আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 20 মিনিট পড়ুন

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, যে সংখ্যাগুলো কেউ বলে না

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, লাল শাকে কি রক্ত বাড়ে, পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, অক্সালেট ও নাইট্রেটের হিসাব, বাসি শাকের ভয়, শিশু ও গর্ভাবস্থায় খাওয়ার নিয়ম।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

বাঁশের ঝুড়িতে টকটকে লাল ডাঁটা ও সবুজ-লাল পাতাসহ তাজা লাল শাক, পাশে কড়াইয়ে সেদ্ধ হওয়া গোলাপি জল ও ছেঁকে ফেলার ছাঁকনি, ডান পাশে কিডনি ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রতীক, লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
সূচিপত্র16টি বিভাগ

কড়াইয়ে লাল শাক চাপালে প্রথমে যেটা চোখে পড়ে, সেটা পুষ্টি নয়, রঙ। ডাঁটা থেকে গাঢ় ম্যাজেন্টা রস বেরিয়ে এসে গোটা শাকটাকে ভিজিয়ে দেয়, ভাতের পাশে দিলে ভাতের কোনাটা গোলাপি হয়ে যায়, আর ধোয়ার সময় আঙুলের ডগা রাঙিয়ে দেয়। বাংলা ইন্টারনেটে লাল শাক নিয়ে লেখা প্রায় সবকিছুর ভিত ওই রঙটাই। লাল মানেই রক্ত, রক্ত মানেই আয়রন, আয়রন মানেই রক্তাল্পতা সারবে। যুক্তিটা সুন্দর, সংখ্যাগুলো অন্য কথা বলে।

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা মাপতে গেলে তাই রঙ নয়, খাদ্য-উপাদানের ছকটা খুলে বসতে হয়। লাল শাক হলো Amaranthus tricolor L., Amaranthaceae গোত্রের একটি দ্রুতবর্ধনশীল পাতা-সবজি, ইংরেজিতে red amaranth, পুরোনো বইয়ে Amaranthus gangeticus নামেও লেখা হয়। USDA-র মাপে ১০০ গ্রাম কাঁচা লাল শাকে ২৩ ক্যালোরি, ২১৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৩২ মিলিগ্রাম আয়রন এবং ১১৪০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে থাকে (USDA FoodData Central, FDC 168385)। এর মধ্যে আসল গল্প ক্যালসিয়ামের, আয়রনের নয়। আর ভিটামিন কে-র সংখ্যাটা এত বড় যে সেটাই সবচেয়ে বাস্তব সতর্কতা।

নিচে যে ছয়টি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি, পাঠক আজ বাংলায় ঠিক সেগুলোই বেশি খোঁজেন। রঙটা কীসের, সংখ্যাগুলো কত, অপকারিতা আছে কিনা, বাসি শাক বিপজ্জনক কিনা, রক্ত পাতলা করার ওষুধ চললে কী হয়, আর শিশু ও গর্ভবতীর পাতে এর জায়গা কোথায়। বাড়িতে যদি লাল শাক রক্ত বাড়ানোর জন্যই রান্না হয়, পরের অংশটা পড়ে দেখুন।

লাল শাকের রঙ লাল হয় কেন, আর সেই রঙের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক কতটা?

লাল শাকের লাল রঙ আসে বিটালেইন নামের এক শ্রেণির রঞ্জক পদার্থ থেকে, আয়রন থেকে নয়। বাংলাদেশে করা একটি গবেষণায় লাল রঙের অ্যামারান্থাস পাতায় বিটাসায়ানিন ৩৩.৩০ এবং বিটাজ্যান্থিন ৩৩.০৯ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা ওজনে মাপা হয়েছিল, মোট বিটালেইন ৬৬.৪০ (Sarker ও Oba, PLoS One 2019;14(12):e0222517)। বিটের গাঢ় লাল রঙও আসে একই পরিবারের রঞ্জক থেকে। এটি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রঞ্জক, রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে এর কোনো রাসায়নিক সম্পর্ক নেই।

তাহলে রক্তাল্পতার দাবিটা দাঁড়ায় কোথায়? দাঁড়ায় আয়রনের ওপর, আর সেখানেই লাল শাক তেমন এগিয়ে নেই। ১০০ গ্রামে ২.৩২ মিলিগ্রাম আয়রন খারাপ নয়, কিন্তু এটি নন-হিম আয়রন, যা প্রাণিজ উৎসের তুলনায় শরীরে অনেক কম শোষিত হয়, আর সেই শোষণ আরও কমে যায় যখন একই পাতায় প্রচুর অক্সালেট থাকে। অক্সালেট অন্ত্রেই খনিজের সঙ্গে জুড়ে বসে।

আমার নিজের কাছে এই জায়গাটা মজার লাগে। রঙ দেখে ওষুধ বাছার অভ্যাসটা খুব পুরোনো, ইউরোপে একে বলত doctrine of signatures, আর বাংলাতেও আখরোট দেখে মস্তিষ্ক আর লাল শাক দেখে রক্ত ভাবার চল একইরকম। ধারণাটা কাব্যিক। শুধু পুষ্টিবিজ্ঞান ওভাবে চলে না। রক্তাল্পতার আসল খাদ্যতালিকা কেমন হয় তা নিয়ে আলাদা করে লিখেছি হিমোগ্লোবিন কম হলে কী খাওয়া উচিত লেখাটিতে, আর বাংলার যে শাকটিকে ঐতিহ্যগতভাবে রক্তের শাক বলা হয় সেই কুলেখাড়া পাতার হিসাবটাও আলাদা।

লাল শাকের পুষ্টিগুণ, ১০০ গ্রামে সংখ্যাগুলো আসলে কত

লাল শাকের পুষ্টিগুণের মূল জোর ক্যালসিয়াম, ভিটামিন কে ও পটাশিয়ামে, আয়রনে নয়। বাংলা পাতাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ঘুরে বেড়ায় যে সংখ্যাটা, ১০০ গ্রামে ৩৭৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, সেটি USDA-র মাপা মানের প্রায় পৌনে দুই গুণ। আসল সংখ্যাটা ২১৫।

