আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 27 মিনিট পড়ুন

কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, প্রেসার কিডনি আর রান্নার নিয়ম

কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, কলমি শাকের ক্ষতিকর দিক, প্রেসার বাড়ে না কমে, কিডনি ও ইউরিক এসিডের হিসাব, পুষ্টিগুণ সংখ্যায় আর ভাজি না সেদ্ধ, খাওয়ার নিয়ম।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

বাঁশের ঝুড়িতে ফাঁপা ডাঁটা ও সাদা ফুলসহ তাজা কলমি শাক, বাঁ পাশে ফুটন্ত জলে সেদ্ধ শাক ও তির চিহ্ন ধরে নিচে কড়াইয়ে ভাজা শাক, ডান পাশে কিডনি ও রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
সূচিপত্র18টি বিভাগ

পুকুরপাড়ের ধারে ভাদ্র মাসের কলমি তুলে আনার পর বাড়ির হেঁশেলে দুটো জিনিসের একটা ঘটে। কেউ শাকটা ধুয়ে সরাসরি কড়াইয়ে ফেলে রসুন আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভেজে নেন। কেউ আগে ফুটিয়ে নেন, তারপর সেদ্ধ জলটা ফেলে দিয়ে ভাজেন। পার্থক্যটা ছোট নয়। বাংলা ইন্টারনেটে কলমি শাক নিয়ে যত লেখা আছে, তার প্রায় সবকটাই প্রথম পদ্ধতিটা শেখায়। অথচ এই একটা সিদ্ধান্তের ওপরেই কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতার অনেকটা ঝুলে আছে, আর সেটা কেউ বলে না।

কলমি শাক হলো Ipomoea aquatica Forsk., Convolvulaceae গোত্রের একটি অর্ধ-জলজ লতা, ইংরেজিতে water spinach বা swamp morning glory, সংস্কৃতে কলম্বী। ১০০ গ্রাম কাঁচা কলমি শাকে থাকে ১৯ ক্যালোরি, ৫৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ এবং ১.৬৭ মিলিগ্রাম আয়রন (USDA FoodData Central, FDC 169301)। এর সবচেয়ে আলোচিত ক্ষতিকর দিক অক্সালেট, আর সেই অক্সালেটের বড় অংশ ফুটন্ত জলে নেমে আসে।

এই লেখাটা তাই উপকারের তালিকা দিয়ে শুরু করছি না। শুরু করছি রান্নাঘর দিয়ে, কারণ কলমি শাক নিয়ে যে প্রশ্নগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি খোঁজেন, প্রেসার বাড়ে না কমে, কিডনির রোগী খেতে পারবেন কিনা, ইউরিক এসিড বাড়ে কিনা, তার উত্তর ঘুরেফিরে ওই এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। আপনি যদি কলমি শাক ভাজি করেই খেয়ে থাকেন, পরের অংশটা আপনার জন্য।

এক নজরে, কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতার হিসাব

উপকার আর ক্ষতির ভারসাম্যটা সংক্ষেপে এইরকম দাঁড়ায়। নিচের প্রতিটি লাইনের পিছনে কোন গবেষণা বা কোন শাস্ত্রীয় সূত্র দাঁড়িয়ে আছে তা লেখার ভেতরে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে, আর যেখানে প্রমাণ দুর্বল সেখানে সেটাও স্পষ্ট করে বলা আছে।

  • যা নিশ্চিত, পুষ্টি। ১০০ গ্রামে ৫৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ৭১ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, মাত্র ১৯ ক্যালোরিতে (USDA, FDC 169301)।
  • যা সম্ভাবনাময় কিন্তু প্রমাণে দুর্বল, রক্তে শর্করা কমানো। মানুষের ওপর একটিমাত্র ছোট গবেষণা আছে, যেখানে আলাদা তুলনামূলক দল ছিল না, রোগীরা নিজেরাই নিজেদের তুলনা ছিলেন।
  • যা এখনো ইঁদুরেই আটকে, যকৃতের সুরক্ষা। যে মাত্রায় কাজ হয়েছে, ভাতের পাতে সেটা আসে না।
  • যা ভুল, বসন্ত রোগ ঠেকানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO গুটিবসন্তকে ১৯৮০ সালেই নির্মূল ঘোষণা করেছে।
  • কলমি শাকের ক্ষতিকর দিক প্রধানত তিনটি, দ্রবণীয় অক্সালেট, চাষের জলের দূষণ, আর কাঁচা খেলে পরজীবী।
  • একটিমাত্র অভ্যাসে দুটি ঝুঁকি কমে আর তৃতীয়টিও কিছুটা, সেদ্ধ করে জলটা ফেলে দেওয়া। দূষণের ঝুঁকিটা অবশ্য রান্নায় নয়, ভালো জলের শাক বেছে নেওয়ায় কমে।

কলমি শাক ভাজবেন না সেদ্ধ করবেন?

সেদ্ধ করাই কলমি শাকের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, কারণ ফুটন্ত জলে শাকের দ্রবণীয় অক্সালেট নেমে আসে এবং জল ফেলে দিলে সেটাও চলে যায়। থাইল্যান্ডের সুরিন প্রদেশের বাজার থেকে কেনা তেরোটি শাকসবজি নিয়ে করা একটি গবেষণায় কলমি শাক আলাদা করে পরীক্ষা করা হয়েছিল, আর সেখানে ফুটিয়ে নেওয়ার পরে কলমির দ্রবণীয় অক্সালেট ৩৬.২ শতাংশ কমে গিয়েছিল (Juajun ও সহকর্মীরা, Food and Nutrition Sciences 2012;3:1631-1635)।

সংখ্যাটা কলমির নিজের, ধার করা নয়। ওই গবেষণায় তাজা কলমি শাকের মোট অক্সালেট ছিল ১০০ গ্রাম শুষ্ক ভরে ৮৮১.০ মিলিগ্রাম, সেদ্ধ করার পরে ৬৮২.৬। দ্রবণীয় অক্সালেট ছিল ৮৭৯.০, সেদ্ধ করার পরে ৫৬১.২।

এখানে একটা বিষয় থামিয়ে দেখার মতো। ওই একই গবেষণার হিসাবে মোট ৮৮১ মিলিগ্রামের মধ্যে ৮৭৯ মিলিগ্রামই দ্রবণীয়। অর্থাৎ কলমি শাকের অক্সালেট প্রায় পুরোটাই সেই ধরনের যেটা শরীর বেশি শুষে নেয়, আর ঠিক সেই কারণেই রান্নার পদ্ধতিটা এখানে অন্য শাকের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পালং শাকে অক্সালেটের ভালো অংশ ক্যালসিয়ামের সঙ্গে বাঁধা থাকে, কলমিতে তা নয়।

অন্য শাকসবজিতেও একই জিনিস দেখা গেছে। নয় রকম সবজি নিয়ে করা আমেরিকার একটি গবেষণায় ফুটিয়ে নেওয়ায় দ্রবণীয় অক্সালেট ৩০ থেকে ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল, ভাপে দিলে কমেছিল মাত্র ৫ থেকে ৫৩ শতাংশ, আর যতটা অক্সালেট শাক থেকে কমেছিল তার প্রায় পুরোটাই রান্নার জলে পাওয়া গিয়েছিল (Chai ও Liebman, Journal of Agricultural and Food Chemistry 2005;53(8):3027-3030)। শেষ তথ্যটাই আসল কথা। অক্সালেট উবে যায় না, জলে নামে। জলটা রেখে দিলে কিছুই বাদ যায় না।

