রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায়, কোনটা কাজ করে কোনটা নয়
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, কোন খাবার ও অভ্যাস সত্যিই কাজে লাগে, গিলয় ও আশ্বগন্ধায় লিভারের ঝুঁকি কতটা, আর কারা সতর্ক থাকবেন।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

কোভিডের সময় ভারত ও বাংলাদেশে গিলয়ের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল, কারণ প্রায় প্রতিটি ঘরে তখন একটাই আলোচনা, ইমিউনিটি। তার কয়েক মাস পরেই ভারতের হাসপাতালগুলো থেকে অন্য একটা খবর আসতে শুরু করে, ওই একই ভেষজ খেয়ে কিছু মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুটো খবর একসঙ্গে পড়লে এই লেখার দরকারটা বোঝা যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় বলতে আয়ুর্বেদ কোনো একক ভেষজ বোঝায়নি, বুঝিয়েছে ঘুম, হজম, ঋতু, পরিশ্রম ও মানসিক চাপ মিলিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার শাস্ত্রীয় নাম ব্যাধিক্ষমত্ব। আধুনিক ইমিউনোলজিও মোটামুটি একই জায়গায় দাঁড়ায়, তবে আরও কড়া ভাষায়, প্রতিরোধ ক্ষমতা এমন কোনো মিটার নয় যার কাঁটা ইচ্ছেমতো উপরে তোলা যায়।
এই লেখায় প্রতিটি দাবির পিছনে প্রমাণের ওজন আলাদা করে দেখানো হয়েছে, কোনটার পক্ষে গবেষণা আছে, কোনটা কেবল ঐতিহ্য, আর কোনটার সঙ্গে বাস্তব ঝুঁকি জড়িয়ে আছে। শেষেরটাই সবচেয়ে কম আলোচিত।
এক নজরে, কোন উপায়ের পিছনে কতটা প্রমাণ
প্রতিটি উপায়ের পিছনে প্রমাণের ওজন এক নয়, আর সেই পার্থক্যটাই এই লেখার মূল বিষয়। তালিকা সবাই দেয়। প্রমাণের ওজন কেউ দেয় না, অথচ ঘুম আর একটা ক্যাপসুলকে একই তালিকায় পাশাপাশি বসিয়ে দিলে পাঠক বুঝবেন কী করে কোনটায় ভরসা রাখা যায় আর কোনটায় নয়।
| উপায় | প্রমাণের মাত্রা | সংক্ষেপে |
|---|---|---|
| পর্যাপ্ত ঘুম | মাঝারি প্রমাণ | ১৬৪ জনের উপর করা Prather ২০১৫ গবেষণায় কম ঘুমে সর্দির ঝুঁকি স্পষ্ট বেশি |
| সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত প্রোটিন | মাঝারি প্রমাণ | ঘাটতি সারালে প্রতিরক্ষা ভাল হয়, উদ্বৃত্ত খেলে বাড়ে না |
| ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট, ঠান্ডা ঠেকাতে | সীমিত প্রমাণ | কোক্রেন বলছে ঠেকায় না, স্থায়িত্ব সামান্য কমায় |
| মানসিক চাপ কমানো ও পরিমিত ব্যায়াম | সীমিত প্রমাণ | যুক্তিসঙ্গত, তবে সরাসরি ইমিউন-ফলাফলের প্রমাণ পাতলা |
| রসায়ন ভেষজ, যেমন চ্যবনপ্রাশ ও তুলসী | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | শাস্ত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত, বড় মানব ট্রায়াল নেই |
| গিলয় বা গুডুচী | ঝুঁকি নথিভুক্ত | LiverTox-এ লিভার ক্ষতির কারণ হিসেবে A শ্রেণিভুক্ত |
| একক "ইমিউনিটি বুস্টার" পণ্য | অপর্যাপ্ত প্রমাণ | কোনো নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নেই |
সারণির শেষ দুটি সারি বাংলা ইন্টারনেটে প্রায় কোথাও এভাবে লেখা হয় না। অথচ পাঠকের সবচেয়ে বেশি দরকার ঠিক ওই দুটোই।
"ইমিউনিটি বাড়ানো" কথাটা কি আদৌ ঠিক?
