ভৃঙ্গরাজ গাছ চেনার উপায় ও উপকারিতা, হলুদ ফুল হলে সেটা নয়
ভৃঙ্গরাজ গাছ চেনার উপায় ও ফুলের রং কী, কেশুতি পাতার আসল পরিচয়, হলুদ ফুলের গাছটি কেন আলাদা, চুলে এর উপকারিতার প্রমাণ কতদূর আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

ফুলের রং দেখেই ব্যাপারটা ধরা যায়, আর বাংলা ইন্টারনেটে ঠিক এই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়। ভৃঙ্গরাজ গাছ চেনার উপায় খুঁজলে যে পাতাগুলো সবার আগে আসে, তার একটি শীর্ষ ফলাফলের ঠিকানাতেই লেখা আছে অন্য একটি গাছের নাম, আর সেখানে ভৃঙ্গরাজকে হলুদ ফুলের গাছ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আসল ভৃঙ্গরাজের ফুল হলুদ নয়, সাদা।
ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba Hassk., Asteraceae গোষ্ঠীর একটি ছোট বর্ষজীবী গাছ, বাংলায় যাকে কেশুতি বা কেশুরি বলা হয়, আর যার ছোট সাদা ডেইজি-সদৃশ ফুলই চেনার প্রধান চিহ্ন। হলুদ ফুলের যে গাছটিকেও অনেকে ভৃঙ্গরাজ বলেন, সেটি আলাদা প্রজাতি, Wedelia chinensis, আয়ুর্বেদীয় ফার্মাকোপিয়ায় যার নাম কেসরাজ। দুটি একই নয়।
এই লেখায় থাকছে গাছটি চেনার নির্দিষ্ট উপায়, নামগুলোর গোলমাল কোথায়, চুলে ভৃঙ্গরাজের উপকারিতা নিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রমাণ ঠিক কতদূর গেছে, তেল ব্যবহারের ও ঘরে বানানোর নিয়ম, কেনার সময় কী দেখবেন, আর সবচেয়ে জরুরি, কাদের সতর্ক থাকা দরকার। বাঙালি স্নানঘরের তাকে প্রজন্ম পেরিয়ে আসা সেই গাঢ় সবুজ-কালো তেলের শিশিটার ভিতরে আসলে কী, সেটাই ধরার চেষ্টা।
এক নজরে
চেনার কাজটা আগে সারুন।
- ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba, বাংলায় কেশুতি বা কেশুরি, ফুল ছোট ও সাদা
- হলুদ ফুলের গাছটি আলাদা প্রজাতি, Wedelia chinensis, ফার্মাকোপিয়ায় নাম কেসরাজ
- ডাল বা পাতা ছিঁড়লে কালচে রস বেরোয়, এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাঠ-পরীক্ষা
- শাস্ত্রে এটি কেশ্য ও কেশরঞ্জন, অর্থাৎ চুলের বৃদ্ধি ও বর্ণ-রক্ষার সহায়ক
- ২০২৬ সালের একটি ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালে ভৃঙ্গরাজযুক্ত তেল মিনক্সিডিলের কাছাকাছি ফল দেখিয়েছে, তবে সেটি বহু-ভেষজ মিশ্রণ
- মূল সতর্কতা সংবেদনশীল ত্বক, গর্ভাবস্থা ও অভ্যন্তরীণ সেবনে ওষুধ-মিথস্ক্রিয়া
কোন দাবির পিছনে কতটা প্রমাণ, সেটা নিচের ছকে আলাদা করে রাখলাম, কারণ ভৃঙ্গরাজ নিয়ে লেখা বেশিরভাগ বাংলা পাতায় সব দাবিকে একই ওজনে পাশাপাশি সাজিয়ে দেওয়া হয় আর তাতে পাঠকের পক্ষে বোঝার উপায় থাকে না কোনটা মানুষের ট্রায়াল থেকে আসছে আর কোনটা কেবল ইঁদুরের গবেষণা বা শাস্ত্রীয় উল্লেখ।
| দাবি | প্রমাণের মাত্রা | সংক্ষেপে |
|---|---|---|
| চুল পড়া কমা ও ঘনত্ব বাড়া | মাঝারি প্রমাণ | ২০২৬ সালের ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়াল, তবে বহু-ভেষজ তেল ও ছোট নমুনা |
| অকালে পাকা চুলে সহায়তা | সীমিত প্রমাণ | একই ট্রায়ালে পাকা চুলের স্কোরে মিনক্সিডিলের চেয়ে ভালো ফল |
| শুধু ভৃঙ্গরাজ তেলের নিজস্ব ফল | অপর্যাপ্ত প্রমাণ | একক ভেষজ হিসেবে মানুষের ট্রায়াল কার্যত নেই |
| খাওয়ার নির্যাসে চুল পড়া কমা | সীমিত প্রমাণ | ২০২৫ সালের গবেষণা, তবে নিয়ন্ত্রণ দল ছাড়া খোলা নকশা |
| খুশকি ও স্কাল্পের চুলকানি | সীমিত প্রমাণ | অ্যান্টিফাঙ্গাল ও প্রদাহ-নাশক ভূমিকা আলোচিত |
| লিভারের কার্যকারিতা | সীমিত প্রমাণ | মূলত প্রাণী-গবেষণা |
| স্মৃতি ও মেধা | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | মেধ্য রসায়ন হিসেবে শাস্ত্রে উল্লিখিত |
| কেশ্য ও কেশরঞ্জন শ্রেণিভুক্তি | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | চরক সংহিতা ও অষ্টাঙ্গ হৃদয়ে নথিভুক্ত |
ভৃঙ্গরাজ গাছ চেনার উপায় কী?
