আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ১৭ জুলাই, ২০২৬ 11 মিনিট পড়ুন

রাধুনি মশলার উপকারিতা, আর জোয়ানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ভুল

রাধুনি মশলার উপকারিতা কী, রাধুনি আর জোয়ান বা সেলারি সিড কেন এক নয়, আয়ুর্বেদে অজমোদার পরিচয়, খাওয়ার মাত্রা আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার, প্রমাণভিত্তিক গাইড।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

রাধুনি মশলার ছোট বাদামি বীজ, বাঙালি রান্নার পাঁচফোড়নে ব্যবহৃত অজমোদা বা Trachyspermum roxburghianum ভেষজের পরিচিতি
সূচিপত্র11টি বিভাগ

রান্নাঘরের তাকে যে প্যাকেটটায় বড় করে 'রাধুনী' লেখা, ওটা আসলে বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় মশলা কোম্পানির নাম। মশলাটার নাম নয়। আসল রাধুনি ওই প্যাকেটে নেই, আছে পাঁচফোড়নের কৌটোয়, ছোট ছোট বাদামি বীজ হয়ে, যেগুলোকে আপনি এতদিন হয়তো জিরে বা জোয়ান ভেবে এসেছেন।

রাধুনি মশলার উপকারিতা বলতে আয়ুর্বেদ ও লোকচিকিৎসায় মূলত তিনটে জিনিস বোঝানো হয়, হজমে সাহায্য, পেটের বায়ু ও গ্যাস কমানো, আর মুখের রুচি ফেরানো। এই ব্যবহারের ভিত্তি মূলত ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার আর কিছু প্রাথমিক গবেষণাগার-স্তরের কাজ, মানুষের ওপর বড় কোনো ট্রায়াল এখনো হয়নি। রাধুনির বৈজ্ঞানিক নাম Trachyspermum roxburghianum, আর আয়ুর্বেদে এই ধরনের ঝাঁঝালো বীজ অজমোদা নামে চলে, যার শাস্ত্রীয় মাত্রা দিনে ১ থেকে ৩ গ্রাম গুঁড়ো।

এই লেখায় দেখব রাধুনি ঠিক কোন গাছের বীজ, জোয়ান আর সেলারি সিডের সঙ্গে তফাত কোথায়, শাস্ত্র একে কী বলে, গবেষণা কতদূর এগিয়েছে, কতটা খাওয়া যায় আর কাদের সাবধান থাকা দরকার। সঙ্গে একটা গোলমালের কথাও বলব, যেটা খোদ ভারত সরকারের ফার্মাকোপিয়াতেই ছাপার অক্ষরে রয়ে গেছে।

রাধুনি আসলে কোন গাছের বীজ, আর নামটা কেন এত গোলমেলে

রাধুনি হলো Apiaceae গোত্রের একটি গাছের শুকনো ফল, যাকে আমরা চলতি কথায় বীজ বলি, আর তার বৈজ্ঞানিক নাম Trachyspermum roxburghianum, সমার্থক Carum roxburghianum। বাংলায় একে চন্দনি নামেও ডাকা হয়। মশলা হিসেবে গাছটির চাষ ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর ইন্দোনেশিয়া জুড়ে। শ্রীলঙ্কায় এর নাম আসামোদাগম, থাইল্যান্ডে ফাক চি লম, মায়ানমারে কান্ট-বালু।

নামের গোলমাল অবশ্য এখানেই থামে না। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে Plant Systematics and Evolution জার্নালে প্রকাশিত একটি পুনর্বিন্যাসে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গাছটিকে সরিয়ে নতুন নাম দেন Psammogeton involucratus, আর Kew-এর নাম-নিবন্ধন সংস্থা IPNI-তে সেই নতুন সংযুক্তি নথিভুক্ত হয়ে আছে। মজার ব্যাপার হলো, GBIF-এর কোনো তালিকায় নতুন নামটিকে গৃহীত ধরে পুরনোটিকে সমার্থক বলা হয়েছে, আবার কোনো তালিকায় পুরনো নামটাই গৃহীত হিসেবে বসে আছে, আর আয়ুর্বেদীয় বইপত্র থেকে বাজারের প্যাকেট, সর্বত্র Trachyspermum roxburghianum-ই চলছে। অর্থাৎ নামটা এখনো পুরোপুরি থিতু হয়নি। এটা লুকিয়ে রাখার কিছু নেই, বরং জেনে রাখা ভালো, কারণ একই গাছের দুটো নাম দেখলে আপনি যেন ভাবেন না যে দুটো আলাদা জিনিস কিনছেন।