উপাদান ১০০ গ্রাম কাঁচা ১০০ গ্রাম সেদ্ধ, জল ফেলা
শক্তি ২৩ ক্যালোরি ২১ ক্যালোরি
প্রোটিন ২.৪৬ গ্রাম ২.১১ গ্রাম
ক্যালসিয়াম ২১৫ মিলিগ্রাম ২০৯ মিলিগ্রাম
আয়রন ২.৩২ মিলিগ্রাম ২.২৬ মিলিগ্রাম
পটাশিয়াম ৬১১ মিলিগ্রাম ৬৪১ মিলিগ্রাম
ম্যাগনেশিয়াম ৫৫ মিলিগ্রাম ৫৫ মিলিগ্রাম
ভিটামিন সি ৪৩.৩ মিলিগ্রাম মাপা হয়নি
ভিটামিন এ (RAE) ১৪৬ মাইক্রোগ্রাম ১৩৯ মাইক্রোগ্রাম
ফোলেট ৮৫ মাইক্রোগ্রাম ৫৭ মাইক্রোগ্রাম
ভিটামিন কে ১১৪০ মাইক্রোগ্রাম মাপা হয়নি

সূত্র USDA FoodData Central, FDC 168385 (কাঁচা) ও FDC 169202 (সেদ্ধ, জল ঝরানো, লবণ ছাড়া)।

একটা কথা সৎভাবে বলে রাখা দরকার। এগুলো আমেরিকার খাদ্য-উপাদান তালিকার মান, Amaranthus গণের পাতার জন্য, নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের জাতের জন্য নয়। মাটির গুণ, সার আর জাতভেদে সংখ্যাগুলো এদিক ওদিক হয়। প্রথম আলোর একটি লেখায় ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্টের উদ্ধৃতিতে ক্যারোটিন ১০০ গ্রামে প্রায় ১২,০০০ মাইক্রোগ্রাম বলা হয়েছে, যা USDA-র মানের চেয়ে বহু গুণ বেশি। দুটো তালিকা মিলছে না, এবং এই অমিলটা লুকিয়ে একটা সংখ্যা বেছে নেওয়ার চেয়ে খোলাখুলি বলে দেওয়াই ভালো, কারণ পাঠক যদি জানেন যে খাদ্য-উপাদানের তালিকাগুলোও নিজেদের মধ্যে দ্বিমত করে, তাহলে কোনো একটি ওয়েবসাইটের একটি সংখ্যাকে তিনি আর শেষ কথা বলে ধরে নেবেন না।

লাল শাক নাকি পালং শাক, কোনটায় কী বেশি

লাল শাক ও পালং শাকের তুলনায় জেতা-হারা উপাদানভেদে ভাগ হয়ে যায়, কোনো একটি শাক সব দিকে এগিয়ে নেই। মজার ব্যাপার, চরক সংহিতার শাকবর্গেও এই দুটোর নাম পাশাপাশি বসানো আছে, সূত্রস্থান ২৭-এর ১০০ নম্বর শ্লোকে পালঙ্ক্যা ও মারিষ একই তালিকায়।

উপাদান (১০০ গ্রাম কাঁচা) লাল শাক পালং শাক
ক্যালসিয়াম ২১৫ মিলিগ্রাম ৯৯ মিলিগ্রাম
আয়রন ২.৩২ মিলিগ্রাম ২.৭১ মিলিগ্রাম
ভিটামিন এ (RAE) ১৪৬ মাইক্রোগ্রাম ৪৬৯ মাইক্রোগ্রাম
ফোলেট ৮৫ মাইক্রোগ্রাম ১৯৪ মাইক্রোগ্রাম
পটাশিয়াম ৬১১ মিলিগ্রাম ৫৫৮ মিলিগ্রাম
ভিটামিন কে ১১৪০ মাইক্রোগ্রাম ৪৮৩ মাইক্রোগ্রাম

সূত্র USDA FoodData Central, FDC 168385 ও FDC 168462।

ছকটা এক ঝলকে তিনটে প্রচলিত কথা ভেঙে দেয়। লাল শাক আয়রনে পালংকে হারায় না। ভিটামিন এ-তে তো নয়ই, সেখানে পালং তিন গুণেরও বেশি এগিয়ে। আর গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার, ফোলেট, সেখানেও পালং দ্বিগুণেরও বেশি। লাল শাকের একচ্ছত্র জয় দুটো জায়গায়, ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন কে। এর মধ্যে ক্যালসিয়ামের সারিটা নিঃসন্দেহে সুখবর, কিন্তু ভিটামিন কে-র সারিটা এমন একটি দলের জন্য রীতিমতো সতর্কতা যাঁদের কথা বাংলা পাতাগুলোতে হয় বলা হয় না, নয়তো উল্টো করে বলা হয়, আর সেই আলোচনায় আসছি একটু পরেই।

এক নজরে লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, দাবির পাশে সংখ্যা বসালে কী দাঁড়ায়

বাংলা পাতাগুলোতে লাল শাক নিয়ে যে কথাগুলো ঘুরেফিরে আসে, তার পাশে সংখ্যাটা বসালে ছবিটা বেশ বদলে যায়। নিচের ছকে মাঝের ঘরে রাখলাম সেই সংখ্যা বা তথ্যটাই, আর ডানদিকে প্রমাণের স্তর, যেখানে শক্তিশালী থেকে অপর্যাপ্ত পর্যন্ত স্বীকৃত পাঁচটি ধাপ ব্যবহার করেছি যাতে কোন দাবির পিছনে কতটা ভিত আছে তা এক ঝলকেই বোঝা যায়।