ভৃঙ্গরাজ গাছ চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় দুটি, ফুলের রং আর ডাল ছিঁড়লে বেরোনো রসের রং।
চেনার ধাপগুলো সরল। গাছটি ছোট, ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার উঁচু, কখনো সোজা কখনো মাটি ঘেঁষে ছড়ানো, আর গাঁট থেকে শিকড় নামায়। বাংলার আরও যে ভেষজ গাছগুলো এভাবে অযত্নে জন্মায় সেগুলোর তালিকা ভেষজ বিভাগে একসঙ্গে সাজানো আছে। পাতা সরু, বিপরীতমুখী, গায়ে খসখসে ছোট রোঁয়া। ভেজা মাটি, পুকুরপাড় ও ধানখেতের আলে এটি নিজে থেকেই জন্মায়, এতটাই সাধারণ যে বেশিরভাগ মানুষ একে আগাছা ভাবেন।
ফুলটাই আসল চিহ্ন। ভৃঙ্গরাজের ফুল ছোট, ছয় থেকে আট মিলিমিটার চওড়া, পাপড়ি সাদা, মাঝখানটা হালকা সবুজাভ-সাদা, দেখতে ছোট ডেইজির মতো। ইংরেজি নামটাই তাই False Daisy। ফুল যদি উজ্জ্বল হলুদ হয়, তবে হাতের গাছটি ভৃঙ্গরাজ নয়।
দ্বিতীয় পরীক্ষাটা আরও সহজ, আর মাঠে দাঁড়িয়েই করা যায়। তাজা ডাল বা পাতা ছিঁড়লে কাটা জায়গা থেকে যে রস বেরোয় তা কিছুক্ষণের মধ্যেই কালচে হয়ে যায় আর আঙুলে বা কাপড়ে দাগ ফেলে দেয়, আর এই কালচে রসের কারণেই গাছটি হাজার বছর ধরে চুলে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। রসটাই আসল।
কেশুতি, কেশরাজ, ভীমরাজ, নামগুলো কি একই গাছ?
নামগুলো দৈনন্দিন বাংলায় একই গাছ বোঝালেও ফার্মাকোপিয়ার হিসেবে ভৃঙ্গরাজ ও কেসরাজ আলাদা দুটি ভেষজ, আর এই পার্থক্যটা কেনার সময় কাজে লাগে।
বাংলায় Eclipta alba-কে সবচেয়ে বেশি ডাকা হয় কেশুতি বা কেশুরি নামে, কোথাও কেশরাজ, কোথাও ভীমরাজ। এই ভাষাগত ব্যবহারে কোনো ভুল নেই, গ্রামবাংলায় কেশুতি বললে মানুষ এই গাছটাই বোঝে।
গোলমালটা শুরু হয় শাস্ত্রীয় ও ফার্মাকোপিয়ার স্তরে। পর্যালোচনা-সাহিত্য অনুযায়ী আয়ুর্বেদীয় ফার্মাকোপিয়া অফ ইন্ডিয়ায় ভৃঙ্গরাজ ও কেসরাজ দুটি পৃথক দ্রব্য হিসেবে নথিভুক্ত, ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba-র সম্পূর্ণ গাছ আর কেসরাজ হলো Wedelia chinensis-এর মূল বাদ দিয়ে শুকনো গাছ। অর্থাৎ বাংলা মুখের ভাষায় যে দুটি নাম একে অপরের বিকল্প, ওষুধের নাম হিসেবে সে দুটি এক নয়।
এখানেই আমাদের নিজেদের একটা সংশোধন দরকার। এই লেখার আগের সংস্করণে বলা ছিল ভৃঙ্গরাজ, কেশরাজ, ভীমরাজ ও মহাভৃঙ্গরাজ ঘুরেফিরে একই গাছকেই বোঝায়। দৈনন্দিন বাংলার হিসেবে কথাটা চলে, কিন্তু ফার্মাকোপিয়ার হিসেবে চলে না, আর সেই ফারাকটা এখানে স্পষ্ট করে দেওয়া হলো।
হলুদ ফুলের ভৃঙ্গরাজ আসলে অন্য গাছ
হলুদ ফুলের যে গাছটিকে বাংলা ইন্টারনেটে প্রায়ই ভৃঙ্গরাজ বলা হয়, সেটি Wedelia chinensis, শাস্ত্রে যাকে পীত ভৃঙ্গরাজ বলা হয়, আর চুলের গবেষণাগুলো সেই গাছটির ওপর হয়নি।