মজার ব্যাপারটা হলো, এই কথাটা নতুন নয়। চরক সংহিতার সূত্রস্থানের সাতাশতম অধ্যায়ে শাক বর্গ নিয়ে বলা হয়েছে শাক সাধারণভাবে গুরু, রুক্ষ, মধুর, শীতবীর্য ও ভেদন, এবং সেদ্ধ করে রস নিংড়ে ফেলে যথেষ্ট স্নেহপদার্থ মিশিয়ে খেলে তা পথ্য হয়ে ওঠে (চরক সংহিতা, সূত্রস্থান ২৭, শ্লোক ৯৮ থেকে ১০৩)। দুই হাজার বছরের পুরনো একটা রান্নার নির্দেশ আর ২০০৫ সালের একটা খাদ্যরসায়নের গবেষণা একই কথা বলছে, অথচ বাংলা ইন্টারনেটের কলমি শাক খাওয়ার নিয়ম বলতে বোঝায় ভাজি। আমার মনে হয় এটাই এই শাক নিয়ে সবচেয়ে বড় ফাঁক।

সেদ্ধ করলে অবশ্য ভিটামিন সি-র কিছুটাও জলে নামে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু ভিটামিন সি আপনি লেবু, পেয়ারা বা আমলকী থেকেও পাবেন। দ্রবণীয় অক্সালেট সরানোর দ্বিতীয় কোনো সহজ উপায় নেই।

কলমি শাকের পুষ্টিগুণ, ১০০ গ্রামে কী আছে আর কোন সংখ্যাটা ঠিক

পুষ্টিগুণের নির্ভরযোগ্যতম হিসাবটি আসে আমেরিকার কৃষি দপ্তরের খাদ্য উপাত্ত ভাণ্ডার থেকে, যেখানে কলমি শাক তালিকাভুক্ত আছে Water convolvulus, raw নামে, FDC নম্বর 169301, NDB নম্বর 11503। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা কলমি শাকের হিসাব এইরকম।

উপাদান প্রতি ১০০ গ্রামে
শক্তি ১৯ ক্যালোরি
জলীয় অংশ ৯২.৪৭ গ্রাম
প্রোটিন ২.৬ গ্রাম
কার্বোহাইড্রেট ৩.১৩ গ্রাম
খাদ্য আঁশ ২.১ গ্রাম
ভিটামিন সি ৫৫ মিলিগ্রাম
ভিটামিন এ ৩১৫ মাইক্রোগ্রাম RAE (৬,৩০০ IU)
ফোলেট ৫৭ মাইক্রোগ্রাম
ক্যালসিয়াম ৭৭ মিলিগ্রাম
আয়রন ১.৬৭ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম ৭১ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম ৩১২ মিলিগ্রাম
সোডিয়াম ১১৩ মিলিগ্রাম

অনেকেই জিজ্ঞেস করেন কলমি শাকে কি ভিটামিন আছে, আর কলমি শাকে কি আয়রন আছে। উত্তর হ্যাঁ, দুটোই আছে, তবে পরিমাণটা যতটা বলা হয় ততটা নয়। বিশেষ করে আয়রন।

এবার অস্বস্তিকর অংশ। বাংলায় কলমি শাকের পুষ্টিগুণ নিয়ে যে সংখ্যাগুলো ঘুরছে, সেগুলো একে অপরের সঙ্গে মেলে না।

উৎস শক্তি প্রোটিন আয়রন ক্যালসিয়াম
USDA, FDC 169301 ১৯ ক্যালোরি ২.৬ গ্রাম ১.৬৭ মিলিগ্রাম ৭৭ মিলিগ্রাম
বাংলা উইকিপিডিয়া ১৯ ক্যালোরি ২.৬ গ্রাম ১.৬৭ মিলিগ্রাম ৭৭ মিলিগ্রাম
আটটির বেশি বাংলা ব্লগে অনুলিপি হওয়া তালিকা ২৯ ক্যালোরি ৩ গ্রাম ২.৫ মিলিগ্রাম ৭৩ মিলিগ্রাম
teachers.gov.bd, ৬২৪৩০৬ নম্বর পাতা ৩০ ক্যালোরি ৩.৯ গ্রাম ০.৬ গ্রাম ০.৭১ মিলিগ্রাম
দৈনিক ইনকিলাব, ৩ মে ২০২৪ ৪৬ ক্যালোরি ১.৮ গ্রাম ৩.৯ মিলিগ্রাম ১০৭ মিলিগ্রাম

একই সবজি, একই ওজন, অথচ শক্তি ১৯ থেকে ৪৬ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে গোলমেলে ঘরটি বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষক বাতায়নের পাতায়, যেখানে আয়রনের মান লেখা আছে ০.৬ গ্রাম। গ্রাম, মিলিগ্রাম নয়। USDA-র মান ১.৬৭ মিলিগ্রামের পাশে ০.৬ গ্রাম মানে প্রায় সাড়ে তিনশো গুণ বেশি, যা এককের ভুল ছাড়া আর কিছু হতে পারে না, কারণ মিলিগ্রামের জায়গায় গ্রাম বসে গেছে। একই তালিকায় ক্যালসিয়াম লেখা আছে ০.৭১ মিলিগ্রাম, যেখানে USDA বলছে ৭৭ মিলিগ্রাম, অর্থাৎ এই ঘরটি উল্টো দিকে প্রায় একশো গুণ কম। পাতাটি ২০২১ সাল থেকে কলমি শাকের খোঁজে প্রথম দিকে আসে।

ছড়িয়ে থাকা তালিকাটিরও একটা অদ্ভুত চরিত্র আছে। সোডিয়াম ১১৩, পটাশিয়াম ৩১২ আর আঁশ ২.১, এই তিনটি ঘর USDA-র সঙ্গে হুবহু মেলে, অথচ শক্তি, কার্বোহাইড্রেট, আয়রন ও জলীয় অংশ মেলে না। অর্থাৎ কেউ একজন কোনো এক সময়ে দুটো আলাদা উৎস জোড়া দিয়ে একটা তালিকা বানিয়েছিলেন, আর তারপর সেটাই বছরের পর বছর হাতবদল হয়ে চলেছে। এই লেখায় আমি USDA-র মান ব্যবহার করছি, কারণ সেটির উৎস, সংস্করণ ও প্রকাশের তারিখ যাচাই করা যায়।

কলমি শাকের উপকারিতা, কোন দাবির পিছনে কতটা প্রমাণ

কলমি শাকের উপকারিতা নিয়ে বাংলা ইন্টারনেটে অন্তত আঠারোটি দাবি ঘোরে, কিন্তু সেগুলোর প্রমাণের জোর সমান নয়। নিচের ছকটি প্রতিটি দাবির পাশে প্রমাণের স্তর বসিয়ে দিচ্ছে।

দাবি প্রমাণের স্তর ভিত্তি
পুষ্টি জোগায়, বিশেষত ভিটামিন এ ও সি শক্তিশালী প্রমাণ USDA-র পরিমাপিত উপাত্ত, FDC 169301
আঁশ থাকায় কোষ্ঠ পরিষ্কারে সহায়ক মাঝারি প্রমাণ ১০০ গ্রামে ২.১ গ্রাম আঁশ, আঁশের সাধারণ ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত
রক্তে শর্করা কমাতে সহায়ক হতে পারে সীমিত প্রমাণ একটিমাত্র ছোট মানব গবেষণা, ২০০৩
যকৃতের সুরক্ষায় কাজে লাগতে পারে অপর্যাপ্ত প্রমাণ শুধু ইঁদুরের ওপর নির্যাস প্রয়োগ
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক সীমিত প্রমাণ পটাশিয়াম ও আঁশের পরোক্ষ যুক্তি, কলমি নিয়ে গবেষণা নেই
রক্তাল্পতা দূর করে সীমিত প্রমাণ ১.৬৭ মিলিগ্রাম উদ্ভিজ্জ আয়রন, শোষণ কম
মায়ের দুধ বাড়ায় ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার নিঘণ্টুতে স্তন্যদ বলা আছে, আধুনিক পরীক্ষা নেই
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে অপর্যাপ্ত প্রমাণ কোষ ও প্রাণীর স্তরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পর্যবেক্ষণ মাত্র
বসন্ত রোগ ঠেকায় অপর্যাপ্ত প্রমাণ কোনো গবেষণা নেই, আর গুটিবসন্ত ১৯৮০ সালে নির্মূল ঘোষিত