যা বলা হয় সংখ্যা বা তথ্য কী বলছে প্রমাণের স্তর
ক্যালসিয়ামে ভরপুর, হাড়ের শাক সত্যি, তবে ২১৫ মিলিগ্রাম প্রতি ১০০ গ্রামে, বাংলা পাতাগুলোর ৩৭৪ নয় শক্তিশালী প্রমাণ
আয়রনের খনি, রক্ত বাড়ায় ২.৩২ মিলিগ্রাম, পালং শাকের ২.৭১-এর চেয়ে কম, তাও নন-হিম অপর্যাপ্ত প্রমাণ
চোখের জন্য ভিটামিন এ-র সেরা শাক ১৪৬ মাইক্রোগ্রাম RAE, পালং শাকের ৪৬৯-এর তিন ভাগের এক ভাগ অপর্যাপ্ত প্রমাণ
প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখে ৬১১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম আছে, তবে লাল শাকের নিজস্ব ট্রায়াল নেই সীমিত প্রমাণ
ক্যান্সার প্রতিরোধ করে বিটালেইন একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, কিন্তু একটিও মানব গবেষণা নেই অপর্যাপ্ত প্রমাণ
শরীরে দ্রুত শোষিত হয় ২০২৫ সালের ট্রায়ালে ১৬ জনের রক্তে নাইট্রেট তিন গুণেরও বেশি উঠেছিল মাঝারি প্রমাণ
শাস্ত্রে রক্তপিত্ত ও বিষে ব্যবহৃত চরক সূত্রস্থান ২৭.৯৪, তবে বর্ণনাটি ভিন্ন প্রজাতির ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার

ছকের প্রথম সারিটা আলাদা করে পড়ার মতো। একটা ভুল সংখ্যা এতগুলো পাতায় এতবার লেখা হয়েছে যে সেটাই এখন লাল শাকের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ আসল মানটাও যথেষ্ট ভালো। অতিরঞ্জন না করেও বলা যেত, লাল শাক বাঙালির পাতে ক্যালসিয়ামের অন্যতম সেরা উৎস। এটুকুই যথেষ্ট ছিল।

লাল শাকের অপকারিতা ১, অক্সালেট আর কিডনির হিসাব

লাল শাকের প্রথম বাস্তব অপকারিতা অক্সালেট, এবং এদিক থেকে অ্যামারান্থাস জাতীয় শাক পরিমাপ করা সবচেয়ে উঁচু দলের মধ্যে পড়ে। ভারতের এগারোটি শাক নিয়ে করা একটি বিশ্লেষণে পালং, অ্যামারান্থাস ও কচু সবচেয়ে বেশি মোট অক্সালেটের দলে ছিল, শুকনো ওজনের হিসাবে ১০০ গ্রামে ৫,১৩৮ থেকে ১২,৫৭৬ মিলিগ্রাম, যার বড় অংশ দ্রবণীয় ধরনের (Radek ও Savage, Int J Food Sci Nutr 2008;59(3):246-260, DOI 10.1080/09637480701791176)। দ্রবণীয় অক্সালেটই শরীরে বেশি শোষিত হয়।

তাজা ওজনের হিসাবে সংখ্যাটা কত, সেটা নিয়ে প্রকাশিত মানগুলো জাত ও চাষের অবস্থাভেদে এত ছড়ানো যে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বসিয়ে দেওয়াটা সৎ হবে না। যেটা সব গবেষণায় একরকম, সেটা হলো দিক। অ্যামারান্থাস অক্সালেটে উঁচুর দিকে।

এখন ভালো খবরটা, এবং এটাই লেখার সবচেয়ে কাজের অংশ। ১৯৭৮ সালে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, অ্যামারান্থাস পাতা সেদ্ধ করে জল না ফেলে খাওয়ালে দুধের ক্যালসিয়াম শোষণ কমে যায়, কিন্তু সেদ্ধ জলটা ফেলে দিলে সেই শোষণে আর কোনো প্রভাব পড়ে না (Pingle ও Ramasastri, Br J Nutr 1978;40(3):591-594, DOI 10.1079/bjn19780163)। অর্থাৎ লাল শাকের ২১৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম আপনি কতটা পাবেন, সেটা ঠিক করে দেয় রান্নার একটা সিদ্ধান্ত। একই কথা কলমিপুঁই শাকের ক্ষেত্রেও খাটে, যদিও তিনটি শাকের অক্সালেটের মাত্রা এক নয়।

কিডনির রোগী কী করবেন? আমেরিকার National Kidney Foundation স্পষ্ট করে বলছে, কিডনির রোগ থাকলেই শাক বাদ দিতে হয় না, বেশিরভাগ রোগীকেই পটাশিয়ামের কারণে শাক কমাতে হয় না, সিদ্ধান্তটা রক্তের রিপোর্ট দেখে নিতে হয় (National Kidney Foundation, Leafy Green Vegetables, সর্বশেষ হালনাগাদ ২ জানুয়ারি ২০২৩)। তবে ক্যালসিয়াম-অক্সালেট পাথর যাঁদের বারবার হয়েছে, তাঁদের অক্সালেটের পরিমাণ নিয়ে আলাদা আলোচনা দরকার। আর একটা সূক্ষ্ম কথা ওই সংস্থাটিই মনে করিয়ে দেয়, রান্না করলে শাক কমে যায় বলে এক বাটি রান্না করা শাকে এক বাটি কাঁচা শাকের চেয়ে অনেক বেশি পটাশিয়াম ঢোকে। কিডনির ঝুঁকি মাথায় রেখে খাবার বাছার আরেকটি উদাহরণ পাবেন কামরাঙা ও কিডনির ঝুঁকি লেখাটিতে।

লাল শাকের অপকারিতা ২, নাইট্রেটের যে সংখ্যাটা কেউ বলে না

লাল শাকের দ্বিতীয় অপকারিতা নাইট্রেট, এবং সরকারি জরিপে মাপা সংখ্যাটা বাংলা ইন্টারনেটে একবারও আসেনি। হংকং সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্র বাজারের সবজি নিয়ে যে ঝুঁকি-মূল্যায়ন করেছিল, তাতে Chinese spinach অর্থাৎ অ্যামারান্থাস শাকে গড় নাইট্রেট পাওয়া গিয়েছিল প্রতি কেজিতে ৪,৮০০ মিলিগ্রাম, পরিসর ৩,৭০০ থেকে ৬,৩০০, যা জরিপের সব সবজির মধ্যে সর্বোচ্চ (Centre for Food Safety, Risk Assessment Studies Report No. 40, জুলাই ২০১০)।