আপনার রান্নাঘরের কৌটোয় যেটা আছে, সেটা কি সত্যিই রাধুনি? প্রশ্নটা তুচ্ছ নয়, কারণ এই বীজ চেনার ভুলটাই সবচেয়ে বেশি হয়।

রাধুনি, জোয়ান আর সেলারি সিড কি এক জিনিস?

না, রাধুনি, জোয়ান আর সেলারি সিড তিনটি আলাদা উদ্ভিদের বীজ, যদিও দেখতে প্রায় একরকম বলে বাজারে একটার জায়গায় আরেকটা দিব্যি বিক্রি হয়ে যায়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া সরাসরি লিখেছে, রাধুনিকে প্রায়ই সেলারি সিডের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয় বা তার বদলি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

মশলা বৈজ্ঞানিক নাম চেনার সূত্র মূল ব্যবহার
রাধুনি Trachyspermum roxburghianum তীব্র ঝাঁঝালো, খানিকটা হিং-ঘেঁষা গন্ধ ফোড়ন, শুক্তো, আচার
জোয়ান Trachyspermum ammi থাইমলের কড়া ঝাঁঝ, জিভে সামান্য অবশ ভাব হজমি টোটকা, পরোটা
সেলারি সিড Apium graveolens মৃদু তেতো, ঘাস-ঘেঁষা গন্ধ স্যুপ, আচার, পশ্চিমি রান্না
অজমোদা (ফার্মাকোপিয়ার সংজ্ঞায়) Apium leptophyllum শাস্ত্রীয় ঔষধের কাঁচামাল অজমোদাদি চূর্ণ

তফাতটা ধরার সবচেয়ে সহজ উপায় নাক। জোয়ানের ঝাঁঝে থাইমল এতটাই চড়া যে জিভে দিলে সামান্য অবশ লাগে, রাধুনিতে সেটা হয় না। আর জিরের সঙ্গে চেহারার মিল থাকলেও গন্ধে দুটো আলাদা মেরুতে, জিরে মিষ্টি ও মাটি-ঘেঁষা, রাধুনি তীব্র ও ঝাঁঝালো। বাংলা সংবাদমাধ্যমের একটি জনপ্রিয় লেখা রাধুনিকে সরাসরি Celery Seeds বলে চালিয়ে দিয়েছে, আর সেখান থেকেই ভুলটা বাংলা ইন্টারনেটে এমনভাবে ছড়িয়েছে যে আজ বহু লেখায় সেলারির পুষ্টিগুণ নির্দ্বিধায় রাধুনির নামে বসিয়ে দেওয়া হয়, যে প্রসঙ্গে নিচে আলাদা করে আসছি।

এক নজরে

  • বৈজ্ঞানিক নাম Trachyspermum roxburghianum, নতুন পুনর্বিন্যাসে Psammogeton involucratus, গোত্র Apiaceae
  • আয়ুর্বেদীয় নাম অজমোদা, বাংলায় রাধুনি বা চন্দনি
  • অজমোদার শাস্ত্রীয় গুণ (API) কটু ও তিক্ত রস, লঘু ও রুক্ষ গুণ, উষ্ণ বীর্য, কটু বিপাক
  • অজমোদার প্রধান শাস্ত্রীয় কর্ম দীপন ও রুচিকৃৎ, অর্থাৎ খিদে ও হজম বাড়ানো
  • অজমোদার শাস্ত্রীয় মাত্রা দিনে ১ থেকে ৩ গ্রাম গুঁড়ো, তবে API-র অজমোদা আর রাধুনি ঠিক এক গাছ নয় (নিচে বিস্তারিত)
  • প্রমাণের মাত্রা হজমের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার ও সীমিত প্রমাণ, রক্তচাপ বা হাড়ের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত প্রমাণ
  • সতর্কতা গর্ভাবস্থা, উচ্চ পিত্ত ও অম্ল, কিডনির সমস্যা, তবে রাধুনির নিজস্ব নিরাপত্তা-গবেষণা নেই, সতর্কতাগুলো ঐতিহ্যগত ও সাবধানতামূলক