"ইমিউনিটি বাড়ানো" কথাটা বিজ্ঞানসম্মত ভাষা নয়, এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের হেলথ পাবলিশিং সরাসরি সেটাই লিখেছে। তাদের ভাষায়, ইমিউনিটি বুস্ট করার ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে তেমন অর্থবহ নয়, কারণ শরীরে কোষের সংখ্যা বাড়ানো নিজে থেকে ভাল কিছু নয়।
কারণটা সহজ। ইমিউন সিস্টেম একটিমাত্র অঙ্গ নয়, বহু ধরনের কোষ ও সংকেতের একটা সমন্বিত ব্যবস্থা, আর সেটি ভাল কাজ করে ভারসাম্যে, বাড়াবাড়িতে নয়। কোন কোষ কতটা বাড়ালে উপকার হবে, সেটাই এখনো জানা নেই। বাড়াবাড়ি ইমিউন সক্রিয়তার নামই তো অ্যালার্জি আর অটোইমিউন রোগ।
হার্ভার্ডের ওই পাতাটি আরও একটা অস্বস্তিকর কথা বলে, জীবনযাত্রা আর উন্নত ইমিউন কার্যকারিতার মধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সরাসরি যোগ এখনো নেই। তারা তবু স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের পক্ষেই মত দেয়, কারণ ঘুম, খাবার ও পরিশ্রমের অন্য উপকারগুলো ভালভাবে প্রমাণিত, খরচ নেই, ঝুঁকি নেই, আর ইমিউন সিস্টেমের উপকার হলে সেটা বাড়তি লাভ।
আমার কাছে এই সততাটাই কাজের। "বাড়ানো" নয়, "ভারসাম্য রাখা", এই শব্দবদলটুকু করলে বাকি আলোচনাটা অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়। মজার ব্যাপার, আয়ুর্বেদের ব্যাধিক্ষমত্ব ধারণাও কিন্তু ভারসাম্যের ভাষাতেই কথা বলে, বাড়ানোর ভাষায় নয়।
ওজস, আয়ুর্বেদের ইমিউনিটি-শক্তি
ওজস হলো আয়ুর্বেদ-বর্ণিত একটি সূক্ষ্ম জীবনীশক্তি, যাকে সাত ধাতুর পরিপূর্ণ পরিণতি ও শরীরের প্রতিরক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। সংস্কৃতে শব্দটি প্রায় "জীবন-সার" বা "প্রাণ-সার" অর্থে ব্যবহৃত। রস, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, মজ্জা ও শুক্র, এই সাত ধাতু ঠিকঠাক পুষ্ট হলে তবেই ওজস তৈরি হয় বলে শাস্ত্রে বলা হয়েছে।
ওজস কেমন আছে, তা শরীর নিজেই জানিয়ে দেয় বলে চরক সংহিতায় বর্ণনা আছে। লক্ষণগুলো দুই দিক থেকে দেখা হয়েছে।
| ওজস ভাল থাকলে | ওজস ক্ষীণ হলে |
|---|---|
| ত্বকে দীপ্তি ও জৌলুস | ত্বকের জৌলুস হারিয়ে যাওয়া |
| ভাল প্রতিরোধ ক্ষমতা | ঘন ঘন সর্দি ও সংক্রমণ |
| মানসিক স্থিরতা | উদ্বেগ ও অস্থিরতা |
| অবিচল শক্তি ও সহনশীলতা | অল্পেই ক্লান্তি |
আধুনিক ভাষায় ওজস আর ইমিউনিটি ঠিক এক জিনিস নয়, এবং এই দুটোকে মিলিয়ে ফেলা ভুল হবে। মিলটা ধারণাগত, কারণ দুটিতেই শরীরের নানা সিস্টেম জুড়ে একটা সমন্বিত প্রতিরক্ষার কথা বলা হয়েছে যেখানে কোনো একটিমাত্র অঙ্গ বা একটিমাত্র উপাদান একা পুরো দায়িত্ব নেয় না। তফাতটাও মনে রাখা দরকার, ওজস মাপা যায় না, শ্বেত রক্তকণিকা মাপা যায়।
ব্যাধিক্ষমত্বের তিনটি স্তর
ব্যাধিক্ষমত্ব হলো রোগের সঙ্গে শরীরের লড়ার ক্ষমতা, এবং চরক সংহিতা একে তিন ভাগে ভাগ করেছে। প্রতিটি স্তরের উৎস আলাদা, এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণও আলাদা।
| প্রকার | ভিত্তি | আমাদের হাতে? |
|---|---|---|
| সহজ | জন্মগত, প্রকৃতিদত্ত | না, পরিবর্তন করা যায় না |
| কালজ | বয়স ও ঋতু-নির্ভর | আংশিক, শৈশব ও বার্ধক্যে কম |
| যুক্তিকৃত | অভ্যাস, খাদ্য ও রসায়নে অর্জিত | হ্যাঁ, এটিই আমাদের হাতে |
সব নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই। বয়স বাড়লে প্রতিরক্ষা স্বাভাবিকভাবেই বদলায়, আধুনিক ভাষায় যাকে ইমিউনোসেনেসেন্স বলা হয়, আর শাস্ত্রের "কালজ" ভাগটি ঠিক সেই কথাই অন্যভাবে বলেছে বহু শতাব্দী আগে, যদিও তখন কোষ বা অ্যান্টিবডির কোনো ধারণাই ছিল না। তবু "যুক্তিকৃত" অংশটি যথেষ্ট বড়, এবং এই লেখার বাকি অংশ মূলত সেই অর্জনযোগ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়েই।
ব্যাধিক্ষমত্ব বাড়ানোর সাতটি স্তম্ভ
যুক্তিকৃত ব্যাধিক্ষমত্ব, অর্থাৎ অভ্যাসে অর্জিত প্রতিরোধ ক্ষমতা, মূলত সাতটি দৈনন্দিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ভেষজ এই তালিকার শেষে, শুরুতে নয়, আর সেটাই আসল কথা।
১. পরিপূর্ণ ঘুম
