্তু জমে থাকা আমকে সরাসরি হজম করে না, আর পাচন ঠিক তার উল্টো, নিজে বড় করে আগুন না বাড়িয়েও জমে থাকা কাঁচা আমকে পুড়িয়ে হজম করিয়ে দেয়। একটা আগুন বাড়ায়, আরেকটা জমে থাকা কাঁচা জিনিস পুড়িয়ে দেয়। কিছু ভেষজ আবার দুটো কাজই একসঙ্গে করে, তাই বাস্তবে দীপন ও পাচন প্রায়ই জোড়ায় ব্যবহার হয়। নিচের ছকে ফারাকটা ধরে ধরে দেখানো হলো।
| দিক | দীপন | পাচন |
|---|---|---|
| মূল কাজ | অগ্নি জ্বালানো, খিদে বাড়ানো | জমে থাকা আম হজম করানো |
| আমের ওপর প্রভাব | সরাসরি হজম করে না | সরাসরি হজম করে |
| চেনা ভেষজ | শুঁঠ, পিপুল, গোলমরিচ | মুস্তা, চিত্রক |
| কখন বেশি দরকার | খিদে কম, অগ্নি দুর্বল | জিভে প্রলেপ, আম জমেছে |
এই ফারাক ব্যবহারিক দিক থেকেও কাজে লাগে। কারো শুধু খিদে কমেছে কিন্তু আম জমেনি, সেখানে দীপনই যথেষ্ট। আবার কারো জিভে মোটা সাদা প্রলেপ, পেট ভার, সেখানে পাচন দরকার। বেশিরভাগ সময় দুটো একসঙ্গে চলে বলে শাস্ত্রে এদের প্রায়ই দীপন-পাচন বলে একসঙ্গে ডাকা হয়।
অগ্নি ও আম, কেন এই ধাপ দরকার
অগ্নি ও আম, এই দুটো ধারণা না বুঝলে দীপন-পাচনের দরকারটাই স্পষ্ট হয় না। আয়ুর্বেদে অগ্নি মানে হজম ও বিপাকের সেই শক্তি, যা খাবারকে শরীরের কাজে লাগার মতো করে ভাঙে।
এই অগ্নি সবার এক নয়। শাস্ত্রে পাকস্থলীর মূল অগ্নিকে চার ভাগে দেখা হয়, সম অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ, বিষম অর্থাৎ খেয়ালি, তীক্ষ্ণ অর্থাৎ অতি প্রখর, আর মন্দ অর্থাৎ দুর্বল। যখন অগ্নি মন্দ বা দুর্বল থাকে, খাবার পুরোপুরি হজম হয় না, আর সেই অসম্পূর্ণ, আঠালো অংশটাই জমে যাকে বলা হয় আম। এই আম শরীরে বিষের মতো আচরণ করে বলে ধরা হয়, স্রোত বন্ধ করে, ভারী ভাব আনে। যে দোষ আমে মাখানো তাকে বলে সাম, আর আম দূর হলে সেটাই হয় নিরাম। দীপন-পাচনের গোটা লক্ষ্য সাম থেকে নিরাম অবস্থায় পৌঁছনো।
এখানে আধুনিক বিজ্ঞানের একটা সৎ আপত্তিও আছে। আম বা ডিটক্স, কোনো শব্দেরই আধুনিক বিজ্ঞানে নির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য সংজ্ঞা নেই, আর আম বা অগ্নিকে সরাসরি কোনো ল্যাব-পরীক্ষায় বসানো যায় না। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ও সার্বিক সুস্থতার যোগ নিয়ে আজকাল আলোচনা বাড়ছে ঠিকই, তবু একে দেহতত্ত্বের প্রমাণিত ব্যাখ্যা না ধরে হজম বোঝার একটা ঐতিহ্যগত কাঠামো হিসেবে দেখাই সবচেয়ে সৎ। কোন খাবার কোন অগ্নিতে বসবে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ষড়রসের ভাবনাও, কারণ কটু, তিক্ত ও কষায় রসকে অগ্নির উদ্দীপক বলে ধরা হয়।
রান্নাঘরের দীপন-পাচন ভেষজ
দীপন-পাচনের বেশিরভাগ ভেষজ আসলে বাঙালি রান্নাঘরেই আছে, আলাদা করে কিনতে হয় না। খাবারে ফোড়নের যে মশলা রোজ পড়ে, তার অনেকগুলোই শাস্ত্রে দীপক বা পাচক বলে ধরা।
