সাদা চুল কি কালো হয়, অকালে চুল পাকার প্রমাণভিত্তিক উত্তর
অকালে চুল পাকা কত বয়সে ধরা হয়, জিনের ভাগ কতটা, সাদা চুল কি সত্যিই আবার কালো হয়, কোন ঘাটতি শোধরানো যায় আর হেয়ার ডাইয়ের ঝুঁকি কী, প্রমাণ ধরে বাংলায়।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

সূচিপত্র
বিশ-পঁচিশ বছর বয়সে আয়নায় প্রথম রুপালি রেখাটা চোখে পড়লে একটা অস্বস্তি হয়, আর তার পরেই শুরু হয় ইন্টারনেটে খোঁজা। সেখানে যা মেলে তার বেশিরভাগই এক সুরে বাঁধা, আমলকী মাখুন, মেহেন্দি লাগান, সাদা চুল আবার কালো হয়ে যাবে। কোনো কোনো লেখা সময়ও বেঁধে দেয়, সাত দিন।
সৎ উত্তরটা এর চেয়ে আলাদা এবং অনেক বেশি কাজের। ২০২৪ সালে International Journal of Dermatology-তে প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী চুল পাকার তারতম্যের প্রায় ৯০ শতাংশই জিনগত, আর আজ পর্যন্ত এমন কোনো চিকিৎসা নেই যা অকালে পাকা চুল ফেরাতে বা আটকাতে পারে। তার মানে এই নয় যে কিছুই করার নেই। কয়েকটি জিনিস সত্যিই শোধরানো যায়, সেগুলো আলাদা করে চেনাই আসল কাজ।
এই লেখায় থাকছে অকাল বলতে ঠিক কত বয়স, জিনের ভাগ কতটা, সাদা চুল ফেরার প্রশ্নে গবেষণা কী পেয়েছে, কোন ঘাটতিগুলো শুধরে নেওয়ার মতো, আমলকী ও ভৃঙ্গরাজ আসলে কী করে, শাস্ত্র একে কোথায় বসিয়েছে, কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার আর হেয়ার ডাই নিয়ে কী জানা জরুরি।
এক নজরে
অকালে চুল পাকা মূলত জিননির্ভর একটি প্রক্রিয়া, যেখানে ঘরোয়া উপায়ে হারানো রং ফেরানোর প্রমাণ নেই, তবে কিছু সংশোধনযোগ্য কারণ চিহ্নিত করা যায় এবং সেগুলো নিয়ে কাজ করাই বাস্তবসম্মত পথ। নিচে অবস্থাটা এক নজরে।
- এশীয়দের ক্ষেত্রে ২৫ বছরের আগে চুল পাকলে তবেই সেটি অকাল, ত্রিশের পরে কয়েকটি সাদা চুল স্বাভাবিক
- যমজদের নিয়ে করা গবেষণা অনুযায়ী তারতম্যের প্রায় ৯০ শতাংশ জিনগত
- হারানো রং ফেরানোর প্রমাণিত কোনো চিকিৎসা বা ঘরোয়া উপায় নেই, তকমা অপর্যাপ্ত প্রমাণ
- বি১২, ডি৩ ও কপারের ঘাটতি এবং ধূমপানের সঙ্গে যোগ আছে, এগুলো শোধরানোর তকমা সীমিত প্রমাণ
- আমলকী, ভৃঙ্গরাজ ও কালো তিলের তকমা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার
- মেহেন্দি ও ডাই রং ঢাকে, চুল সারায় না, আর PPD-যুক্ত ডাইয়ে অ্যালার্জির ঝুঁকি আছে
অকালে চুল পাকা মানে ঠিক কত বয়স?