পরিপূর্ণ ঘুম এই তালিকার সবচেয়ে ভাল-প্রমাণিত স্তম্ভ, কারণ এখানেই সবচেয়ে নির্দিষ্ট মানব-গবেষণা আছে। বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়। Prather ও সহলেখকদের ২০১৫ সালের গবেষণায় (Sleep জার্নাল, ৩৮ খণ্ড, ৯ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১৩৫৩ থেকে ১৩৫৯, PMID 26118561) ১৬৪ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের ঘুম সাত দিন ধরে হাতে-পরা অ্যাক্টিগ্রাফ দিয়ে মাপা হয়েছিল, তারপর তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে সর্দির ভাইরাসের সংস্পর্শে আনা হয়। যাঁরা রাতে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন, তাঁদের সর্দি ধরার সম্ভাবনা ৭ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোদের তুলনায় ছিল প্রায় ৪.২ গুণ, আর ৫ ঘণ্টার কম ঘুমানোদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪.৫ গুণ। নমুনা ছোট বলে আস্থার পরিসরটি চওড়া, সেটাও বলে রাখা দরকার। বিস্তারিত ঘুমের লেখায়।
২. সঠিক হজম শক্তি
সঠিক হজম শক্তি বা অগ্নি ভাল থাকলে শরীরে আম বা অপাচিত বর্জ্য জমে না বলে আয়ুর্বেদ মনে করে। ভাল হজম মানে কম প্রদাহ, আর কম প্রদাহ মানে ভাল ইমিউনিটি, এই যোগসূত্রটি আধুনিক গবেষণাতেও আলোচিত, যদিও অন্ত্র ও প্রতিরক্ষার সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। বিস্তারিত অগ্নি দীপনের লেখায়।
৩. মৌসুমি খাবার
মৌসুমি খাবার মানে প্রকৃতি যে ঋতুতে যা দিচ্ছে সেটাই খাওয়া, যা আয়ুর্বেদে ঋতুচর্যার কেন্দ্রীয় নীতি। টাটকা মৌসুমি ফল ও সবজিতে সাধারণত পুষ্টিগুণ বেশি থাকে, কারণ সংরক্ষণ ও দীর্ঘ পরিবহণে কিছু ভিটামিন নষ্ট হয়। বিস্তারিত ঋতুচর্যার লেখায়।
৪. পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম
পরিমিত শারীরিক পরিশ্রম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রমাণিতভাবে উপকারী, তবে এটি সরাসরি ইমিউনিটি বাড়ায় বলে দাবি করার মতো জোরালো প্রমাণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের শারীরিক সক্রিয়তা নির্দেশিকা (Bull ও সহলেখক, British Journal of Sports Medicine, ৫৪ খণ্ড, ২৪ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১৪৫১ থেকে ১৪৬২) প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার পরিশ্রমের কথা বলেছে, অর্থাৎ দিনে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা, যোগ বা সাইক্লিং ওই পরিসরের ভিতরেই পড়ে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের পরে সাময়িকভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে কি না তা নিয়ে ক্রীড়াবিজ্ঞানে বহু বছরের বিতর্ক আছে এবং বিষয়টি এখনো মীমাংসিত নয়, তাই এখানে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
৫. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ইমিউনিটির এক অবহেলিত স্তম্ভ, কারণ দীর্ঘমেয়াদি চাপে কর্টিসল বেশি থাকে এবং সেটি প্রতিরক্ষা কোষের কাজে প্রভাব ফেলে বলে গবেষণায় আলোচিত হয়েছে। প্রাণায়াম, ধ্যান, বই পড়া, প্রকৃতিতে সময় কাটানো, সবই কাজে লাগে। বিস্তারিত মানসিক চাপ কমানোর লেখায়।
৬. বিষাক্ত পদার্থ এড়ানো
বিষাক্ত পদার্থ এড়ানো মানে শরীরে যা প্রতিরক্ষা দুর্বল করে সেগুলো দূরে রাখা। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ, সবই এই তালিকায়। আয়ুর্বেদ এদের মিথ্যা আহার-বিহার বলেছে।
৭. রসায়ন ভেষজ, পরিমিত ও পরিকল্পিত
রসায়ন হলো আয়ুর্বেদের সেই ভেষজ-শ্রেণি, যা দীর্ঘ ও পরিমিত ব্যবহারে ধাতু ও ওজস পুষ্ট করে বলে শাস্ত্রে বলা হয়েছে। এগুলো ভিত্তি নয়, ভিত্তির ওপরে বসানো সহায়ক স্তর। কোন ভেষজগুলো এবং কোনটির পিছনে কতটুকু প্রমাণ, সেটাই পরের অংশে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে খাবারের ভূমিকা
খাবারের ভূমিকা এখানে মূলত ঘাটতি পূরণের, উদ্বৃত্ত জোগানোর নয়, আর এই পার্থক্যটা বাংলা খাদ্য-তালিকাগুলোয় প্রায় কখনো বলা হয় না। ঘাটতি থাকলে খাবার সত্যিই কাজ করে। না থাকলে বাড়তি খেয়ে বাড়তি সুরক্ষা কেনা যায় না, আর এই সহজ কথাটা বুঝলে বাজারের অর্ধেক পণ্যের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