সংখ্যাটা কতটা বড়, সেটা বোঝাতে একটা হিসাব করি। JECFA নাইট্রেটের গ্রহণযোগ্য দৈনিক মাত্রা বা ADI ধরেছে শরীরের প্রতি কেজি ওজনে ০ থেকে ৩.৭ মিলিগ্রাম, অর্থাৎ ৬০ কেজি ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে প্রায় ২২২ মিলিগ্রাম। ওই গড় মান ধরলে ১০০ গ্রাম লাল শাকেই আসে প্রায় ৪৮০ মিলিগ্রাম, অর্থাৎ ADI-র দ্বিগুণেরও বেশি।

এখানেই থেমে গেলে ভুল বোঝানো হবে, তাই বাকিটাও বলি। ADI ঠিক করা হয় সারা জীবন ধরে গ্রহণের নিরাপদ সীমা হিসাবে, আর শাকসবজির নাইট্রেটের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অবস্থান হলো, সবজি খাওয়ার উপকার এর সম্ভাব্য ঝুঁকির চেয়ে বেশি। হংকংয়ের ওই কেন্দ্রটিও তাদের পরের পর্যালোচনায় ঠিক এই কথাটাই লিখেছে। কাজেই এটা লাল শাক বন্ধ করার যুক্তি নয়। এটা রোজ একই শাক না খেয়ে শাক ঘুরিয়ে খাওয়ার যুক্তি, আর ছোট শিশুর বেলায় বাড়তি সতর্ক হওয়ার যুক্তি।

একটা সহজ কৌশলও আছে। এক থেকে তিন মিনিট ফুটন্ত জলে ব্লাঞ্চ করলে শাকের নাইট্রেট ১২ থেকে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় (Centre for Food Safety, Food Safety Focus Issue 49, অগস্ট ২০১০)। লক্ষ করুন, এটি ঠিক সেই কাজটাই যা অক্সালেট কমানোর জন্যও দরকার। একটি অভ্যাস, দুটি সমস্যার উত্তর।

বাসি লাল শাক খাওয়া কি সত্যিই বিপজ্জনক?

বাসি রান্না করা শাক নিয়ে প্রচলিত ভয়টি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে গবেষণায় সমর্থন পায়নি, কিন্তু ছোট শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি বাস্তব। দুটো অর্ধেক একসঙ্গে না বললে কথাটা ভুল দাঁড়ায়, আর বাংলায় সাধারণত একটাই অর্ধেক বলা হয়।

প্রথম অর্ধেক। হংকংয়ের খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্র ২০২২ সালে রান্না করা বাসি সবজি নিয়ে যে পরীক্ষা করেছিল, তাতে দেখা গেছে ফ্রিজে সারা রাত অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা রেখে দিলে রান্না করা সবজিতে নাইট্রাইটের পরিমাণ বাড়ে না। ফ্রিজারে রাখলে রূপান্তর প্রায় থেমেই যায়। তাদের উপসংহার সোজা, ফ্রিজে রাখা বাসি সবজিতে নাইট্রাইট বাড়ার অভিযোগটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

দ্বিতীয় অর্ধেক, এবং এটিই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের মেটহিমোগ্লোবিনেমিয়ার যে ঘটনাগুলো নথিভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর কেন্দ্রে ছিল আগে থেকে বানিয়ে রেখে দেওয়া সবজির পিউরি। স্পেনের উত্তরাংশে ৭৮টি ঘটনার বিশ্লেষণে তিনটি ঝুঁকির কারণ উঠে এসেছিল, পিউরি বানানোর ২৪ ঘণ্টারও বেশি পরে খাওয়ানো, নির্দিষ্ট কিছু সবজি ব্যবহার, আর মাতৃদুগ্ধ পান (Martinez ও সহকর্মীরা, J Pediatr Gastroenterol Nutr 2013;56(5):573-577)। সেখানে যে সবজিগুলো দায়ী ছিল, বোরেজ ও চার্ড, তাদের গড় নাইট্রেট যথাক্রমে ৩,৯৬৮ ও ২,৮১১ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি। আগের একটি গবেষণায় সাতটি শিশুর ঘটনায় জড়িত সিলভার বিটের গড় ছিল ৩,২০০ (Sanchez-Echaniz ও সহকর্মীরা, Pediatrics 2001;107(5):1024-1028)।

এবার মিলিয়ে দেখুন। যে সবজিগুলো সত্যিকারের ঘটনা ঘটিয়েছিল, তাদের নাইট্রেট ছিল প্রতি কেজিতে ২,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিগ্রামের ঘরে। অ্যামারান্থাস শাকের মাপা গড় তার চেয়েও বেশি, ৪,৮০০। কেউ বলছে না লাল শাক বিপজ্জনক। বলা হচ্ছে, শিশুর পিউরির নিয়মটা অন্য সবজির চেয়ে লাল শাকের বেলায় আরও একটু কড়া করে মানা দরকার।

রক্ত পাতলা করার ওষুধ খেলে কি লাল শাক বন্ধ করতে হবে?

না, বন্ধ করা নয়, পরিমাণ এক রাখাই আসল নিয়ম, এবং বাংলা পাতাগুলো এখানে ঠিক উল্টো পরামর্শ দিচ্ছে। একাধিক জনপ্রিয় বাংলা পাতায় সরাসরি লেখা আছে যে অ্যান্টি-কোয়াগুল্যান্ট চললে এই শাক খাওয়া চলবে না। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি হসপিটালস NHS ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ওয়ারফারিন-সংক্রান্ত খাদ্য নির্দেশিকা বলছে উল্টোটা, ভিটামিন কে-যুক্ত খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দরকার নেই, দরকার একটি সুসংগত পরিমাণ বজায় রাখা (CUH NHS Foundation Trust, অনুমোদিত ১৬ এপ্রিল ২০২৫)। একই নির্দেশিকা সতর্ক করছে, দিনে দিনে বা সপ্তাহে সপ্তাহে ভিটামিন কে-র পরিমাণ হঠাৎ বাড়ানো বা কমানো INR বদলে দিতে পারে, আর তাতে রক্ত জমাট বাঁধা বা রক্তপাত, দুদিকেরই ঝুঁকি বাড়ে।

