কোন তেলে শিশুর মালিশ, অভ্যঙ্গের নিয়ম ও প্রমাণ কী বলে
শিশুর তেল মালিশে কোন তেল নিরাপদ, সরিষা ও অলিভ অয়েল নিয়ে প্রমাণ কী বলে, নারকেল তেলের গবেষণা, ম্যাসাজের ধাপ, গোসলের আগে না পরে, মাথার ত্বক ও কখন এড়াবেন।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

সূচিপত্র
- এক নজরে
- অভ্যঙ্গ কী, শাস্ত্র কী বলে
- নবজাতকের জন্য কোন তেল সবচেয়ে নিরাপদ?
- সরিষার তেল কি নবজাতকের জন্য ঠিক?
- অলিভ অয়েল নিয়ে যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি ছড়ায়
- মালিশে আসলে কী প্রমাণ আছে
- ধাপে ধাপে ম্যাসাজের পদ্ধতি
- গোসলের আগে না পরে?
- মাথার ত্বক ও চুলে তেল
- মাথার তালুতে চাপ দেওয়া যাবে না
- কে সতর্ক থাকবেন
- একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
- সংক্ষেপে
- সূত্র / Sources
সূচিপত্র14টি বিভাগ
- এক নজরে
- অভ্যঙ্গ কী, শাস্ত্র কী বলে
- নবজাতকের জন্য কোন তেল সবচেয়ে নিরাপদ?
- সরিষার তেল কি নবজাতকের জন্য ঠিক?
- অলিভ অয়েল নিয়ে যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি ছড়ায়
- মালিশে আসলে কী প্রমাণ আছে
- ধাপে ধাপে ম্যাসাজের পদ্ধতি
- গোসলের আগে না পরে?
- মাথার ত্বক ও চুলে তেল
- মাথার তালুতে চাপ দেওয়া যাবে না
- কে সতর্ক থাকবেন
- একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
- সংক্ষেপে
- সূত্র / Sources
বাঙালি ঘরে শিশু জন্মালে একজন বিশেষ অতিথি আসেন, তেলওয়ালি মাসি। পিতলের বাটিতে কুসুম-গরম তেল, অভিজ্ঞ আঙুল, আর পাশে বসে দিদিমার তদারকি, মাথায় একটু বেশি, পায়ের তলায় ভালো করে। এই দৃশ্যটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বদলায়নি, আর বদলায়নি বলেই কেউ সচরাচর জিজ্ঞেস করেন না, শিশিতে ঠিক কোন তেলটা আছে।
শিশুর তেল মালিশ বা অভ্যঙ্গ হলো কুসুম-গরম তেলে সারা শরীরে কোমল গতিতে মালিশের একটি দৈনন্দিন অভ্যাস, যা কাশ্যপ সংহিতায় শিশু-পরিচর্যার অন্যতম প্রধান চর্যা হিসেবে বর্ণিত। গর্ভাবস্থার যত্ন শেষ হতে না হতেই এই অভ্যাসটা শুরু হয়ে যায়। অভ্যাসটা নিয়ে প্রশ্ন নেই, প্রশ্নটা তেল নিয়ে। কারণ বাংলা ইন্টারনেটে এই একটি প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে গোলমেলে, আর কয়েকটি জনপ্রিয় পরামর্শ প্রমাণের ঠিক উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে।
এই লেখায় থাকবে কোন তেলের পক্ষে কী প্রমাণ, সরিষা ও অলিভ অয়েল নিয়ে আসল তথ্য কী, নারকেল তেলের গবেষণা কী বলছে, ধাপে ধাপে ম্যাসাজের পদ্ধতি, গোসলের আগে না পরে, মাথার ত্বক ও চুলে তেল দেওয়ার নিয়ম, আর কোন অবস্থায় মালিশ একেবারেই করা যাবে না।
এক নজরে
- নারকেল ও সূর্যমুখী তেল বর্তমান প্রমাণে সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ।
- অলিভ অয়েল ত্বকের প্রতিরোধী স্তরের ক্ষতি করে, প্রচলিত পরামর্শ যাই বলুক।
- নবজাতকে কাঁচা সরিষার তেল প্রথম পছন্দ নয়, বড় শিশুতে ঝুঁকি কম।
- নারকেল তেলে ওজন-বৃদ্ধির পক্ষে ভারতীয় ট্রায়ালের প্রমাণ আছে।
- মালিশ গোসলের ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে, বয়স অনুযায়ী ৫ থেকে ১৫ মিনিট।
