সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা এবং খাওয়ার নিয়ম, কতদিন খাবেন
সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, এক সপ্তাহের বেশি কেন নয়, ওজন কমার দাবিটা কতটা সত্যি আর কারা এড়াবেন।
অAI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

সূচিপত্র
- সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, এক নজরে প্রমাণের হিসাব
- সাত দিনের সীমাটা কে ঠিক করল, আর কেন
- সোনা পাতা কোন গাছ, নাম নিয়ে গোলমালটা কোথায়
- পাতাটা পেটে গিয়ে ঠিক কী করে
- সোনা পাতা কি সত্যিই কাজ করে, প্রমাণ কতদূর গেছে?
- সোনা পাতা খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা
- সোনা পাতা কি ওজন কমায়?
- রোজ খেলে কী হয়, নির্ভরতা থেকে মেলানোসিস কোলাই
- লিভারের প্রশ্নটা কতদূর যায়
- একই পাতা ইউরোপে ওষুধ, অথচ খাদ্যপণ্যে নজরদারিতে
- শাস্ত্র, ফার্মাকোপিয়া আর সানা মক্কীর ঐতিহ্য
- কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন
- একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
- সংক্ষেপে
- সূত্র / Sources
সূচিপত্র15টি বিভাগ
- সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, এক নজরে প্রমাণের হিসাব
- সাত দিনের সীমাটা কে ঠিক করল, আর কেন
- সোনা পাতা কোন গাছ, নাম নিয়ে গোলমালটা কোথায়
- পাতাটা পেটে গিয়ে ঠিক কী করে
- সোনা পাতা কি সত্যিই কাজ করে, প্রমাণ কতদূর গেছে?
- সোনা পাতা খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা
- সোনা পাতা কি ওজন কমায়?
- রোজ খেলে কী হয়, নির্ভরতা থেকে মেলানোসিস কোলাই
- লিভারের প্রশ্নটা কতদূর যায়
- একই পাতা ইউরোপে ওষুধ, অথচ খাদ্যপণ্যে নজরদারিতে
- শাস্ত্র, ফার্মাকোপিয়া আর সানা মক্কীর ঐতিহ্য
- কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন
- একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
- সংক্ষেপে
- সূত্র / Sources
মনোহারি দোকানের তাকে ঠোঙায় ভরা যে হলদে সবুজ শুকনো পাতাগুলো বিক্রি হয়, আর ওষুধের দোকানে কাউন্টারের পিছনে যে স্যাশেটটা রাখা থাকে, দুটোর ভিতরের গাছ আসলে এক। নাম সোনা পাতা, কোথাও সোনামুখী। ঠোঙার গায়ে কিছু লেখা থাকে না, স্যাশেটের গায়ে মাত্রা লেখা থাকে।
সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, দুটোই আসে একই জায়গা থেকে। সোনা পাতা হলো Senna alexandrina Mill. গাছের শুকনো পাতা, আয়ুর্বেদে যার নাম স্বর্ণপত্রী, আর আধুনিক ওষুধের শ্রেণিবিন্যাসে যেটি একটি উত্তেজক রেচক বা স্টিমুল্যান্ট ল্যাক্সেটিভ। মাঝেমধ্যে হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যে স্বল্পমেয়াদে ব্যবহারের জন্য ইউরোপে এর ওষুধি স্বীকৃতি আছে, তবে সেই স্বীকৃতির সঙ্গেই একটা শক্ত শর্ত জুড়ে দেওয়া আছে, এক সপ্তাহের বেশি নয়।
বাংলা ইন্টারনেটে সোনা পাতা নিয়ে যা লেখা হয়, তার সঙ্গে এই শর্তটার দূরত্ব বিরাট। খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পাতা সোজাসুজি লিখছে রোজ সকালে খালি পেটে সোনা পাতার চা খেতে, ওজন কমানোর জন্য। এই লেখায় সেই দূরত্বটাই ধরার চেষ্টা করেছি, কারা এটি নিয়ে কী বলেছেন, প্রমাণ ঠিক কতদূর গেছে, আর কাদের এটি ছোঁয়াও উচিত নয়।
সোনা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, এক নজরে প্রমাণের হিসাব
প্রমাণের ওজন প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রে আলাদা, আর সোনা পাতার বেলায় সেটাই সবচেয়ে জরুরি তথ্য।
| দাবি | প্রমাণের মাত্রা | সংক্ষেপে |
|---|---|---|
| মাঝেমধ্যে হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যে স্বল্পমেয়াদি ব্যবহার | সীমিত প্রমাণ | EMA-তে well-established use, কিন্তু ২০২৩ সালের AGA/ACG নির্দেশিকায় শর্তসাপেক্ষ সুপারিশ, নিম্ন নিশ্চয়তা |
| ওজন কমানো বা মেদ ঝরানো | অপর্যাপ্ত প্রমাণ | কাজ শুধু বৃহদন্ত্রে, জল ও লবণে |
| রক্ত পরিষ্কার বা ডিটক্স | অপর্যাপ্ত প্রমাণ | কোনো নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নেই |