আয়ুর্বেদে অজমোদা, আর ফার্মাকোপিয়ার ভিতরের গোলমালটা

আয়ুর্বেদে রাধুনি-জাতীয় ঝাঁঝালো বীজ অজমোদা নামে পরিচিত, আর ভারত সরকারের The Ayurvedic Pharmacopoeia of India বা API অজমোদার শাস্ত্রীয় পরিচয়, গুণ ও মাত্রা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। API-র প্রথম খণ্ডের দুই নম্বর মনোগ্রাফ অনুযায়ী অজমোদার রস কটু ও তিক্ত, গুণ লঘু ও রুক্ষ, বীর্য উষ্ণ, বিপাক কটু। কর্ম হিসেবে লেখা আছে দীপন, বিদাহী, কফবাতজিৎ, রুচিকৃৎ ও কৃমিজিৎ। শাস্ত্রীয় প্রয়োগ গুল্ম, অরুচি, হিক্কা, ছর্দি ও কৃমিরোগে, আর মাত্রা দিনে ১ থেকে ৩ গ্রাম গুঁড়ো। প্রধান যোগ দুটি, অজমোদাদি চূর্ণ আর অজমোদ অর্ক।

কটু ও তিক্ত রস, লঘু-রুক্ষ গুণ আর উষ্ণ বীর্য, এই তিনটে মিলিয়ে শাস্ত্রের হিসেবে জিনিসটা দাঁড়ায় হালকা, শুকনো ও গরম স্বভাবের, যা পাচক অগ্নিকে উসকে দেয় আর কফ ও বাত কমিয়ে পিত্ত বাড়ায়। বাঙালি হেঁশেলে ভারী নিরামিষ পদে রাধুনির ফোড়ন যে ঐতিহ্য, শাস্ত্রীয় যুক্তিটা ঠিক সেখানেই মেলে।

এবার গোলমালটা। API যে গাছটিকে অজমোদা বলছে, সেটি রাধুনি নয়, সেটি Apium leptophyllum। অথচ ওই একই মনোগ্রাফের সমার্থক তালিকায় বাংলা নামের ঘরে ছাপা আছে Randhuni। অর্থাৎ যে শব্দ দিয়ে বাঙালি রান্নাঘরের একটা বীজ চেনে, সরকারি ফার্মাকোপিয়া সেই শব্দ দিয়ে অন্য একটা গাছ চেনাচ্ছে। বাজারে অজমোদা নামে অন্তত তিনটে আলাদা প্রজাতি বিকোয়, Apium leptophyllum, Apium graveolens আর Trachyspermum roxburghianum, আর ফার্মাকোগনসি নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বহুদিন ধরেই এই বদলাবদলি ও ভেজালের কথা লিখে আসছেন।

এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার, কারণ এই লেখার বাকিটা তার ওপর দাঁড়িয়ে। উপরের রস, গুণ, বীর্য আর ১ থেকে ৩ গ্রামের মাত্রা, সবটাই কড়া অর্থে অজমোদার হিসেব, রাধুনির নিজস্ব যাচাই করা মাত্রা এটা নয়। রাধুনিও যেহেতু বাজারে ও প্রয়োগে অজমোদা নামেই চলে, আয়ুর্বেদীয় চর্চায় এই একই হিসেব রাধুনির ওপর খাটিয়ে দেওয়া হয়। খাটানোটা সুবিধাজনক, কিন্তু নিখুঁত নয়, আর সেটা জেনে রাখাই সৎ পথ।