- নাভি না শুকানো পর্যন্ত নাভির অংশে তেল নয়।
- মাথার নরম তালুতে কোনো চাপ নয়, শুধু তেলের হালকা প্রলেপ।
অভ্যঙ্গ কী, শাস্ত্র কী বলে
অভ্যঙ্গ হলো আয়ুর্বেদের পরিভাষায় তেল দিয়ে সারা শরীরে মালিশ, আর শিশুর ক্ষেত্রে কাশ্যপ সংহিতা একে দৈনন্দিন চর্যার অপরিহার্য অংশ বলেছে। শাস্ত্র বলে, নিয়মিত অভ্যঙ্গ শিশুর বল, বর্ণ, আয়ু, পুষ্টি ও নিদ্রা, এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই সহায়ক, আর সেই তালিকাটা এত লম্বা বলেই আজও প্রায় হুবহু একই দাবি বিজ্ঞাপনে ফিরে আসে।
শাস্ত্রীয় যুক্তিটা বাত দোষকে ঘিরে। শিশুর দ্রুত বৃদ্ধির পর্বে শরীরে গতি ও অস্থিরতা বেশি, আর স্নেহ বা তৈলাক্ত পদার্থ বাত দোষকে শান্ত করে বলে শাস্ত্র মনে করে। সেই কারণেই ঠান্ডা ঋতুতে ও শুষ্ক আবহাওয়ায় অভ্যঙ্গের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, যা ঋতু অনুযায়ী যত্নের সাধারণ নীতির সঙ্গেও মেলে।
তবে শাস্ত্র কোন তেল ভালো সেই প্রশ্নের আধুনিক উত্তর দিতে পারে না, কারণ তখন ত্বকের প্রতিরোধী স্তর মেপে দেখার উপায় ছিল না। প্রমাণের মাত্রার দিক থেকে অভ্যঙ্গের সামগ্রিক কাঠামোটিকে বলা উচিত ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, আর তেল বাছাইয়ের প্রশ্নে আধুনিক গবেষণাই ভরসা।
নবজাতকের জন্য কোন তেল সবচেয়ে নিরাপদ?
নবজাতকের মালিশে বর্তমান প্রমাণ অনুযায়ী নারকেল ও সূর্যমুখী তেল সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ, আর অলিভ ও কাঁচা সরিষার তেল এড়িয়ে চলাই ভালো। বাঙালি ঘরের প্রচলিত পছন্দের সঙ্গে এটি পুরোপুরি মেলে না, তাই কারণগুলো একে একে দেখা দরকার।
| তেল | নবজাতকের ত্বকে | প্রমাণের মাত্রা |
|---|---|---|
| নারকেল | ওজন-বৃদ্ধিতে ট্রায়ালের সমর্থন, আর্দ্রতা ধরে রাখে | মাঝারি প্রমাণ |
| সূর্যমুখী | প্রতিরোধী স্তর অক্ষত রাখে, লিনোলিক অ্যাসিড-সমৃদ্ধ | মাঝারি প্রমাণ |
| তিল | শাস্ত্রে বহুল ব্যবহৃত, নবজাতকে সরাসরি তথ্য কম | সীমিত প্রমাণ |
| সরিষা | প্রতিরোধী স্তরের ক্ষতির ইঙ্গিত, ঝাঁঝে অস্বস্তি | ক্ষতির পক্ষে প্রমাণ |
| অলিভ | চার সপ্তাহে প্রতিরোধী স্তর দুর্বল, লালচে ভাব | ক্ষতির পক্ষে প্রমাণ |
| বাদাম | অ্যালার্জির ঝুঁকি, বিশেষত পারিবারিক ইতিহাস থাকলে | অপর্যাপ্ত প্রমাণ |
| মিনারেল অয়েল | ট্রায়ালে নারকেল তেলের চেয়ে পিছিয়ে | সীমিত প্রমাণ |
শাস্ত্রীয় বাল-তৈল আলাদা শ্রেণি। বল-তৈল, লক্ষাদি বা ক্ষীরবলা তৈলের মতো যোগগুলো একক তেল নয়, ভেষজ-সিদ্ধ প্রস্তুতি, তাই শিশুর ক্ষেত্রে এদের ব্যবহার নিবন্ধিত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকের পরামর্শে হওয়া উচিত, কারণ উপাদান ও মাত্রা প্রস্তুতকারকভেদে বদলায় এবং অজানা উৎসের মিশ্রণে ভেজালের ঝুঁকি থাকে।
তেল যাই বাছুন, দুটি শর্ত সব ক্ষেত্রেই খাটে। তেলটি খাদ্য-গ্রেড ও ভেজালমুক্ত হতে হবে, আর গন্ধ বদলে গেলে বা অনেক দিনের পুরোনো হয়ে গেলে সেটি ফেলে দিতে হবে, কারণ বাসি তেলে ত্বকে জ্বালাভাব হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাজারের খোলা তেল নয়।
সরিষার তেল কি নবজাতকের জন্য ঠিক?
