আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ২৫ মে, ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ২৪ আগস্ট, ২০২৬ 9 মিনিট পড়ুন

ভৃঙ্গরাজ তেলের উপকারিতা, চুলে ব্যবহারের নিয়ম ও সতর্কতা

ভৃঙ্গরাজ বা কেশরাজ তেলের উপকারিতা চুল পড়া ও পাকা চুলে, ঘরে তেল বানানো ও ব্যবহারের নিয়ম, গবেষণা কী বলে ও কাদের সতর্কতা দরকার, বাংলায় গবেষণা-সমর্থিত গাইড।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

ভৃঙ্গরাজ পাতা ও আয়ুর্বেদিক হেয়ার অয়েল, চুলের যত্নের কেশরাজ ভেষজ ভৃঙ্গরাজ তেলের পরিচিতি
সূচিপত্র11টি বিভাগ

বাঙালি স্নানঘরের তাকে যে গাঢ় সবুজ-কালো তেলের শিশিটা প্রজন্ম পেরিয়ে আসছে, গন্ধে একটু তেতো-মিষ্টি, রঙে গাঢ় জলপাই, তার ভিতরের প্রধান ভেষজ অনেক সময়ই ভৃঙ্গরাজ। সংস্কৃতে এই গাছের একটা নামই কেশরাজ, অর্থাৎ চুলের রাজা। বানানভেদে অনেকে একে ভৃংরাজ বা ভীমরাজ লেখেন, তবে জিনিসটা একটাই। গ্রামবাংলার পুকুরপাড়ে বা স্যাঁতসেঁতে জমিতে গাছটা এত সাধারণ যে অনেকে একে নিছক আগাছাই ভাবেন, অথচ শাস্ত্রে এর কদর অনেক পুরোনো।

ভৃঙ্গরাজ তেল আসলে চুলের জন্য কতটা কাজ করে, এর সোজা উত্তর হলো, ঐতিহ্যে ও প্রাণী-গবেষণায় ভালো ইঙ্গিত আছে, কিন্তু মানুষের ওপর বড় মাপের প্রমাণ এখনো সীমিত। আয়ুর্বেদে এটি Eclipta alba গাছ, শাস্ত্রে যাকে কেশ্য অর্থাৎ চুলের হিতকর ভেষজ বলা হয়েছে। তবে গোড়াতেই একটা কথা পরিষ্কার। ভৃঙ্গরাজ তেল চুল-পড়ার নিশ্চিত সমাধান নয়, বরং একটি সহায়ক ভেষজ, যার আসল জোর নিয়মিত যত্ন ও স্কাল্প-মাসাজের অভ্যাসে। আর ভৃঙ্গরাজ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তেলের রূপে, যদিও চূর্ণ, হেয়ার-প্যাক ও তাজা পাতার রসেও এর ব্যবহার আছে। এই পাতায় উপকারের দাবি আর গবেষণার বাস্তব, দুটো দিকই সৎভাবে সাজানো হয়েছে।

এক নজরে

  • ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba গাছ, বাংলায় কেশরাজ বা ভীমরাজ, চুলের ভেষজ হিসেবে বিখ্যাত
  • শাস্ত্রে এটি কেশ্য ও কেশরঞ্জন, অর্থাৎ চুলের বৃদ্ধি ও বর্ণ-রক্ষার সহায়ক
  • প্রধান ব্যবহার চুলে তেল, তারপর চূর্ণ ও হেয়ার-প্যাক, আর সীমিত মাত্রায় অভ্যন্তরীণ
  • গবেষণার জোর মূলত প্রাণী-পর্যায়ে, মানুষের বড় ট্রায়াল এখনো কম
  • মূল সতর্কতা সংবেদনশীল ত্বক, গর্ভাবস্থা, অভ্যন্তরীণ সেবনে ওষুধ-মিথস্ক্রিয়া
  • মনে রাখা ভালো, এটি সহায়ক ভেষজ, চুল-পড়ার আসল কারণের চিকিৎসার বিকল্প নয়