লাল শাকের ক্ষেত্রে কথাটা অন্য শাকের চেয়ে বেশি প্রযোজ্য, কারণ সংখ্যাটা বড়। ১০০ গ্রামে ১১৪০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক পর্যাপ্ত গ্রহণমাত্রা বা AI ধরা হয় ১২০ মাইক্রোগ্রাম আর নারীর ৯০ (Institute of Medicine, Dietary Reference Intakes, National Academies Press, 2001)। অর্থাৎ এক বাটি লাল শাকেই দৈনিক মাত্রার নয় থেকে বারো গুণ ঢুকে যায়।

এটা ভয়ের সংখ্যা নয়, এটা অসামঞ্জস্যের সংখ্যা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ভিটামিন কে-র কোনো সহনীয় ঊর্ধ্বসীমা বা UL নির্ধারণ করা যায়নি, কারণ বেশি খেলে ক্ষতি হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা ওষুধে। আপনি যদি ওয়ারফারিন খান এবং সপ্তাহে একদিন হঠাৎ এক বাটি লাল শাক খান, তারপর তিন সপ্তাহ ছুঁয়েও দেখেন না, আপনার INR ওঠানামা করবে। রোজ অল্প খেলে সেটা হবে না। অনেক চিকিৎসক অবশ্য ব্যবহারিক কারণে রোগীকে উঁচু ভিটামিন কে-যুক্ত সবজি দিনে একটির বেশি পরিবেশন না করতে বলেন, যা এই সামঞ্জস্য রাখারই আরেকটি রূপ। ওষুধ ও খাবারের এই টানাপোড়েনটা রক্তচাপের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সে প্রসঙ্গে লিখেছি উচ্চ রক্তচাপে কী খাবেন লেখাটিতে।

মানুষের ওপর গবেষণা আসলে কতটুকু আছে

লাল শাক নিয়ে মানুষের ওপর করা প্রকাশিত গবেষণা খুব কম, আর যেটি সবচেয়ে সাম্প্রতিক সেটি উপকারিতার গবেষণা নয়, শোষণের গবেষণা। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি এলোমেলোকৃত, দ্বৈত-অন্ধ, প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত চার-পর্বের ক্রসওভার ট্রায়ালে ১৬ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবককে খালি পেটে ২০০০ মিলিগ্রাম করে তিনটি ভিন্ন অ্যামারান্থাস প্রজাতির নির্যাস দেওয়া হয়েছিল, যার একটি Amaranthus tricolor অর্থাৎ আমাদের লাল শাক (Suhag ও Kodre, Curr Ther Res Clin Exp 2025;103:100789, PMID 40546684)।

ফল কী দাঁড়াল? প্লাসিবোতে রক্তরসে নাইট্রেটের সর্বোচ্চ ঘনত্ব ছিল প্রতি মিলিলিটারে ৬২.৮১ ন্যানোগ্রাম, A. tricolor নির্যাসে ২৫২.৩৫, অর্থাৎ প্রায় তিন গুণেরও বেশি। লালার নাইট্রাইটও কয়েক গুণ বেড়েছিল। গবেষকরা কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিকূল ঘটনার কথা জানাননি, হালকা পেটের গোলমাল প্লাসিবো ও নির্যাস দুই দলেই হয়েছিল এবং একই দিনে সেরে গিয়েছিল।

এই গবেষণাটা ঠিক কী দেখায়, সেটা নিয়ে সৎ থাকা দরকার। এটি দেখায় অ্যামারান্থাসের নাইট্রেট শরীরে ভালোভাবে পৌঁছয়। এটি দেখায় না যে লাল শাক রক্ত বাড়ায়, ক্যান্সার ঠেকায়, বা প্রেসার কমায়। ২০০০ মিলিগ্রাম ঘনীভূত নির্যাস আর ভাতের পাতে এক বাটি ভাজা শাক এক জিনিস নয়, আর ১৬ জনের একদিনের ট্রায়াল থেকে দীর্ঘমেয়াদি উপকারের সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না। আমার নিজের কাছে বরং এর সবচেয়ে কাজের দিকটা হলো, এটি উপরের নাইট্রেটের আলোচনাটাকেই শক্ত ভিত দেয়। লাল শাকের নাইট্রেট কাগজে থেকে যায় না, রক্তে পৌঁছয়।

শাস্ত্রে লাল শাক কোন নামে আছে, তণ্ডুলীয়ক না মারিষ

আয়ুর্বেদের শাকবর্গে অ্যামারান্থাস গোত্রের একাধিক গাছ আলাদা নামে আছে, আর লাল শাক সম্ভবত তণ্ডুলীয়ক নয়, মারিষ। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এই দুটো নাম প্রায়ই গুলিয়ে ফেলা হয়, তাই ধরে ধরে বলি।

চরক সংহিতার সূত্রস্থান ২৭-এ তণ্ডুলীয়ক-এর বর্ণনা আছে ৯৪ নম্বর শ্লোকে, যেখানে একে বলা হয়েছে রূক্ষ, মদ ও বিষের প্রভাব নাশক, রক্তপিত্তে উপকারী, রসে ও বিপাকে মধুর এবং বীর্যে শীতল। কিন্তু নিঘণ্টুগুলিতে তণ্ডুলীয়ক-কে চিহ্নিত করা হয় Amaranthus spinosus বা কাঁটা নটে হিসাবে, আর সংস্কৃত শব্দকোষে এর বাংলা প্রতিশব্দ দেওয়া থাকে নটে শাক। সেটি লাল শাক নয়, আলাদা প্রজাতি।

অন্যদিকে ওই একই অধ্যায়ের ১০০ নম্বর শ্লোকে পালঙ্ক্যার পাশে মারিষ-এর নাম আছে, আর মারিষ-কে চিহ্নিত করা হয় Amaranthus blitumAmaranthus tricolor হিসাবে। পরবর্তী নিঘণ্টুগুলিতে মারিষ দুই ভাগে ভাগ হয়েছে, শ্বেত মারিষ ও রক্ত মারিষ, এবং রক্ত মারিষ-ই Amaranthus tricolor, অর্থাৎ আমাদের লাল শাক। চরকের বর্ণনায় মারিষ মধুর রস, গুরু গুণ, শীতল বীর্য, মধুর বিপাক এবং কফবর্ধক। একই অধ্যায়ের ১০৩ নম্বর শ্লোকে শাক রান্নার সাধারণ নিয়মও দেওয়া আছে, সেদ্ধ করে রস নিংড়ে ফেলে স্নেহপদার্থ মিশিয়ে খাওয়া।