নবজাতকের মালিশে সরিষার তেল প্রথম পছন্দ নয়, যদিও শীতকালে বাঙালি ঘরে এটিই সবচেয়ে চেনা অভ্যাস। কথাটা অস্বস্তিকর, তাই প্রমাণটা স্পষ্ট করে বলা দরকার।
২০২২ সালে Advances in Skin and Wound Care জার্নালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় ১৪টি নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল ও ৫,৬৮৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, নিয়মিত ব্যবহৃত তেলগুলোর মধ্যে বিশেষত সরিষা ও অলিভ তেল নবজাতকের ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এর আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, সরিষার তেল একবার লাগানোর পরেই ত্বকের কোষে সূক্ষ্ম গঠনগত পরিবর্তন ধরা পড়ে এবং প্রতিরোধী স্তরের সেরে ওঠা ধীর হয়ে যায়।
তবে ছবিটা একরঙা নয়। সরাসরি মুখোমুখি তুলনার সবচেয়ে বড় গবেষণাটি হলো BMC Pediatrics জার্নালে ২০১৯ সালে প্রকাশিত নেপালের একটি ক্লাস্টার-এলোমেলো ট্রায়াল (Summers ও সহকর্মীরা, ৯৯৫ জন নবজাতক), যেখানে সূর্যমুখী তেলে ত্বকের অম্লস্তর দ্রুত তৈরি হয়েছিল ও ২৮ দিনের মাথায় ত্বকের প্রোটিন বেশি ছিল, কিন্তু জল-হারানোর হার, লালচে ভাব, র্যাশ বা শুষ্কতায় দুই তেলের মধ্যে অর্থবহ পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
সৎ উপসংহারটা তাই মাঝামাঝি। সরিষার তেল মাখালেই শিশুর ক্ষতি হবে, এমন প্রমাণ নেই, কিন্তু বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলে নারকেল বা সূর্যমুখীই বেশি যুক্তিসঙ্গত। বড় শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও কম, তবে ঝাঁঝালো গন্ধে নাক-চোখে অস্বস্তি হতে পারে বলে অনেক শিশু-চিকিৎসক নবজাতকে এটি নিরুৎসাহিত করেন।
অলিভ অয়েল নিয়ে যে ভুলটা সবচেয়ে বেশি ছড়ায়
অলিভ অয়েল শিশুর মালিশের জন্য নিরাপদ নয়, অথচ বাংলা ইন্টারনেটে এটিকেই প্রায়ই নবজাতকের সবচেয়ে নিরাপদ তেল হিসেবে দেখানো হয়। এই একটি জায়গায় জনপ্রিয় পরামর্শ আর গবেষণা সরাসরি বিপরীত দিকে হাঁটছে।
মূল গবেষণাটি Pediatric Dermatology জার্নালে ২০১৩ সালে প্রকাশিত, Danby ও সহকর্মীদের কাজ। ঊনিশ জন স্বেচ্ছাসেবকের এক হাতে অলিভ অয়েল ও অন্য হাতে সূর্যমুখী তেল দিনে দুইবার করে চার সপ্তাহ লাগানো হয়েছিল। ফল স্পষ্ট। অলিভ অয়েল লাগানো দিকে ত্বকের প্রতিরোধী স্তরের দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় ও হালকা লালচে ভাব দেখা দেয়, আর সূর্যমুখী তেলের দিকে সেটি হয়নি, বরং আর্দ্রতা বেড়েছিল। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, শুষ্ক ত্বকের চিকিৎসায় ও শিশুর মালিশে অলিভ অয়েল ব্যবহার পরামর্শযোগ্য নয়।
একটা সীমাবদ্ধতা এখানে সৎভাবে বলা দরকার। গবেষণাটি প্রাপ্তবয়স্কদের হাতের ত্বকে করা হয়েছিল, নবজাতকের গায়ে নয়, আর গবেষকরা নিজেরাই একে নবজাতকের যত্নের জন্য ইঙ্গিতবাহী বলেছেন, চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। তবু যে তেলের পক্ষে কোনো অনুকূল ফল পাওয়া যায়নি এবং যেটির ক্ষতির ইঙ্গিত একাধিক গবেষণায় এসেছে, শিশুর নরম ত্বকে সেটি বেছে নেওয়ার কারণ থাকে না।