ভৃঙ্গরাজ কী আর শাস্ত্র একে কেন কেশরাজ বলে

ভৃঙ্গরাজ হলো Eclipta alba (কাছাকাছি নাম Eclipta prostrata) নামের Asteraceae গোষ্ঠীর একটি ছোট বর্ষজীবী লতানে গাছ, যা ভেজা মাটি, পুকুরপাড় ও ধানখেতের আলে নিজে থেকেই জন্মায়। এর ছোট সাদা বা হলদে ফুল, সরু পাতা, আর একটা বিশেষত্ব আছে, ডাল ভাঙলে ভিতর থেকে কালচে রস বের হয়। এই কালচে রসকেই ভেষজের প্রধান শক্তি বলে ধরা হয়। রসটাই আসল।

নামটা নিয়ে একটা ছোট বিভ্রান্তি মিটিয়ে নেওয়া ভালো। ভৃঙ্গরাজ, কেশরাজ, ভীমরাজ ও মহাভৃঙ্গরাজ, এই নামগুলো ঘুরেফিরে একই গাছকেই বোঝায়, শুধু অঞ্চল ও বানানভেদে আলাদা শোনায়। চরক সংহিতা ও অষ্টাঙ্গ হৃদয়ে ভৃঙ্গরাজকে বারবার কেশ্য অর্থাৎ চুলের হিতকর ভেষজের তালিকায় রাখা হয়েছে, আর যকৃৎ ও কেশ, এই দুই জায়গায় এর প্রধান ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।

আয়ুর্বেদিক চুলের যত্নের লেখায় আমরা দেখেছি, শাস্ত্রে চুলকে নিছক সৌন্দর্যের অঙ্গ নয়, অস্থি-ধাতুর উপজাত হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ হাড়ের পুষ্টি ভালো হলে চুল ভালো, আর চুলের অবস্থা শরীরের গভীর স্বাস্থ্যের একটা আয়না। ভৃঙ্গরাজের ভূমিকাও এই গভীর-স্তরের যত্নে, কেবল বাইরের চাকচিক্যে নয়।

গবেষণা ভৃঙ্গরাজ নিয়ে কী বলে?

ভৃঙ্গরাজ নিয়ে আধুনিক গবেষণার ছবিটা আশাব্যঞ্জক, কিন্তু গোড়াতেই একটা সততা দরকার, প্রায় সব জোরালো প্রমাণই এখনো প্রাণীর ওপর, মানুষে নয়। ভৃঙ্গরাজের মধ্যে ওয়েডেলোল্যাকটোন, ক্যুমেস্টান, ট্রাইটারপেনয়েড ও ফ্ল্যাভোনয়েডের মতো যৌগ পাওয়া গেছে, যেগুলোর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-নাশক গুণ আলোচিত। এর মধ্যে 5-আলফা-রিডাক্টেস নামের এনজাইম (যা টেস্টোস্টেরনকে DHT-তে বদলায়, আর DHT পুরুষ-প্যাটার্ন চুল-পড়ার একটি কারণ) সীমিত করার সম্ভাবনাও কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে, তবে তা এখনো প্রাথমিক।