সবচেয়ে চেনা নাম আদা, শুকিয়ে নিলে যাকে বলে শুঁঠ, খাবার আগে সামান্য আদা-নুন চিবোনোকে আয়ুর্বেদ দীপনের সহজ টোটকা বলে। জিরা ভাজার সেই গরম, মাটি-মাটি গন্ধ রান্নাঘরে ছড়ালেই বোঝা যায় হজমের কাজ শুরু, জিরা-জলকে ঐতিহ্যগতভাবে দীপক ধরা হয়। শার্ঙ্গধর সংহিতা দীপন ভেষজের উদাহরণে রেখেছে পিপুল, গোলমরিচ, শুঁঠ ও মুস্তার মতো নাম। গোলমরিচ, পিপুল ও শুঁঠ, এই তিন মিলে তৈরি হয় ত্রিকটু, হজমের সবচেয়ে চেনা ধ্রুপদী যোগ। আর জমা আম হজমের দিকে বেশি ঝোঁকে চিত্রক, যা চিত্রকাদি বটির মূল উপকরণ। কয়েকটি চেনা ভেষজের ভূমিকা নিচের ছকে।
| ভেষজ | মূলত | চেনা ঘরোয়া রূপ |
|---|---|---|
| আদা বা শুঁঠ | দীপন ও পাচন | খাবার আগে আদা-নুন |
| জিরা | দীপন | জিরা-জল, ফোড়ন |
| গোলমরিচ | দীপন ও পাচন | ত্রিকটুর অংশ |
| পিপুল | দীপন | ত্রিকটুর অংশ |
| চিত্রক | পাচন | চিত্রকাদি বটি |
এই ভেষজগুলো নিয়ে দুটো বিষয় খোলাখুলি বলি। এদের বেশিরভাগের হজমে ভূমিকা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহারের স্তরে, আধুনিক বড় প্রমাণ কম। আদার ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম, মার্কিন NCCIH-এর মতে বিশেষত গর্ভাবস্থার বমিভাবে আদা সহায়ক হতে পারে, তবে হজমে এর কার্যকারিতা নিয়ে তারা নির্দিষ্ট দাবি করে না আর একে মূলত ঐতিহ্যগত ব্যবহার বলে (NCCIH), তাই সীমিত প্রমাণ কথাটাই এখানে সবচেয়ে মানানসই। দ্বিতীয় বিষয়, এগুলো রোজকার খাবারের মশলা হিসেবে নিরাপদ হলেও ওষুধের মাত্রায় নয়, আর NCCIH-ও জানায় আদা কারো কারো বুক জ্বালা বাড়াতে পারে, তাই অম্লপিত্ত থাকলে ঝাল মশলায় সংযম দরকার।
শোধনের আগে প্রস্তুতি, পূর্বকর্মের ক্রম
শোধন বা শরীর শুদ্ধ করা আসলে একটা সাজানো ক্রমের একেবারে শেষ ধাপ, তার আগে থাকে বেশ কিছুটা প্রস্তুতি। এই প্রস্তুতি-পর্বকে আয়ুর্বেদে বলা হয় পূর্বকর্ম, আর দীপন-পাচন তারই শুরু।
ক্রমটা মোটামুটি এমন। প্রথমে দীপন-পাচন দিয়ে অগ্নি জ্বালানো ও আম হজম করানো, যাতে দোষ আঠালো ভাব ছেড়ে বের-হওয়ার-উপযোগী হয়। তারপর স্নেহন, অর্থাৎ ভিতরে-বাইরে স্নেহ বা তেল-ঘি প্রয়োগ, আর স্বেদন, অর্থাৎ ঘাম ঝরিয়ে দোষকে কোষ্ঠে টেনে আনা। এই সব হয়ে গেলে তবেই মূল শোধন, যেমন বমন বা বিরেচন। কেন এই ধাপ এত জরুরি, তার সহজ ছবি হলো, দেয়ালে শুকিয়ে যাওয়া আঠা জোর করে টেনে তুলতে গেলে রং আর প্লাস্টার একসঙ্গে উঠে আসে, কিন্তু আগে জলে ভিজিয়ে নরম করে নিলে সেই আঠা অনায়াসে খুলে যায়, শোধনের আগে দীপন-পাচনও শরীরে ঠিক তেমন কাজ করে। শোধন ও এর বিপরীত শমন পদ্ধতির পার্থক্য নিয়ে আলাদা করে সাজানো আছে শোধন বনাম শমন চিকিৎসার লেখায়।