অনেক উদ্ভিদবিজ্ঞানী এই জায়গায় আপত্তি তুলবেন, আর সেটা অযৌক্তিক নয়। একই নামে তিনটে প্রজাতি চললে শাস্ত্রীয় গুণের হিসেবটাই নড়বড়ে হয়ে যায়, কারণ চরক বা সুশ্রুতের যুগে যে বীজটাকে অজমোদা বলা হয়েছিল, আজকের প্যাকেটে সেটাই আছে কি না তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। এই সীমাবদ্ধতাটুকু মাথায় রেখেই নিচের গবেষণার অংশটা পড়া দরকার। প্রমাণের মাত্রা এখানে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, প্রমাণিত কার্যকারিতা নয়।

আধুনিক গবেষণা রাধুনি নিয়ে কী বলে

রাধুনি নিয়ে আধুনিক গবেষণা এখনো প্রাথমিক স্তরে, যা আছে তা মূলত গবেষণাগার আর প্রাণীর ওপর করা পরীক্ষা, মানুষের ওপর করা কোনো বড় ক্লিনিকাল ট্রায়াল নেই।

২০২৪ সালে Journal of Ethnopharmacology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Kalaskar ও সহকর্মীরা) রাধুনির বীজের উদ্বায়ী তেলে বা এসেনশিয়াল অয়েলে GC-MS বিশ্লেষণে ৫৫টি যৌগ শনাক্ত হয়, যার মধ্যে থাইমল ১৩.৮ শতাংশ আর লিমোনিন ১১.৫ শতাংশ। ওই তেল DPPH পরীক্ষায় IC৫০ ৯৪.৪১ মাইক্রোগ্রাম প্রতি মিলিলিটার মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা দেখিয়েছে। Staphylococcus aureus ও Bacillus subtilis-এর বিরুদ্ধে MIC ছিল ২ মাইক্রোলিটার প্রতি মিলিলিটার, আর সুইস অ্যালবিনো ইঁদুরে ২০০ মিগ্রা প্রতি কেজি মাত্রায় ব্যথা কমেছে প্রায় ৪৪.৩ শতাংশ। Vero কোষে কোনো বিষক্রিয়া দেখা যায়নি।

শ্রীলঙ্কায় রাধুনির বীজ থেকে আসামোদাগম নামে একটি অর্ক তৈরি হয়, যেটি শাস্ত্রীয় অর্ক কল্পনা পদ্ধতিতেই বানানো। ২০২৪ সালে Natural Product Communications-এ প্রকাশিত গবেষণায় (Jayawantha ও সহকর্মীরা) দেখা গেছে ওই অর্কে থাইমলের পরিমাণ ৯২.৭৩ শতাংশ, আর সেটি ইউরিয়েজ এনজাইম আটকায় IC৫০ ০.২৪ মিগ্রা প্রতি মিলিলিটার মাত্রায়, যা Helicobacter pylori-র প্রসঙ্গে আগ্রহজনক। গবেষকরা নিজেরাই অবশ্য লিখেছেন, পুরোটাই টেস্টটিউবের কাজ, মানুষের ওপর ট্রায়াল এখনো বাকি।

সংখ্যাগুলো দেখে আমি প্রথমে বেশ উত্তেজিত হয়েছিলাম। পরে খেয়াল করলাম, একটিও মানব-ট্রায়াল নেই। ইঁদুরের ক্ষতে বা টেস্টটিউবের ব্যাকটেরিয়ায় যা কাজ করেছে, আপনার পেটের গ্যাসে তা করবেই, এই গবেষণাগুলো সেই নিশ্চয়তা দেয় না। তাই হজম ও রুচির ক্ষেত্রে প্রমাণের মাত্রা সীমিত প্রমাণ, আর সেটুকু বলাই সৎ।

রাধুনি রান্নায় ও ঘরোয়া ব্যবহারে কীভাবে খাবেন?