প্রোটিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক ও আয়রনের ঘাটতি থাকলে প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়, এবং ঘাটতি সারালে সেটি আবার ফিরে আসে, যে কারণে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের উন্নতি সবচেয়ে বড় ফারাক গড়ে দেয়। কিন্তু ঘাটতি না থাকলে আরও বেশি খেয়ে প্রতিরক্ষা আরও উপরে তোলা যায়, এমন প্রমাণ নেই। ডাল, ডিম, মাছ, দই, বাদাম, মৌসুমি শাকসবজি ও রঙিন ফল, এই সাধারণ থালিটুকুই কাজের।
ভিটামিন সি নিয়ে একটা প্রচলিত ধারণা এখানে সংশোধন করা দরকার। Hemila ও Chalker-এর ২০১৩ সালের কোক্রেন পদ্ধতিগত পর্যালোচনা (CD000980) অনুযায়ী নিয়মিত ভিটামিন সি সাধারণ জনগোষ্ঠীতে সর্দি হওয়া ঠেকায় না। যা করে তা হলো সর্দির স্থায়িত্ব সামান্য কমায়, বড়দের ক্ষেত্রে প্রায় ৮ শতাংশ আর শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ শতাংশ। আট শতাংশ মানে সাত দিনের সর্দি সাড়ে ছয় দিন। উপকার আছে, কিন্তু ক্যাপসুলের বিজ্ঞাপন যতটা বলে ততটা নয়।
আপনি কি লক্ষ করেছেন, খাদ্য-তালিকার লেখাগুলোয় প্রায় সবসময় "এই খাবারটি ইমিউনিটি বাড়ায়" লেখা থাকে, কিন্তু "কতটা" বা "কার ক্ষেত্রে" লেখা থাকে না? ওই দুটো প্রশ্নই আসল।
ইমিউনিটি-সহায়ক ভেষজ, আর প্রতিটির প্রমাণের ওজন
আয়ুর্বেদে কয়েকটি রসায়ন ভেষজকে ইমিউনিটি-সহায়ক বলে গণ্য করা হয়, তবে এদের প্রমাণের ওজন সমান নয় এবং একটির ক্ষেত্রে বাস্তব ঝুঁকিও নথিভুক্ত।
| ভেষজ | প্রমাণের মাত্রা | মূল কথা |
|---|---|---|
| আমলকী | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | ভিটামিন সি-র প্রাকৃতিক উৎস, খাদ্য হিসেবে নিরাপদ |
| তুলসী | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | দৈনন্দিন ঘরোয়া রসায়ন, বড় ট্রায়াল নেই |
| হলুদ ও কারকুমিন | সীমিত প্রমাণ | প্রদাহরোধী প্রভাব তুলনায় ভাল-অধ্যয়িত |
| চ্যবনপ্রাশ | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | ক্লাসিকাল প্রস্তুতি, বড় মানব প্রমাণ নেই |
| আশ্বগন্ধা | সীমিত প্রমাণ, ঝুঁকি নথিভুক্ত | LiverTox-এ লিভার ক্ষতির সম্ভাব্য কারণ, B শ্রেণি |
| গিলয় বা গুডুচী | ঝুঁকি নথিভুক্ত | LiverTox-এ প্রতিষ্ঠিত কারণ, A শ্রেণি |
আমলকী (Phyllanthus emblica), শাস্ত্রে যার আরেক নাম ধাত্রী, আয়ুর্বেদে অন্যতম প্রধান রসায়ন ফল, আর খাদ্য হিসেবে এটি নিরাপদ ও পরিচিত। বিস্তারিত আমলকীর লেখায়। তুলসী (Ocimum tenuiflorum, পুরনো নামে Ocimum sanctum) দৈনন্দিন ঘরোয়া রসায়ন হিসেবে ব্যবহৃত, সকালে কয়েকটি কাঁচা পাতা কিংবা এক কাপ গরম চায়ের ঝাঁঝালো সুগন্ধ, সহজ অভ্যাস, বিস্তারিত তুলসীর লেখায়। হলুদ (Curcuma longa), সংস্কৃতে হরিদ্রা, ও কারকুমিন নিয়ে বিস্তারিত কাঁচা হলুদের লেখায়।
চ্যবনপ্রাশ বহু ভেষজ মিশিয়ে তৈরি একটি আমলকী-ভিত্তিক ক্লাসিকাল প্রস্তুতি, যা শীতে এক চা চামচ করে অনেক বঙ্গীয় পরিবারে আজও চলে। ভারতের আয়ুষ মন্ত্রক কোভিডের সময় যে স্বনির্ভর পরিচর্যার নির্দেশিকা দিয়েছিল, তাতে চ্যবনপ্রাশ ছিল, এবং সেই উদ্যোগের কথা Journal of Ayurveda and Integrative Medicine-এ কোটেচার ২০২১ সালের লেখায় নথিভুক্ত আছে। ত্রিফলা হজম ও পরিপাকতন্ত্রের পরিচর্যায় কেন্দ্রীয়, বিস্তারিত ত্রিফলার লেখায়।
আশ্বগন্ধা (Withania somnifera), সংস্কৃতে অশ্বগন্ধা, নিয়ে একটা সতর্কতা যোগ করা দরকার যা আগে এই লেখায় ছিল না। NIH-এর LiverTox ডেটাবেস আশ্বগন্ধাকে লিভার ক্ষতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে B শ্রেণিতে রেখেছে, প্রায় ২৩টি নথিভুক্ত ঘটনার ভিত্তিতে, যেখানে সাধারণত শুরু করার ২ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে জন্ডিস ও চুলকানি দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওষুধ বন্ধ করলে ১ থেকে ৪ মাসে সেরে যায়, তবে মৃত্যুর ঘটনাও বর্ণিত আছে, আর LiverTox স্পষ্ট বলেছে সিরোসিস বা উন্নত দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ থাকলে এটি এড়ানো উচিত। বিস্তারিত আশ্বগন্ধার লেখায়।
গিলয় খাওয়া কি নিরাপদ?