অকালে চুল পাকা বা প্রিম্যাচিওর হেয়ার গ্রেয়িং-এর সংজ্ঞা জাতিভেদে আলাদা, আর এশীয়দের ক্ষেত্রে সীমাটি ২৫ বছর। চিকিৎসাশাস্ত্রে চুল পাকার প্রক্রিয়াটির নাম ক্যানাইটিস (canities), আর সময়ের আগে সেটি শুরু হলে তাকে বলা হয় প্রিম্যাচিওর ক্যানাইটিস। ২০২৪ সালে দেশাই ও সহকর্মীদের International Journal of Dermatology-তে প্রকাশিত পর্যালোচনায় সীমাগুলি এভাবে দেওয়া আছে।
| জনগোষ্ঠী | যত বয়সের আগে পাকলে অকাল |
|---|---|
| শ্বেতাঙ্গ | ২০ বছর |
| এশীয় | ২৫ বছর |
| কৃষ্ণাঙ্গ | ৩০ বছর |
বাংলা লেখায় এই সংখ্যাটা প্রায় কোথাও থাকে না, অথচ এটিই প্রথম কাজের তথ্য। বত্রিশ বছর বয়সে কানের পাশে চার-পাঁচটা সাদা চুল দেখে যিনি দুশ্চিন্তা করছেন এবং একের পর এক ঘরোয়া প্যাক লাগিয়ে যাচ্ছেন, তাঁর ক্ষেত্রে চিকিৎসাশাস্ত্রের হিসাবে ব্যাপারটা অকালই নয়, বরং বয়সের স্বাভাবিক গতি। দুশ্চিন্তাটা তখন অকারণ। খরচটাও।
কেন পাকে, আর তাতে জিনের ভাগ কতটা
চুল পাকে চুলের গোড়ায় থাকা মেলানোসাইট কোষের রং তৈরির ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে, আর সেই ক্ষমতা কখন কমবে তা মূলত ঠিক করে দেয় জিন। ওই একই পর্যালোচনা জানাচ্ছে, যমজদের নিয়ে করা নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় চুল পাকার তারতম্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত কারণের উপর নির্ভরশীল বলে পাওয়া গেছে।
সংখ্যাটা অস্বস্তিকর, কিন্তু কাজেরও। দেশাইদের পর্যালোচনার ওই নব্বই শতাংশ যদি জিনের হাতে থাকে, তাহলে বাকিটুকু নিয়ে কাজ করাই যুক্তিসঙ্গত, আর সেই বাকিটুকুতে আছে ধূমপান, পুষ্টির ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা আর অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। ধূমপানের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাটি হলো তামাক থেকে তৈরি হওয়া প্রচুর মুক্ত মূলক বা ROS মেলানোসাইট কোষের ক্ষতি করে, আর তাতে চুলের ফলিকল সময়ের আগেই ক্ষয়ে যায়। এই তালিকার মধ্যে ধূমপানই একমাত্র জিনিস যেটি সম্পূর্ণভাবে নিজের হাতে, আর যার পিছনে একটি বোধগম্য জৈব-রাসায়নিক ব্যাখ্যা আছে। ছাড়লে হারানো রং ফিরে আসবে, এমন দাবি অবশ্য কোথাও করা হয়নি, তাই প্রত্যাশাটা ওখানেই বেঁধে রাখা ভালো।
মানসিক চাপের কথাটা বাঙালি ঘরে বহুচর্চিত, পরীক্ষার আগে বা কঠিন সময়ে চুল পেকে যাওয়ার গল্প প্রায় সবাই শুনেছেন। এই যোগটি কল্পনা নয়, তবে এর প্রমাণ যতটা সূক্ষ্ম তার চেয়ে অনেক বেশি জোর দিয়ে বলা হয়। পরের অংশে ঠিক সেই গবেষণাটির কথা আসছে। মানসিক চাপ সামলানোর দিকটি নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে উদ্বেগ ও আয়ুর্বেদ আর ঘুম না আসার সমাধান নিবন্ধে।
সাদা চুল কি সত্যিই আবার কালো হয়?