| ত্বক ফর্সা বা বলিরেখা কমানো | অপর্যাপ্ত প্রমাণ | মুখে খাওয়ার ইঙ্গিতে কোনো মনোগ্রাফ নেই |
| বিরেচন বা পেট পরিষ্কারে শাস্ত্রীয় ব্যবহার | ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার | API-তে কর্ম রেচন, ব্যবহার বিবন্ধ ও উদররোগ |
লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার, প্রথম সারিটাই একমাত্র সারি যেখানে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন আছে। বাকি চারটি নিয়েই বাংলা ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি লেখা হয়, অর্থাৎ যে দাবিগুলোর পিছনে প্রমাণ সবচেয়ে পাতলা ঠিক সেগুলোই পাঠকের চোখে সবচেয়ে বেশি পড়ে, আর যেটির পক্ষে প্রমাণ আছে সেটির সঙ্গে জোড়া শর্তটাই কোথাও লেখা থাকে না। ফারাকটা এখানেই।
সাত দিনের সীমাটা কে ঠিক করল, আর কেন
সাত দিনের সীমাটা এসেছে ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সির হার্বাল মেডিসিনাল প্রোডাক্টস কমিটি বা HMPC-র মনোগ্রাফ থেকে, নথি নম্বর EMA/HMPC/625849/2015, গৃহীত হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে। সেখানে ডোজ়ের ঘরে পরিষ্কার লেখা আছে, "Not to be used for more than 1 week", এবং তারপরেই যোগ করা আছে যে ওই এক সপ্তাহের মধ্যেও সাধারণত দুই থেকে তিন বার খাওয়াই যথেষ্ট।
কারণটা মনোগ্রাফের সতর্কতার ঘরেই লেখা। দীর্ঘদিন উত্তেজক রেচক ব্যবহার করলে অন্ত্রের কাজ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং রেচকের উপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। NHS একই কথা আরও সরাসরি বলে, বেশি দিন খেলে শরীর নিজের বদলে ওষুধের উপর ভরসা করতে শুরু করে।
মনোগ্রাফে আরও একটি লাইন আছে যেটি বাংলা কোনো পাতায় আমি পাইনি, অথচ ওটাই সবচেয়ে কাজের। সোনা পাতার প্রস্তুতি তখনই ব্যবহার করা উচিত যখন খাদ্যাভ্যাস বদলে বা আঁশজাতীয় বাল্ক ফর্মিং উপাদান দিয়ে ফল পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এটি প্রথম ধাপ নয়, শেষ ধাপ। আঁশ, জল আর হজম শক্তি বাড়ানোর দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো আগে, ইসবগুলের মতো বাল্ক ফর্মিং উপাদান তারপর, সোনা পাতা সবার শেষে।
আমার কাছে এই ক্রমটাই লেখাটার আসল কথা মনে হয়েছে। বাকি সব তর্ক এর পরে।
সোনা পাতা কোন গাছ, নাম নিয়ে গোলমালটা কোথায়
সোনা পাতা হলো Fabaceae গোত্রের Senna alexandrina Mill. গাছের শুকনো পত্রক, পুরনো বইপত্রে যার নাম Cassia angustifolia Vahl বা Cassia senna L.। ভারত সরকারের আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়া অফ ইন্ডিয়া, পার্ট ১, খণ্ড ১-এর ৬৬ নম্বর মনোগ্রাফে এর নাম স্বর্ণপত্রী, এবং সেখানে বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে সরাসরি লেখা আছে স্বর্ণমুখী ও সোনাপাতা।
ওই একই মনোগ্রাফে গাছটির উৎস নিয়ে যে বিবরণ আছে, সেটা পড়তে গিয়ে ভালো লাগল। দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে তিন্নেভেলি, মাদুরাই আর তিরুচিরাপল্লি জেলায় বড় আকারে চাষ হয়। পুরু নীলচে পাতা হাতে ছিঁড়ে সংগ্রহ করা হয়, তারপর ছায়ায় সাত থেকে দশ দিন শুকোনো হয়, যতক্ষণ না রংটা হলদেটে সবুজ হয়ে আসে। ইংরেজিতে তাই এর একটা নাম টিনেভেলি সেনা। নামটা জেলার। ঠোঙা খুললে যে হালকা টক ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে লাগে আর আঙুলে পাতা ভাঙলে যে খসখসে শব্দ হয়, ওটা ঠিকমতো ছায়ায় শুকোনো পাতার চেনা লক্ষণ।
নাম নিয়ে একটা বিভ্রান্তি আছে যেটা এড়ানো ভালো। সোনা পাতা আর সোনালু বা অমলতাস (Cassia fistula) এক গাছ নয়, যদিও দুটোই ক্যাসিয়া গোত্রের এবং দুটোরই রেচক ব্যবহার আছে। আর Cassia occidentalis বা কফি সেনা তো সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনেক বেশি বিপজ্জনক, LiverTox-এ ওই গাছের পাতা দুই সপ্তাহ খাওয়ার পরে একজন ৭৫ বছর বয়সী রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত আছে। এক ঠোঙায় ভরা শুকনো পাতা দেখে এগুলো আলাদা করা কঠিন।
পাতাটা পেটে গিয়ে ঠিক কী করে