রাধুনি খাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রচলিত পথ হলো রান্নার ফোড়ন, আর ঔষধি প্রয়োগে আয়ুর্বেদীয় চর্চা অজমোদার শাস্ত্রীয় মাত্রাই ধরে, API অনুযায়ী দিনে ১ থেকে ৩ গ্রাম গুঁড়ো।

গরম তেলে রাধুনি পড়লে সেকেন্ড দুয়েকের মধ্যেই চটপট শব্দ করে ফাটতে শুরু করে, আর যে ঝাঁঝালো গন্ধটা হুড়মুড়িয়ে ওঠে সেটা হিং-এর কাছাকাছি, তীব্র আর খানিকটা কটু। এই ফাটার শব্দটাই সংকেত, তেল যথেষ্ট গরম হয়েছে আর এবার বাকি উপকরণ পড়তে পারে। দেরি করলে বীজ পুড়ে তেতো হয়ে যায়।

১. ফোড়ন হিসেবে গোটা বীজ, শুক্তো, ছেঁচকি, চচ্চড়ি বা গরমকালের পাতলা আম ডালে। পরিমাণ চার জনের রান্নায় বড়জোর আধ চা-চামচ। ২. পাঁচফোড়নের অংশ হিসেবে, মেথি, মৌরি, কালোজিরে আর জিরের সঙ্গে। পঞ্চম উপাদান সাধারণত সর্ষে, তবে অনেক জায়গায় সর্ষের জায়গায় বসে রাধুনি, আর বাংলা উইকিপিডিয়াতেও এই বদলটার উল্লেখ আছে। ৩. গুঁড়ো হিসেবে শুক্তো নামানোর ঠিক আগে ওপরে ছিটিয়ে, সামান্য, আধ চা-চামচের কম। ৪. ঔষধি প্রয়োগে ১ থেকে ৩ গ্রাম গুঁড়ো কুসুম গরম জলে, তবে সেটা শাস্ত্রীয় ঔষধি মাত্রা, রোজকার রান্নায় এত পড়ে না।

তফাতটা খেয়াল করুন। রান্নার ফোড়নে যে পরিমাণ পড়ে আর ঔষধি মাত্রা, দুটো এক জিনিস নয়, আর নিচের সতর্কতাগুলোর প্রায় সবকটাই ঔষধি মাত্রার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

রাধুনি মশলার উপকারিতা নিয়ে যে দাবিগুলো এখনো প্রমাণিত নয়

রাধুনি নিয়ে বাংলা ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি যে তিনটি দাবি ঘোরে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হাড় মজবুত করা আর রক্তাল্পতা দূর করা, তিনটির একটিরও সমর্থনে রাধুনির নিজস্ব কোনো মানব-গবেষণা আমি খুঁজে পাইনি।

খনিজের হিসেবটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা ধরা যায়। USDA FoodData Central-এ সেলারি বীজের পুষ্টি-বিশ্লেষণ আছে (FDC ID 170920), আর সেখানে প্রতি ১০০ গ্রামে আয়রন ৪৪.৯ মিগ্রা, ক্যালসিয়াম ১৭৬৭ মিগ্রা। রাধুনিকে যেহেতু অনেকে সেলারি সিড ভাবেন, সেলারির ওই সংখ্যাগুলোই রাধুনির নামে চালু হয়ে গেছে।

কিন্তু ধরে নিলাম সংখ্যাটা রাধুনির জন্যও খাটে। ফোড়নে রাধুনি লাগে বড়জোর ১ গ্রাম। ওই হিসেবে আয়রন দাঁড়ায় ০.৪৫ মিগ্রা, ক্যালসিয়াম প্রায় ১৭.৭ মিগ্রা। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক চাহিদার তুলনায় সেটা প্রায় ধরার মতোই নয়। প্রতি ১০০ গ্রামের হিসেব দিয়ে মশলার পুষ্টিগুণ বোঝানো তাই একরকম পরিসংখ্যানের ভেলকি, কারণ কেউ ১০০ গ্রাম রাধুনি খায় না। রক্তাল্পতার জন্য ভরসা করতে হবে আসল আয়রন-সমৃদ্ধ খাবারে, আর উচ্চ রক্তচাপেও খাদ্যতালিকার বদলে ফোড়নের মশলায় সমাধান খোঁজা বাস্তবসম্মত নয়। এই তিনটি দাবির প্রমাণের মাত্রা তাই অপর্যাপ্ত প্রমাণ।