হারানো রং ফিরিয়ে আনার মতো প্রমাণিত কোনো চিকিৎসা বা ঘরোয়া উপায় নেই, আর এটিই এই লেখার সবচেয়ে জরুরি বাক্য। দেশাই ও সহকর্মীদের পর্যালোচনার ভাষা এখানে সরাসরি, আজ পর্যন্ত জানা কোনো চিকিৎসা অকালে পাকা চুল ফেরাতে বা প্রতিরোধ করতে পারে না।
তবু ছবিটা পুরোপুরি সাদা-কালো নয়, আর এখানে একটি চমকপ্রদ গবেষণা আছে। ২০২১ সালে eLife জার্নালে রোজেনবার্গ ও সহকর্মীদের প্রকাশিত কাজে ১৪ জন অংশগ্রহণকারীর মোট ৩৯৭টি চুল বিশ্লেষণ করা হয়, অংশগ্রহণকারীদের গড় বয়স ছিল ৩৫। সেখানে দেখা যায়, কিছু সাদা চুল মানসিক চাপ বাড়ার সময় রং হারিয়েছিল এবং চাপ কমার পর সেই একই চুল আবার রং ফিরে পেয়েছে।
এবার শর্তগুলো, কারণ ওগুলো বাদ দিলে কথাটা মিথ্যা হয়ে যায়। রোজেনবার্গ ও সহকর্মীরা নিজেরাই জোর দিয়ে লিখেছেন যে ঘটনাটি বিরল, আড়াই বছর ধরে খুঁজে তাঁরা মাত্র ১৪ জন অংশগ্রহণকারী পেয়েছিলেন। তাঁরা আরও বলেছেন, এমন রং ফেরা মূলত চুল পাকার একেবারে গোড়ার দিকেই বেশি ঘটে, আর পুরোপুরি সাদা হয়ে যাওয়া চুল বা বেশি বয়সের ক্ষেত্রে এই গবেষণা থেকে কোনো সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
তাহলে সৎ উত্তরটা দাঁড়ায় এই রকম। সাদা চুল কালো হওয়ার ঘটনা ঘটে, বিরল ভাবে, পাকা শুরুর দিকে, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানসিক চাপের ওঠানামা। আমলকী বা মেহেন্দির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ওই গবেষণায় দেখানো হয়নি। কেউ যদি সাত দিনে সাদা চুল কালো করার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটি প্রমাণের সঙ্গে মেলে না।
আরেকটি প্রশ্ন প্রায় সবাই করেন, একটা পাকা চুল তুলে ফেললে কি জায়গায় আরও কয়েকটা পাকা চুল গজায়? এই ধারণার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। রং তৈরির কাজটা প্রতিটি ফলিকল আলাদাভাবে করে, তাই একটি ফলিকলের চুল তুলে ফেললে পাশের ফলিকলগুলোর রং তৈরির ক্ষমতায় তাতে কিছু বদলায় না। যা হয় তা অন্য জিনিস। বারবার একই জায়গা থেকে চুল টেনে তুললে ফলিকলের ক্ষতি হতে পারে, আর তাতে ওই জায়গায় চুল পাতলা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ তুললে পাকা বাড়ে না, তবে না তোলাই ভালো।
যে ঘাটতিগুলো সত্যিই শুধরে নেওয়া যায়
অকালে চুল পাকার সঙ্গে কয়েকটি পুষ্টি-ঘাটতির পরিসংখ্যানগত যোগ পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় পাওয়া গেছে, আর এগুলোই বাস্তবে হাতে থাকা অংশ। দেশাইদের পর্যালোচনায় ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি৩ ও কপারের ঘাটতির সঙ্গে যোগের কথা বলা হয়েছে।
কপার নিয়ে একটি নির্দিষ্ট গবেষণার সংখ্যা আছে। ২০১২ সালে Biological Trace Element Research জার্নালে নাইনি ও সহকর্মীদের কাজে অকালে চুল পাকা ৬৬ জন রোগী ও বয়স-লিঙ্গ মিলিয়ে নেওয়া ৬৬ জন সুস্থ মানুষের রক্ত পরীক্ষা করা হয়। রোগীদের সিরাম কপার ছিল ৯০.৭ ± ৩৭.৪ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার, নিয়ন্ত্রণ দলে ১০৫.৩ ± ৫০.২ (p = 0.048)।