শেষ সারিটা আলাদা। এটি নিয়ে দুটো কথা বলা দরকার। কলমি শাককে বসন্ত রোগের প্রতিষেধক বলার রীতিটা শুধু ব্লগে নয়, একটি জাতীয় দৈনিকে এবং বাংলা উইকিপিডিয়াতেও আছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রাকৃতিকভাবে গুটিবসন্তের শেষ রোগীটি পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে সোমালিয়ায়, আর ১৯৮০ সালে সংস্থাটি রোগটিকে নির্মূল ঘোষণা করে, যা আজ পর্যন্ত একমাত্র সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে ঘটেছে। বাংলায় বসন্ত বলতে অনেকে জলবসন্ত বোঝান, কিন্তু কলমি শাক তার কোনোটিই ঠেকায় এমন প্রমাণ কোথাও নেই।

সামগ্রিক ছবিটা ২০২৬ সালের একটি পর্যালোচনাই ভালো বলে দিয়েছে। ChemistrySelect জার্নালে প্রকাশিত ওই পর্যালোচনায় কলমি শাকের ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনলিক অ্যাসিড ও ক্যারোটিনয়েডের দীর্ঘ তালিকা দেওয়ার পরে লেখকরা সরাসরি লিখেছেন যে ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ, নির্যাসের মানকরণ ও শরীরে শোষণের হিসাব না থাকায় এগুলোর ক্লিনিকাল প্রয়োগ এখনো সীমিত (Majumdar ও Saraf, ChemistrySelect 2026, DOI 10.1002/slct.74042)। গাছে উপাদান থাকা আর সেটা মানুষের শরীরে কাজ করা, দুটো আলাদা কথা।

শাকের আঁশ ও হজমের সম্পর্ক নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার আয়ুর্বেদিক উপায় এবং হজম শক্তি বাড়ানোর উপায় পাতায়।

কলমি শাক খেলে কি প্রেসার বাড়ে না কমে?

কলমি শাক রক্তচাপ বাড়ায় না, তবে কমায় বলেও মানুষের ওপর করা কোনো গবেষণা নেই। প্রশ্নটা বাংলায় এত বেশি খোঁজা হয় যে এর একটা সোজা উত্তর পাওয়া দরকার, আর সোজা উত্তরটা হলো, কলমি শাক সাধারণ একটি সবজি, ওষুধ নয়।

যুক্তি যেটুকু আছে তা পরোক্ষ। ১০০ গ্রাম কলমি শাকে ৩১২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ২.১ গ্রাম আঁশ থাকে (USDA, FDC 169301), আর পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ ও আঁশযুক্ত শাকসবজি বেশি খাওয়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সাধারণ খাদ্যপরামর্শের অংশ। এটুকুই।

তবে একটা তুলনা এখানে সৎভাবে করা দরকার। USDA-র ওই ৩১২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আসলে খুব বেশি নয়। কাঁচা পালং শাকে একই ওজনে থাকে ৫৫৮ মিলিগ্রাম (USDA, FDC 168462), অর্থাৎ কলমির প্রায় দ্বিগুণ। তাই কলমি শাককে আলাদা করে প্রেসারের শাক বলে আলাদা মর্যাদা দেওয়ার ভিত্তি দুর্বল। এটি পটাশিয়ামের একটি ভালো উৎস, শ্রেষ্ঠ উৎস নয়।

উল্টো দিকের একটা হিসাবও আছে যেটা কেউ বলে না। কলমি শাকে প্রাকৃতিকভাবেই ১০০ গ্রামে ১১৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে (USDA, FDC 169301), যা বেশিরভাগ ডাঙার শাকসবজির তুলনায় বেশি। সংখ্যাটা নিজে থেকে উদ্বেগের নয়, কিন্তু উচ্চ রক্তচাপে যাঁরা নুন মেপে খান তাঁদের মনে রাখা ভালো যে রান্নার নুনটাই একমাত্র হিসাব নয়। রক্তচাপের পুরো খাদ্যতালিকা নিয়ে আলাদা লেখা আছে উচ্চ রক্তচাপে কী খাবেন পাতায়, এখানে কেবল কলমির অংশটুকু ধরা হলো।

কলমি শাক কি সত্যিই ডায়াবেটিসে কাজ করে?

রক্তে শর্করা কমানোর দাবিটির পিছনে কলমি শাকের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর করা মাত্র একটি গবেষণা আছে, এবং সেটির নকশায় গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রীলঙ্কার গবেষকরা টাইপ টু ডায়াবেটিসের রোগীদের গ্লুকোজ খাওয়ানোর আগে ও পরে কলমি শাকের মিশ্রণ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, আর দুই ঘণ্টা পরে রক্তের শর্করায় ২৯.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিলেন (Malalavidhane ও সহকর্মীরা, Phytotherapy Research 2003;17(9):1098-1100)।

সংখ্যাটা শুনতে চমকপ্রদ। কিন্তু তিনটি কথা এর সঙ্গে না বললে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রথমত, রোগীরা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ গোষ্ঠী ছিলেন। অর্থাৎ আলাদা কোনো তুলনামূলক দল ছিল না, এলোমেলোভাবে ভাগ করাও হয়নি, এবং কতজন রোগী অংশ নিয়েছিলেন সেটিও গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা নেই। দ্বিতীয়ত, এক ঘণ্টার মাথায় ফলটা পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ ছিল না, অর্থবহ হয়েছিল কেবল দুই ঘণ্টায়। তৃতীয়ত, এটি ছিল একবারের তাৎক্ষণিক পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদে HbA1c কমে কিনা তা দেখা হয়নি।

ইঁদুরের কাজ এর চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। একই গবেষক দল আগে দেখিয়েছিলেন সুস্থ ইঁদুরে একক মাত্রায় ৩৩ শতাংশ শর্করা কমে (Journal of Ethnopharmacology 2000;72:293-298), আর সেখানে কার্যকর মাত্রা ছিল শরীরের ওজনের প্রতি কিলোগ্রামে ৩.৪ গ্রাম শাক। ইঁদুরের মাত্রা মানুষের পাতে সরাসরি বসানো যায় না, আর মানুষের গবেষণাটিতে ঠিক কতটা শাক দেওয়া হয়েছিল তা বলা নেই। ফলে বাংলা ইন্টারনেট যখন ডায়াবেটিসে কলমি শাক খাওয়ার পরামর্শ দেয়, তখন সেই পরামর্শের কোনো মাত্রাই আসলে নির্ধারিত নয়।

আমার নিজের পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, এই ধরনের একক, পুরনো, নিয়ন্ত্রণহীন গবেষণাকে ভিত্তি করে কোনো খাবারকে ওষুধের মতো উপস্থাপন করাটা আমার কাছে অতিরঞ্জন মনে হয়। কলমি শাক ডায়াবেটিসের খাদ্যতালিকায় ভালো সবজি হতে পারে, কম ক্যালোরি ও আঁশের কারণে। কিন্তু কারো ওষুধের বিকল্প নয়। ডায়াবেটিসের পুরো খাদ্যতালিকা নিয়ে বিস্তারিত আছে ডায়াবেটিসে কী খাবেন কী এড়াবেন লেখায়।

যকৃতের দাবিটির অবস্থা আরও দুর্বল। কলমি শাকের নির্যাস যকৃতের ক্ষতি কমিয়েছিল এমন যে গবেষণাটি বারবার উদ্ধৃত হয়, সেটি ইঁদুরের ওপর করা, যেখানে দুই মাস ধরে প্রতি কিলোগ্রাম ওজনে ২৫০ ও ৫০০ মিলিগ্রাম ইথানল নির্যাস খাওয়ানো হয়েছিল এবং ALT ১৬০.৮ থেকে নেমে ৩৯.৮৫-এ এসেছিল (Alkiyumi ও সহকর্মীরা, Molecules 2012;17(5):6146-6155)। ঘনীভূত নির্যাস আর ভাতের পাতের শাক এক জিনিস নয়। ফ্যাটি লিভারের খাদ্য নিয়ে আলাদা লেখা আছে ফ্যাটি লিভারে কী খাবেন পাতায়।