দোষের হিসাবে তাই লাল শাক দুই জায়গায় দুরকম দাঁড়ায়। মারিষ হিসাবে এটি শীতল ও গুরু, কফ বাড়ায় বলে ধরা হয়, আর তণ্ডুলীয়ক হিসাবে বর্ণনাটি রূক্ষ ও পিত্তশামক। এক গণের দুই গাছে ত্রিদোষের হিসাব যে আলাদা হবে, সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু নাম গুলিয়ে ফেললে দুটো বিবরণ এক গাছের ঘাড়ে চেপে বসে।

এখানে দুটো কথা সততার সঙ্গে বলা দরকার। এক, নিঘণ্টুর উদ্ভিদ-চিহ্নিতকরণ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে, সব সূত্র এক সিদ্ধান্তে আসে না, আর আমি কোনো একটি পক্ষ নেওয়ার চেয়ে মতভেদটা জানিয়ে রাখাই ভালো মনে করি। দুই, কফবর্ধক বলার মানে সবার ক্ষেত্রে সমস্যা নয়, আয়ুর্বেদে এটি প্রকৃতিভেদে বিবেচনার কথা। রস, গুণ, বীর্য ও বিপাকের এই কাঠামোটা কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে ষড়রস বা ছয় রসের লেখাটি দেখতে পারেন, আর কোন ঋতুতে কোন শাক কেমন বসে তার কাঠামো আছে ঋতুচর্যার আলোচনায়।

গর্ভাবস্থায় ও শিশুর পাতে লাল শাক

গর্ভাবস্থায় সাধারণ খাবার হিসাবে রান্না করা লাল শাকে নথিভুক্ত কোনো ক্ষতি নেই, তবে ফোলেটের জন্য এটি সেরা বাছাই নয়। বাংলা পাতাগুলো এখানে বেশ জোর দিয়ে লেখে যে গর্ভাবস্থায় সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন লাল শাক খাওয়া উচিত। সেই নির্দিষ্ট পরামর্শটির কোনো উৎস আমি খুঁজে পাইনি, এবং সংখ্যার হিসাবে যুক্তিটাও দুর্বল, কারণ ফোলেটে পালং শাক লাল শাকের দ্বিগুণেরও বেশি এগিয়ে। গর্ভাবস্থার সামগ্রিক খাদ্যতালিকা নিয়ে আলাদা করে লিখেছি গর্ভাবস্থায় কী খাবেন কী খাবেন না লেখাটিতে।

শিশুর বেলায় আসল প্রশ্নটা বয়স নয়। প্রশ্নটা সময়, রান্না থেকে খাওয়ার মধ্যে কত ঘণ্টা কাটল। ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর বাড়তি খাবারের অংশ হিসাবে লাল শাক দেওয়া যায়, কিন্তু উপরের নাইট্রেটের আলোচনাটা মাথায় রেখে। হংকংয়ের খাদ্য নিরাপত্তা কেন্দ্রের নির্দেশনা হলো শিশুর সবজি-পিউরি বা সবজি-খিচুড়ি বানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ানো, একান্ত রেখে দিতে হলে ফ্রিজে চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বড়জোর ১২ ঘণ্টা, তার বেশি হলে ফ্রিজারে মাইনাস ১৮ ডিগ্রিতে, আর খাওয়ানোর আগে ভালো করে গরম করে সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া (Food Safety Focus Issue 49, অগস্ট ২০১০)।

সহজ কথায়, সকালে বানিয়ে রেখে বিকেলে গরম করে শিশুকে লাল শাকের পিউরি খাওয়ানোর অভ্যাসটাই এখানে ঝুঁকিপূর্ণ, শাকটা নয়। শিশুর খাবার ও যত্নের সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে পড়তে পারেন শিশুদের আয়ুর্বেদিক যত্ন লেখাটি।

কীভাবে ব্যবহার করবেন

লাল শাক খাওয়ার সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত নিয়ম হলো সেদ্ধ করে সেই জলটা ফেলে দিয়ে তারপর রান্না করা, আর প্রাপ্তবয়স্কের জন্য রান্না করা এক বাটি অর্থাৎ মোটামুটি ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম।

১. গোড়ার মাটি ছাড়াতে অন্তত তিনবার জল বদলে ধুয়ে নিন। ডাঁটার খাঁজে বালি জমে থাকে, আঙুল বুলিয়ে দেখলেই খসখসে লাগে। ২. ফুটন্ত জলে এক থেকে তিন মিনিট রাখুন। জলটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় ম্যাজেন্টা হয়ে যাবে, আর ওই রঙের সঙ্গেই দ্রবণীয় অক্সালেট ও কিছুটা নাইট্রেট নেমে আসে। ৩. ওই লাল জলটা ফেলে দিন। সুন্দর দেখতে বলে ডাল বা ঝোলে ঢেলে দেওয়ার লোভটা সামলান, কারণ ওটাই ফেলার জিনিস। এইটুকুই ১৯৭৮ সালের ওই গবেষণায় ক্যালসিয়াম শোষণের পুরো পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছিল। ৪. এবার কড়াইয়ে সরষের তেল গরম করে রসুন, শুকনো লঙ্কা বা কালোজিরার ফোড়ন দিয়ে ভেজে নিন। সেদ্ধ শাক আর জল ছাড়ে না, তাই ভাজাটা দ্রুত হয় এবং ঝাঁঝালো ফোড়নের গন্ধটা অনেক বেশি খোলে। ৫. একই পাতে দুধ, দই বা ছানা জাতীয় ক্যালসিয়ামের উৎস রাখলে ভালো। ওই একই বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, দুধ বা ক্যালসিয়াম লবণ মেশালে অন্ত্রে শোষণযোগ্য অক্সালেট ৩২ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় (Radek ও Savage, 2008)।