এখানে একটা কথা জোর দিয়ে বলা দরকার। মূল শোধন, অর্থাৎ পঞ্চকর্ম, ইউটিউব দেখে বা নিজের বুদ্ধিতে বাড়িতে করার জিনিস নয়। ভুল সময়ে বা ভুল লোকের ওপর শোধন হিতে বিপরীত হতে পারে, তাই এটি প্রশিক্ষিত বৈদ্যের তত্ত্বাবধানেই করা উচিত। দীপন-পাচনের রান্নাঘর-স্তরের অভ্যাস আর পুরো শোধন-প্রক্রিয়া, দুটোকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
নিজে বুঝবেন কীভাবে আম জমেছে
আম জমেছে কি না, তার কয়েকটা চেনা ইঙ্গিত আয়ুর্বেদ দিয়েছে, যা নিজেই লক্ষ করা যায়। এগুলো রোগ-নির্ণয় নয়, নিছক ইশারা।
সবচেয়ে বেশি বলা লক্ষণ সকালে জিভে মোটা সাদা বা হলদে প্রলেপ, সঙ্গে মুখে আঠালো স্বাদ। এর সঙ্গে থাকতে পারে খিদে কমে যাওয়া, খাওয়ার পরে ভারী ও ঝিমঝিম ভাব, শরীর ম্যাজম্যাজ, আর মল ভাসা বা আঠালো হওয়া। আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন, ভারী ভোজের পরদিন সকালে জিভটা কেমন মোটা আর মুখ তেতো লাগে? আয়ুর্বেদ ঠিক এই অভিজ্ঞতাটাকেই আম জমার ইঙ্গিত বলে দেখে। এমন সময়ে শাস্ত্রের প্রথম পরামর্শ প্রায়ই লঙ্ঘন, অর্থাৎ হালকা উপবাস বা কম খাওয়া, যাতে অগ্নি বিশ্রাম পেয়ে জমা আম পোড়াতে পারে, আর সঙ্গে হালকা দীপন-পাচক পথ্য। ভারী খাবার চাপিয়ে না দিয়ে পেটকে একটু ফাঁকা রাখা, এই সহজ কাজটাই এখানে সবচেয়ে কাজের।
কে সতর্ক থাকবেন বা কখন এড়াবেন
দীপন-পাচনের বেশিরভাগ ঘরোয়া অভ্যাস নিরীহ হলেও কয়েকটি অবস্থায় বাড়তি সতর্কতা দরকার, কারণ দীপক মশলা সবার শরীরে এক আচরণ করে না। কথাগুলো ছোট, কিন্তু জরুরি।
যাঁদের অগ্নি এমনিতেই তীক্ষ্ণ, অর্থাৎ বুক জ্বালা, অম্লপিত্ত, গ্যাস্ট্রাইটিস বা পেপটিক আলসারের প্রবণতা আছে, তাঁদের বেশি ঝাল গোলমরিচ-পিপুল জাতীয় দীপক মশলায় সংযম দরকার, কারণ এগুলো জ্বালা ও অম্ল আরও বাড়াতে পারে। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় কড়া ভেষজ ও যেকোনো শোধন-প্রক্রিয়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়। রক্তক্ষরণের প্রবণতা বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ চললে ঝাল দীপক ভেষজে সাবধানতা দরকার। আর সবচেয়ে বড় কথা, বমন বা বিরেচনের মতো মূল শোধন কখনো নিজে বাড়িতে চেষ্টা করবেন না, এটি প্রশিক্ষিত বৈদ্যের অধীনে হওয়ার জিনিস। দীর্ঘদিনের হজমের গোলমাল, অকারণ ওজন কমা বা মলে রক্ত দেখা দিলে আম-এর তত্ত্বে ফেলে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
দীপন-পাচন নিয়ে পড়তে গিয়ে আমার প্রথমে একটু হাসিই পেয়েছিল, ভেবেছিলাম আদা-জিরার মতো চেনা মশলাকে বড় বড় সংস্কৃত নাম দিয়ে জটিল করা হয়েছে। ভুল ভেবেছিলাম। পরে বুঝলাম, জটিলতা নয়, বরং একটা সাজানো যুক্তি এর পেছনে আছে।