কলমি শাকের ক্ষতিকর দিক, অক্সালেট আর কিডনির হিসাব

দ্রবণীয় অক্সালেটই কলমি শাকের প্রধান ক্ষতিকর দিক, যা অন্ত্রে ক্যালসিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ক্যালসিয়াম অক্সালেট তৈরি করে এবং কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কলমি শাকের অপকারিতা নিয়ে যত প্রশ্ন ওঠে, তার বেশিরভাগের উত্তর এই একটি যৌগেই লুকিয়ে আছে। বাংলা ইন্টারনেটের বেশিরভাগ পাতা লিখে রেখেছে কলমি শাকের কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। সংখ্যাগুলো অন্য কথা বলে।

কত অক্সালেট, সেই প্রশ্নের উত্তরে দুটি প্রকাশিত গবেষণা দুই রকম বলছে, আর এই অমিলটাই এখানে আসল তথ্য।

গবেষণা পদ্ধতি মান
Juajun ও সহকর্মীরা, ২০১২, থাইল্যান্ড এনজাইম পদ্ধতি ৮৮১ মিলিগ্রাম প্রতি ১০০ গ্রাম শুষ্ক ভরে, শুষ্ক ভর ৭.২ শতাংশ ধরলে তাজা ওজনে যা দাঁড়ায় প্রায় ৬৩ মিলিগ্রাম
Waiba ও সহকর্মীরা, ২০২৬, ভারত KMnO₄ টাইট্রেশন ২৫০.২৪ মিলিগ্রাম প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা শাকে

চার গুণের ব্যবধান। পার্থক্যটার একটা সম্ভাব্য কারণ পদ্ধতি, কারণ টাইট্রেশনভিত্তিক মাপ সাধারণত এনজাইম পদ্ধতির চেয়ে বেশি দেখায়, আর জাত ও চাষের জায়গাও আলাদা ছিল। ভারতীয় গবেষণাটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বারাণসীর ICAR-IIVR খামারে কাশী মনু জাতের ওপর করা হয়েছিল (Waiba ও সহকর্মীরা, Plant Science Today, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, DOI 10.14719/pst.12440)।

এখানে সুবিধাটা হলো, দুই প্রান্তের যেকোনোটি ধরলেও উপসংহার একই দিকে যায়। যাঁদের বারবার ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হয়, তাঁদের দৈনিক অক্সালেট ১০০ মিলিগ্রামের নিচে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় (Siener, Seidler ও Hönow, Food Science and Technology 2021;41(Suppl.1):169-173)। কম মানটি ধরলেও এক বাটি দেড়শো গ্রাম কলমি শাক প্রায় গোটা দিনের কোটা ছুঁয়ে ফেলে। বেশি মানটি ধরলে ছাড়িয়ে যায় কয়েক গুণ।

তবে ভয় দেখানোটাও এখানে অসৎ হবে। থাই গবেষণাটি নিজেই কলমি শাককে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ফেলেছে, অর্থাৎ যে খাবারগুলো হালকা রান্নার পরে নিয়মিত ও বেশি পরিমাণে খেলেও উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করে না। শর্তটা লক্ষ করুন, হালকা রান্নার পরে। অর্থাৎ নিরাপত্তার রায়টা শর্তসাপেক্ষ, আর শর্তটা হলো সেই রান্না যেটা বাংলা ইন্টারনেট শেখাচ্ছে না।

ভারতীয় গবেষণাটি আরও একটা কাজে লাগার মতো জিনিস দেখিয়েছে। শুকিয়ে নিলে অক্সালেট ২৫০ থেকে নেমেছিল ১০৭.৬৬-এ, আর নুন-জলে গাঁজিয়ে নিলে নেমেছিল ২২.১৭-এ, অর্থাৎ ৯১.১ শতাংশ কম। বাংলায় কলমি গাঁজিয়ে খাওয়ার চল নেই, কিন্তু তথ্যটা এই দিকেই ইঙ্গিত করে যে প্রক্রিয়াকরণেই সমাধান, বর্জনে নয়।

কিডনির রোগীদের জন্য তাই ঢালাও নিষেধ নয়, বরং তিনটি বাস্তব পরামর্শ। পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে ঠিক করুন। সেদ্ধ করে জল ফেলে রান্না করুন। আর একই বেলায় ক্যালসিয়ামযুক্ত কিছু রাখুন, কারণ ক্যালসিয়াম অন্ত্রেই অক্সালেটকে বেঁধে ফেলে বলে সেটি কিডনি পর্যন্ত কম পৌঁছায়। বাংলার আরেকটি শাকের অক্সালেট হিসাব দেখতে চাইলে পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।

আরও একটা কথা কম বলা হয়। অক্সালেট শুধু পাথরের সঙ্গে জড়িত নয়, এটি ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেশিয়ামকেও বেঁধে ফেলে তাদের শোষণ কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ যে শাকটিকে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের উৎস বলে বিক্রি করা হচ্ছে, তারই ভেতরে সেই দুটি খনিজের শোষণ আটকানোর উপাদান বসে আছে। সেদ্ধ করার আরেকটা যুক্তি এটাই। রক্তাল্পতায় কোন খাবারে কতটা আয়রন, সেই হিসাব আছে অ্যানিমিয়া দূর করার খাবার লেখায়, আর বাংলার যে শাকটিকে ঘরোয়াভাবে সবচেয়ে বেশি রক্তবর্ধক বলা হয় তার যাচাই আছে কুলেখাড়া পাতার উপকারিতা পাতায়।

কলমি শাক খেলে কি ইউরিক এসিড বাড়ে?

না, শাকসবজির পিউরিনের সঙ্গে গেঁটেবাত বা ইউরিক এসিড বাড়ার যোগ বড় মাপের গবেষণায় পাওয়া যায়নি। প্রশ্নটা বাংলায় ঘন ঘন ওঠে। কারণ সম্ভবত এই যে পিউরিন শব্দটা শুনলেই অনেকে সব উদ্ভিজ্জ খাবারকেই সন্দেহের তালিকায় ফেলে দেন, অথচ পিউরিনের উৎস প্রাণিজ না উদ্ভিজ্জ, সেই তফাতটাই এখানে আসল।

বড় প্রমাণটি আসে বারো বছর ধরে চালানো একটি সম্ভাব্য গবেষণা থেকে, যেখানে শুরুতে গেঁটেবাত নেই এমন ৪৭,১৫০ জন পুরুষকে অনুসরণ করা হয়েছিল এবং ওই সময়ে ৭৩০টি নিশ্চিত নতুন গেঁটেবাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। ফলাফলে লাল মাংস ও সামুদ্রিক খাবারের সঙ্গে ঝুঁকি বেড়েছিল, দুগ্ধজাত খাবারে কমেছিল, আর পিউরিন-সমৃদ্ধ সবজির সঙ্গে কোনো যোগই পাওয়া যায়নি (Choi ও সহকর্মীরা, New England Journal of Medicine 2004;350(11):1093-1103)।

গেঁটেবাত নিয়ে কলমি শাকের ওপর আলাদা কোনো গবেষণা নেই, এটুকু স্বীকার করে নেওয়া দরকার। কিন্তু শাকসবজি নিয়ে সাধারণ ফলটি যেদিকে যায়, তাতে কলমিকে আলাদা করে ইউরিক এসিডের অপরাধী বানানোর কোনো ভিত্তি দেখি না। যাঁরা ইউরিক এসিডের ওষুধে আছেন, তাঁদের খাদ্যতালিকা অবশ্যই চিকিৎসকই ঠিক করবেন।

কলমি শাকে কি এলার্জি আছে?