শাস্ত্রে ভৃঙ্গরাজের কয়েকটি ভেদের কথা আছে, শ্বেত অর্থাৎ সাদা, পীত অর্থাৎ হলুদ, আর নীল। এর মধ্যে শ্বেত ভৃঙ্গরাজ, অর্থাৎ Eclipta alba, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং আধুনিক গবেষণার প্রায় পুরোটাই এই প্রজাতিকে ঘিরে।
সমস্যাটা কেবল নামের নয়, বাজারেরও। প্রকাশিত পর্যালোচনায় সরাসরি লেখা আছে, কাঁচা ভেষজের বাজারে Eclipta alba-তে প্রায়ই Wedelia calendulacea মিশিয়ে দেওয়া হয়, অর্থাৎ এটি একটি নথিভুক্ত ভেজাল-সমস্যা, কারও কল্পনা নয়। (উদ্ভিদবিদ্যায় Wedelia গোত্রের এই গাছগুলোকে এখন Sphagneticola নামে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই পুরোনো ও নতুন দুই নামই সাহিত্যে চোখে পড়ে।)
এই ধরনের নাম-বিভ্রান্তি বাংলার ভেষজে বিরল নয়। রাম বাসক আর বাসকের ক্ষেত্রেও ঠিক একই জিনিস ঘটে, দুটি আলাদা গাছকে এক নামে ডাকা হয় বলে গবেষণার ফলও গুলিয়ে যায়।
তার মানে হলুদ ফুলের গাছটি অকেজো, তা নয়। আপনি কি কখনো খেয়াল করে দেখেছেন, আপনার বাড়ির কাছের যে গাছটিকে ভৃঙ্গরাজ বলা হয় তার ফুল কোন রঙের? উত্তরটা হলুদ হলে সেটি আলাদা একটি ভেষজ, যার নিজস্ব ব্যবহার আছে, কিন্তু চুলের যে প্রমাণ নিয়ে এই লেখা, সেটি তার নয়।
ভৃঙ্গরাজ কী আর শাস্ত্র একে কেন কেশ্য বলে
ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba Hassk. (সমার্থক নাম Eclipta prostrata) নামের Asteraceae গোষ্ঠীর একটি ছোট বর্ষজীবী গাছ, যা ভেজা মাটি, পুকুরপাড় ও ধানখেতের আলে নিজে থেকেই জন্মায়। ইংরেজিতে একে বলা হয় False Daisy, আর বাংলায় কেশুতি।
শাস্ত্রে এর অবস্থান নির্দিষ্ট। চরক সংহিতা ও অষ্টাঙ্গ হৃদয়ে ভৃঙ্গরাজকে বারবার কেশ্য অর্থাৎ চুলের হিতকর ভেষজের তালিকায় রাখা হয়েছে, আর যকৃৎ ও কেশ, এই দুই জায়গায় এর প্রধান ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। এই শ্রেণিভুক্তি ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহারের নথি, আধুনিক অর্থে কার্যকারিতার প্রমাণ নয়, আর দুটোর ফারাক এই লেখায় বারবার ফিরে আসবে।
দোষের হিসাবে ভৃঙ্গরাজকে সাধারণত কফ ও বাত, এই দুই দোষের প্রশমক বলা হয়। আয়ুর্বেদিক পর্যালোচনা সাহিত্যে এর রসপঞ্চক দেওয়া আছে এইভাবে, রস কটু ও তিক্ত, গুণ রুক্ষ ও লঘু, বিপাক কটু, আর এই সমন্বয়ই একে কফ ও বাত কমানোর দিকে নিয়ে যায়। বীর্য নিয়ে অবশ্য উৎসে উৎসে মতভেদ আছে, বেশিরভাগ পর্যালোচনায় একে উষ্ণ বলা হলেও কয়েকটি জায়গায় শীতল বলা হয়েছে, তাই এখানে একটা পক্ষ নিলাম না।
আয়ুর্বেদিক চুলের যত্নের লেখায় আমরা দেখেছি, শাস্ত্রে চুলকে নিছক সৌন্দর্যের অঙ্গ নয়, অস্থি-ধাতুর উপজাত হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ হাড়ের পুষ্টি ভালো হলে চুল ভালো, আর চুলের অবস্থা শরীরের গভীর স্বাস্থ্যের একটা আয়না। ভৃঙ্গরাজের ভূমিকাও এই গভীর-স্তরের যত্নে, কেবল বাইরের চাকচিক্যে নয়।
গবেষণা ভৃঙ্গরাজ নিয়ে কী বলে?