দুটি প্রাণী-গবেষণা এখানে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়। Archives of Dermatological Research জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Roy ও সহকর্মীরা, ২০০৮) ইঁদুরের ত্বকে ভৃঙ্গরাজের পেট্রোলিয়াম-ইথার নির্যাস লাগিয়ে দেখা যায়, ৫ শতাংশ নির্যাস বৃদ্ধি-পর্যায়ের (অ্যানাজেন) ফলিকল বাড়িয়েছে (৬৯ বনাম নিয়ন্ত্রণ দলে ৪৭), এমনকি ২ শতাংশ মিনক্সিডিলের চেয়েও ভালো ফল দেখিয়েছে। আরেকটি গবেষণায় (Datta ও সহকর্মীরা, Journal of Ethnopharmacology, ২০০৯) মাউসের ওপর ভৃঙ্গরাজের মিথানল-নির্যাস মাত্রা-নির্ভরভাবে চুলের বৃদ্ধি-পর্যায় উদ্দীপিত করেছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই থেকে ভৃঙ্গরাজ মিনক্সিডিলের সমান কার্যকর, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। প্রথমত, এগুলো প্রাণীর ওপর নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, মানুষের মাথার ত্বক ও চুল-পড়ার কারণ অনেক জটিল। দ্বিতীয়ত, Biomolecules পত্রিকায় ২০২১ সালে প্রকাশিত Timalsina ও Devkota-র পর্যালোচনায় সরাসরি লেখা আছে, Eclipta prostrata নিয়ে মানুষের ওপর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার তথ্য কার্যত নেই এবং ভবিষ্যতে সঠিকভাবে নকশা করা ক্লিনিকাল গবেষণা দরকার। ওই পর্যালোচনাতেই একটি তুলনা আছে যা মনে রাখার মতো, ইথানল-নির্যাসে চুল গজানো সম্পূর্ণ হতে লেগেছিল প্রায় ১৯.০১ দিন, মিনক্সিডিলে ১৬.০৫ দিন, আর সেটিও ইঁদুরে। তাই সবচেয়ে সৎ কথাটা হলো, ইঙ্গিত ভালো, প্রমাণ অসম্পূর্ণ। এটুকুই বাস্তব।

ভৃঙ্গরাজ তেলের প্রধান উপকারিতা কী কী

ভৃঙ্গরাজের সবচেয়ে পরিচিত উপকারিতা চুল ও স্কাল্পের যত্নে, তারপর আসে লিভার ও সাধারণ কেশ-পুষ্টির প্রসঙ্গ। কোন ব্যবহারের পিছনে কতটা জোরালো প্রমাণ, তা এক নজরে গুছিয়ে দেখা দরকার, কারণ সব দাবির ভিত এক নয়।

যেখানে ব্যবহৃত হয় সম্ভাব্য ভূমিকা (হেজ করা) প্রমাণের জোর
চুল পড়া কমানো ও নতুন চুল ফলিকলের বৃদ্ধি-পর্যায় উদ্দীপনে সহায়ক বলে ইঙ্গিত সীমিত প্রমাণ (মূলত প্রাণী-গবেষণা)
অকালে পাকা চুল বর্ণ-রক্ষায় সহায়ক বলে ধরা হয় ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার
খুশকি ও স্কাল্পের চুলকানি অ্যান্টিফাঙ্গাল ও প্রদাহ-নাশক ভূমিকা আলোচিত সীমিত প্রমাণ
লিভারের কার্যকারিতা হেপাটোপ্রোটেকটিভ গুণ আলোচিত সীমিত প্রমাণ (মূলত প্রাণী)
স্মৃতি ও মেধা মেধ্য রসায়ন হিসেবে ঐতিহ্যে উল্লিখিত ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার

চুল ও স্কাল্পের প্রসঙ্গেই ভৃঙ্গরাজের ব্যবহার সবচেয়ে পুরোনো ও প্রসিদ্ধ। চুল পড়া বন্ধের ঘরোয়া যত্নে এর নাম প্রায়ই আসে, আর অকালে পাকা চুলের প্রসঙ্গে একে কেশরঞ্জন হিসেবে ধরা হয়। খুশকির ক্ষেত্রে ভৃঙ্গরাজ তেল খুশকি দূর করার সাধারণ যত্নের একটা অংশ হতে পারে, তবে তীব্র খুশকি বা টাক পড়ার ক্ষেত্রে শুধু তেলে ভরসা করা ঠিক নয়। লিভারের প্রসঙ্গে ভৃঙ্গরাজকে ভুঁই আমলার মতোই সহায়ক ভাবা হয়, কিন্তু সেখানেও প্রমাণ প্রাথমিক। চুলই এর মূল ক্ষেত্র।

ভৃঙ্গরাজ, আমলকী আর ব্রাহ্মী, চুলের তিন ভেষজের পার্থক্য

ভৃঙ্গরাজ, আমলকী ও ব্রাহ্মী, চুলের এই তিন ভেষজকে প্রায়ই একসঙ্গে বলা হয়, অথচ এদের মূল ভূমিকা আলাদা। কোনটা কী কাজে বেশি ব্যবহৃত, তা নিচের ছকে সাজানো, যাতে তেল বা প্যাক বাছার সময় সুবিধা হয়।