এলার্জির কোনো প্রকাশিত নথিভুক্ত ঘটনা কলমি শাকের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সাহিত্যে খুঁজে পাইনি, অথচ প্রশ্নটি বাংলায় মাসে কয়েকশো বার খোঁজা হয়। এর মানে এই নয় যে কারো হয় না। এর মানে হলো, দাবিটা ঘরোয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, নথিভুক্ত গবেষণার ভিত্তিতে নয়, আর পাঠকের এই তফাতটা জানা দরকার।

যেকোনো খাবারেই কারো কারো সংবেদনশীলতা থাকতে পারে। কলমি শাকের ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সম্ভাবনা আছে যা আলাদা করে ভাবার মতো। শাকটি জলে জন্মায় এবং পাতার গায়ে জলজ কাদা, শ্যাওলা ও পোকার অংশ লেগে থাকতে পারে, তাই খাওয়ার পরে যে প্রতিক্রিয়া হয় তার উৎস সবসময় গাছটি নাও হতে পারে। ভালো করে ধুয়ে নেওয়া তাই দুটো সমস্যারই উত্তর।

খাওয়ার পরে ফুসকুড়ি, চুলকানি, ঠোঁট বা মুখ ফুলে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে খাওয়া বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এটুকুই সঠিক পথ।

কলমি শাকে কি গ্যাস হয়?

গ্যাস বা পেট ফাঁপা কারো কারো হতে পারে, তবে এর কারণ কলমি শাকের কোনো বিষাক্ততা নয়, খাদ্য আঁশ। ১০০ গ্রামে ২.১ গ্রাম আঁশ থাকে (USDA, FDC 169301), আর অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সেই আঁশ ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি হয়, যা যেকোনো শাকেই ঘটে।

আয়ুর্বেদের দিক থেকেও এর একটা সমান্তরাল ব্যাখ্যা আছে। চরক সংহিতা শাক বর্গকে সাধারণভাবে গুরু ও রুক্ষ বলেছে এবং সেই কারণেই সেদ্ধ করে স্নেহপদার্থ মিশিয়ে খাওয়ার কথা বলেছে, যেটাকে আধুনিক ভাষায় হজম সহজ করার নির্দেশ বলা যায়। বাস্তবে দুটো জিনিস কাজে লাগে, পরিমাণ কমানো আর ঘি বা সরষের তেলের সঙ্গে রান্না করা।

যে জলে গাছটা বেড়েছে, সেটাই আসল প্রশ্ন

জলজ গাছ হিসেবে কলমি শাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-প্রশ্নটি গাছটি নিয়ে নয়, গাছটি যে জলে জন্মেছে তা নিয়ে। বাংলা ইন্টারনেটে এটা এক লাইনে সারা হয়, নোংরা জলের শাক খেলে পেটের রোগ হতে পারে। প্রকাশিত গবেষণা যা বলে তা এর চেয়ে সুনির্দিষ্ট এবং কিছুটা ভিন্ন।

ব্যাংকক অঞ্চলের নয়টি কলমি চাষের জায়গা থেকে নমুনা নিয়ে করা একটি গবেষণায় সীসা, ক্যাডমিয়াম ও পারদ মাপা হয়েছিল, যার সাতটি জায়গার শাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি হতো। ফলাফল দুই দিকে গিয়েছিল। মানুষের সহনসীমার হিসাবে সীসা ও ক্যাডমিয়ামের মাত্রা সরাসরি বিপদের মনে হয়নি, কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় পারদের মাত্রা খুব বেশি ছিল, এবং পারদ ডাঁটার চেয়ে পাতায় বেশি জমেছিল, সর্বোচ্চ গড় যথাক্রমে ১,৪৪০ ও ৪২২ মাইক্রোগ্রাম প্রতি কিলোগ্রাম শুষ্ক ভরে (Göthberg ও সহকর্মীরা, Environmental Toxicology and Chemistry 2002;21(9):1934-1939)। অর্থাৎ চেনা ভয়টা ভুল জায়গায় ছিল।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে আরেকটি বিষয় এর সঙ্গে যোগ হয়, আর্সেনিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার CSIRO-র যৌথ গবেষণায় ভূগর্ভস্থ জলে সেচ দেওয়া ফসল পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল যে সবুজ শাকজাতীয় সবজিগুলো, যার মধ্যে কলমি নাম ধরে উল্লেখ করা আছে, আর্সেনিক সঞ্চয় করে (Huq ও সহকর্মীরা, Journal of Health, Population and Nutrition 2006;24(3):305-316)। এটা কলমির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, এটা জলের বিরুদ্ধে। একই জমির ধান ও অন্য সবজিতেও একই কথা প্রযোজ্য।

তৃতীয় ঝুঁকিটি পরজীবী, এবং এটি কেবল কাঁচা খাওয়ার সঙ্গে জড়িত। Fasciolopsis buski নামের একটি অন্ত্রের চ্যাপ্টা কৃমি জলজ গাছের গায়ে সিস্ট আকারে লেগে থাকে এবং কাঁচা গাছ বা দূষিত জলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢোকে, আর সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য যে গাছগুলোকে দায়ী করা হয় তার তালিকায় কলমি শাক আছে। ২০২২ সালে আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিহারের সীতামারহিতে ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪টি শিশুর মধ্যে এই সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছিল, যারা কাঁচা শামুক, দূষিত জল ও পাশের ডোবার জলে সেচ দেওয়া সবজি খেত (Saikia ও সহকর্মীরা, Emerging Infectious Diseases 2022;28(6):1265-1268)।

তিনটি ঝুঁকিরই ব্যবহারিক উত্তর এক জায়গায় এসে মেলে। কোথাকার শাক কিনছেন সেটা জানুন, রাস্তার পাশের নর্দমা বা কারখানার বর্জ্য-জলের ধারের শাক এড়ান, ভালো করে ধুয়ে নিন, আর কলমি শাক কখনো কাঁচা খাবেন না। কলমির স্যালাড বাংলার খাদ্যাভ্যাসে নেই, এটা সৌভাগ্যের কথা।

কলমি কি, কলমি শাকের ইংরেজি নাম, বৈজ্ঞানিক নাম আর শাস্ত্রে কলম্বী

কলমি শাকের বৈজ্ঞানিক নাম Ipomoea aquatica Forsk., গোত্র Convolvulaceae, অর্থাৎ এটি মিষ্টি আলু ও ডালিয়া-জাতীয় লতার আত্মীয়, পালং শাকের নয়। আমেরিকার কৃষি দপ্তরের খাদ্য তালিকায় গাছটি এই বৈজ্ঞানিক নামেই নথিভুক্ত, Water convolvulus নামে, FDC নম্বর 169301। ইংরেজিতে একে বলা হয় water spinach, river spinach, water morning glory, water convolvulus, Chinese spinach বা swamp cabbage, আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বহুল প্রচলিত নামটি kangkong। থাইল্যান্ডে এর নাম পাক বুংনাম।

নামের এই ভিড়ের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি পরিষ্কার করা দরকার। water spinach নামে spinach শব্দটি থাকলেও কলমি শাক আর পালং শাক আলাদা গোত্রের দুটি গাছ, এবং পালং শাকের পুষ্টি বা অক্সালেটের হিসাব কলমির ওপর বসানো যায় না। বাংলা ইন্টারনেটের একাধিক পাতায় এই দুটি শাকের তথ্য মিশে গেছে।

গাছটির চেহারাতেও একটি সহজ শনাক্তকারী আছে। ডাঁটা ফাঁপা, ভেতরে বাতাস থাকে বলে জলে ভেসে থাকতে পারে, লতা দুই থেকে তিন মিটার বা তার বেশি লম্বা হয়, পাতা লম্বাটে বর্শার ফলার মতো, আর ফুল তূরীর আকারের, সাদা, গোড়ার দিকে বেগুনি আভা। জলে ভাসা জলজ ধরন আর ভেজা মাটিতে জন্মানো স্থলজ ধরন, দুইই বাংলায় মেলে।