ভৃঙ্গরাজ নিয়ে আধুনিক গবেষণার ভিত্তি দীর্ঘদিন ছিল প্রাণী-গবেষণা, আর মানুষের ট্রায়াল যোগ হয়েছে সম্প্রতি, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে। আগে প্রাণী-পর্বটা দেখে নিই, কারণ বাংলা ইন্টারনেটে যে দাবিগুলো ঘোরে তার প্রায় সবগুলোরই উৎস এই পর্ব। ভৃঙ্গরাজের মধ্যে ওয়েডেলোল্যাকটোন, ক্যুমেস্টান, ট্রাইটারপেনয়েড ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো যৌগ পাওয়া গেছে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-নাশক গুণ আলোচিত। এর মধ্যে 5-আলফা-রিডাক্টেস নামের এনজাইম (যা টেস্টোস্টেরনকে DHT-তে বদলায়, আর DHT পুরুষ-প্যাটার্ন চুল-পড়ার একটি কারণ) সীমিত করার সম্ভাবনাও কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, তবে তা এখনো প্রাথমিক।
দুটি প্রাণী-গবেষণা এখানে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়। Archives of Dermatological Research জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Roy ও সহকর্মীরা, ২০০৮) ইঁদুরের ত্বকে ভৃঙ্গরাজের পেট্রোলিয়াম-ইথার নির্যাস লাগিয়ে দেখা যায়, ৫ শতাংশ নির্যাস বৃদ্ধি-পর্যায়ের (অ্যানাজেন) ফলিকল বাড়িয়েছে (৬৯ বনাম নিয়ন্ত্রণ দলে ৪৭), এমনকি ২ শতাংশ মিনক্সিডিলের চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে। আরেকটি গবেষণায় (Datta ও সহকর্মীরা, Journal of Ethnopharmacology, ২০০৯) মাউসের ওপর ভৃঙ্গরাজের মিথানল-নির্যাস মাত্রা-নির্ভরভাবে চুলের বৃদ্ধি-পর্যায় উদ্দীপিত করেছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এই থেকে ভৃঙ্গরাজ মিনক্সিডিলের সমান কার্যকর, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। এগুলো প্রাণীর ওপর নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, আর মানুষের মাথার ত্বক ও চুল-পড়ার কারণ অনেক জটিল। Biomolecules পত্রিকায় ২০২১ সালে প্রকাশিত Timalsina ও Devkota-র পর্যালোচনায় সরাসরি লেখা ছিল, Eclipta prostrata নিয়ে মানুষের ওপর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার তথ্য কার্যত নেই।
তবে সেই ছবিটা ২০২৫ সাল থেকে বদলাতে শুরু করেছে, আর সেটাই এই অংশের সবচেয়ে নতুন খবর। কথাটা এখন পুরোনো।
মিনক্সিডিলের সঙ্গে তুলনায় ভৃঙ্গরাজ কোথায় দাঁড়াল?
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালে ভৃঙ্গরাজযুক্ত একটি আয়ুর্বেদিক তেল ৫ শতাংশ মিনক্সিডিলের কাছাকাছি ফল দেখিয়েছে, তবে গবেষণাটি একক ভেষজের নয়।
গবেষণাটি Patel ও সহকর্মীদের, প্রকাশিত Cureus জার্নালে (2026;18(7):e111988)। ৭৮ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৭৫ জন ১২০ দিনের পর্ব শেষ করেন, প্রতি দলে ২৫ জন, বণ্টন ছিল কম্পিউটার-নির্ধারিত এবং অংশগ্রহণকারী ও মূল্যায়নকারী কেউই জানতেন না কে কোন দলে। তিনটি দল ছিল, শুধু বহু-ভেষজ তেল, তেল ও ৫ শতাংশ মিনক্সিডিল একসঙ্গে, এবং শুধু ৫ শতাংশ মিনক্সিডিল।
| ১২০ দিনে পরিবর্তন | বহু-ভেষজ তেল | ৫% মিনক্সিডিল |
|---|---|---|
| চুলের ঘনত্ব | ১৬.২৪% বৃদ্ধি | ১৪.৫২% বৃদ্ধি |
| চুলের পুরুত্ব | ২৬.৩৬% বৃদ্ধি | ২১.৬৪% বৃদ্ধি |
| চিরুনি-পরীক্ষায় চুল পড়া | ৫৫.২০% হ্রাস | ৫৩.৭১% হ্রাস |
| পাকা চুলের স্কোর | ২৪.১৮% হ্রাস | ৪.২৮% হ্রাস |
সব ক'টি পরিবর্তনই দলের ভিতরে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল (p<0.0001), আর কোনো দলেই জ্বালা, লালচে ভাব বা চুলকানির মতো প্রতিকূল ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
এবার শর্তগুলো, কারণ এগুলো ছাড়া উপরের ছকটা বিভ্রান্তিকর। তেলটি একক ভৃঙ্গরাজ নয়, তাতে নীল বা Indigofera tinctoria, ভৃঙ্গরাজ, আমলকী ও যষ্টিমধু তিল তেলে প্রস্তুত, ফলে ফলটুকু ভৃঙ্গরাজের নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করা যায় না। প্রতি দলে মাত্র ২৫ জন, গবেষণা একটিমাত্র কেন্দ্রে, সময়কাল ১২০ দিন, আর প্লাসিবো দল ছিল না, তুলনা হয়েছে সক্রিয় ওষুধের সঙ্গে। এই দাবির প্রমাণের মাত্রা তাই মাঝারি প্রমাণ, শক্তিশালী নয়।