কেউ বলতে পারেন, হাজার বছরের ঐতিহ্যে যখন আছে তখন নিশ্চয়ই কিছু আছে। কথাটা পুরো ফেলে দেওয়ার নয়, ঐতিহ্য অনেক সময়ই গবেষণার আগে হাঁটে। তবে ঐতিহ্য রাধুনিকে বসিয়েছে হজম আর রুচির ঘরে। রক্তচাপ বা হাড়ের দাবিগুলোর উৎস খুঁজতে গেলে আপনি ইন্টারনেটেই গিয়ে থামবেন।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

রাধুনি নিয়ে সবচেয়ে জরুরি নিরাপত্তা-তথ্যটা হলো, রাধুনির নিজস্ব কোনো নিরাপত্তা-গবেষণা নেই। PubMed-এ Trachyspermum roxburghianum নামটা হুবহু খুঁজলে সব মিলিয়ে তিনটি এন্ট্রি ওঠে, আর তার একটিও বিষক্রিয়া, নিরাপত্তা বা গর্ভাবস্থা নিয়ে নয়। তাই নিচের সতর্কতাগুলোকে প্রমাণিত ঝুঁকির তালিকা ভাববেন না, এগুলো ঐতিহ্যগত ও সাবধানতামূলক অবস্থান, আর প্রমাণের মাত্রা এখানে অপর্যাপ্ত প্রমাণ। রান্নার পরিমাণে রাধুনিকে সাধারণভাবে নিরাপদ ধরা হয়।

গর্ভাবস্থায় ঔষধি মাত্রায় অজমোদা বা রাধুনি না নেওয়ার পরামর্শই প্রচলিত। আয়ুর্বেদীয় প্রয়োগ-সাহিত্য আর পশ্চিমা ভেষজ-চর্চা, দুই জায়গাতেই অজমোদা ও সেলারি বীজকে ঋতুস্রাব-উদ্দীপক ধরা হয় বলে ঘনীভূত মাত্রা এড়াতে বলা হয়। তবে এখানে একটা মোচড় আছে, আর সেটা এই লেখার গোড়ার গোলমালেরই লেজ। সতর্কতাটা আসলে সেলারি বীজের ভেষজ-সাহিত্যের, রাধুনির নিজস্ব গবেষণার নয়, আর ওই নাম-গোলমালের রাস্তা ধরেই সেটা রাধুনির ঘাড়ে এসে বসেছে। তাতে সতর্কতাটা ফেলে দেওয়ার মতো হয়ে যায় না। তথ্য যেখানে নেই, সেখানে সাবধান হওয়াই দস্তুর, বিশেষত গর্ভাবস্থায় খাওয়াদাওয়ার মতো জায়গায়। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, বাংলা ইন্টারনেটের যে লেখাগুলো রাধুনিকে মাসিকের ব্যথা বা অনিয়মিত ঋতুস্রাবে উপকারী বলে দাবি করে, তাদের প্রায় কেউই গর্ভাবস্থার এই সতর্কতাটুকু পাশাপাশি বলে না, অথচ একই ঋতুস্রাব-উদ্দীপক ধর্মের কারণেই কথা দুটো একসঙ্গে বলা দরকার।

পিত্তের দিকটা অন্তত শাস্ত্রের নিজের যুক্তিতেই দাঁড়ায়। API-র অজমোদা মনোগ্রাফে বীর্য লেখা আছে উষ্ণ, আর কর্মের তালিকায় আছে বিদাহী, অর্থাৎ জ্বালা ধরানোর ধর্ম। তাই যাঁদের এমনিতেই বুকজ্বালা বা অম্লের সমস্যা আছে, ঔষধি মাত্রায় রাধুনি তাঁদের অস্বস্তি বাড়াতে পারে, এটুকু ধরে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত। রান্নার ফোড়নে অত পড়ে না।