শাস্ত্রে কলমি শাকের নাম কলম্বী। ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টু ও কৈয়দেব নিঘণ্টুর শাক বর্গে একে মধুর রস, লঘু ও স্নিগ্ধ গুণ, শীত বীর্য এবং কটু বিপাকের বলা হয়েছে, আর গুণের মধ্যে উল্লেখ আছে স্তন্যদ, অর্থাৎ স্তন্যদান বাড়ায় বলে ধরা হতো।

দোষের হিসাবটা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ বাংলা ইন্টারনেটে কলমি শাক নিয়ে এই তথ্যটি কোথাও নেই। নিঘণ্টুগুলোর বিবরণ অনুযায়ী কলম্বী কফবর্ধক, আর বাত ও পিত্তের প্রশমক। সহজ ভাষায়, শীতল ও স্নিগ্ধ হওয়ায় এটি বাত ও পিত্তের উত্তাপ কমায়, কিন্তু কফের ধাত যাঁদের প্রবল, তাঁদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে খেলে কফ বাড়াতে পারে বলে ধরা হয়। এখানে দুটো সতর্কতা আছে। এক, কোন গুণটি কোন নিঘণ্টু থেকে এসেছে, প্রচলিত সংকলনগুলো তা আলাদা করে বলে না, তাই আমি দুটি গ্রন্থের নামই একসঙ্গে রাখছি। দুই, কিছু আধুনিক পাঠে কলম্বীকে ত্রিদোষশামক বলা হয়েছে, যা কফবর্ধক বিবরণের সঙ্গে মেলে না; এই অমিলটা মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে জানিয়ে রাখাই সৎ। মজার দিকটা হলো, শাস্ত্রের কফবর্ধক তকমা আর এই লেখার রান্নার পরামর্শ একই দিকে যায়, কারণ শাস্ত্র শাককে সেদ্ধ করে রস ফেলে স্নেহপদার্থ মিশিয়ে খেতেই বলেছে। দোষভেদে খাবারের প্রতিক্রিয়া কেন বদলায়, সেই কাঠামোটা দেখতে পারেন ত্রিদোষ, বাত পিত্ত কফ লেখায়। এখানেই বাংলা ইন্টারনেটের সবচেয়ে প্রচলিত দাবিটির আসল শিকড়, ছোট মাছ দিয়ে কলমি শাক রেঁধে খেলে মায়ের দুধ বাড়ে। দাবিটা আকাশ থেকে পড়েনি, এর একটা শাস্ত্রীয় ভিত্তি আছে। তবে ভিত্তি থাকা আর প্রমাণিত হওয়া এক নয়। আধুনিক কোনো গবেষণায় কলমি শাক স্তন্যদান বাড়ায় কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি, তাই এটিকে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার হিসেবেই রাখা উচিত, প্রমাণিত ফল হিসেবে নয়।

একটা ছোট সৎ স্বীকারোক্তি এখানে দিয়ে রাখি। চরক সংহিতার সাতাশতম অধ্যায়ে শাক বর্গের সাধারণ নিয়মটি আছে, কিন্তু ওই অধ্যায়ে কলম্বী নাম ধরে আলাদাভাবে বর্ণিত হয়নি। কলম্বীর নিজস্ব গুণের বিবরণ আসে নিঘণ্টুগুলো থেকে। রস ও বীর্যের ধারণাটা কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে আলাদা লেখা আছে ষড়রস, ছয় স্বাদের বিজ্ঞান পাতায়।

গর্ভাবস্থায় কলমি শাক খাওয়ার উপকারিতা ও সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় কলমি শাকের বাস্তব উপকারিতা হলো ফোলেট ও ভিটামিন এ। ১০০ গ্রামে ৫৭ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট থাকে, যা ভ্রূণের স্নায়ুনালী গঠনে কাজে লাগে, সঙ্গে ৩১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ৫৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ১.৬৭ মিলিগ্রাম আয়রন (USDA, FDC 169301)। ভিটামিন সি একই পাতে থাকায় উদ্ভিজ্জ আয়রনের শোষণ কিছুটা বাড়ে।

তবে সতর্কতাটা পুষ্টিতে নয়, রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধিতে। গর্ভাবস্থায় জলজ শাক কাঁচা বা আধসেদ্ধ খাওয়া এড়ানো দরকার, কারণ উপরে যে পরজীবী ও জীবাণুর ঝুঁকির কথা বলা হলো, গর্ভাবস্থায় তার পরিণতি বেশি গুরুতর হতে পারে। ভালো করে ধুয়ে, সেদ্ধ করে, টাটকা অবস্থায় খাওয়াই নিয়ম।

গর্ভাবস্থায় কলমি শাক নিয়ে আলাদা কোনো নিরাপত্তা গবেষণা নেই, এটাও বলে রাখা দরকার। অর্থাৎ এখানে সতর্কতাগুলো সাধারণ খাদ্যনিরাপত্তার, নথিভুক্ত ক্ষতির নয়। গর্ভাবস্থার পূর্ণ খাদ্যতালিকা নিয়ে বিস্তারিত আছে গর্ভাবস্থায় কী খাবেন কী খাবেন না লেখায়।

কীভাবে ব্যবহার করবেন

সেদ্ধ করে জল ফেলে রান্না করা, কলমি শাক খাওয়ার নিয়ম বলতে আসলে এই একটাই কথা, আর ধাপ তিনটি, ধুয়ে নেওয়া, সেদ্ধ করে জল ফেলা, তারপর অল্প তেলে বা ঘিয়ে রান্না করা। প্রাপ্তবয়স্কের জন্য রান্না করা এক বাটি, মোটামুটি ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম, সাধারণ খাবার হিসেবে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ। ধাপটা কঠিন নয়। বাড়তি সময় লাগে বড়জোর তিন মিনিট, অথচ ফুটিয়ে নেওয়ায় কলমির দ্রবণীয় অক্সালেট ৩৬.২ শতাংশ কমতে দেখা গেছে (Food and Nutrition Sciences 2012;3:1631-1635), আর জলটা ফেলে দিলে সেটুকু আর আপনার পাতে ওঠে না।

১. বাজার থেকে আনার পরে প্রথমেই দেখে নিন ডাঁটা সতেজ আর ফাঁপা কিনা, পাতা ঝিমিয়ে না গিয়ে টানটান সবুজ কিনা। নেতিয়ে পড়া, হলদেটে বা গোড়ায় পিছল হয়ে যাওয়া শাক নেবেন না। ২. দু-তিনবার জল বদলে ভালো করে ধুয়ে নিন। ফাঁপা ডাঁটার ভেতরে ও পাতার ভাঁজে কাদা ও জলজ শ্যাওলা আটকে থাকে, ধোয়ার সময় জল ঘোলা হয়ে উঠতে দেখলেই বুঝবেন কেন ধাপটা দরকার। ৩. ফুটন্ত জলে দুই থেকে তিন মিনিট সেদ্ধ করুন, তারপর জলটা ফেলে দিন। শাক গাঢ় সবুজ হয়ে আসবে আর ডাঁটা নরম হবে। এই জলটাই অক্সালেট নিয়ে নামে, তাই ডাল বা ঝোলে ব্যবহার করবেন না। ৪. এবার সরষের তেলে রসুন, পেঁয়াজ ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে শাকটা মিশিয়ে চার থেকে পাঁচ মিনিট ভেজে নিন। রসুন ফোড়নের ঝাঁঝালো গন্ধ ওঠার পরেই শাক দেওয়া ভালো। ৫. চিংড়ি, ছোট মাছ বা ছানার মতো ক্যালসিয়ামযুক্ত কিছু একই বেলায় রাখলে বাড়তি সুবিধা, কারণ ক্যালসিয়াম অন্ত্রেই অক্সালেটকে বেঁধে ফেলে। বাঙালি হেঁশেলের চিংড়ি দিয়ে কলমি শাক তাই নিছক স্বাদের জুটি নয়।