পাকা চুলের সারিটা তবু আলাদা করে চোখে পড়ে, কারণ সেখানে ফারাকটা বড়, ২৪ শতাংশের বিপরীতে ৪ শতাংশ। অকালে পাকা চুলের প্রসঙ্গে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো মানের ইঙ্গিত, যদিও একই শর্তগুলো এখানেও খাটে।
খাওয়ার নির্যাস নিয়ে একটি গবেষণাও ২০২৫ সালে এসেছে। Mote ও সহকর্মীদের কাজে (Journal of Ayurveda and Integrated Medical Sciences, 2025;10(12):36-42) ৫৪ জনের মধ্যে ৫০ জন ২৪ সপ্তাহ ভৃঙ্গরাজ-নির্যাসের বড়ি খান, আর চিরুনি-পরীক্ষায় চুল পড়া ৭২.৪ থেকে নেমে ২৭.১-এ দাঁড়ায়। সংখ্যাটা বড়, কিন্তু নকশাটা দুর্বল, কোনো নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না এবং কেউই ব্লাইন্ড ছিলেন না, আর চিরুনি-পরীক্ষার মতো মাপকাঠি খোলা নকশায় প্রত্যাশার প্রভাবে সহজেই বদলায়। সীমিত প্রমাণ, তার বেশি নয়।
সবচেয়ে সৎ সারসংক্ষেপটা তাই এমন। একক ভেষজ হিসেবে ভৃঙ্গরাজ তেলের নিজস্ব ফল নিয়ে মানুষের ট্রায়াল এখনো কার্যত নেই, কিন্তু ভৃঙ্গরাজযুক্ত মিশ্র তেল নিয়ে এখন অন্তত একটি ভালো নকশার ট্রায়াল আছে। আগের অবস্থান ছিল প্রমাণ কার্যত শূন্য, এখন সেটি আর ঠিক নয়।
ভৃঙ্গরাজ তেলের প্রধান উপকারিতা কী কী
ভৃঙ্গরাজের সবচেয়ে পরিচিত উপকারিতা চুল ও স্কাল্পের যত্নে, তারপর আসে লিভার ও সাধারণ কেশ-পুষ্টির প্রসঙ্গ। প্রতিটি দাবির পিছনে প্রমাণ কতটা, তা উপরের এক নজরে অংশের ছকে একসঙ্গে দেওয়া আছে, তাই এখানে আর সেই তালিকা দ্বিতীয়বার সাজালাম না; বরং কোন দাবিটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটা দেখে নেওয়া যাক।
একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখি। এই ছয়টি দাবির মধ্যে মাত্র দুটির পিছনে মানুষের ওপর করা গবেষণা আছে, ২০২৬ সালের ট্রায়াল আর ২০২৫ সালের খাওয়ার-নির্যাসের গবেষণা, বাকি চারটির ভিত্তি প্রাণী-গবেষণা বা শাস্ত্রীয় উল্লেখ। অনুপাতটা মনে রাখলে বাকি অংশ পড়া সহজ হয়।
চুল ও স্কাল্পের প্রসঙ্গেই ভৃঙ্গরাজের ব্যবহার সবচেয়ে পুরোনো ও প্রসিদ্ধ। চুল পড়া বন্ধের ঘরোয়া যত্নে এর নাম প্রায়ই আসে, আর অকালে পাকা চুলের প্রসঙ্গে একে কেশরঞ্জন হিসেবে ধরা হয়। খুশকির ক্ষেত্রে ভৃঙ্গরাজ তেল খুশকি দূর করার সাধারণ যত্নের একটা অংশ হতে পারে, তবে তীব্র খুশকি বা টাক পড়ার ক্ষেত্রে শুধু তেলে ভরসা করা ঠিক নয়। লিভারের প্রসঙ্গে ভৃঙ্গরাজকে ভুঁই আমলার মতোই সহায়ক ভাবা হয়, কিন্তু সেখানেও প্রমাণ প্রাথমিক। চুলই এর মূল ক্ষেত্র।
ভৃঙ্গরাজ, আমলকী আর ব্রাহ্মী, চুলের তিন ভেষজের পার্থক্য
ভৃঙ্গরাজ, আমলকী ও ব্রাহ্মী, চুলের এই তিন ভেষজকে প্রায়ই একসঙ্গে বলা হয়, অথচ এদের মূল ভূমিকা আলাদা। কোনটা কী কাজে বেশি ব্যবহৃত, তা নিচের ছকে সাজানো, যাতে তেল বা প্যাক বাছার সময় সুবিধা হয়।
| ভেষজ | মূল ভূমিকা | চুলে যেভাবে ব্যবহৃত |
|---|---|---|
| ভৃঙ্গরাজ | কেশ্য, ফলিকল ও বর্ণ | তেল ও চূর্ণ, স্কাল্পে মাসাজ |
| আমলকী | ভিটামিন সি, গোড়া মজবুত | তেল, চূর্ণ ও হেয়ার-প্যাক |
| ব্রাহ্মী | মেধ্য, স্ট্রেস-জনিত চুল | তেল, স্কাল্প ঠান্ডা রাখা |
তিনটির মধ্যে ভৃঙ্গরাজ সবচেয়ে সরাসরি চুল-বৃদ্ধির প্রসঙ্গে ধরা হয়, আমলকী গোড়ার পুষ্টি ও কোলাজেনে সহায়ক বলে মনে করা হয়, আর ব্রাহ্মী মূলত মন শান্ত রেখে স্ট্রেস-জনিত চুল-পড়ায় আলোচিত। বাজারের অনেক আয়ুর্বেদিক হেয়ার অয়েলে এই তিনটিই একসঙ্গে থাকে, তাই আলাদা করে চেনা থাকলে উপাদান-তালিকা পড়া সহজ হয়। উপরে যে ২০২৬ সালের ট্রায়ালটির কথা বলা হলো, সেটিও ঠিক এমনই একটি মিশ্রণের, যেখানে ভৃঙ্গরাজের সঙ্গে আমলকী ও যষ্টিমধুও ছিল, আর সেই কারণেই ফলটুকু কোনো একটি ভেষজের নামে লেখা যায় না। তিনটে আলাদা কাজ করে।
ভৃঙ্গরাজ তেল চুলে কীভাবে ব্যবহার করবেন?