আর একটি কথা, রোজ একই শাক না খেয়ে ঘুরিয়ে খান। লাল শাক, কলমি, পুঁই, নটে, পালং পালা করে খেলে কোনো একটি উপাদানই জমে ওঠার সুযোগ পায় না। আঁশের কারণে পেট পরিষ্কার রাখতে শাক সাহায্য করে ঠিকই, তবে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমাধান শুধু শাকে নেই, জল ও অভ্যাসেও আছে।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

লাল শাক সাধারণ খাবার হিসাবে বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ, কিন্তু চারটি দলের জন্য আলাদা বিবেচনা দরকার, এবং প্রতিটির পিছনেই নির্দিষ্ট সূত্র আছে।

  • ওয়ারফারিন বা অন্য ভিটামিন কে-নির্ভর রক্ত পাতলা করার ওষুধ যাঁরা খান। শাক বাদ দেওয়ার দরকার নেই, পরিমাণ সুসংগত রাখা দরকার, কারণ হঠাৎ বাড়া বা কমা INR বদলে দিতে পারে (CUH NHS Foundation Trust, ওয়ারফারিন খাদ্য নির্দেশিকা, অনুমোদিত ১৬ এপ্রিল ২০২৫)। লাল শাকে ভিটামিন কে ১০০ গ্রামে ১১৪০ মাইক্রোগ্রাম, দৈনিক পর্যাপ্ত মাত্রার বহু গুণ (USDA, FDC 168385; Institute of Medicine, 2001)।
  • যাঁদের বারবার ক্যালসিয়াম-অক্সালেট পাথর হয়েছে। অ্যামারান্থাস মাপা সবচেয়ে উঁচু অক্সালেটের দলে পড়ে (Radek ও Savage, Int J Food Sci Nutr 2008;59(3):246-260)। সেদ্ধ করে জল ফেলা এবং একই বেলায় ক্যালসিয়াম রাখা, দুটোই অন্ত্রে শোষণযোগ্য অক্সালেট কমায় (Pingle ও Ramasastri, Br J Nutr 1978;40(3):591-594)। পরিমাণটা চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করে নিন।
  • কিডনির রোগে যাঁদের রক্তে পটাশিয়াম বেশি থাকে। National Kidney Foundation বলছে কিডনির রোগ থাকলেই শাক বাদ দিতে হয় না, সিদ্ধান্তটা রক্তের রিপোর্ট দেখে নিতে হয়, তবে রান্না করা শাকে একই বাটিতে কাঁচার চেয়ে অনেক বেশি পটাশিয়াম ঢোকে (NKF, Leafy Green Vegetables, হালনাগাদ ২ জানুয়ারি ২০২৩)। লাল শাকে ১০০ গ্রামে ৬১১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম।
  • ছয় মাসের নিচের শিশু, এবং যেকোনো শিশুর বাসি পিউরি। ছয় মাসের নিচে বাড়তি খাবারই দেওয়ার কথা নয়। তার পরেও লাল শাকের পিউরি আগে থেকে বানিয়ে রেখে দেওয়া চলবে না, কারণ নথিভুক্ত শিশু-মেটহিমোগ্লোবিনেমিয়ার ঘটনাগুলোর কেন্দ্রে ছিল ঠিক এই অভ্যাসটিই (Martinez ও সহকর্মীরা, J Pediatr Gastroenterol Nutr 2013;56(5):573-577; Sanchez-Echaniz ও সহকর্মীরা, Pediatrics 2001;107(5):1024-1028)।

এলার্জির কথা বহু জায়গায় লেখা থাকে। খোঁজ করে লাল শাকে খাদ্য-এলার্জির কোনো প্রকাশিত কেস রিপোর্ট আমি পাইনি, অর্থাৎ সতর্কতাটি ঘরোয়া অভিজ্ঞতার, নথিভুক্ত প্রমাণের নয়, আর সেটা বলে দেওয়াই সৎ। গর্ভাবস্থায় নিরাপত্তা নিয়েও আলাদা গবেষণা নেই, সাধারণ খাবার হিসাবে সমস্যা দেখানো হয়নি, তবে প্রমাণের অনুপস্থিতি আর নিরাপত্তার প্রমাণ এক কথা নয়।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

লাল শাকের সেদ্ধ জলটা আমি আগে ফেলতাম না। রঙটা এত সুন্দর যে মনে হতো ওতেই তো সব গুণ, ডালে ঢেলে দিলে ডালটাও গোলাপি হয়ে যায়, বাচ্চারা খুশি হয়। ১৯৭৮ সালের ওই ছোট গবেষণাটা পড়ার পর অভ্যাসটা বদলেছি, আর বদলাতে গিয়ে একটা জিনিস লক্ষ করলাম, জল ফেলে দিলে ভাজা শাকের স্বাদটা বরং পরিষ্কার হয়, ওই হালকা কষা ভাবটা থাকে না। (কষা ভাবটাই যে অক্সালেট, সেটা অবশ্য আমার অনুমান, প্রমাণ নয়।)

আপনার রান্নাঘরে কোন পদ্ধতিটা চলে? শীতের বাজারে যখন এক আঁটি লাল শাক প্রায় জ্বলজ্বল করে, তখন ওটাকে কেবল রঙের জন্য কিনি নাকি হিসাব করে কিনি, প্রশ্নটা আমার কাছে এখনো খোলা।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই আছে, কিন্তু দুটোই প্রচলিত গল্পের চেয়ে আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে। উপকারটা আয়রনে নয়, ক্যালসিয়ামে, ১০০ গ্রামে ২১৫ মিলিগ্রাম, পালং শাকের দ্বিগুণেরও বেশি। আর অপকারিতা নেই বলে যে কথাটা প্রায় প্রতিটি বাংলা পাতায় লেখা আছে, সেটা ভুল, কারণ অক্সালেট আর নাইট্রেট দুটোতেই এই শাক মাপা সবচেয়ে উঁচু দলের মধ্যে পড়ে।

ভালো খবরটা হলো, তিনটি ঝুঁকির মধ্যে দুটি একই কাজে অনেকটা কমে যায়। কাজটা ছোট। ফুটন্ত জলে এক থেকে তিন মিনিট, তারপর ওই লাল জলটা ফেলে দেওয়া। তৃতীয়টি, ভিটামিন কে, রান্নায় কমে না, সেটির উত্তর অভ্যাসে, পরিমাণ এক রাখায়।