রান্না করা শাক ফেলে রেখে পরের দিন গরম করে খাওয়া এড়ান, বিশেষত শিশুদের ক্ষেত্রে। শাকের পাতে পরিমিতি কীভাবে বসে তার সাধারণ কাঠামো দেখতে পারেন আয়ুর্বেদিক ডায়েট চার্ট লেখায়।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য কলমি শাক সাধারণ একটি মরশুমি সবজি, এবং নিচের তালিকাটি নিষেধাজ্ঞা নয়, সতর্কতার তালিকা। প্রতিটি সতর্কতার পাশে তার ভিত্তিটিও লিখে দিলাম, কারণ কোনটি নথিভুক্ত ক্ষতির ভিত্তিতে বলা আর কোনটি নিছক তথ্যের অভাবে বলা, সেই তফাতটা পাঠকের জানা দরকার।

  • কিডনির রোগী ও যাঁদের বারবার পাথর হয়েছে। কলমির অক্সালেটের প্রায় পুরোটাই দ্রবণীয় (Food and Nutrition Sciences 2012;3:1631-1635), আর পাথরের রোগীদের দৈনিক অক্সালেট ১০০ মিলিগ্রামের নিচে রাখার পরামর্শ আছে (Food Science and Technology 2021;41:169-173)। পরিমাণ ও রান্নার পদ্ধতি চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করুন। কলমি শাক নিয়ে পাথরের রোগীদের ওপর সরাসরি কোনো গবেষণা নেই, তাই সতর্কতাটি সাবধানতার ভিত্তিতে।
  • যাঁরা ওয়ারফারিনের মতো রক্ত পাতলা করার ওষুধে আছেন। NHS-এর ওয়ারফারিন নির্দেশিকা বলছে ব্রকোলি, পালং ও অন্যান্য সবুজ শাকে থাকা ভিটামিন কে ওষুধটির কাজে প্রভাব ফেলতে পারে, খাওয়া বারণ নয়, তবে ক্লিনিকের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার (NHS, পাতাটি সর্বশেষ পর্যালোচিত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। কলমির ক্ষেত্রে বাড়তি অনিশ্চয়তা হলো, USDA-র এন্ট্রিতে ভিটামিন কে-র কোনো মানই দেওয়া নেই, অর্থাৎ কতটা আছে তা জানা নেই।
  • গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা। আলাদা নিরাপত্তা গবেষণা নেই, অর্থাৎ সতর্কতাটি তথ্যের অভাবের, নথিভুক্ত ক্ষতির নয়। সাধারণ সবজি হিসেবে ভালো করে সেদ্ধ করে খাওয়া নিয়ে আপত্তির কিছু জানা যায়নি, তবে কাঁচা বা আধসেদ্ধ নয়।
  • শিশুরা। কাঁচা জলজ শাক শিশুদের দেবেন না। বিহারে ৩ থেকে ১২ বছরের ১৪টি শিশুর মধ্যে Fasciolopsis buski সংক্রমণ নথিভুক্ত হয়েছিল, যাদের সংস্পর্শের উৎসের মধ্যে দূষিত জলে সেচ দেওয়া সবজি ছিল (Emerging Infectious Diseases 2022;28(6):1265-1268)।
  • যাঁরা অজানা বা সন্দেহজনক জলের শাক পাচ্ছেন। নর্দমা, কারখানার বর্জ্য-জল বা ব্যস্ত রাস্তার ধারের ডোবার শাক এড়ান। ব্যাংককের চাষের জায়গাগুলোতে সীসা ও ক্যাডমিয়াম বিপদসীমার নিচে থাকলেও পারদ কোথাও কোথাও খুব বেশি পাওয়া গিয়েছিল (Environmental Toxicology and Chemistry 2002;21(9):1934-1939), আর ভূগর্ভস্থ জলে সেচ দেওয়া জমিতে আর্সেনিক সঞ্চয়ের প্রশ্নটিও আছে (J Health Popul Nutr 2006;24(3):305-316)।
  • যাঁদের সহজে গ্যাস বা পেট ফাঁপে। আঁশের কারণে হতে পারে, বিষক্রিয়ার কারণে নয়। পরিমাণ কমিয়ে এবং সেদ্ধ করে স্নেহপদার্থ মিশিয়ে খেলে সাধারণত সামলানো যায়, যা চরক সংহিতার শাক বর্গের নির্দেশেরই বাস্তব রূপ।
  • যাঁদের এলার্জির ধাত আছে। কলমি শাকে এলার্জির কোনো প্রকাশিত কেস রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ এই সতর্কতাটি ঘরোয়া অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, নথিভুক্ত প্রমাণের নয়। প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • যে দাবিটির কোনো ভিত্তি নেই। কলমি শাক বসন্ত রোগ ঠেকায়, এই কথাটি মানবেন না। রোগটিকে ১৯৮০ সালে নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছে, আর কোনো শাক কোনো ভাইরাসজনিত রোগ ঠেকায় এমন প্রমাণ নেই।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

পড়তে বসে আমার সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্তটা এসেছিল পুষ্টির তালিকা মেলাতে গিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষক বাতায়নের যে পাতাটি কলমি শাকের খোঁজে প্রথম দিকেই আসে, সেখানে ১০০ গ্রাম শাকে আয়রনের পরিমাণ লেখা আছে ০.৬ গ্রাম। মিলিগ্রাম হলে সেটি USDA-র মানের চেয়েও কম হতো, কিন্তু লেখা আছে গ্রাম, যা বাস্তবের প্রায় সাড়ে তিনশো গুণ। একই তালিকায় ক্যালসিয়াম লেখা আছে ০.৭১ মিলিগ্রাম। পাতাটি ২০২১ সাল থেকে সেখানেই আছে।

আমি ডাক্তার নই, পুষ্টিবিদও নই, পড়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু এই একটা এককের ভুল আমাকে যা বোঝাল তা হলো, বাংলায় খাবার নিয়ে লেখার আসল সমস্যা মিথ্যা নয়, অযত্ন। কেউ মিথ্যা বলার চেষ্টা করেননি। কেউ সংখ্যাটা একবার মিলিয়েও দেখেননি। আর যে মুহূর্তে একটা সরকারি ঠিকানার পাতায় সংখ্যাটা বসে গেল, সেটা বাকি সবার কাছে উৎস হয়ে গেল।

নিজের অবস্থানটা তাই বেশ সরল। এটি সস্তা, মরশুমে সহজলভ্য, কম ক্যালোরির একটি ভালো শাক, যার অক্সালেট নিয়ে যতটা ভয় দেখানো হয় ততটা দরকার নেই এবং যতটা নীরবতা আছে ততটাও ঠিক নয়। আর এটাকে যাঁরা ডায়াবেটিস বা ক্যান্সারের দাওয়াই হিসেবে লিখছেন, তাঁরা কলমি শাকের উপকার করছেন না।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

একই দাঁড়িপাল্লায় কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা মাপলে ছবিটা বেশ শান্ত হয়ে আসে। বেশ শান্ত। উপকারের দিকে যা নিশ্চিত তা পুষ্টি, ১০০ গ্রামে ৫৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩১৫ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ৭১ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, মাত্র ১৯ ক্যালোরিতে (USDA, FDC 169301)। বড় দাবিগুলোর মধ্যে শর্করা কমানোর পিছনে আছে একটিমাত্র ছোট ও নিয়ন্ত্রণহীন মানব গবেষণা, যকৃতের দাবিটি এখনো ইঁদুরেই আটকে, আর বসন্ত ঠেকানোর দাবিটি সরাসরি ভুল।

অপকারের দিকটা তিন ভাগে বসে। দ্রবণীয় অক্সালেট, চাষের জলের দূষণ, আর কাঁচা খাওয়ার পরজীবী ঝুঁকি। কলমি শাকের অপকারিতা বলতে বাস্তবে এই তিনটিকেই বোঝায়। আর এই তিনটির মধ্যে দুটি এবং কিছুটা তৃতীয়টিও একটিমাত্র অভ্যাসে কমে যায়।