গিলয় বা গুডুচী (Tinospora cordifolia) সবার জন্য নিরাপদ নয়, এবং এই ভেষজটি নিয়ে গত কয়েক বছরে যে তথ্য জমা হয়েছে তা বাংলা ইন্টারনেটে প্রায় কোথাও নেই।
NIH-এর LiverTox ডেটাবেস Tinospora cordifolia-কে লিভার ক্ষতির প্রতিষ্ঠিত কারণ হিসেবে A শ্রেণিতে রেখেছে, যা তাদের বিচারে সর্বোচ্চ নিশ্চয়তার শ্রেণি। LiverTox-এর ২৭ জুন ২০২৫ তারিখে হালনাগাদ করা অধ্যায় অনুযায়ী ২০১৭ সাল থেকে ৫০টির বেশি স্পষ্ট লিভার ক্ষতির ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, বেশিরভাগই ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে, কিছু জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও।
সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। LiverTox যে ভারতীয় বহুকেন্দ্রিক গবেষণার কথা জানিয়েছে, তাতে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৩ জন রোগী নথিভুক্ত হয়েছিলেন, অর্থাৎ ঠিক সেই সময়ে যখন কোভিডের কারণে ইমিউনিটি বাড়ানোর পরামর্শে গিলয়ের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ছিল। LiverTox ওই সিরিজে ৪ জনের মৃত্যু ও ২টি লিভার প্রতিস্থাপনের কথা লিখেছে। উল্লেখ্য, নাগরাল ও সহলেখকদের ২০২২ সালের পর্যালোচনায় ওই একই সিরিজ প্রসঙ্গে ২টি মৃত্যুর কথা আছে, অর্থাৎ সংখ্যাটি নিয়ে উৎসভেদে পার্থক্য আছে, আর মূল গবেষণাপত্রটি আমি নিজে খুলে দেখতে পারিনি বলে এখানে LiverTox-এর হিসাবটিই উদ্ধৃত করলাম।
ক্ষতির চেহারাটা কেমন। LiverTox অনুযায়ী মূলত হেপাটোসেলুলার ধরনের ক্ষতি, ALT ও AST স্বাভাবিকের ঊর্ধ্বসীমার ১০ থেকে ৫০ গুণ পর্যন্ত, অর্থাৎ ৫০০ থেকে ৩০০০ ইউনিট প্রতি লিটার। উপসর্গ শুরু হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে ৬ মাস, সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ। ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে ANA বা অটোঅ্যান্টিবডি ধরা পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে লিভার বায়োপসিতে অটোইমিউন হেপাটাইটিসের চেহারা মিলেছে। দিনে ৯০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় ৪ থেকে ৫ সপ্তাহ খেয়েও ক্ষতি হয়েছে, অর্থাৎ বিশাল মাত্রা লাগেনি।
নাগরাল ও সহলেখকদের ছয়জনের কেস সিরিজে (Journal of Clinical and Experimental Hepatology, ২০২৩, ১৩ খণ্ড, ২ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৩৬০ থেকে ৩৭১) বিলিরুবিন ছিল ৯.১ থেকে ৪৫.১ মিগ্রা প্রতি ডেসিলিটার আর ট্রান্সঅ্যামিনেজ ৪৫৫ থেকে ৩১১৪ ইউনিট প্রতি লিটার। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হলো, ক্ষতিটা ভুল গাছ চিনে নেওয়ার ফল নয়। অর্থাৎ Tinospora crispa নামের অন্য একটি পরিচিত বিষাক্ত প্রজাতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার কারণে নয়, Tinospora cordifolia নিজেই দায়ী, আর সম্ভাব্য প্রক্রিয়াটি হলো ভেষজটির ইমিউনোমডুলেটরি ক্রিয়া থেকেই অটোইমিউন ধাঁচের হেপাটাইটিস শুরু হওয়া। প্রায় সব ক্ষেত্রেই রোগীরা নিজে থেকে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাচ্ছিলেন।
এখানে একটা তিক্ত বিদ্রূপ আছে যেটা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। যে গুণটির জন্য গিলয়ের এত নাম, অর্থাৎ ইমিউন সিস্টেমকে উদ্দীপ্ত করা, ক্ষতির সম্ভাব্য কারণও ঠিক সেটাই। এই লেখার আগের সংস্করণে গিলয়কে শুধু "সবচেয়ে চর্চিত ইমিউনোমডুলেটর" বলা হয়েছিল আর সতর্কতা ছিল কেবল অটোইমিউন রোগীদের জন্য। আজকের প্রমাণে সেটা যথেষ্ট নয়। বিস্তারিত গিলয়ের লেখায়, যদিও সেখানেও এই তথ্য যোগ হওয়া বাকি।