কিডনির সমস্যা থাকলে ঔষধি মাত্রা এড়ানোই সাবধানি পথ। ভেষজ-সাহিত্যে সেলারি বীজের উদ্বায়ী তেলের উত্তেজক প্রভাবের কারণে তীব্র কিডনি-রোগে সেলারি এড়াতে বলা হয়, আর এই সতর্কতাটাও রাধুনিতে পৌঁছেছে সেই একই নাম-গোলমাল বেয়ে, রাধুনির নিজস্ব কোনো বৃক্ক-সংক্রান্ত তথ্য নেই। স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, আর ঠিক সেই কারণেই ঔষধি মাত্রা না নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া নিয়েও জানা কিছু নেই, তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ চললে আগে চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে API-র প্রথম খণ্ডের দুই নম্বর মনোগ্রাফটা খুলে আমি খানিকক্ষণ থমকে ছিলাম। সরকারি বইটা অজমোদা বলতে বোঝাচ্ছে Apium leptophyllum নামের একটা গাছ, অথচ ঠিক তার কয়েক লাইন নিচেই সমার্থক শব্দের তালিকায় বাংলা নামের ঘরে দিব্যি ছাপা রয়েছে Randhuni, আর ওই এক শব্দেই দুটো আলাদা উদ্ভিদ মিশে গিয়ে গোটা পরিচয়টা ঘেঁটে গেছে। (লাইনটা আমি দুবার পড়েছি, ভুল পড়িনি।) এতদিন ভাবতাম মশলার নাম নিয়ে গোলমাল বুঝি শুধু বাজারেই হয়, দোকানি যা দেয় তাই। এখন দেখছি বইতেও। আমাদের রান্নাঘরের সবচেয়ে চেনা বীজটার পরিচয়পত্রেই একটা ফাঁক রয়ে গেছে, আর সেটা কেউ সারায়নি।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

রাধুনি বাঙালির হেঁশেলের একটা পুরনো ঝাঁঝালো বীজ, যার আসল জোর হজম আর মুখের রুচিতে, আর সেটুকুও দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ ঐতিহ্য আর গুটিকয় প্রাথমিক গবেষণার ওপর, যে গবেষণা এখনো মানুষের ওপর পৌঁছয়নি। রক্তচাপ, হাড় বা রক্তাল্পতার দাবিগুলো এখনো অপর্যাপ্ত প্রমাণের ঘরেই থাকে।

আগামীকাল রান্নার আগে পাঁচফোড়নের কৌটোটা একবার হাতের তালুতে ঢালুন। বীজগুলো আলাদা করে শুঁকে দেখুন। হিং-ঘেঁষা ঝাঁঝ পেলে ওটা রাধুনি, থাইমলের কড়া ঝাঁঝে জিভ সামান্য অবশ হলে ওটা জোয়ান, আর মিষ্টি মাটি-ঘেঁষা গন্ধ হলে জিরে। এইটুকু চিনে রাখলে দোকানি বদলি মশলা ধরিয়ে দিলে অন্তত বুঝতে পারবেন। আর ঔষধ হিসেবে খেতে চাইলে দিনে ১ থেকে ৩ গ্রামের বেশি নয়, গর্ভাবস্থায় ঔষধি মাত্রা একেবারেই নয়।