সেনোসাইড নামের যৌগগুলোই সোনা পাতার সক্রিয় উপাদান, রাসায়নিকভাবে যেগুলো ১,৮-ডাইহাইড্রক্সিঅ্যানথ্রাসিন ডেরিভেটিভ। মজার ব্যাপারটা হলো, EMA-র মনোগ্রাফ অনুযায়ী সেনোসাইড উপরের পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিতই হয় না, মানুষের পাচক উৎসেচক এগুলো ভাঙতেও পারে না। ভাঙার কাজটা করে বৃহদন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া, যারা সেনোসাইডকে বদলে দেয় রেইন অ্যানথ্রোনে। সেটাই আসল সক্রিয় অণু।
তারপর দুটো আলাদা পথে কাজ হয়। এক, বৃহদন্ত্রের চলন বেড়ে যায়, খাবার দ্রুত এগোয়। দুই, কোলনের কোষ জল ও লবণ শুষে নেওয়া কমিয়ে দেয় এবং উল্টে কোলনের ভিতরে জল ও লবণ ছাড়তে শুরু করে, মনোগ্রাফে যে দুটো প্রক্রিয়াকে যথাক্রমে অ্যান্টিঅ্যাবজর্পটিভ আর সিক্রেটাগগ ইফেক্ট বলা হয়েছে। ফলে অন্ত্রের ভিতরে তরলের পরিমাণ বেড়ে যায়।
এই দুটো বাক্যের মধ্যেই ওজন কমানোর দাবিটার উত্তর লুকিয়ে আছে, কিন্তু সেটা পরের দিকে। এখানে যেটা মনে রাখার, পুরো ঘটনাটা বৃহদন্ত্রে ঘটে। মেদ, লিভার বা বিপাকের সঙ্গে এর সরাসরি কোনো যোগ মনোগ্রাফে বলা হয়নি।
EMA-র মনোগ্রাফ অনুযায়ী কাজ শুরু হতে দেরি হয় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা, কারণ ওষুধটিকে আগে বৃহদন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছতে হয়, তারপর ব্যাকটেরিয়ার হাতে বদলাতে হয়। NHS তাই রাতে শোয়ার আগে একবার খাওয়ার পরামর্শ দেয়, আর বলে সোনা পাতা কাজ করতে মোটামুটি ৮ ঘণ্টা নেয়। রাতে খেয়ে ভোরে কিছু হয়নি দেখে আবার খাওয়া, এই ভুলটা এখান থেকেই আসে।
সোনা পাতা কি সত্যিই কাজ করে, প্রমাণ কতদূর গেছে?
কোষ্ঠকাঠিন্যে সোনা পাতার কার্যকারিতার পক্ষে প্রমাণ আছে, তবে সেটা যত ছোট আর যত সীমিত, বাংলা লেখাগুলো পড়ে তা বোঝার উপায় নেই।
সবচেয়ে ভালো একক পরীক্ষাটি ২০২১ সালের, প্রকাশিত হয়েছিল American Journal of Gastroenterology-তে (Morishita ও সহলেখক, ১১৬ খণ্ড, ১ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ১৫২ থেকে ১৬১, PMID 32969946)। ৯০ জন রোগীকে ২৮ দিন ধরে সোনা পাতা ১.০ গ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড ১.৫ গ্রাম বা প্লাসিবো দেওয়া হয়েছিল। ওই ট্রায়ালে সামগ্রিক উন্নতির হার দাঁড়িয়েছিল প্লাসিবোতে ১১.৭ শতাংশ, সোনা পাতায় ৬৯.২ শতাংশ আর ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইডে ৬৮.৩ শতাংশ, রিপোর্ট করেছেন Morishita ও সহলেখকেরা।
সংখ্যাটা দেখতে চমৎকার। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৯ মে প্রকাশিত AGA ও ACG-র যৌথ নির্দেশিকা এই একই প্রমাণ দেখে যা লিখেছে, সেটাই আসল কথা। তাদের ভাষায়, প্যানেল সোনা পাতা ব্যবহারের পক্ষে মত দিচ্ছে, তবে সেটি একটি শর্তসাপেক্ষ সুপারিশ এবং প্রমাণের নিশ্চয়তা নিম্ন। পলিইথিলিন গ্লাইকল বা লিনাক্লোটাইডের মতো ওষুধ যেখানে মাঝারি নিশ্চয়তায় জোরালো সুপারিশ পেয়েছে, সোনা পাতা সেখানে এক ধাপ নিচে।
কেন নিচে, সেটাও তারা বলেছে। প্রমাণের ভিত্তি মূলত একটিই ছোট পরীক্ষা, সেখানে ব্যবহৃত মাত্রা বাস্তবে সাধারণত যা ব্যবহার হয় তার চেয়ে বেশি, এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার কোনো তথ্যই নেই।
আমার মনে হয় এই জায়গাটাতেই বাংলা লেখাগুলো সবচেয়ে বড় ভুল করে। "মহৌষধ" শব্দটা যেখানে ব্যবহার হয়, সেখানে বসার কথা ছিল "সীমিত প্রমাণ" শব্দ দুটোর। অনেক চিকিৎসক অবশ্য এর উল্টো দিকটাও বলেন, যে সস্তা, সহজলভ্য এবং স্বল্পমেয়াদে কার্যকর একটি জিনিসকে অতিরিক্ত সতর্কতা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলে মানুষ আরও খারাপ কিছু বেছে নেবে। কথাটার জোর আছে। তবু সীমিত প্রমাণকে সীমিত বলাটাই সৎ উত্তর।
সোনা পাতা খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা
দুটো আলাদা সরকারি হিসাব সোনা পাতার মাত্রা ঠিক করে দেয়, এবং সেই দুটো এক এককে লেখা নয়, এটাই ব্যবহারিক গোলমালের মূল।
| উৎস | মাত্রা | কতবার | সর্বোচ্চ মেয়াদ | বয়স |
|---|---|---|---|---|
| EMA/HMPC মনোগ্রাফ | ১০ থেকে ৩০ মিগ্রা হাইড্রক্সিঅ্যানথ্রাসিন ডেরিভেটিভ, সেনোসাইড বি হিসেবে গণনা করা | রাতে একবার | ১ সপ্তাহ, ওই সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার | ১২ বছরের বেশি |