ভৃঙ্গরাজ তেলের আসল উপকার আসে সঠিক নিয়মে ব্যবহারে, বেশি লাগানোয় নয়। মূল কথা স্কাল্পে, গোড়ায়, নিয়মিত। ধাপগুলো সরল।
- তেল হালকা কুসুম গরম করুন, বেশি গরম নয়
- আঙুলের ডগা দিয়ে স্কাল্পে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বৃত্তাকারে মাসাজ করুন
- চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত হালকা করে মেখে নিন
- রাতে রেখে সকালে, অথবা ১ থেকে ২ ঘণ্টা রেখে হালকা শ্যাম্পু
- সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার, তার বেশি নয়
হেয়ার-প্যাক চাইলে ২ টেবিল-চামচ ভৃঙ্গরাজ-চূর্ণ, ১ চা-চামচ আমলকী-চূর্ণ ও পর্যাপ্ত দই বা কুসুম গরম জল মিশিয়ে ৩০ মিনিট স্কাল্পে রেখে ধুয়ে ফেলুন, সপ্তাহে একবার। স্কাল্পের সাধারণ যত্নের বাকি ধাপগুলো আয়ুর্বেদিক চুলের যত্নের লেখায় আলাদা করে সাজানো আছে। একটা বাস্তব পরামর্শ দিই। বেশি দিলে বেশি উপকার, এই ধারণা এখানে খাটে না, বরং রোজ ভারী তেল স্কাল্প বন্ধ করে খুশকি বাড়াতে পারে। ধৈর্য রাখুন, অন্তত ১২ সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহারের পর পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করুন।
ঘরে ভৃঙ্গরাজ তেল কীভাবে বানাবেন?
ঘরে ভৃঙ্গরাজ তেল বানানো সহজ, আর তাতে উপাদান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। মূল নিয়ম হলো তাজা পাতার রস তেলে ধীরে ধীরে মিশিয়ে নেওয়া, পুড়িয়ে ফেলা নয়। পদ্ধতিটা এমন।
এক মুঠো তাজা ভৃঙ্গরাজ পাতা ভালো করে ধুয়ে ছেঁচে নিন, আর তার সঙ্গে নিন ১ কাপ, প্রায় ২০০ মিলি, নারকেল বা তিল তেল। কম আঁচে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট গরম করুন, যতক্ষণ না পাতার রস উবে গিয়ে তেল গাঢ় সবুজাভ হয়, খেয়াল রাখবেন পাতা যেন পুড়ে কালো না হয়। ঠান্ডা হলে পরিষ্কার সুতির কাপড়ে ছেঁকে কাচের শিশিতে ভরে রাখুন, ঠান্ডা ছায়ায় রাখলে মাসকয়েক ভালো থাকে।
কেনা তেল নিলে AYUSH-অনুমোদিত প্রস্তুতকারক বেছে নিন, আর উপাদান-তালিকায় ভৃঙ্গরাজ যেন প্রথম দিকে থাকে, খনিজ-তেল বা সিলিকন নয়। নতুন যেকোনো তেল প্রথমবার মাথায় দেওয়ার আগে কানের পিছনে বা হাতে অল্প লাগিয়ে এক দিন দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ভৃঙ্গরাজ তেল কেনার সময় কী দেখবেন ও দাম কেমন
ভৃঙ্গরাজ তেলের দাম ব্র্যান্ড ও প্যাকের আকার অনুযায়ী অনেকটা বদলায়, আর বেশিরভাগ বোতলেই ভৃঙ্গরাজ একা থাকে না।
উপাদান-তালিকাটাই প্রথম দেখার জিনিস। বাজারচলতি বেশিরভাগ আয়ুর্বেদিক হেয়ার অয়েলে ভৃঙ্গরাজের সঙ্গে ব্রাহ্মী, আমলকী, যষ্টিমধু, জটামাংসী ও আরও কয়েকটি ভেষজ মেশানো থাকে, যেমন ভারতের একটি প্রচলিত ব্র্যান্ডের ২০০ মিলি বোতলে আঠারোটি উপাদানের তালিকা দেওয়া আছে আর দাম ২৪৯ রুপি। এটি ভালো না খারাপ তা বলা যায় না, কারণ উপরের ট্রায়ালটিও মিশ্র তেলেরই ছিল, তবে বোতলের গায়ে বড় করে ভৃঙ্গরাজ লেখা থাকলেও ভিতরে সেটি অষ্টম বা দশম উপাদান হতে পারে, আর সেটা জেনে কেনা ভালো।
| অঞ্চল | যা পাওয়া গেল |
|---|---|
| ভারত | ২০০ মিলি বহু-ভেষজ তেল, প্রায় ২৪৯ রুপি |
| বাংলাদেশ | দাম বিক্রেতাভেদে বড় ব্যবধানে ঘোরে, নির্ভরযোগ্য খুচরো পরিসর যাচাই করা যায়নি |
এখানে দেওয়া দাম শুধু তথ্যের জন্য, সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক, বিক্রেতা ও সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে যাচাই করে নেবেন। কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা মানে আমরা সেটির প্রচার বা সুপারিশ করছি, তা নয়।
বাংলাদেশের ঘরটা ফাঁকা রাখলাম ইচ্ছে করেই। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম সেখানে ভৃঙ্গরাজ তেল মূলত ছোট বিক্রেতা ও ফেসবুক পেজ থেকে বিক্রি হয়, প্যাকের আকার ৫০ গ্রাম থেকে ২০০ মিলি পর্যন্ত ঘোরে আর দামের কোনো স্থিতিশীল খুচরো পরিসর আমি যাচাই করতে পারিনি। একটা আন্দাজি সংখ্যা বসিয়ে দেওয়ার চেয়ে ফাঁকা রাখা সৎ।