একটা ফল এখানে প্রচলিত ধারণার উল্টো, আর সেটা বলে রাখা দরকার। নাইনিদের ওই গবেষণায় আয়রন রোগীদের মধ্যে বরং বেশি ছিল, ১০৮.৩ ± ৪৮.৪ বনাম ৮৮.৮ ± ৩৯.৫ (p = 0.008), আর জিঙ্কে অর্থবহ কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি (p = 0.285)। অর্থাৎ আয়রনের অভাবে চুল পাকে, এই কথাটা অন্তত এই গবেষণায় দাঁড়ায়নি।
ভারত ও বাংলাদেশে নিরামিষভোজীদের মধ্যে বি১২-এর ঘাটতি সাধারণ, আর সেই প্রসঙ্গে ভিটামিন বি১২ ও শাকাহারীদের উৎস লেখাটি আলাদা করে পড়া যেতে পারে। তবে একটা কথা পরিষ্কার রাখা দরকার। যোগ থাকা আর কারণ হওয়া এক জিনিস নয়, আর ঘাটতি শুধরে নিলে সাদা চুল কালো হয়ে যাবে এমন প্রমাণ কোথাও নেই। ঘাটতি সারানোর যুক্তি আলাদা, সেটি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য এমনিতেই দরকারি।
| কারণ | শোধরানো যায়? | প্রমাণের তকমা |
|---|---|---|
| জিন ও পারিবারিক ধারা | না | প্রায় ৯০ শতাংশ তারতম্যের কারণ |
| ভিটামিন বি১২, ডি৩, কপারের ঘাটতি | রক্তপরীক্ষা করে, চিকিৎসকের পরামর্শে | সীমিত প্রমাণ |
| ধূমপান | হ্যাঁ | সীমিত প্রমাণ |
| থাইরয়েডের সমস্যা | চিকিৎসায় | সীমিত প্রমাণ |
| মানসিক চাপ | আংশিক | সীমিত প্রমাণ, eLife ২০২১ |
| হারানো রং ফেরানো | না | অপর্যাপ্ত প্রমাণ |
ছকের শেষ সারিটি হতাশাজনক, কিন্তু উপরের সারিগুলোতে কাজ করার জায়গা আছে, আর সেটুকু গুছিয়ে নেওয়াই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। ঘুমের সময় ঠিক করা তার প্রথম ধাপ, রাত এগারোটার মধ্যে শুয়ে পড়ার অভ্যাস করলে চাপ সামলানোর কাজটা এমনিতেই সহজ হয়। সঙ্গে দিনে দশ থেকে পনেরো মিনিট ধ্যান বা প্রাণায়াম রাখতে পারেন। এগুলো সাদা চুল কালো করবে না, সেই প্রতিশ্রুতি এখানে নেই, তবে চাপ কমানোর দিকটিতে eLife-এর গবেষণা যতটুকু ইঙ্গিত দিয়েছে তার সঙ্গে এগুলো অন্তত সঙ্গতিপূর্ণ। ধূমপান করলে সেটি ছাড়াই তালিকার সবচেয়ে কাজের পদক্ষেপ।
আমলকী, ভৃঙ্গরাজ ও মেহেন্দি ঠিক কী করে
আমলকী, ভৃঙ্গরাজ ও কালো তিল চুলের যত্নে শাস্ত্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ভেষজ, তবে এগুলো পাকা চুল কালো করে এমন মানব-গবেষণা নেই, তাই এদের তকমা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার। এই তফাতটা ধরতে পারলে বাকি সিদ্ধান্তগুলো সহজ হয়ে যায়।
আমলকী ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ, আর অক্সিডেটিভ স্ট্রেস যেহেতু চুল পাকার একটি পথ, সেই যুক্তিতে আমলকীর ব্যবহার অযৌক্তিক নয়। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত হওয়া আর প্রমাণিত হওয়া এক নয়। ভৃঙ্গরাজকে শাস্ত্রে কেশরাজ বলা হয়েছে, আর তেল মালিশে মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়ে ও চুল ভালো থাকে বলে বহুদিনের প্রথা। রং ফেরার দাবিটি আলাদা এবং সেটির সমর্থন নেই।
মেহেন্দি নিয়ে কথাটা আরও সোজা। মেহেন্দি চুলে রং চড়ায়, অর্থাৎ সাদা চুলকে ঢেকে দেয়। এটি প্রসাধনী আবরণ, চিকিৎসা নয়, আর দুটোকে গুলিয়ে ফেলা মানে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করা। ঢাকতে চাইলে ঢাকুন, তাতে আপত্তির কিছু নেই, শুধু জেনে ঢাকুন।