ভয় পাওয়ার কথা বলছি না। LiverTox নিজেই লিখেছে বেশিরভাগ রোগী ৬ মাসের মধ্যে পুরোপুরি সেরে উঠেছেন, আর গিলয় যত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় তার তুলনায় নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা অল্প। কিন্তু বিরল আর শূন্য এক নয়, বিশেষত যখন জিনিসটা রোগ সারাতে নয়, নিছক "ইমিউনিটির জন্য" খাওয়া হচ্ছে।
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভিত্তি খাবার, ঘুম, টিকা ও পরিচ্ছন্নতা, ভেষজ নয়, এবং এই ক্রমটাই সবচেয়ে জরুরি।
শিশুরা বছরে বেশ কয়েকবার সর্দিকাশিতে ভোগে, আর সেটা দুর্বল ইমিউনিটির প্রমাণ নয়, বরং ইমিউন সিস্টেমের শেখার প্রক্রিয়া। ঘন ঘন অসুস্থ হওয়া মানেই ঘাটতি, এই ধারণাটা ভুল। যা সত্যিই দেখার, তা হলো সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতা, ঘন ঘন নিউমোনিয়া, বারবার হাসপাতালে ভর্তি বা ক্ষত শুকোতে অস্বাভাবিক দেরি হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার, ভেষজ নয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যে ভেষজগুলো আলোচিত, সেগুলো শিশুর ক্ষেত্রে একই মাত্রায় ভাবা যায় না। গিলয় ও আশ্বগন্ধা, দুটিরই লিভার সংক্রান্ত নথিভুক্ত ঘটনা আছে, তাই নিজে থেকে শিশুকে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দুধে এক চিমটি হলুদ বা পরিমিত আমলকীর মুরাব্বার মতো খাদ্য-পর্যায়ের অভ্যাস আলাদা কথা। বিস্তারিত শিশুদের আয়ুর্বেদিক যত্নের লেখায়।
দৈনিক ইমিউন রুটিন, একটি নমুনা
একটি ভাল দৈনন্দিন রুটিন মানে বড় কোনো পরিবর্তন নয়, বরং সারা দিনে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ছোট অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। ধারাবাহিকতাই আসল। নিচের নমুনাটি সকালের দিনচর্যার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়।
| সময় | অভ্যাস |
|---|---|
| ভোর ৬টা | ঘুম থেকে উঠুন |
| ৬:১৫ | কুসুম গরম জল, এক চা চামচ মধু |
| ৬:৩০ থেকে ৭:০০ | ২০ মিনিট প্রাণায়াম ও হালকা যোগ |
| ৭:৩০ | তুলসী চা, এক চা চামচ চ্যবনপ্রাশ (শীতে) |
| ৮:৩০ | পুষ্টিকর জলখাবার, দই, ফল, বাদাম |
| ১২:৩০ থেকে ১:৩০ | প্রধান খাবার, সম্পূর্ণ থালি |
| ৪:০০ | হালকা স্ন্যাক, এক কাপ আদা চা |
| ৬:৩০ | একটু রোদে হাঁটা |
| ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ | হালকা রাতের খাবার |
| ৯:৪৫ | এক কাপ গরম হলুদ দুধ |
| ১০:০০ | ঘুম |
এই রুটিন শুরু করলেই সঙ্গে সঙ্গে বদল আশা না করাই ভাল। কয়েক সপ্তাহ একটানা মেনে চললে অনেকেই কিছুটা পার্থক্য অনুভব করেন, যদিও সবার ক্ষেত্রে একইরকম হবে এমন নিশ্চয়তা নেই এবং এই ধরনের অনুভূতি মেপে দেখা কঠিন।
কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন
ইমিউনিটি-সহায়ক বলে পরিচিত ভেষজগুলোও কয়েকটি ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তাই নিচের অবস্থায় সতর্কতা জরুরি। এটাই এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
| অবস্থা | সতর্কতা |
|---|---|
| লিভারের রোগ, সিরোসিস বা ফ্যাটি লিভার | গিলয় ও আশ্বগন্ধা এড়ানোই নিরাপদ, LiverTox সিরোসিসে আশ্বগন্ধা এড়াতে বলেছে |
| অটোইমিউন রোগ (লুপাস, MS, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাশিমোটো) | গিলয়, আশ্বগন্ধা ও তুলসী প্রতিরক্ষা অতিরিক্ত উদ্দীপ্ত করতে পারে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয় |
| ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ওষুধ গ্রহণকারী (ট্রান্সপ্ল্যান্ট, কেমোথেরাপি) | কোনো ইমিউন-উদ্দীপক ভেষজ নয় |
| গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান | রসায়ন ভেষজ চিকিৎসকের পরামর্শে, নিজে থেকে নয় |
| শিশু | ভেষজের মাত্রা ও সহনশীলতা ভিন্ন, গিলয় ও আশ্বগন্ধা নিজে থেকে নয় |