আজ সন্ধ্যায় যদি বাড়িতে লাল শাক হয়, একটাই কাজ করুন। কড়াইয়ে দেওয়ার আগে জল ফুটিয়ে শাকটা দুই মিনিট রাখুন, তারপর ছেঁকে ওই গোলাপি জলটা সিঙ্কে ফেলে দিন, আর পাতে এক কাপ দই রাখুন। এটুকুই লাল শাকের ক্যালসিয়ামটা আপনার হাড় পর্যন্ত পৌঁছনোর সবচেয়ে সহজ পথ।

সূত্র / Sources

  • USDA FoodData Central. Amaranth leaves, raw (FDC 168385); Amaranth leaves, cooked, boiled, drained, without salt (FDC 169202); Spinach, raw (FDC 168462). fdc.nal.usda.gov
  • Radek M, Savage GP. Oxalates in some Indian green leafy vegetables. International Journal of Food Sciences and Nutrition. 2008;59(3):246-260. PMID 18335334
  • Pingle U, Ramasastri BV. Effect of water-soluble oxalates in Amaranthus spp. leaves on the absorption of milk calcium. British Journal of Nutrition. 1978;40(3):591-594. PMID 568935
  • Suhag D, Kodre AN. Comparison of bioavailability of nitrates and nitrites in 3 species of Amaranthus. Current Therapeutic Research, Clinical and Experimental. 2025;103:100789. PMID 40546684
  • Sarker U, Oba S. Protein, dietary fiber, minerals, antioxidant pigments and phytochemicals, and antioxidant activity in selected red morph Amaranthus leafy vegetable. PLoS One. 2019;14(12):e0222517. PMID 31830064
  • Martinez A, Sanchez-Valverde F, Gil F, ও সহকর্মীরা. Methemoglobinemia induced by vegetable intake in infants in northern Spain. Journal of Pediatric Gastroenterology and Nutrition. 2013;56(5):573-577. PMID 23287806
  • Sanchez-Echaniz J, Benito-Fernández J, Mintegui-Raso S. Methemoglobinemia and consumption of vegetables in infants. Pediatrics. 2001;107(5):1024-1028. PMID 11331681
  • Institute of Medicine. Vitamin K. In Dietary Reference Intakes for Vitamin A, Vitamin K, Arsenic, Boron, Chromium, Copper, Iodine, Iron, Manganese, Molybdenum, Nickel, Silicon, Vanadium, and Zinc. Washington DC. National Academies Press, 2001. NCBI Bookshelf NBK222299
  • Centre for Food Safety, Hong Kong SAR Government. Nitrate and Nitrite in Vegetables Available in Hong Kong. Risk Assessment Studies Report No. 40, July 2010. cfs.gov.hk
  • Centre for Food Safety, Hong Kong SAR Government. Nitrate and Nitrite in Vegetables and Infant Feeding. Food Safety Focus, Issue 49, August 2010. cfs.gov.hk
  • Centre for Food Safety, Hong Kong SAR Government. Nitrate and Nitrite in Leftover Cooked Vegetables. June 2022. cfs.gov.hk
  • Cambridge University Hospitals NHS Foundation Trust. Dietary advice for patients taking warfarin. অনুমোদিত ১৬ এপ্রিল ২০২৫. cuh.nhs.uk
  • National Kidney Foundation. Leafy Green Vegetables. হালনাগাদ ২ জানুয়ারি ২০২৩. kidney.org
  • চরক সংহিতা, সূত্রস্থান ২৭ (অন্নপানবিধি অধ্যায়), শ্লোক ৯৪, ১০০ ও ১০৩. carakasamhitaonline.com

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

কারো ক্ষেত্রে হ্যাঁ, তবে লাল শাকে এলার্জির কোনো নথিভুক্ত কেস রিপোর্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ বাংলা ইন্টারনেটে প্রশ্নটা বহুল খোঁজা। অর্থাৎ দাবিটা ঘরোয়া অভিজ্ঞতার, প্রকাশিত গবেষণার নয়। যেকোনো খাবারেই ব্যক্তিবিশেষে প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তাই খাওয়ার পরে ফুসকুড়ি, ঠোঁট ফোলা বা পেট খারাপ হলে বন্ধ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
বাঁশের ঝুড়িতে ফাঁপা ডাঁটা ও সাদা ফুলসহ তাজা কলমি শাক, বাঁ পাশে ফুটন্ত জলে সেদ্ধ শাক ও তির চিহ্ন ধরে নিচে কড়াইয়ে ভাজা শাক, ডান পাশে কিডনি ও রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ27 মিনিট

কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, প্রেসার কিডনি আর রান্নার নিয়ম

কলমি শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, কলমি শাকের ক্ষতিকর দিক, প্রেসার বাড়ে না কমে, কিডনি ও ইউরিক এসিডের হিসাব, পুষ্টিগুণ সংখ্যায় আর ভাজি না সেদ্ধ, খাওয়ার নিয়ম।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
বাঁশের ঝুড়িতে সবুজ পুঁই পাতা ও লাল ডাঁটা, কাঠের বাটিতে পাকা বেগুনি পুঁই বীজ, ডান পাশে কিডনি ও পাথরের প্রতীক এবং উপকার-অপকারের দাঁড়িপাল্লা, পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ21 মিনিট

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি

পুঁই শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, পুইশাকের পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, এলার্জি ও কিডনির ভয় কতটা সত্যি, পুঁইশাক খেলে গ্যাস হয় কিনা, খাওয়ার নিয়ম আর কাদের সতর্কতা।

১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
কাঠের বাটিতে কালচে বাদামি আলকুশি বীজ আর পাশে ছড়ানো আলকুশি পাউডার, আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ20 মিনিট

আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা, এক চামচে কতটা লেভোডোপা

আলকুশি পাউডার ও বীজের উপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, এক চামচে ঠিক কতটা লেভোডোপা পড়ে, খাওয়ার নিয়ম, কতদিন, দাম, অপকারিতা আর অশ্বগন্ধার সঙ্গে মেশানোর প্রশ্ন।

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