মালিশে আসলে কী প্রমাণ আছে
শিশুর তেল মালিশের পক্ষে প্রমাণ আছে, তবে সেটি নির্দিষ্ট কয়েকটি ফলাফলে সীমিত, আর সব দাবি সমান শক্তিশালী নয়।
সবচেয়ে সরাসরি প্রমাণটি নারকেল তেলের পক্ষে। Indian Pediatrics জার্নালে ২০০৫ সালে প্রকাশিত একটি এলোমেলো নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে (Sankaranarayanan ও সহকর্মীরা) নারকেল তেল, মিনারেল অয়েল ও প্লাসিবো পাউডার তুলনা করা হয়েছিল অপরিণত ও পূর্ণ-মেয়াদি দুই দলের নবজাতকে। অপরিণত শিশুদের ক্ষেত্রে নারকেল তেলে ওজন-বৃদ্ধির হার মিনারেল অয়েল ও প্লাসিবো দুটোর চেয়েই বেশি ছিল, আর পূর্ণ-মেয়াদি শিশুদের ক্ষেত্রে প্লাসিবোর চেয়ে বেশি। একই গবেষণায় স্নায়ু-আচরণগত মূল্যায়নে তিন দলের মধ্যে অর্থবহ কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ ওজনের সুবিধা মানেই বিকাশের সুবিধা নয়।
বিকাশের প্রশ্নে কোক্রেনের ২০০৪ সালের পর্যালোচনা (Vickers ও সহকর্মীরা) আরও স্পষ্ট। অপরিণত ও কম ওজনের শিশুদের মালিশে দৈনিক ওজন-বৃদ্ধি প্রায় ৫.১ গ্রাম বেড়েছিল এবং হাসপাতালে থাকার সময় কমেছিল, কিন্তু বিকাশ-সংক্রান্ত ফলাফলের পক্ষে প্রমাণকে পর্যালোচনাটি দুর্বল বলেছে এবং অন্তর্ভুক্ত গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
তাহলে মালিশ কেন করবেন? ওজন ও ত্বকের দিক থেকে যুক্তি আছে, আর কোমল স্পর্শ, নির্দিষ্ট সময়ে ঘটা একটি পরিচিত রুটিন আর গায়ে-গায়ে সময় কাটানোর মূল্য সংখ্যায় মাপা কঠিন হলেও বাস্তব। মালিশের পরে অনেক শিশু সহজে ঘুমিয়ে পড়ে বলে অভিভাবকরা জানান, যদিও ঘুমের সামগ্রিক নিয়ম আলাদা বিষয়। শুধু হাড় শক্ত হয় বা লম্বা হয়, এই ধরনের প্রচলিত দাবির পক্ষে প্রমাণ নেই।
ধাপে ধাপে ম্যাসাজের পদ্ধতি
সঠিক পদ্ধতির মূল কথা হলো কোমল স্পর্শ, উষ্ণ ঘর ও তাড়াহুড়োর অভাব। বেবি ম্যাসাজ কোনো কসরত নয়, চাপ দিয়ে হাড় বসানোর চেষ্টা তো নয়ই।
অনেক পরিবারে মালিশ ঘুমের আগের ধাপ হিসেবে দিনের রুটিনে বসানো হয়, আর একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘটা এই পুনরাবৃত্তিই শিশুকে স্থিতি দেয়, যেভাবে বড়দের ক্ষেত্রে দিনচর্যা কাজ করে। প্রস্তুতির ধাপগুলো সহজ। শিশুর খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পরে সময় বাছুন, ঘর গরম ও কোলাহলমুক্ত রাখুন, নরম কাপড়ের ওপর শোয়ান, নখ ছোট করে কেটে হাত ধুয়ে নিন এবং আংটি বা চুড়ি খুলে রাখুন। তেল গরম করুন ছোট বাটিতে গরম জলের ওপর বসিয়ে, সরাসরি আঁচে বা মাইক্রোওয়েভে নয়, কারণ অসমান তাপ ত্বক পুড়িয়ে দিতে পারে। লাগানোর আগে নিজের কব্জির ভেতরের দিকে এক ফোঁটা ফেলে দেখে নিন।
- মাথার তালুতে শুধু তেলের হালকা প্রলেপ, কোনো চাপ নয়।
- কপাল ও মুখে সামান্য, চোখ, নাক ও কানে যেন না ঢোকে।
- বুকে ও পেটে ঘড়ির কাঁটার দিকে গোল গতিতে, পেটে খুব হালকা হাতে।
- হাত ও পায়ে কাঁধ বা ঊরু থেকে শুরু করে আঙুলের দিকে।
- পিঠে ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত লম্বা টানে।
- পায়ের তলায় একটু বেশি সময়, শিশুরা সাধারণত এটি পছন্দ করে।
সময়ের হিসাব বয়স অনুযায়ী, নবজাতকে পাঁচ থেকে সাত মিনিট, এক মাসের পরে দশ মিনিট, ছয় মাসের পরে পনেরো মিনিট পর্যন্ত। নাভির গোড়া না শুকানো পর্যন্ত, সাধারণত সাত থেকে চোদ্দ দিন, ওই অংশ বাদ রাখুন। শিশু কাঁদলে বা অস্বস্তি দেখালে থামুন, জোর করে শেষ করার কিছু নেই।
গোসলের আগে না পরে?
তেল মালিশ গোসলের আগে করাই নিয়ম, আর দুইয়ের মাঝে দশ থেকে পনেরো মিনিট রাখা হয়। প্রশ্নটা ঘোরে অনেক, অথচ উত্তরটা সরল।
যুক্তিটা এরকম। মালিশের পরে কিছুক্ষণ সময় দিলে তেল ত্বকে বসে যায়, তারপর কুসুম-গরম জলে গোসল করালে উপরের বাড়তি তেলটুকু ধুয়ে যায় আর ত্বক আঠালো থাকে না। এক ঘণ্টার বেশি দেরি করলে খোলা গায়ে ধুলো বসে, আবার পাঁচ মিনিটের কম হলে তেল ঠিকমতো শোষিত হয় না। শীতকালে গোসলের ঘর আগে থেকে গরম করে নিন এবং গোসলের পরে দ্রুত মুছে নরম কাপড়ে জড়িয়ে নিন, কারণ ভেজা গায়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়াই এই বয়সে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
শীতে গোসলের পরে সামান্য তেল বা শিশু-উপযোগী ময়েশ্চারাইজার আবার লাগানো যায়। নাভি না শুকানো পর্যন্ত পুরো শরীর ডুবিয়ে গোসল না করিয়ে ভেজা কাপড়ে মুছিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।
মাথার ত্বক ও চুলে তেল
শিশুর মাথার ত্বকে তেল দেওয়া যায়, তবে উদ্দেশ্য চুল গজানো নয়, শুষ্কতা ও খুশকির মতো আঁশ নরম করা। তেল মাখালে চুল ঘন হবে, এই প্রচলিত দাবিটির পক্ষে প্রমাণ নেই।
জন্মের পরের কয়েক সপ্তাহে অনেক শিশুর মাথায় হলদেটে আঁশ জমে, ইংরেজিতে যাকে বলে ক্রেডল ক্যাপ। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজির তথ্য অনুযায়ী এটি একধরনের সেবোরিক ডার্মাটাইটিস, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে নিজে থেকেই সেরে যায় এবং এতে শিশুর কষ্ট হয় না। একই সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী গোসলের আগে মাথার ত্বকে তেল লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিলে আঁশ নরম হয়, তারপর শ্যাম্পু করার সময় কোমল হাতে ঘষে তুলে ফেলা যায়।
কয়েকটা কাজ এখানে করবেন না। আঁশ নখ দিয়ে খুঁটে তুলবেন না, কারণ ত্বক ছড়ে সংক্রমণ হতে পারে। মাথার নরম তালুতে চাপ দেবেন না। আর আঁশের জায়গা লাল হয়ে ফুলে উঠলে, পুঁজ দেখা দিলে বা শিশু অস্বস্তি দেখালে নিজে থেকে কিছু না করে চিকিৎসককে দেখান।
মাথার তালুতে চাপ দেওয়া যাবে না
শিশুর মাথার নরম তালুতে চাপ দিয়ে আকৃতি ঠিক করার পুরোনো অভ্যাসটি বিপজ্জনক এবং সম্পূর্ণ বর্জনীয়। কারণটা শারীরবৃত্তীয়।
নবজাতকের মাথার উপরের দিকে যে নরম জায়গাটি থাকে, তাকে বলে ফন্টানেল বা ব্রহ্মতালু। এটি সাধারণত নয় থেকে আঠারো মাস পর্যন্ত খোলা থাকে, কারণ মস্তিষ্ক তখনো দ্রুত বাড়ছে এবং খুলির হাড়গুলো তখনো পুরোপুরি জোড়া লাগেনি, ফলে ওই জায়গাটা আসলে মস্তিষ্কের ওপর একটা পাতলা আবরণ ছাড়া আর কিছু নয়। ওই জায়গায় চাপ দিলে সরাসরি মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে, আর মাথার আকৃতি টিপে বদলে দেওয়া যায় এই ধারণার পক্ষে কোনো ভিত্তি নেই।