কারিপাতা নিয়েও একই কথা খাটে। শুকনো কারিপাতা নারকেল তেলে ফুটিয়ে ছেঁকে মাথায় মালিশ করার প্রথা বাংলার ঘরে বহুদিনের, আর কারিপাতায় আয়রন ও কপারের ভালো উপস্থিতি আছে এটিও সত্যি, কিন্তু এই তেল চুলের রং ধরে রাখে এমন মানব-গবেষণা নেই। খাদ্য হিসেবে কারিপাতা রাখতে আপত্তি নেই, রং ফেরানোর প্রত্যাশা রাখাটাই ভুল।
কালো তিল ও তামার পাত্রে রাখা জল নিয়ে প্রচলিত পরামর্শগুলোর অবস্থাও একই। কালো তিলে কপার থাকে এটি সত্যি, কিন্তু তিল খেয়ে সাদা চুল কালো হয়েছে এমন কোনো ট্রায়াল নেই, তাই এটিকে খাদ্য হিসেবে দেখাই সঠিক, ওষুধ হিসেবে নয়। পার্থক্যটা ছোট নয়।
| উপাদান | যা করে | যা করে না |
|---|---|---|
| আমলকী | অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জোগায়, চুলের সাধারণ যত্নে শাস্ত্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত | পাকা চুল কালো করে না |
| ভৃঙ্গরাজ তেল | মালিশে মাথার ত্বকে আরাম ও রক্তসঞ্চালন, বহুদিনের প্রথা | মেলানিন ফিরিয়ে আনে না |
| কালো তিল | কপারসহ খনিজের খাদ্য-উৎস | ওষুধের বিকল্প নয় |
| মেহেন্দি ও ডাই | সাদা চুল ঢেকে দেয়, প্রসাধনী আবরণ | চিকিৎসা নয়, PPD থাকলে অ্যালার্জির ঝুঁকি |
আয়ুর্বেদ অকালজ পালিতকে কীভাবে দেখে
আয়ুর্বেদে অকালে পাকা চুলের নাম অকালজ পালিত, আর চরক সংহিতায় এর মূল কারণ হিসেবে পিত্ত দোষের বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাথার ত্বকে সক্রিয় পিত্তের অংশটিকে বলা হয় ভ্রাজক পিত্ত, যা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় চুলের বর্ণ ও উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ করে।
পিত্ত বাড়ার কারণ হিসেবে শাস্ত্র বলেছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও রাগ, রাত জাগা, অতিরিক্ত ঝাল ও টক খাবার এবং দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকা। অষ্টাঙ্গ হৃদয়ে রক্তের অশুদ্ধি ও বাত দোষের মিশ্রণের কথাও এসেছে। শাস্ত্রীয় পথ্যে তাই পিত্ত-শমনকারী খাদ্যাভ্যাসের উপর জোর দেওয়া হয়, ঘি, নারকেল, ডালিম ও শীতল স্বভাবের ফল।
এই সব ব্যাখ্যার তকমা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, কারণ শাস্ত্রীয় নথিভুক্তি মানে প্রাচীন প্রয়োগের রেকর্ড, প্রমাণিত কার্যকারিতা নয়। তবু একটা জায়গায় মিল আছে। মানসিক চাপ ও রাত জাগাকে শাস্ত্র যে গুরুত্ব দিয়েছে, আধুনিক গবেষণাও চাপ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের প্রসঙ্গে ঘুরেফিরে সেই একই দুটি জিনিসেই ফিরে আসে, যদিও ব্যাখ্যার পথ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। সামগ্রিক চুলের যত্নের পদ্ধতি নিয়ে আয়ুর্বেদিক চুলের যত্ন লেখাটি সবচেয়ে বিশদ, আর চুল পড়া বা টাক আলাদা সমস্যা, সেগুলো নিয়ে চুল পড়া বন্ধ করার উপায় ও টাক পড়া রোধে আয়ুর্বেদ লেখা দুটি দেখতে পারেন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চুল পাকা নিজে কোনো রোগ নয়। কিন্তু কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি অন্য কিছুর সংকেত হতে পারে, আর তখন ঘরোয়া প্যাকে মাস কাটিয়ে দেওয়ার বদলে রক্তপরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই বেশি কাজের সিদ্ধান্ত। নিচের অবস্থাগুলি সেই ধরনের।