সূত্র / Sources

  • Kalaskar M, Gavit A, Prabhu S, ও সহকর্মীরা. Chemical composition, antioxidant, antimicrobial, and wound healing effects of Trachyspermum roxburghianum (DC.) H. Wolff essential oil, an in vivo and in silico approach. Journal of Ethnopharmacology, ২০২৪. DOI 10.1016/j.jep.2024.118055: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/38484951
  • Jayawantha D, Hettigoda L, Mudalige TD, Paranagama PA. Exploring the Bioactivity of Siddhalepa Asamodagam Spirit from Seeds of Trachyspermum roxburghianum (DC.) H. Wolff. Natural Product Communications, ২০২৪. DOI 10.1177/1934578X241271629: journals.sagepub.com
  • The Ayurvedic Pharmacopoeia of India, Part I, Volume I, ভারত সরকার. অজমোদা মনোগ্রাফ ২ (Apium leptophyllum), সমার্থক তালিকা, রস-গুণ-বীর্য-বিপাক, প্রয়োগ ও মাত্রা: ayurveda.hu/api/API-Vol-1.pdf
  • Psammogeton involucratus (Roxb.) Mousavi, Mozaff. & Zarre, Plant Systematics and Evolution ৩০৮ (১)-২: ১০ (২০২১), নতুন সংযুক্তির নথি. International Plant Names Index (IPNI), Kew: ipni.org
  • Spices, celery seed, FDC ID 170920 (SR Legacy), প্রতি ১০০ গ্রামে আয়রন ৪৪.৯ মিগ্রা ও ক্যালসিয়াম ১৭৬৭ মিগ্রা. USDA FoodData Central: fdc.nal.usda.gov
  • Trachyspermum roxburghianum নামে প্রকাশিত গবেষণার সম্পূর্ণ তালিকা, হুবহু নামে অনুসন্ধানে ৩টি এন্ট্রি, নিরাপত্তা বা গর্ভাবস্থা নিয়ে একটিও নয় (নিরাপত্তা-তথ্যের অনুপস্থিতির ভিত্তি): pubmed.ncbi.nlm.nih.gov

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

না, রাধুনি আর জোয়ান এক নয়। রাধুনির বৈজ্ঞানিক নাম Trachyspermum roxburghianum, আর জোয়ানের Trachyspermum ammi। দুটোই Apiaceae গোত্রের, বীজ দেখতেও প্রায় একরকম, তাই বাজারে একটার বদলে আরেকটা দিব্যি বিক্রি হয়ে যায়। তবে গন্ধে তফাত আছে। রাধুনির ঝাঁঝ খানিকটা হিং-ঘেঁষা, আর জোয়ানে থাইমলের কড়া ঝাঁঝ অনেক বেশি স্পষ্ট।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
ভুঁই আমলা বা Phyllanthus niruri গাছের পাতার নিচে সারি সারি বীজ, লিভার ও জন্ডিসে ব্যবহৃত আয়ুর্বেদিক ভেষজ ভুঁই আমলার পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

ভুঁই আমলা কি সত্যিই লিভারের জন্য ভালো? উপকার, নিয়ম ও সতর্কতা

ভুঁই আমলা বা Phyllanthus niruri লিভার ও জন্ডিসে কতটা কাজ করে, গবেষণা কী বলে, খাওয়ার নিয়ম, আমলকীর সঙ্গে পার্থক্য আর কাদের এড়ানো উচিত, বাংলায় সৎ গাইড।

১৬ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
করঞ্জ বা করঞ্জা গাছের বীজ ও শুকনো শিকড়, আয়ুর্বেদে ত্বকের রোগে ব্যবহৃত ভেষজ করঞ্জ তেলের উৎস
ভেষজ11 মিনিট

করঞ্জ গাছের উপকারিতা, বীজ-তেল ও ত্বকের রোগে ব্যবহার

করঞ্জ গাছের উপকারিতা, এর বীজ, তেল, পাতা ও ছালের ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার, ত্বকের রোগে বাহ্যিক প্রয়োগের নিয়ম ও সতর্কতা এবং নাটা করঞ্জের সঙ্গে পার্থক্য, বাংলা গাইড।

১৪ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
যষ্টিমধু বা মুলেঠির শুকনো শিকড়, আয়ুর্বেদের কাশি ও অম্ল-শামক ভেষজ যষ্টিমধুর পরিচিতি
ভেষজ9 মিনিট

যষ্টিমধুর উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও কাদের ঝুঁকি বেশি

যষ্টিমধুর উপকারিতা কাশি, গলা ব্যথা ও অম্লে, সঠিক খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা, আর উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যায় কেন যষ্টিমধু এড়ানো জরুরি, বাংলায় বিস্তারিত গাইড।

১৩ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