| NHS, নিজে থেকে কেনা | ৭.৫ বা ১৫ মিগ্রা, ট্যাবলেট বা সিরাপ | রাতে একবার | কয়েক দিন, এক সপ্তাহের বেশি নয় | ১২ বছর ও তার বেশি |
| NHS, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে | ৬ থেকে ১৭ বছরে ৭.৫ মিগ্রা ট্যাবলেট | দিনে একবার রাতে | চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী | ৬ বছর থেকে |
| আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়া অফ ইন্ডিয়া | ০.৫ থেকে ২ গ্রাম চূর্ণ | নির্দিষ্ট নয় | নির্দিষ্ট নয় | নির্দিষ্ট নয় |
সারণির চার নম্বর সারিটার সঙ্গে উপরের তিনটের তুলনা করা যায় না, আর সেটাই সমস্যা। EMA আর NHS মাত্রা মাপে সক্রিয় গ্লাইকোসাইডের মিলিগ্রামে, আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়া মাপে শুকনো পাতার গ্রামে। এক গ্রাম পাতায় কত মিলিগ্রাম সেনোসাইড থাকবে, সেটা নির্ভর করে পাতার মান, বয়স, শুকোনোর পদ্ধতি আর সংরক্ষণের উপর।
গুলে খেলে জিভে যে তেতো কষা স্বাদটা লেগে থাকে, সেটাও শাস্ত্রে লিপিবদ্ধ। আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়ায় স্বর্ণপত্রীর রস হিসেবে লেখা আছে কটু, তিক্ত ও কষায়, অর্থাৎ ঝাঁঝালো, তেতো আর কষা। স্বাদটা ঢাকতে চিনি বা মধু মেশালে মাত্রার হিসাবটা আরও গোলমেলে হয়ে যায়।
মনোহারি দোকানে বা অনলাইনে সোনা পাতার গুঁড়ো বিক্রি হয় ওজনে, বাংলাদেশি অনলাইন তালিকাগুলোয় সাধারণত ১০০ বা ১৫০ গ্রামের প্যাকেটে। সেনোসাইডের পরিমাণ কোথাও লেখা থাকে না। ফলে বাড়িতে চামচে মেপে খাওয়ার সময় আপনি আসলে জানেন না মিলিগ্রামের হিসাবে কতটা খাচ্ছেন। EMA-র মনোগ্রাফে ডোজ়ের পাশে যে বাক্যটা আছে, সেটাই এখানে সবচেয়ে কাজের পরামর্শ, সঠিক মাত্রা হলো সবচেয়ে কম মাত্রাটি যেটি একটি স্বস্তিদায়ক নরম মল তৈরি করে। বেশি নয়, তার চেয়ে কম নয়।
আপনি কি কখনো লক্ষ করেছেন, ঠোঙার গায়ে দাম লেখা থাকে অথচ শক্তি লেখা থাকে না? ওষুধের ক্ষেত্রে এটাই মূল পার্থক্য।
সোনা পাতা কি ওজন কমায়?
সোনা পাতা চর্বি কমায় না, এবং এই উত্তরটা অনুমান নয়, ফার্মাকোলজি থেকেই আসে।
উপরে যে কর্মপদ্ধতি লেখা হয়েছে, তাতে সোনা পাতার পুরো কাজটা বৃহদন্ত্রে, জল ও ইলেকট্রোলাইটের চলাচলে। অন্ত্রের ভিতরে জল বাড়ে, মল বেরিয়ে যায়। ওজন মাপার কাঁটা পরদিন সকালে যদি একটু নামে, সেটা জল আর মলের ওজন, শরীরের মেদ নয়। খাদ্য থেকে শক্তি শোষণ কমানোর কোনো পদ্ধতি EMA-র মনোগ্রাফে বর্ণিত হয়নি, এবং ওজন কমানোর ইঙ্গিতে সোনা পাতার কোনো নিয়ন্ত্রক অনুমোদনও নেই।
তার উপরে ঝুঁকিটা একমুখী। ওজন কমানোর জন্য কেউ যদি রোজ খেতে শুরু করেন, তিনি ঠিক সেই আচরণটাই করছেন যেটি EMA আর NHS দুই জায়গাতেই নিষেধ করা আছে, এবং যেটি থেকে পটাশিয়াম কমে যাওয়া, নির্ভরতা আর অন্ত্রের কাজ দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ওজন নিয়ে আয়ুর্বেদ যা বলে তা রেচক নয়, বলে অগ্নি, আম আর জীবনযাত্রার কথা। ওজন কমানোর আয়ুর্বেদিক অভ্যাস আর আম কেন শরীরে জমে, এই দুটো লেখায় সেই দিকটা আলাদা করে আছে। রেচক দিয়ে ওজন কমানোর ধারণাটা আমার কাছে বিজ্ঞাপনের অতিকথন মনে হয়, আর এটাই বাংলা সার্চ ফলাফলে সোনা পাতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো ভুল দাবি।
রোজ খেলে কী হয়, নির্ভরতা থেকে মেলানোসিস কোলাই
দীর্ঘদিন সোনা পাতা খেলে যে সমস্যাগুলো হতে পারে, EMA-র মনোগ্রাফ সেগুলো নাম ধরে তালিকাভুক্ত করেছে, আর বাংলা কোনো লেখায় এগুলো আমি পাইনি।
প্রথমটা নির্ভরতা। উত্তেজক রেচক দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে অন্ত্রের কাজ দুর্বল হতে পারে এবং রেচকের উপর নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। রোজ রেচক লাগলে কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ খোঁজা দরকার, এটাই মনোগ্রাফের নির্দেশ।