ভেষজ মূল ভূমিকা চুলে যেভাবে ব্যবহৃত
ভৃঙ্গরাজ কেশরাজ, ফলিকল ও বর্ণ তেল ও চূর্ণ, স্কাল্পে মাসাজ
আমলকী ভিটামিন সি, গোড়া মজবুত তেল, চূর্ণ ও হেয়ার-প্যাক
ব্রাহ্মী মেধ্য, স্ট্রেস-জনিত চুল তেল, স্কাল্প ঠান্ডা রাখা

তিনটির মধ্যে ভৃঙ্গরাজ সবচেয়ে সরাসরি চুল-বৃদ্ধির প্রসঙ্গে ধরা হয়, আমলকী গোড়ার পুষ্টি ও কোলাজেনে সহায়ক বলে মনে করা হয়, আর ব্রাহ্মী মূলত মন শান্ত রেখে স্ট্রেস-জনিত চুল-পড়ায় আলোচিত। বাজারের অনেক আয়ুর্বেদিক হেয়ার অয়েলে এই তিনটিই একসঙ্গে থাকে, তাই আলাদা করে চেনা থাকলে উপাদান-তালিকা পড়া সহজ হয়। তিনটে আলাদা কাজ করে।

ভৃঙ্গরাজ তেল চুলে কীভাবে ব্যবহার করবেন?

ভৃঙ্গরাজ তেলের আসল উপকার আসে সঠিক নিয়মে ব্যবহারে, বেশি লাগানোয় নয়। মূল কথা স্কাল্পে, গোড়ায়, নিয়মিত। ধাপগুলো সরল।

  1. তেল হালকা কুসুম গরম করুন, বেশি গরম নয়
  2. আঙুলের ডগা দিয়ে স্কাল্পে ১০ থেকে ১৫ মিনিট বৃত্তাকারে মাসাজ করুন
  3. চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত হালকা করে মেখে নিন
  4. রাতে রেখে সকালে, অথবা ১ থেকে ২ ঘণ্টা রেখে হালকা শ্যাম্পু
  5. সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার, তার বেশি নয়

হেয়ার-প্যাক চাইলে ২ টেবিল-চামচ ভৃঙ্গরাজ-চূর্ণ, ১ চা-চামচ আমলকী-চূর্ণ ও পর্যাপ্ত দই বা কুসুম গরম জল মিশিয়ে ৩০ মিনিট স্কাল্পে রেখে ধুয়ে ফেলুন, সপ্তাহে একবার। একটা বাস্তব পরামর্শ দিই। বেশি দিলে বেশি উপকার, এই ধারণা এখানে খাটে না, বরং রোজ ভারী তেল স্কাল্প বন্ধ করে খুশকি বাড়াতে পারে। ধৈর্য রাখুন, অন্তত ১২ সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহারের পর পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করুন।

ঘরে ভৃঙ্গরাজ তেল কীভাবে বানাবেন?

ঘরে ভৃঙ্গরাজ তেল বানানো সহজ, আর তাতে উপাদান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। মূল নিয়ম হলো তাজা পাতার রস তেলে ধীরে ধীরে মিশিয়ে নেওয়া, পুড়িয়ে ফেলা নয়। পদ্ধতিটা এমন।

এক মুঠো তাজা ভৃঙ্গরাজ পাতা ভালো করে ধুয়ে ছেঁচে নিন, আর তার সঙ্গে নিন ১ কাপ, প্রায় ২০০ মিলি, নারকেল বা তিল তেল। কম আঁচে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট গরম করুন, যতক্ষণ না পাতার রস উবে গিয়ে তেল গাঢ় সবুজাভ হয়, খেয়াল রাখবেন পাতা যেন পুড়ে কালো না হয়। ঠান্ডা হলে পরিষ্কার সুতির কাপড়ে ছেঁকে কাচের শিশিতে ভরে রাখুন, ঠান্ডা ছায়ায় রাখলে মাসকয়েক ভালো থাকে।