তাই এই সপ্তাহে কলমি শাক রাঁধলে একটাই জিনিস বদলে দেখুন। কড়াইয়ে দেওয়ার আগে দুই-তিন মিনিট ফুটিয়ে নিন, আর সেদ্ধ জলটা ফেলে দিন, ওই জল ডালে বা ঝোলে দেবেন না। বাড়িতে কারো পাথরের ইতিহাস থাকলে এই ধাপটা বাদ দেবেন না, আর একই বেলায় চিংড়ি বা ছোট মাছ রাখুন। বাংলার আরও দুটি শাকের প্রমাণ যাচাই পড়তে চাইলে দেখুন পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা আর থানকুনি পাতার উপকারিতা, আর পাতে সবুজের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে শজনে পাতার উপকারিতা লেখাটিও কাজে লাগতে পারে।

সূত্র / Sources

  • U.S. Department of Agriculture, Agricultural Research Service. Water convolvulus, raw (Ipomoea aquatica). FoodData Central, SR Legacy, FDC ID 169301, NDB 11503, published April 2019. The spinach comparison figure is from the same database, Spinach, raw (Spinacia oleracea), FDC ID 168462, NDB 11457. fdc.nal.usda.gov
  • Juajun O, Vanhanen L, Sangketkit C, Savage G. Effect of Cooking on the Oxalate Content of Selected Thai Vegetables. Food and Nutrition Sciences, 2012, 3(12):1631-1635, DOI 10.4236/fns.2012.312213. doi.org/10.4236/fns.2012.312213
  • Chai W, Liebman M. Effect of different cooking methods on vegetable oxalate content. Journal of Agricultural and Food Chemistry, 2005, 53(8):3027-3030, DOI 10.1021/jf048128d. PMID 15826055. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/15826055
  • Waiba KM, Dubey RK, Kumar R, Sisodia A, Rai N, Kumar R, Barman K, Singh AK. Comparative assessment of oxalic acid levels in fresh, dried and fermented forms of water spinach (Ipomoea aquatica Forsk.). Plant Science Today, version 1.0 published 15 January 2026, DOI 10.14719/pst.12440. doi.org/10.14719/pst.12440
  • Siener R, Seidler A, Hönow R. Oxalate-rich foods. Food Science and Technology (Campinas), 2021, 41(Suppl. 1):169-173, DOI 10.1590/fst.10620. scielo.br
  • Malalavidhane TS, Wickramasinghe SMDN, Perera MSA, Jansz ER. Oral hypoglycaemic activity of Ipomoea aquatica in streptozotocin-induced, diabetic wistar rats and Type II diabetics. Phytotherapy Research, 2003, 17(9):1098-1100, DOI 10.1002/ptr.1345. PMID 14595595. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/14595595
  • Malalavidhane TS, Wickramasinghe SMDN, Jansz ER. Oral hypoglycaemic activity of Ipomoea aquatica. Journal of Ethnopharmacology, 2000, 72(1-2):293-298, DOI 10.1016/s0378-8741(00)00217-8. PMID 10967485. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/10967485
  • Alkiyumi SS, Abdullah MA, Alrashdi AS, Salama SM, Abdelwahab SI, Hadi AHA. Ipomoea aquatica extract shows protective action against thioacetamide-induced hepatotoxicity. Molecules, 2012, 17(5):6146-6155, DOI 10.3390/molecules17056146. PMCID PMC6269074. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC6269074
  • Choi HK, Atkinson K, Karlson EW, Willett W, Curhan G. Purine-rich foods, dairy and protein intake, and the risk of gout in men. New England Journal of Medicine, 2004, 350(11):1093-1103, DOI 10.1056/NEJMoa035700. PMID 15014182. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/15014182
  • Göthberg A, Greger M, Bengtsson BE. Accumulation of heavy metals in water spinach (Ipomoea aquatica) cultivated in the Bangkok region, Thailand. Environmental Toxicology and Chemistry, 2002, 21(9):1934-1939, DOI 10.1002/etc.5620210922. PMID 12206434. pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/12206434
  • Saikia D, Prasad YK, Dahal S, Ghatani S. Fasciolopsis buski detected in humans in Bihar and pigs in Assam, India. Emerging Infectious Diseases, 2022, 28(6):1265-1268, DOI 10.3201/eid2806.220171. wwwnc.cdc.gov/eid/article/28/6/22-0171_article
  • Huq SMI, Joardar JC, Parvin S, Correll R, Naidu R. Arsenic contamination in food-chain, transfer of arsenic into food materials through groundwater irrigation. Journal of Health, Population and Nutrition, 2006, 24(3):305-316. PMID 17366772, PMCID PMC3013251. ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3013251
  • Majumdar S, Saraf S. Bioactive compounds of Ipomoea aquatica, structure-activity and mechanistic insights. ChemistrySelect, 2026, DOI 10.1002/slct.74042. doi.org/10.1002/slct.74042
  • National Health Service, UK. Warfarin, common questions about food and drink. NHS medicines guide, page last reviewed 24 February 2026. nhs.uk/medicines/warfarin
  • World Health Organization. Smallpox health topic, last naturally occurring case Somalia 1977, declared eradicated 1980. who.int/health-topics/smallpox
  • চরক সংহিতা, সূত্রস্থান ২৭ (অন্নপানবিধি অধ্যায়), শাক বর্গ, শ্লোক ৯৮ থেকে ১০৩; এবং ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টু ও কৈয়দেব নিঘণ্টুর শাক বর্গে কলম্বী।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

না, কলমি শাক রক্তচাপের ওষুধ নয় এবং কলমি শাক খেলে প্রেসার কমে এমন কোনো মানুষের ওপর করা গবেষণা নেই। যুক্তিটা পরোক্ষ, ১০০ গ্রামে ৩১২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আর ২.১ গ্রাম আঁশ থাকে (USDA, FDC 169301), আর পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ শাকসবজি বেশি খাওয়া রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বলে ধরা হয়। তবে কলমির পটাশিয়াম পালং শাকের চেয়ে কম, তাই একে আলাদা করে প্রেসারের শাক বলার ভিত্তি দুর্বল।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
বাঁশের ঝুড়িতে টকটকে লাল ডাঁটা ও সবুজ-লাল পাতাসহ তাজা লাল শাক, পাশে কড়াইয়ে সেদ্ধ হওয়া গোলাপি জল ও ছেঁকে ফেলার ছাঁকনি, ডান পাশে কিডনি ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রতীক, লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ20 মিনিট

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, যে সংখ্যাগুলো কেউ বলে না

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, লাল শাকে কি রক্ত বাড়ে, পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, অক্সালেট ও নাইট্রেটের হিসাব, বাসি শাকের ভয়, শিশু ও গর্ভাবস্থায় খাওয়ার নিয়ম।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
বাঁশের ঝুড়িতে সবুজ পুঁই পাতা ও লাল ডাঁটা, কাঠের বাটিতে পাকা বেগুনি পুঁই বীজ, ডান পাশে কিডনি ও পাথরের প্রতীক এবং উপকার-অপকারের দাঁড়িপাল্লা, পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ21 মিনিট

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, পুইশাকের পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি, পুঁইশাক খেলে গ্যাস হয় কিনা, খাওয়ার নিয়ম আর কাদের সতর্কতা।

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
কাঠের বাটিতে কালচে বাদামি আলকুশি বীজ আর পাশে ছড়ানো আলকুশি পাউডার, আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ20 মিনিট

আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা, এক চামচে কতটা লেভোডোপা

আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, এক চামচে ঠিক কতটা লেভোডোপা পড়ে, খাওয়ার নিয়ম, কতদিন, দাম, অপকারিতা আর অশ্বগন্ধার সঙ্গে মেশানোর প্রশ্ন।

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