দ্বিতীয়টা জল ও লবণের ভারসাম্য। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে জল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে, প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা রক্ত যেতে পারে। পটাশিয়াম কমে গেলে (হাইপোক্যালেমিয়া) সেটি হৃদযন্ত্রের কিছু ওষুধের কাজ বাড়িয়ে দেয়, আর সেখান থেকেই ওষুধের পারস্পরিক ক্রিয়ার ঝুঁকি আসে।
তৃতীয়টা মেলানোসিস কোলাই, বা মনোগ্রাফের ভাষায় সিউডোমেলানোসিস কোলাই। দীর্ঘদিন ব্যবহারে অন্ত্রের ভিতরের আস্তরণে গাঢ় রঙের ছোপ পড়ে যায়। NCBI-র StatPearls অধ্যায় অনুযায়ী অ্যানথ্রাকুইনোন জাতীয় রেচকের মধ্যে সোনা পাতাই এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ, এবং আক্রান্তদের প্রায় ৯৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি রেচক ব্যবহারকারী। কলোনোস্কোপি করতে গিয়ে সাধারণত ধরা পড়ে।
এখানে একটা আশ্বাসের কথাও আছে, যেটা বলা দরকার। মেলানোসিস কোলাই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় না, StatPearls সরাসরি লিখেছে এর সঙ্গে কোলন ক্যান্সারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক নেই। আর ওষুধ বন্ধ করলে কয়েক মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ছোপ মিলিয়েও যায়। EMA-র মনোগ্রাফেও একই কথা, রোগী ওষুধ বন্ধ করলে এটি সাধারণত সরে যায়।
লিভারের প্রশ্নটা কতদূর যায়
লিভারের ক্ষতি সোনা পাতার সবচেয়ে কম আলোচিত ঝুঁকি, এবং তালিকার চতুর্থ ঝুঁকিও এটাই। EMA-র মনোগ্রাফে অতিরিক্ত মাত্রার ঘরে সোজাসুজি লেখা আছে যে অ্যানথ্রানয়েডযুক্ত ওষুধ দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে টক্সিক হেপাটাইটিস হতে পারে। NIH-এর LiverTox ডেটাবেস সোনা পাতাকে লিভার ক্ষতির সম্ভাব্য বিরল কারণ হিসেবে D শ্রেণিতে রেখেছে, সাধারণত ৩ থেকে ৫ মাস ব্যবহারের পরে দেখা যায়, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত মাত্রার সঙ্গে যুক্ত। LiverTox-এ নথিভুক্ত একটি ঘটনায় ৫২ বছর বয়সী এক মহিলা কয়েক বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে সোনা পাতার চা খাওয়ার পরে ALT ৯১৬০ ইউনিট প্রতি লিটার আর INR ৫.৭ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি এক মাসের মধ্যে পুরো সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু LiverTox সতর্ক করেছে যে সেরে ওঠার পরে আবার সোনা পাতা শুরু করলে ক্ষতি ফিরে আসতে দেখা গেছে।
এই ঘটনাগুলো বিরল, সেটা বলে রাখা দরকার, নয়তো ভুল ভয় তৈরি হবে। বিরল, কিন্তু শূন্য নয়, আর প্রায় সবকটিই দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ ঝুঁকিটা পাতাটার নয়, অভ্যাসটার।
শ্রেণিবিন্যাসটা তুলনায় রাখলে মাত্রাটা বোঝা সহজ হয়। LiverTox-এর একই মাপকাঠিতে সোনা পাতা D, অশ্বগন্ধা B, আর গিলয় বা গুলঞ্চ সর্বোচ্চ A শ্রেণিতে। তিনটিই বাংলা ঘরে পরিচিত ভেষজ, অথচ লিভারের দিক থেকে তিনটির ওজন সমান নয়।
একই পাতা ইউরোপে ওষুধ, অথচ খাদ্যপণ্যে নজরদারিতে
ইউরোপে সোনা পাতার নিয়ন্ত্রক অবস্থান দুই ভাগে বিভক্ত, এবং এই বিভাজনটা বোঝা গেলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়।
ওষুধ হিসেবে, HMPC-র মনোগ্রাফে সোনা পাতা well-established use পেয়েছে, মাঝেমধ্যে হওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যে স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারের জন্য, নির্দিষ্ট মাত্রায় ও নির্দিষ্ট মেয়াদে।
খাদ্যপণ্য হিসেবে ছবিটা আলাদা। ২০২১ সালের ১৮ মার্চের কমিশন রেগুলেশন (EU) 2021/468 হাইড্রক্সিঅ্যানথ্রাসিন ডেরিভেটিভযুক্ত Cassia senna পাতা ও ফলের প্রস্তুতিকে রেগুলেশন (EC) 1925/2006-এর অ্যানেক্স III-এর পার্ট C-তে, অর্থাৎ ইউনিয়নের নজরদারির তালিকায় রেখেছে। এরপর EFSA ২০২৩ সালে জমা পড়া নতুন তথ্য পর্যালোচনা করে ২০২৪ সালের ২৩ মে প্রকাশিত মতামতে (EFSA Journal ২২ খণ্ড, ৫ সংখ্যা, e8766, DOI 10.2903/j.efsa.2024.8766) লিখেছে যে জমা দেওয়া গবেষণার ভিত্তিতে এই প্রস্তুতিগুলির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি, এবং জিনোটক্সিক যৌগযুক্ত মিশ্রণের জন্য কোনো নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