| ক্রনিক রোগ (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ) | ভেষজ ও ওষুধের মিথস্ক্রিয়ার সম্ভাবনা থাকে |
ভেষজ খাওয়ার সময় জন্ডিস, প্রস্রাব গাঢ় হওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি ভাব বা পেটের ডান দিকে উপরে ব্যথা দেখা দিলে ভেষজ বন্ধ করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। এগুলো লিভারের সমস্যার পরিচিত লক্ষণ।
আর একটা কথা, যেটা কোনো ভেষজ-তালিকা বলে না। ঘন ঘন গুরুতর সংক্রমণ, একই জায়গায় বারবার ফোড়া, ক্ষত শুকোতে অস্বাভাবিক দেরি বা ব্যাখ্যাহীন ওজন কমা, এগুলো "ইমিউনিটি কম" ভেবে ঘরোয়া উপায়ে সামলানোর বিষয় নয়, এগুলো পরীক্ষা করানোর বিষয়। মরসুমি সর্দি-কাশিতে ঘরোয়া টোটকা যতটা কাজে লাগে, এই ধরনের উপসর্গে ততটাই অপ্রাসঙ্গিক, দুটো গুলিয়ে ফেলবেন না।
আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে
আধুনিক বিজ্ঞান আয়ুর্বেদিক রসায়ন ভেষজের সম্ভাবনাকে স্বীকার করলেও জোরালো মানব-প্রমাণের অভাবের কথা স্পষ্ট বলে। বেশিরভাগ গবেষণাই ইন-ভিট্রো বা প্রাণী-পর্যায়ের, মানব ট্রায়াল কম এবং সাধারণত ছোট নমুনার।
ভারতের আয়ুষ মন্ত্রক কোভিডের সময় স্বনির্ভর পরিচর্যার নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল, আর একই সঙ্গে আয়ুষ হস্তক্ষেপ নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার ঠেকাতে নির্দেশ জারি করেছিল, দুটোর কথাই মন্ত্রকের তৎকালীন সচিব রাজেশ কোটেচার ২০২১ সালের নিবন্ধে (Journal of Ayurveda and Integrative Medicine, ১২ খণ্ড, ১ সংখ্যা) নথিভুক্ত আছে। ওই দ্বিমুখী অবস্থানটিই আসলে ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়, ঘরোয়া পরিচর্যা এক জিনিস, নিরাময়ের দাবি আরেক।
আধুনিক ইমিউনোলজিস্টরা একটি বিষয়ে একমত, ভেষজকে টিকা বা প্রমাণিত চিকিৎসার বিকল্প ভাবা ঠিক নয়। গিলয়ের কেস সিরিজগুলো তার সবচেয়ে কড়া উদাহরণ, কারণ সেখানে ক্ষতিটা এসেছিল ঠিক সেই অভ্যাস থেকেই, নিজে থেকে "ইমিউনিটির জন্য" ভেষজ খাওয়া। হাইপ এড়িয়ে সতর্ক আশাবাদে থাকাই ভাল।
একটি ছোট ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
নিজের লেখা একটা সুপারিশ কেটে বাদ দেওয়া অস্বস্তিকর কাজ, আর এবারের হালনাগাদে আমাকে ঠিক সেটাই করতে হয়েছে। আগের সংস্করণে গিলয় ছিল নিরীহ একটা সুপারিশ, শুধু অটোইমিউন রোগীদের জন্য ছোট্ট সতর্কতা সহ। LiverTox-এর অধ্যায়টা পড়ার পরে বুঝলাম, ৫০টির বেশি নথিভুক্ত ঘটনা আর একটা A শ্রেণির কার্যকারণ রেটিং-এর সামনে ওই এক লাইনের সতর্কতা কোনোভাবেই যথেষ্ট ছিল না, বিশেষত যখন পাঠক সেটা পড়ে দোকানে যাচ্ছেন। ওটুকু যথেষ্ট ছিল না।
ইমিউনিটি নিয়ে লেখার সবচেয়ে বড় ফাঁদ এটাই (আমি নিজেও এতে পা দিয়েছিলাম), ভাল উদ্দেশ্যে লেখা একটা সুপারিশও পুরোনো হয়ে যেতে পারে। ভেষজ নিরীহ, এই ধারণাটা সবচেয়ে ব্যয়বহুল ধারণাগুলোর একটা।
উপসংহার
সবচেয়ে কাজের কাজটা হলো তালিকাটা উল্টো দিক থেকে পড়া, অর্থাৎ কী যোগ করব তার আগে দেখা কী বাদ দেওয়া দরকার। ক্রমটাই আসল। ঘুম, সুষম খাবার, পরিমিত পরিশ্রম, কম চাপ আর ঋতু অনুযায়ী জীবনযাত্রা, এই ভিত্তিটুকুর কোনো বিকল্প কোনো ভেষজে নেই। ভিত্তির উপরে আমলকী, তুলসী বা চ্যবনপ্রাশ পরিমিতভাবে যোগ করা যায়, তবে সেগুলো সহায়ক, রক্ষাকবচ নয়।
আজ থেকে একটা জিনিসের দিকে নজর রাখুন, আপনার বাড়িতে "ইমিউনিটির জন্য" নিয়মিত খাওয়া হচ্ছে এমন কোনো ভেষজ গুঁড়ো বা ক্যাপসুল আছে কি না, আর থাকলে কতদিন ধরে চলছে। মাসের পর মাস চললে সেটা একবার চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন, বিশেষ করে গিলয় বা আশ্বগন্ধা হলে। ভেষজ শুরু করার চেয়ে ভেষজ কতদিন ধরে চলছে সেই হিসেব রাখাটা এখন বেশি জরুরি।
সূত্র / Sources