একই ধরনের আরও কয়েকটি প্রচলিত অভ্যাস বাদ দেওয়া দরকার। শিশুর জিভের নিচের পর্দা নিজে থেকে কাটা যাবে না, এটি চিকিৎসকের কাজ। চোখে কাজল বা সুরমা দেওয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ কিছু কাজলে সীসা পাওয়া গেছে এবং শিশুর স্নায়ুতন্ত্রে সীসার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। আর কানে বা নাকে তেল ঢালা যাবে না। কোনো অবস্থাতেই নয়।
কে সতর্ক থাকবেন
কিছু অবস্থায় মালিশ স্থগিত রাখা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এগোনো দরকার, কারণ তখন উপকারের বদলে অস্বস্তি বা ক্ষতি হতে পারে। তালিকাটা ছোট। নিচের যেকোনো একটি অবস্থায় সেদিনের মালিশ বাদ দিলে কিছুই ক্ষতি হয় না, আর জোর করে চালিয়ে গেলেই ঝুঁকিটা তৈরি হয়।
- জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা সর্দি-কাশি চলাকালীন পুরো শরীরে মালিশ স্থগিত রাখুন।
- ত্বকে র্যাশ, একজিমা, ফুসকুড়ি, ক্ষত বা ছড়ে যাওয়া জায়গা থাকলে সেখানে তেল নয়।
- টিকা নেওয়ার দিন ও পরের চব্বিশ ঘণ্টা মালিশ বাদ রাখুন।
- অপরিণত বা কম ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরামর্শই চূড়ান্ত।
- পরিবারে বাদামের অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে বাদাম-তেল এড়িয়ে চলুন।
- নতুন কোনো তেল শুরুর আগে হাতের ছোট অংশে লাগিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা দেখে নিন।
- খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নয়, অন্তত এক ঘণ্টা পরে।
- ভেজাল বা অজানা উৎসের আয়ুর্বেদিক বাল-তৈল ব্যবহার করবেন না, নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়।
অপরিণত শিশুর ক্ষেত্রে কথাটা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ তাদের ত্বক আরও পাতলা এবং তার মধ্য দিয়ে তেলের উপাদান শরীরে ঢোকার হারও বেশি, তাই কী মাখানো হচ্ছে সেই প্রশ্নটা সেখানে আরও বেশি জরুরি। শিশুর সামগ্রিক রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রশ্নে অবশ্য মালিশের ভূমিকা গৌণ, সেখানে টিকা ও বুকের দুধই মূল।
একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
আমার এক বন্ধু, যিনি আজ শিশু-বিশেষজ্ঞ, একবার বলেছিলেন যে ছোটবেলায় মায়ের মালিশের সময় তিনি বুঝতেন না সেটি নিছক তেল লাগানো ছিল না, ওই দশ মিনিটে শিশু আসলে নিজের শরীরের মানচিত্র চিনতে শেখে, কোথায় কাঁধ, কোথায় কনুই, কোথায় পায়ের পাতা। কথাটা আমার মনে থেকে গেছে।
এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে অবশ্য অন্য একটা জিনিসও মনে হয়েছে। আমরা যে তেলটা নিয়ে সবচেয়ে কম প্রশ্ন করি, বাড়িতে যেটা বরাবর চলে আসছে, প্রশ্নটা ঠিক সেখানেই করা দরকার ছিল। (নিজের বাড়ির শিশিটার গায়ে কী লেখা আছে, সেটা দেখতে আমার তিরিশ বছর লেগে গেল।)
সংক্ষেপে