সেই যুক্তিটা টের পেয়েছিলাম একটা বিয়েবাড়ির লম্বা ভোজ-পর্বের পর। পরপর কয়েক দিন ভারী খাওয়ার শেষে সকালে উঠে দেখতাম জিভ মোটা, মুখ তেতো, খিদে উধাও। আগে হলে হয় জোর করে কিছু খেতাম, নয়তো চটজলদি কোনো ডিটক্স পানীয় খুঁজতাম, এবার বরং তার উল্টো পথে গেলাম, এক-দুবেলা খাওয়া হালকা করে দিলাম, খাবার আগে একটু আদা রাখলাম, আর পেটটাকে জোর না করে সময় দিলাম। দিন দুয়েকেই জিভ পরিষ্কার, খিদে ফিরল। নতুন কিছু যোগ করিনি, শুধু কিছু বাদ দিয়েছিলাম। এটাই বোধহয় লঙ্ঘন আর দীপনের সহজ পাঠ, যা আমাদের ঠাকুমারা উপোস বলে এমনিই জানতেন।
সংক্ষেপে
দীপন পাচন শোধন আসলে আয়ুর্বেদের একটা সহজ যুক্তির নাম, আগে হজম ঠিক করো, তারপর শরীর শুদ্ধ করো। দীপন অগ্নি জ্বালায়, পাচন জমা আম হজম করায়, আর শোধন দোষ বের করে, আর এই ক্রমটাই একে তাড়াহুড়োর ডিটক্স-ভাবনা থেকে আলাদা করে। রান্নাঘরের আদা, জিরা, গোলমরিচ ও পিপুলই এর চেনা দীপক-পাচক ভেষজ, তবে মূল শোধন বা পঞ্চকর্ম বৈদ্যের তত্ত্বাবধানের জিনিস, বাড়ির নয়।
শেষে একটা কথাই মনে রাখুন। দীপন-পাচন-শোধনের পুরো শিক্ষা এক কথায়, ক্রম মেনে ধীরে এগোনো, একদিনে সব নয়। ভারী খাওয়ার পরদিন সকালে জিভে মোটা প্রলেপ আর খিদে কম দেখলে সেদিন খাবারটা হালকা রাখুন, খাবার আগে একটু আদা-নুন চিবিয়ে নিন, আর জোর করে ভারী খাবার চাপাবেন না, শরীরকে একটু সময় দিন। বড় কোনো হজমের সমস্যা, অম্লপিত্ত বা ক্রনিক রোগ থাকলে, বা শোধন-পঞ্চকর্মের কথা ভাবলে, তার আগে যোগ্য আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নেবেন। এই ধারণার শিকড় বুঝতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার হাব পাতাও দেখতে পারেন।
সূত্র / Sources
- শার্ঙ্গধর সংহিতা, পূর্বখণ্ড অধ্যায় ৪ (দীপন, পাচন ও শোধনের সংজ্ঞা): carakasamhitaonline.com
- চরক সংহিতা, অগ্নি ও আম প্রসঙ্গ (দীপন-পাচন-লঙ্ঘন): carakasamhitaonline.com
- NCCIH (NIH), Ginger (আদার প্রমাণ ও নিরাপত্তা, গর্ভাবস্থার বমিভাব ও ঐতিহ্যগত ব্যবহার): nccih.nih.gov
- AYUSH মন্ত্রক, ভারত সরকার (আয়ুর্বেদ, পঞ্চকর্ম ও পূর্বকর্ম প্রসঙ্গ): ayush.gov.in
- WHO, ঐতিহ্যবাহী ও পরিপূরক চিকিৎসা: who.int
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

শোধন বনাম শমন চিকিৎসা, আয়ুর্বেদের দুই পথের পার্থক্য
শোধন বনাম শমন চিকিৎসা মানে কী, শমন চিকিৎসার সাত প্রকার, পঞ্চকর্মের সঙ্গে সম্পর্ক, কোন অবস্থায় কোনটা বেছে নেওয়া হয় আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার জেনে নিন।

ষড়রস বা ছয় রস কী, আয়ুর্বেদে স্বাদের সম্পূর্ণ বিজ্ঞান
ষড়রস বা ছয় রস কী, মধুর অম্ল লবণ কটু তিক্ত ও কষায় রসের দোষ-প্রভাব, পঞ্চমহাভূত গঠন, অতিরিক্ত হলে ঝুঁকি এবং বাঙালি থালায় ছয় রস সাজানোর আয়ুর্বেদিক গাইড।

সপ্তধাতু — শরীরের সাত স্তর ও আয়ুর্বেদিক পুষ্টির ক্রম
আয়ুর্বেদের সপ্তধাতু অর্থাৎ রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্রের পরিচয়, ধাত্বগ্নি ও পুষ্টির ক্রমিক রূপান্তর এবং এর আধুনিক তাৎপর্য নিয়ে বাংলা গাইড।