দুটো অবস্থান পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একই যুক্তির দুই দিক। নিয়ন্ত্রিত মাত্রায়, নির্দিষ্ট মেয়াদে, ওষুধ হিসেবে ঠিক আছে। খোলা খাদ্যপণ্য হিসেবে, যেখানে কেউ কতটা কতদিন খাবেন তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সেখানে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে একই দ্বৈততা অন্যভাবে দেখা যায়। ওষুধের তথ্যভাণ্ডার MedEx অনুযায়ী ইসবগুল ভুসি ও সোনাপাতার সংমিশ্রণ সেখানে একটি নিবন্ধিত জেনেরিক, প্রতি ৪ গ্রাম মাত্রায় ৩ গ্রাম ইসবগুল ভুসির সঙ্গে ১ গ্রাম সোনাপাতা, এবং একাধিক ব্র্যান্ডে বাজারে আছে। অর্থাৎ যে পাতা মনোহারি দোকানে ভেষজ চা হিসেবে ওজনে বিক্রি হয়, সেটিই ওষুধের দোকানে মাপা মাত্রার নিবন্ধিত উপাদান।
শাস্ত্র, ফার্মাকোপিয়া আর সানা মক্কীর ঐতিহ্য
আয়ুর্বেদে স্বর্ণপত্রীর অবস্থান নিয়ে ভারত সরকারের ফার্মাকোপিয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্র, কারণ ওটি আইনি মানদণ্ডের নথি।
API-র ৬৬ নম্বর মনোগ্রাফ অনুযায়ী স্বর্ণপত্রীর রস কটু, তিক্ত ও কষায়। গুণ লঘু, রূক্ষ ও তীক্ষ্ণ। বীর্য উষ্ণ, বিপাক কটু। কর্মের ঘরে একটিই শব্দ, রেচন। থেরাপিউটিক ব্যবহারের ঘরে দুটি, উদররোগ ও বিবন্ধ, অর্থাৎ কোষ্ঠবদ্ধতা। গুরুত্বপূর্ণ যোগ হিসেবে নাম আছে পঞ্চসকার চূর্ণ আর সারিবাদ্যাসবের।
শাস্ত্রের তালিকাটাও কিন্তু সংকীর্ণ। রক্ত পরিষ্কার, ত্বক ফর্সা বা ওজন কমানো, এর কোনোটাই API-র কর্ম বা ব্যবহারের ঘরে নেই। শাস্ত্র আর নিয়ন্ত্রক, দুই দিকই সোনা পাতাকে মূলত একটি রেচক হিসেবেই দেখে। শোধন আর শমনের পার্থক্য নিয়ে আয়ুর্বেদের যে কাঠামো, সেখানেও শোধন বনাম শমন চিকিৎসার আলোচনায় বিরেচন একটি নির্দিষ্ট, তত্ত্বাবধানে করা প্রক্রিয়া, রোজকার অভ্যাস নয়। কোষ্ঠকাঠিন্যের দৈনন্দিন সামলানোয় ত্রিফলা বা হরীতকীর ভূমিকা আলাদা, ঐতিহ্যগতভাবে ওগুলোকে তুলনায় মৃদু বলা হয়।
আরেকটা জিনিস ওই তালিকায় নেই, আর সেই অনুপস্থিতিটাই তাৎপর্যপূর্ণ। আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়ার বহু মনোগ্রাফে কর্মের ঘরে দোষের হিসাব লেখা থাকে, যেমন ঠিক পরের মনোগ্রাফেই সাদা জিরের কর্মে আছে কফবাতহর। স্বর্ণপত্রীর কর্মের ঘরে সেরকম কোনো দোষঘ্ন শব্দ নেই, আছে কেবল রেচন। অর্থাৎ ভারত সরকারের এই ফার্মাকোপিয়া সোনা পাতাকে দোষ ভারসাম্যের ভেষজ হিসেবে চিহ্নিতই করেনি, চিহ্নিত করেছে একটিমাত্র নির্দিষ্ট কাজের ভেষজ হিসেবে। বাংলা লেখাগুলো যখন একে বাত বা পিত্ত সারানোর ভেষজ বলে, তখন তারা শাস্ত্রের চেয়েও বেশি দাবি করে ফেলে।
বাংলাদেশে সোনা পাতার ব্যবহারের পিছনে আরেকটি বড় কারণ আছে যেটি স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো বাংলা পাতাই স্বীকার করে না। সানা বা সানা মক্কী নামে এই পাতার উল্লেখ হাদিস সাহিত্যে আছে, এবং অনেক পাঠক সেই সূত্রেই এটি ব্যবহার করেন। ধর্মীয় ঐতিহ্যের মূল্যায়ন করা এই লেখার বিষয় নয় এবং সেটি আমার এক্তিয়ারেও পড়ে না। যেটা বলা যায়, একটি ঐতিহ্যকে সম্মান করা আর মাত্রা ও মেয়াদের প্রশ্নটা আলাদা করে জিজ্ঞেস করা, দুটো পরস্পরবিরোধী নয়, কারণ ঐতিহ্য জানায় মানুষ কী ব্যবহার করে এসেছে আর কেন, আর ফার্মাকোপিয়া ও নিয়ন্ত্রক নথি জানায় কতটা, কতদিন এবং কার জন্য নয়। প্রশ্ন দুটো আলাদা।
কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন
কারা সোনা পাতা খাবেন না, তার তালিকাটি EMA-র মনোগ্রাফ আর NHS-এর নির্দেশিকা মিলিয়ে তৈরি, এবং এটি অন্য অনেক ভেষজের তুলনায় লম্বা।
একেবারে ব্যবহার করবেন না যদি থাকে অন্ত্রে বাধা বা সংকোচন, অন্ত্রের অ্যাটোনি, অ্যাপেনডিসাইটিস, প্রদাহজনিত অন্ত্ররোগ যেমন ক্রোন্স ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিস, অজানা কারণে পেটে ব্যথা, অথবা জল ও লবণ কমে যাওয়া তীব্র ডিহাইড্রেশন। গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানে এটি প্রতিনির্দেশিত। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও EMA-র মনোগ্রাফে এটি প্রতিনির্দেশিত, যদিও NHS জানাচ্ছে চিকিৎসক প্রেসক্রাইব করলে তার চেয়ে কম বয়সেও ব্যবহার হয়। নিজে থেকে বাচ্চাকে দেওয়ার জিনিস এটি নয়, শিশুদের আয়ুর্বেদিক যত্নের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রযোজ্য।