কেনা তেল নিলে AYUSH-অনুমোদিত প্রস্তুতকারক বেছে নিন, আর উপাদান-তালিকায় ভৃঙ্গরাজ যেন প্রথম দিকে থাকে, খনিজ-তেল বা সিলিকন নয়। নতুন যেকোনো তেল প্রথমবার মাথায় দেওয়ার আগে কানের পিছনে বা হাতে অল্প লাগিয়ে এক দিন দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

ভৃঙ্গরাজ তেল বাহ্যিক ব্যবহারে সাধারণত নিরাপদ হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি, বিশেষত অভ্যন্তরীণ সেবনে। বাহ্যিক আর অভ্যন্তরীণ, দুটোর ঝুঁকি আলাদা। নিচের দিকগুলো মাথায় রাখুন।

  • সংবেদনশীল ত্বক বা সূর্যমুখী-ক্যামোমাইলে অ্যালার্জি থাকলে ভৃঙ্গরাজেও প্রতিক্রিয়া সম্ভব, তাই আগে প্যাচ-টেস্ট
  • গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার এড়ানো ভালো, তথ্য সীমিত
  • খোলা ক্ষত, সক্রিয় একজিমা বা সংক্রমিত স্কাল্পে তেল না লাগানোই ভালো
  • অভ্যন্তরীণ সেবনে অতিরিক্ত মাত্রায় পেটের অস্বস্তি, আর মূত্রবর্ধক প্রভাবের কথা আলোচিত, তাই রক্তচাপ কম থাকলে বাড়তি সতর্কতা
  • কোলেস্টেরল বা অন্য নিয়মিত ওষুধ চললে অভ্যন্তরীণ ভৃঙ্গরাজ শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ, মিথস্ক্রিয়ার আশঙ্কায়

চুল-পড়ার আসল কারণ যদি থাইরয়েড, ভিটামিন D বা B12-এর অভাব, আয়রন-ঘাটতি বা PCOS হয়, তবে শুধু ভৃঙ্গরাজ তেলে ফল আসবে না, কারণ বাইরের যত্ন কখনো ভেতরের ঘাটতি বা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা পূরণ করতে পারে না। দিনে ১০০-র বেশি চুল দীর্ঘদিন পড়লে রক্ত-পরীক্ষা (ভিটামিন D, B12, ফেরিটিন, TSH) করিয়ে নেওয়া দরকার। চুল পড়ার লেখায় আমরা এই অন্তর্নিহিত কারণ খোঁজার গুরুত্ব বিশদে আলোচনা করেছি, আর ভৃঙ্গরাজ সেখানে সহায়ক ভেষজ, মূল সমাধানের বিকল্প নয়।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

ভৃঙ্গরাজ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ভেষজের চেয়েও বড় সম্ভবত অভ্যাসটা। অভ্যাসটাই আসল নায়ক। বাঙালি পরিবারে সাপ্তাহিক তেল-মাখার একটা দিন থাকত, প্রায়ই শনিবার রাত আর রবিবার সকালে স্নান। কোন ব্র্যান্ড, কোন কম্পোজিশন, এসব ছিল গৌণ। আমার মনে হয়, ভৃঙ্গরাজের সবচেয়ে বড় উপকারটা আসে এই নিয়মিত স্কাল্প-মাসাজ থেকেই, যেখানে আঙুলের নড়াচড়া রক্ত-সঞ্চালন বাড়ায়, ১০ থেকে ১৫ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকা মনকে একটু জিরিয়ে দেয়, আর ভেষজের ভূমিকা তার ওপর একটা বাড়তি স্তর। যাঁরা ব্যস্ততায় এই অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁদের বলব, সপ্তাহে এক রাত আধ ঘণ্টা ফিরিয়ে আনুন। ফল কেবল চুলে নয়, ঘুমেও টের পাবেন।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

ভৃঙ্গরাজ শাস্ত্রের কেশরাজ, চুল-যত্নের একটি পুরোনো ও শ্রদ্ধেয় ভেষজ, কিন্তু তার উপকার নিঃশর্ত নয়। চুল পড়া, অকালে পাকা চুল ও স্কাল্পের যত্নে ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার দীর্ঘকালের, প্রাণী-গবেষণাও ভালো ইঙ্গিত দেয়, তবে মানুষের ওপর বড় প্রমাণ এখনো কম, আর চুল পড়া নিজেই বহু-কারণের সমস্যা। সহজ সমাধান নেই।