- চুল খুব দ্রুত ও ব্যাপকভাবে পাকছে, কয়েক মাসে চোখে পড়ার মতো বদল
- সঙ্গে ক্লান্তি, দুর্বলতা, ফ্যাকাশে ভাব বা হাত-পায়ে ঝিঁঝিঁ, যা বি১২ ঘাটতির পরিচিত লক্ষণ
- ওজন বেড়ে যাওয়া, ঠান্ডা সহ্য না হওয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য, যা থাইরয়েডের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে
- ত্বকে সাদা ছোপ, অর্থাৎ ভিটিলিগোর সম্ভাবনা
- গোছা ধরে চুল উঠে যাওয়া, যা আলোপেসিয়া অ্যারিয়াটার লক্ষণ হতে পারে
এখানে একটা কথা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ এটি চুলের চেয়ে অনেক বড় ব্যাপার। ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরা না পড়লে তা স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সেই ক্ষতির কিছুটা পরে আর পুরোপুরি ফেরানো যায় না, তাই ক্লান্তি বা ঝিঁঝিঁর মতো উপসর্গ থাকলে দেরি করার যুক্তি নেই। চুল পাকা এখানে বড়জোর একটা ইঙ্গিত, আসল বিষয় অন্যটা।
শুধু কয়েকটি সাদা চুল দেখে নিজে থেকে পরীক্ষার লম্বা তালিকা বানানোর দরকার নেই। উপরের সঙ্গী উপসর্গগুলো থাকলে তবেই চিকিৎসকের কাছে যান, আর কোন পরীক্ষা দরকার সেই সিদ্ধান্ত তাঁর।
কে সতর্ক থাকবেন
অকালে পাকা চুলে সবচেয়ে বাস্তব ঝুঁকিটি ভেষজে নয়, চুলের রঙে। ঝুঁকির উৎস মূলত প্যারাফিনাইলিনডায়ামিন বা PPD, আর DermNet-এর তথ্য অনুযায়ী এটি অ্যালার্জিক কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিসের একটি পরিচিত কারণ, যাতে চোখের পাতা, মাথার ত্বক, মুখ ও ঘাড়ে লালচে ভাব, ফোসকা ও ফোলা দেখা দিতে পারে।
- গাঢ় শেডের ডাইয়ে PPD-র ঘনত্ব বেশি থাকে, তাই ঝুঁকিও বেশি
- বাজারের "কালো মেহেন্দি" প্রায়ই প্রাকৃতিক নয়, তাতে PPD মেশানো থাকে, আর সেখান থেকে তীব্র ফোসকা পড়ার ঘটনা নথিবদ্ধ
- ২০০৭ সালে CMAJ জার্নালে রেডলিক ও ডিকোভেনের প্রকাশিত ছয়টি ঘটনার বিবরণে দেখা যায়, ১৪ থেকে ৩৮ বছর বয়সী ছয় জন নারী প্রথমে কালো মেহেন্দির ট্যাটু থেকে PPD-তে সংবেদনশীল হয়ে পড়েন, তারপর সাধারণ হেয়ার ডাই ব্যবহারে তাঁদের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়
- ওই একই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কালো মেহেন্দিতে PPD-র ঘনত্ব ১৫.৭ শতাংশ পর্যন্ত মাপা হয়েছে, যা হেয়ার ডাইয়ে ব্যবহৃত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি
- হাঁপানি, অ্যানাফাইল্যাক্সিস ও তীব্র বৃক্ক-বিকলের মতো সার্বদৈহিক প্রতিক্রিয়াও রিপোর্ট হয়েছে
- একবার প্রতিক্রিয়া হয়ে গেলে PPD-র প্রতি সংবেদনশীলতা সাধারণত আজীবন থেকে যায়
- নতুন কোনো ডাই ব্যবহারের আগে কানের পিছনে ছোট প্যাচ টেস্ট করে ৪৮ ঘণ্টা দেখে নেওয়াই নিয়ম
প্যাচ টেস্টটা বাদ দেবেন না। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় নতুন ভেষজ বা সাপ্লিমেন্ট শুরুর আগে চিকিৎসককে জানিয়ে রাখুন। আর ভিটিলিগো বা আলোপেসিয়া অ্যারিয়াটার মতো অটোইমিউন সমস্যা থাকলে শুধু ঘরোয়া ভেষজে ভরসা না করে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।