অভ্যাসটা থাক। শিশুর তেল মালিশ বা অভ্যঙ্গ ছাড়ার মতো কিছু নয়, তবে তেল বাছাইয়ের প্রশ্নে প্রচলিত পরামর্শ কয়েক জায়গায় বদলানো দরকার। নারকেল ও সূর্যমুখী তেলের পক্ষে প্রমাণ সবচেয়ে ভালো, অলিভ অয়েল ত্বকের প্রতিরোধী স্তরের ক্ষতি করে বলে গবেষণায় দেখা গেছে, আর নবজাতকে কাঁচা সরিষার তেল প্রথম পছন্দ হওয়ার কারণ নেই। মালিশ গোসলের আগে, কোমল হাতে, বয়স অনুযায়ী পাঁচ থেকে পনেরো মিনিট।
আজ বা কাল দুটো কাজ করে দেখতে পারেন। এক, বাড়িতে শিশুর মালিশের তেলের শিশিটা হাতে নিয়ে দেখুন কোন তেল, আর সেটি অলিভ বা সরিষা হলে পরের বার নারকেল বা সূর্যমুখী কিনে দেখুন। দুই, মালিশের সময় মাথার নরম জায়গাটায় কেউ যদি চাপ দেন, সেখানে বিনয়ের সঙ্গে থামান, কারণ ঝুঁকিটা এখানেই সবচেয়ে বেশি। শিশুর সামগ্রিক পরিচর্যার কাঠামো নিয়ে শিশুর আয়ুর্বেদিক যত্নের লেখাটি দেখতে পারেন, আর জীবনযাত্রার সব লেখা একসঙ্গে আছে জীবনযাত্রা বিভাগে।
সূত্র / Sources
- Danby SG, AlEnezi T, Sultan A, et al. Effect of olive and sunflower seed oil on the adult skin barrier, implications for neonatal skin care. Pediatric Dermatology, 2013, doi 10.1111/j.1525-1470.2012.01865.x।
- Sankaranarayanan K, Mondkar JA, Chauhan MM, et al. Oil massage in neonates, an open randomized controlled study of coconut versus mineral oil. Indian Pediatrics, 2005, 42(9):877-884, PMID 16208048।
- Summers A, Visscher MO, Khatry SK, et al. Impact of sunflower seed oil versus mustard seed oil on skin barrier function in newborns. BMC Pediatrics, 2019, PMID 31870338।
- Effects of Topical Oils on Neonatal Skin, a Systematic Review. Advances in Skin and Wound Care, 2022, journals.lww.com।
- Vickers A, Ohlsson A, Lacy JB, Horsley A. Massage for promoting growth and development of preterm and low birth-weight infants. Cochrane Database of Systematic Reviews, 2004, CD000390.pub2।
- American Academy of Dermatology. How to treat cradle cap, aad.org।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

নারীস্বাস্থ্য, বয়স অনুযায়ী কী দেখবেন ও আয়ুর্বেদ কী বলে
নারীস্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ গাইড, বয়সের চার ধাপে কী দেখা দরকার, ঋতুচক্র, রক্তাল্পতা ও মেনোপজে প্রমাণ কী বলে, আর কোন লক্ষণে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।

ডেঙ্গু জ্বরে আয়ুর্বেদিক পরিচর্যা, পেঁপে পাতা ও পথ্য
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, কখন হাসপাতাল জরুরি, পেঁপে পাতা ও প্লেটলেট নিয়ে গবেষণা, গিলয়-তুলসীর সহায়ক ভূমিকা এবং সুস্থ হওয়ার পথ্য, আধুনিক ও আয়ুর্বেদিক বাংলা গাইড।

উদ্বেগ ও আয়ুর্বেদ — অ্যাংজাইটি ব্যবস্থাপনার শাস্ত্রীয় ভেষজ পদ্ধতি
উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির আয়ুর্বেদিক বিশ্লেষণ, বাত-প্রকোপের কারণ, অশ্বগন্ধা, ব্রাহ্মী, অভ্যঙ্গ ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ বাংলা গাইড।