আজ থেকে যদি একটা কাজ করেন, তবে সেটা হোক এই, সপ্তাহে দুই দিন রাতে ভৃঙ্গরাজ তেল কুসুম গরম করে ১৫ মিনিট স্কাল্পে মাসাজ করুন, আর অন্তত ১২ সপ্তাহ চালিয়ে তবে ফল বিচার করুন। সেই সঙ্গে চুল-পড়া বেশি হলে থাইরয়েড ও ভিটামিনের রক্ত-পরীক্ষা করিয়ে নিন, কারণ আসল কারণ ঠিক না করলে কোনো তেলই একা কাজ করবে না। ধৈর্য, নিয়মিততা আর সঠিক কারণ, এই তিনটিই ভৃঙ্গরাজকে কাজে লাগানোর আসল শর্ত।

সূত্র / Sources

  • Roy RK, Thakur M, Dixit VK. Hair growth promoting activity of Eclipta alba in male albino rats. Archives of Dermatological Research, ২০০৮: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/18478241
  • Datta K ও সহকর্মীরা. Eclipta alba extract with potential for hair growth promoting activity. Journal of Ethnopharmacology, ২০০৯: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/19481595
  • Timalsina D, Devkota HP. Eclipta prostrata (L.) L. (Asteraceae), Ethnomedicinal Uses, Chemical Constituents, and Biological Activities. Biomolecules, ২০২১ (মানুষে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার তথ্য কার্যত নেই): PMC8615741
  • ধ্রুপদী রেফারেন্স: চরক সংহিতা ও অষ্টাঙ্গ হৃদয় (ভৃঙ্গরাজ, কেশ্য ও কেশরঞ্জন প্রসঙ্গ)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

হালকা কুসুম গরম করে আঙুলের ডগা দিয়ে স্কাল্পে ১০ থেকে ১৫ মিনিট আস্তে আস্তে মাসাজ করুন। চুলের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছনো জরুরি, ডগায় বেশি লাগবে না। সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার যথেষ্ট। তেল রাতে রেখে সকালে ধোয়া, বা ১ থেকে ২ ঘণ্টা রেখে হালকা শ্যাম্পু, দুটিই চলে। প্রথম মাসেই রোজ লাগালে স্কাল্প তৈলাক্ত ও অস্বস্তিকর হতে পারে।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
শুকনো জামের বিচি ও বিচির গুঁড়ো বাটিতে, পাশে কয়েকটি গোটা কালো জাম, জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ13 মিনিট

জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা, ডায়াবেটিসে মাপের গোলমাল

জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, এক চা চামচ আর দশ গ্রামের ফারাক কোথায়, কোন ট্রায়ালটা পাতার আর কোনটা বিচির, কাদের সতর্ক থাকা দরকার।

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
ঝুড়িতে গোটা হলুদ কামরাঙা ও কাটা তারার আকৃতির ফালি, পাশে কিডনির চিত্র, কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ18 মিনিট

কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা, কিডনি ভালো থাকলে কতটা নিরাপদ

কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, কতটা খেলে কিডনির ঝুঁকি শুরু হয়, হেঁচকি কেন বিপদের লক্ষণ, ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া আর কাদের এড়ানো দরকার।

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
গাঢ় নীল অপরাজিতা ফুল ও কাচের কাপে নীল চা, পাশে শুকনো ফুল, অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ20 মিনিট

অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা, আর ইউরোপে নীল চা কেন অনুমোদন পেল না

অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা নিয়ে প্রমাণ ঠিক কতদূর যায়, নীল চা বানানোর নিয়ম ও মাত্রা, ইউরোপে কেন অনুমোদন মেলেনি, শঙ্খপুষ্পী বিভ্রান্তি আর কাদের এড়ানো দরকার।

৩১ আগস্ট, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