গর্ভাবস্থার কারণটা মনোগ্রাফে নির্দিষ্ট করে লেখা আছে, ইমোডিন ও অ্যালো-ইমোডিনের মতো কয়েকটি অ্যানথ্রানয়েডের জিনোটক্সিক ঝুঁকি সংক্রান্ত পরীক্ষাগার তথ্যের কারণে। স্তন্যদানের কারণ, রেইনের মতো সক্রিয় বিপাকজ অল্প পরিমাণে বুকের দুধে পাওয়া গেছে। গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য খুব সাধারণ সমস্যা, এবং গর্ভাবস্থায় আয়ুর্বেদিক যত্নে সেটির অন্য পথ আছে, রেচক নয়।
সাবধান থাকুন কিডনির সমস্যা থাকলে, কারণ ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি। NHS হৃদযন্ত্রের সমস্যার ক্ষেত্রেও চিকিৎসককে জানাতে বলে। মলের শক্ত ঢেলা জমে থাকা (ফিকাল ইমপ্যাকশন) বা অজানা, তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী পেটের উপসর্গ, যেমন পেটে ব্যথা, বমি বা বমি ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রেচক খাওয়া উচিত নয়, কারণ ওগুলো অন্ত্রে বাধার লক্ষণ হতে পারে।
ওষুধের সঙ্গে যেসব ক্রিয়া মনোগ্রাফে নাম ধরে লেখা আছে।
| ওষুধ বা উপাদান | কী হতে পারে |
|---|---|
| কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড, যেমন ডিগক্সিন | দীর্ঘমেয়াদি অপব্যবহারে পটাশিয়াম কমে গেলে এদের কাজ বেড়ে যায় |
| অ্যান্টিঅ্যারিদমিক ওষুধ ও QT দীর্ঘায়িতকারী ওষুধ | পটাশিয়াম কমার কারণে ক্রিয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে |
| মূত্রবর্ধক বা ডাইইউরেটিক | একসঙ্গে ব্যবহারে পটাশিয়াম হারানো বাড়তে পারে |
| অ্যাড্রিনোকর্টিকোস্টেরয়েড, যেমন প্রেডনিসোলোন | একই কারণে পটাশিয়াম হারানো বাড়তে পারে |
| যষ্টিমধু বা লিকোরিস রুট | একই কারণে পটাশিয়াম হারানো বাড়তে পারে |
| অন্য রেচক | NHS বলে দুটি রেচক একসঙ্গে কেবল চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে |
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে সাধারণ হলো চুলকানি, আমবাত বা ত্বকে র্যাশের মতো অতিসংবেদনশীলতা, আর পেটে ব্যথা, খিঁচুনিভাব ও পাতলা পায়খানা, বিশেষ করে যাঁদের ইরিটেবল কোলন আছে। মনোগ্রাফ বলছে এগুলো অনেক সময় ব্যক্তিগত অতিরিক্ত মাত্রার ফলেও হয়, সেক্ষেত্রে মাত্রা কমানো দরকার। প্রস্রাব হলদে বা লালচে বাদামি হয়ে যেতে পারে, সেটি ক্ষতিকর নয়। পেটে গ্যাস বা অম্লের সমস্যা থাকলে পেটের গ্যাস আর অ্যাসিডিটির আলাদা ব্যবস্থাপনা আছে, রেচক সেগুলোর উত্তর নয়। আর দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যে যাওয়ার আগে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার আয়ুর্বেদিক উপায়ে খাদ্য ও অভ্যাসের ধাপগুলো দেখে নেওয়াই EMA-র নির্দেশিত ক্রম।
একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ
পড়তে বসে যেটা আমাকে সবচেয়ে ভাবিয়েছে, সেটা কোনো একটা তথ্য নয়, দুটো তথ্যের পাশাপাশি বসে থাকা। এক দিকে ভারত সরকারের ফার্মাকোপিয়ায় ছায়ায় সাত দিন ধরে শুকোনো পাতার শান্ত বিবরণ, অন্য দিকে LiverTox-এ ALT ৯১৬০-এর সেই কেস রিপোর্ট। একই গাছ।
প্রথমে আমার মনে হয়েছিল দ্বিতীয়টা বোধহয় অতিরঞ্জিত (পরে দেখলাম, উল্টো, ওটা বছরের পর বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে খাওয়ার ফল, আর সেটাই ঠিক যে অভ্যাসটার কথা বাংলা লেখাগুলো উৎসাহ দিচ্ছে)। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু গা ছাড়া দেওয়ার মতোও নয়। মাঝামাঝি জায়গাটা খুঁজে বের করাই আসলে কঠিন কাজ, আর সেটাই এই লেখায় করার চেষ্টা করেছি।
সংক্ষেপে
রেচক হিসেবেই সোনা পাতার জায়গা, স্বল্পমেয়াদে, আর প্রমাণের ওজন যতটুকু ঠিক ততটুকুই।