ভৃঙ্গরাজের অপকারিতা ও কে সতর্ক থাকবেন
ভৃঙ্গরাজ তেল বাহ্যিক ব্যবহারে সাধারণত নিরাপদ হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি, বিশেষত অভ্যন্তরীণ সেবনে। বাহ্যিক আর অভ্যন্তরীণ, দুটোর ঝুঁকি আলাদা।
সবচেয়ে ভালো নথিভুক্ত ঝুঁকিটা গোত্র-সম্পর্কিত, আর সেটা আলাদা করে বলা দরকার। ভৃঙ্গরাজ Asteraceae গোত্রের গাছ, যে গোত্রে সূর্যমুখী, ক্যামোমাইল, গাঁদা ও পার্থেনিয়ামও পড়ে। Health Science Reports জার্নালে Ključevšek ও Kreft-এর ২০২৫ সালের পর্যালোচনা (8(2), DOI 10.1002/hsr2.70398) অনুযায়ী এই গোত্রের প্রধান সংবেদনশীলতা-সৃষ্টিকারী উপাদান হলো সেসকুইটারপিন ল্যাকটোন, আর একই রকম রাসায়নিক গঠনের কারণে একটিতে সংবেদনশীল হলে গোত্রের অন্যগুলোতেও প্রতিক্রিয়া হতে পারে। ওই পর্যালোচনাতেই উল্লেখ আছে, ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি নির্দেশ দিয়েছে একই গোত্রের সব গাছের প্রতি সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে। নিউজিল্যান্ড ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটির DermNet-ও একই কথা বলে, একবার সংবেদনশীল হলে কাছাকাছি গঠনের অন্য উপাদানেও প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে।
- সূর্যমুখী, ক্যামোমাইল, গাঁদা বা পার্থেনিয়ামে অ্যালার্জি থাকলে ভৃঙ্গরাজেও প্রতিক্রিয়া সম্ভব, উপরের গোত্র-সম্পর্কিত কারণেই, তাই প্রথমবার ব্যবহারের আগে প্যাচ-টেস্ট
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার এড়ানো ভালো; এখানে নিষেধের ভিত্তি কোনো নথিভুক্ত ক্ষতি নয়, বরং তথ্যের অভাব, কারণ ২০২১ সালের Biomolecules পর্যালোচনাতেই বলা হয়েছিল মানুষের ওপর নিরাপত্তার তথ্য কার্যত নেই
- খোলা ক্ষত, সক্রিয় একজিমা বা সংক্রমিত স্কাল্পে তেল না লাগানোই ভালো, সেখানে নিম পাতার মতো ভেষজের সীমাবদ্ধতাও একই রকম
- অভ্যন্তরীণ সেবনে অতিরিক্ত মাত্রায় পেটের অস্বস্তি, আর মূত্রবর্ধক প্রভাবের কথা আলোচিত, তাই রক্তচাপ কম থাকলে বাড়তি সতর্কতা; এটি ঐতিহ্যগত ব্যবহারের ভিত্তিতে বলা, নিয়ন্ত্রিত গবেষণার ভিত্তিতে নয়
- কোলেস্টেরল বা অন্য নিয়মিত ওষুধ চললে অভ্যন্তরীণ ভৃঙ্গরাজ শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ, মিথস্ক্রিয়ার আশঙ্কায়
চুল-পড়ার আসল কারণ যদি থাইরয়েড, ভিটামিন D বা B12-এর অভাব, আয়রন-ঘাটতি বা PCOS হয়, তবে শুধু ভৃঙ্গরাজ তেলে ফল আসবে না, কারণ বাইরের যত্ন কখনো ভেতরের ঘাটতি বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা পূরণ করতে পারে না। দিনে ১০০-র বেশি চুল দীর্ঘদিন পড়লে রক্ত-পরীক্ষা (ভিটামিন D, B12, ফেরিটিন, TSH) করিয়ে নেওয়া দরকার। চুল পড়ার লেখায় আমরা এই অন্তর্নিহিত কারণ খোঁজার গুরুত্ব বিশদে আলোচনা করেছি, আর ভৃঙ্গরাজ সেখানে সহায়ক ভেষজ, মূল সমাধানের বিকল্প নয়।
একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
ভৃঙ্গরাজ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভেষজের চেয়েও বড় সম্ভবত অভ্যাসটা। অভ্যাসটাই আসল নায়ক। (এই লেখা তৈরি করতে গিয়ে অবশ্য নিজের একটা ভুলও ধরা পড়েছে, আগের সংস্করণে আমি ফুলের রং লিখেছিলাম সাদা বা হলদে, অর্থাৎ যে গোলমালটা নিয়ে এত কথা বললাম সেটা আমার নিজের লেখাতেই ছিল।) বাঙালি পরিবারে সাপ্তাহিক তেল-মাখার একটা দিন থাকত, প্রায়ই শনিবার রাত আর রবিবার সকালে স্নান। কোন ব্র্যান্ড, কোন কম্পোজিশন, এসব ছিল গৌণ। আমার মনে হয়, ভৃঙ্গরাজের সবচেয়ে বড় উপকারটা আসে এই নিয়মিত স্কাল্প-মাসাজ থেকেই, যেখানে আঙুলের নড়াচড়া রক্ত-সঞ্চালন বাড়ায়, ১০ থেকে ১৫ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকা মনকে একটু জিরিয়ে দেয়, আর ভেষজের ভূমিকা তার ওপর একটা বাড়তি স্তর। যাঁরা ব্যস্ততায় এই অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের বলব, সপ্তাহে এক রাত আধ ঘণ্টা ফিরিয়ে আনুন। ফল কেবল চুলে নয়, ঘুমেও টের পাবেন।