উপসংহার
অকালে চুল পাকা নিয়ে সবচেয়ে কাজের কথাটা হয়তো এই, যেটুকু বদলানো যায় আর যেটুকু যায় না, সেই দুটোকে আলাদা করে চেনা। জিনের ভাগ প্রায় ৯০ শতাংশ, হারানো রং ফেরানোর প্রমাণিত উপায় নেই, আর সাত দিনে কালো হওয়ার প্রতিশ্রুতিগুলো প্রমাণের সঙ্গে মেলে না। এটুকু জেনে নিলে অকারণ খরচ আর হতাশা দুটোই কমে। লাভটা ছোট নয়।
এই সপ্তাহে দুটো কাজ করতে পারেন। এক, নিজের বয়সটা উপরের ছকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, এশীয় হিসেবে ২৫ পেরিয়ে গেলে ব্যাপারটা হয়তো অকালই নয়। দুই, সঙ্গে ক্লান্তি বা ফ্যাকাশে ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে বি১২ ও থাইরয়েড পরীক্ষা করিয়ে নিন, কারণ এই দুটোই এমন জিনিস যেগুলো ধরা পড়লে সত্যিই শোধরানো যায় এবং যেগুলোর গুরুত্ব চুলের রঙের চেয়ে অনেক বেশি। আর ডাই ব্যবহার করলে নতুন প্রোডাক্টে প্যাচ টেস্টটা বাদ দেবেন না।
সূত্র / Sources
- Desai DD, Karim M, Nohria A, ও সহকর্মীরা (২০২৪). Premature hair graying: a multifaceted phenomenon, International Journal of Dermatology. PMC12008612
- Rosenberg AM, ও সহকর্মীরা (২০২১). Quantitative mapping of human hair greying and reversal in relation to life stress, eLife, 10:e67437. PMC8219384
- Naieni FF, Ebrahimi B, Vakilian HR, Shahmoradi Z (২০১২). Serum iron, zinc, and copper concentration in premature graying of hair, Biological Trace Element Research, 146(1):30-34. PMID 21979243
- Redlick F, DeKoven J (২০০৭). Allergic contact dermatitis to paraphenylendiamine in hair dye after sensitization from black henna tattoos, a report of 6 cases, CMAJ, 176(4):445-446. PMC1800582
- Ngan V, Gomez J (২০১৮). Allergy to paraphenylenediamine and hair dye contact allergy, DermNet, New Zealand Dermatological Society, সর্বশেষ হালনাগাদ আগস্ট ২০১৮. dermnetnz.org
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

নারীস্বাস্থ্য, বয়স অনুযায়ী কী দেখবেন ও আয়ুর্বেদ কী বলে
নারীস্বাস্থ্যের সম্পূর্ণ গাইড, বয়সের চার ধাপে কী দেখা দরকার, ঋতুচক্র, রক্তাল্পতা ও মেনোপজে প্রমাণ কী বলে, আর কোন লক্ষণে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাবেন।

ডেঙ্গু জ্বরে আয়ুর্বেদিক পরিচর্যা, পেঁপে পাতা ও পথ্য
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, কখন হাসপাতাল জরুরি, পেঁপে পাতা ও প্লেটলেট নিয়ে গবেষণা, গিলয়-তুলসীর সহায়ক ভূমিকা এবং সুস্থ হওয়ার পথ্য, আধুনিক ও আয়ুর্বেদিক বাংলা গাইড।

উদ্বেগ ও আয়ুর্বেদ — অ্যাংজাইটি ব্যবস্থাপনার শাস্ত্রীয় ভেষজ পদ্ধতি
উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটির আয়ুর্বেদিক বিশ্লেষণ, বাত-প্রকোপের কারণ, অশ্বগন্ধা, ব্রাহ্মী, অভ্যঙ্গ ও প্রাণায়ামের মাধ্যমে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ বাংলা গাইড।