যদি কখনো ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে একটা জিনিসের দিকে নজর রাখবেন, ব্যবহারের দিন গুনছেন কি না। ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখুন। তিন দিন পরেও কোষ্ঠকাঠিন্য না কমলে NHS বলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে, আর সাত দিনের পরে ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রক নির্দেশের বাইরে চলে যায়, এই সীমাটা নিয়ে EMA আর NHS দুই জায়গায় একই কথা লেখা আছে। রোজ লাগছে মানে সোনা পাতার মাত্রা বাড়ানোর সময় হয়নি, বরং কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণটা খোঁজার সময় হয়েছে। ঠোঙার গায়ে শক্তি লেখা না থাকলে সেটাও মনে রাখবেন, ওজনে কেনা জিনিসের মাত্রা চামচে মাপা যায় না।
সূত্র / Sources
- Committee on Herbal Medicinal Products (HMPC). European Union herbal monograph on Senna alexandrina Mill. (Cassia senna L.; Cassia angustifolia Vahl), folium, EMA/HMPC/625849/2015, adopted 25 September 2018. European Medicines Agency. ema.europa.eu
- NHS. Senna, laxative to treat constipation. National Health Service, UK, page last reviewed 1 February 2022. nhs.uk/medicines/senna
- National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases. Senna. In: LiverTox, Clinical and Research Information on Drug-Induced Liver Injury, last updated 1 April 2020. ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK547922
- Tian C, Al Nasser Y. Melanosis Coli. StatPearls, last updated 30 April 2025. ncbi.nlm.nih.gov/books/NBK493146
- Morishita D, et al. Senna Versus Magnesium Oxide for the Treatment of Chronic Constipation, A Randomized, Placebo-Controlled Trial. American Journal of Gastroenterology, 2021, 116(1):152-161. PMID 32969946. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/32969946
- Chang L, Chey WD, Imdad A, et al. American Gastroenterological Association and American College of Gastroenterology Clinical Practice Guideline, Pharmacological Management of Chronic Idiopathic Constipation. Gastroenterology, 2023, 164(7):1086-1106, DOI 10.1053/j.gastro.2023.03.214, also published in American Journal of Gastroenterology 118(6):936-954. PMID 37211380. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/37211380
- EFSA Panel on Nutrition, Novel Foods and Food Allergens. Scientific Opinion on additional scientific data related to the safety of preparations of Rheum palmatum L., Rheum officinale Baill. and their hybrids, Rhamnus purshiana DC., Rhamnus frangula L. and Cassia senna L., EFSA Journal 2024, 22(5):e8766. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC11112454
- Government of India, Ministry of Health and Family Welfare. The Ayurvedic Pharmacopoeia of India, Part I, Volume I, monograph 66, Svarṇapatrī, pages 140-141.
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর

লেখক সম্পর্কে
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক
তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।
এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, যে সংখ্যাগুলো কেউ বলে না
লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, লাল শাকে কি রক্ত বাড়ে, পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, অক্সালেট ও নাইট্রেটের হিসাব, বাসি শাকের ভয়, শিশু ও গর্ভাবস্থায় খাওয়ার নিয়ম।

কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, প্রেসার কিডনি আর রান্নার নিয়ম
কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, কলমি শাকের ক্ষতিকর দিক, প্রেসার বাড়ে না কমে, কিডনি ও ইউরিক এসিডের হিসাব, পুষ্টিগুণ সংখ্যায় আর ভাজি না সেদ্ধ, খাওয়ার নিয়ম।

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি
পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, পুইশাকের পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি, পুঁইশাক খেলে গ্যাস হয় কিনা, খাওয়ার নিয়ম আর কাদের সতর্কতা।