সংক্ষেপে ও উপসংহার
ভৃঙ্গরাজ শাস্ত্রের কেশ্য ভেষজ, চুল-যত্নে পুরোনো ও শ্রদ্ধেয়, কিন্তু তার উপকার নিঃশর্ত নয়। ২০২৬ সালের ট্রায়ালের পর আর বলা চলে না যে মানুষের ওপর প্রমাণ শূন্য, তবে সেই ট্রায়ালটি বহু-ভেষজ তেলের ও ছোট নমুনার, তাই একক ভৃঙ্গরাজের নিজস্ব ফল এখনো অমীমাংসিত। আর চুল পড়া নিজেই বহু-কারণের সমস্যা। সহজ সমাধান নেই।
আজ থেকে যদি একটা কাজ করেন, তবে সেটা হোক এই, বাড়ির কাছের বা কেনা যে গাছটিকে আপনি ভৃঙ্গরাজ ভাবছেন তার একটা ডাল ছিঁড়ে দেখুন রস কালচে হচ্ছে কি না আর ফুলটা সাদা না হলুদ। ওই দুই সেকেন্ডের পরীক্ষাই ঠিক করে দেবে আপনি আসল গাছটি নিয়ে কাজ করছেন, নাকি অন্য একটি প্রজাতি নিয়ে। তারপর তেল লাগালে সপ্তাহে দুই দিন, অন্তত ১২ সপ্তাহ, আর চুল-পড়া বেশি হলে থাইরয়েড ও ভিটামিনের রক্ত-পরীক্ষা করিয়ে নিন, কারণ আসল কারণ ঠিক না করলে কোনো তেলই একা কাজ করবে না। চুলে রং ও কন্ডিশনিংয়ের ঘরোয়া পথ হিসেবে মেহেদির প্রমাণ দেখা আছে চুলে মেহেদি পাতা লাগানোর নিয়ম লেখায়।
সূত্র / Sources
- Roy RK, Thakur M, Dixit VK. Hair growth promoting activity of Eclipta alba in male albino rats. Archives of Dermatological Research, ২০০৮: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/18478241
- Datta K ও সহকর্মীরা. Eclipta alba extract with potential for hair growth promoting activity. Journal of Ethnopharmacology, ২০০৯: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/19481595
- Timalsina D, Devkota HP. Eclipta prostrata (L.) L. (Asteraceae), Ethnomedicinal Uses, Chemical Constituents, and Biological Activities. Biomolecules, ২০২১: PMC8615741
- Patel MN, Patel N, Merja A, Patel RR, Mishra M. An Integrative Approach of Neeli Bhringraj Polyherbal Hair Oil in Clinical Evaluation of Androgenetic Alopecia (Khalitya) and Premature Hair Graying (Palitya): A Randomized, Double-Blind Clinical Study. Cureus. 2026;18(7):e111988. DOI 10.7759/cureus.111988, PMC13429210
- Mote D, Mali S, Maurya M, Kide L. Clinical Evaluation of Standardized Bhringaraj (Eclipta alba) Extract Tablets in Hair Fall: A 24 Week Prospective Trial. Journal of Ayurveda and Integrated Medical Sciences. 2025;10(12):36-42. jaims.in
- Ključevšek T, Kreft S. Allergic Potential of Medicinal Plants From the Asteraceae Family. Health Science Reports. 2025;8(2). DOI 10.1002/hsr2.70398, PMC11847717
- DermNet, New Zealand Dermatological Society. Compositae allergy and sesquiterpene lactone contact allergy: dermnetnz.org
- ধ্রুপদী রেফারেন্স: চরক সংহিতা ও অষ্টাঙ্গ হৃদয় (ভৃঙ্গরাজ, কেশ্য ও কেশরঞ্জন প্রসঙ্গ)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

বেল খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা, কাঁচা আর পাকা বেলের আসল ফারাক
বেল খাওয়ার উপকারিতা কতটা প্রমাণিত, কাঁচা ও পাকা বেলের ফারাক, পাকা বেল খাওয়ার অপকারিতা, ডায়াবেটিসে বেল, বেল পাতার রস খেলে কী হয় আর খাওয়ার সঠিক সময়।

খালি পান খেলে কি হয়? পান পাতার উপকারিতা ও অপকারিতার প্রমাণ
পান পাতার উপকারিতা কতটা প্রমাণিত, খালি পান খেলে কি হয়, পান খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতায় সুপারি-জর্দার দায়, মিষ্টি পান, পান খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা।

পেয়ারা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, ১৪টি পাতার ট্রায়াল যা বলছে
পেয়ারা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা কোন ট্রায়ালে প্রমাণিত, পেয়ারা পাতা খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা, খালি পেটে পাতা খাওয়া আর পাতার চা ও রস নিয়ে যা জানা আছে।