- Prather AA, Janicki-Deverts D, Hall MH, Cohen S. Behaviorally Assessed Sleep and Susceptibility to the Common Cold. Sleep, 2015, 38(9):1353-1359. PMID 26118561. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/26118561
- National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases. Tinospora cordifolia. In: LiverTox, Clinical and Research Information on Drug-Induced Liver Injury, last updated 27 June 2025. ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK608429
- National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases. Ashwagandha. In: LiverTox, last updated 3 December 2024. ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK548536
- Nagral A, Rudra OS, Menezes S, et al. Herb-induced Liver Injury, A Guide to Approach. Lessons from the Tinospora cordifolia (Giloy) Case Series Story. Journal of Clinical and Experimental Hepatology, 2023, 13(2):360-371. DOI 10.1016/j.jceh.2022.11.001. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC10025683
- Hemila H, Chalker E. Vitamin C for preventing and treating the common cold. Cochrane Database of Systematic Reviews, 2013, Issue 1, CD000980. DOI 10.1002/14651858.CD000980.pub4. PubMed 23440782
- Kotecha R. The journey with COVID-19, Initiatives by Ministry of AYUSH. Journal of Ayurveda and Integrative Medicine, 2021, 12(1):1-3. DOI 10.1016/j.jaim.2021.03.009. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC8011587
- Bull FC, Al-Ansari SS, Biddle S, et al. World Health Organization 2020 guidelines on physical activity and sedentary behaviour. British Journal of Sports Medicine, 2020, 54(24):1451-1462. PMID 33239350. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/33239350
- Phetsouphanh C, Jacka B, Ballouz S, et al. Improvement of immune dysregulation in individuals with long COVID at 24-months following SARS-CoV-2 infection. Nature Communications, 2024, 15:3315. DOI 10.1038/s41467-024-47720-8. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC11024141
- Harvard Health Publishing, Harvard Medical School. How to boost your immune system. Accessed 9 September 2026. health.harvard.edu
- চরক সংহিতা, সূত্রস্থান ১৭/৭৪-৭৫ ও চক্রপাণি টীকা, ওজ ও ব্যাধিক্ষমত্ব প্রসঙ্গ. carakasamhitaonline.com
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

নারীস্বাস্থ্য, বয়স অনুযায়ী কী দেখবেন ও আয়ুর্বেদ কী বলে
নারীস্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ গাইড, বয়সের চার ধাপে কী দেখা দরকার, ঋতুচক্র, রক্তাল্পতা ও মেনোপজে প্রমাণ কী বলে, আর কোন লক্ষণে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।

ডেঙ্গু জ্বরে পেঁপে পাতার রস কি কাজ করে, প্রমাণ কতদূর
ডেঙ্গু জ্বরে পেঁপে পাতার রস কি সত্যিই প্লাটিলেট বা প্লেটলেট বাড়ায়, গবেষণায় কত মাত্রা ব্যবহার হয়েছে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিপদ সংকেত আর কখন হাসপাতালে যাবেন।

অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ, আয়ুর্বেদ কতটা কাজে লাগে আর কোথায় নয়
অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগে আয়ুর্বেদ কতটা কাজে লাগে, অশ্বগন্ধা নিয়ে গবেষণা ও লিভার-ঝুঁকি, ওষুধের সঙ্গে ভেষজের বিক্রিয়া এবং কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার।