আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ২৯ জুলাই, ২০২৬ 16 মিনিট পড়ুন

অর্জুন ছাল কি সত্যিই হার্টের বন্ধু, গবেষণা যা বলে ও যা বলে না

অর্জুন ছাল হৃদযন্ত্রে কতটা কাজ করে, ক্লিনিকাল ট্রায়াল কী বলে, খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, কোন ওষুধের সঙ্গে ঝুঁকি আছে, কাদের এড়িয়ে চলা দরকার, প্রমাণসহ আলোচনা।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

অর্জুন গাছের ছাল ও অর্জুন ছালের গুঁড়ো, পাশে দুধে ফোটানো ক্ষীরপাকের মাটির পাত্র
সূচিপত্র12টি বিভাগ

একটা দাবি বাংলা ইন্টারনেটে এত ঘুরেছে যে অনেকে সেটাকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বলেই ধরে নিয়েছেন, অর্জুন ছালে নাকি কো-এনজাইম কিউ-১০ ভরপুর। ২০২৪ সালে Bioinformation জার্নালে প্রকাশিত অর্জুনের রাসায়নিক উপাদানের যে তালিকাটি বেরিয়েছে, সেখানে ট্রাইটারপেনয়েড, গ্লাইকোসাইড, ফ্ল্যাভোনয়েড আর ট্যানিনের নাম আছে। কো-এনজাইম কিউ-১০ নেই।

অর্জুন ছাল হলো Terminalia arjuna গাছের কাণ্ডের বাকল, যা আয়ুর্বেদে হৃদরোগ বা হৃদ্‌রোগের প্রসঙ্গে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক প্রমাণের অবস্থা মিশ্র। ছোট আকারের কয়েকটি ট্রায়ালে হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা ও কোলেস্টেরলে অনুকূল পরিবর্তন পাওয়া গেছে, আবার ২০১৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা সরাসরি বলেছে, নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। সব মিলিয়ে অর্জুনকে দিতে হবে সীমিত প্রমাণের তকমা, প্রমাণিত চিকিৎসার নয়।

এই লেখায় দেখব অর্জুন ছাল জিনিসটা আসলে কী, চারটি ক্লিনিকাল গবেষণা ধরে ধরে কী পাওয়া গেছে, ছালে কোন যৌগগুলো সত্যিই আছে, শাস্ত্র কী বলেছিল, গাছ চেনার উপায় কী, মাত্রা কত, আর কোন ওষুধ চললে এটি ছুঁয়েও দেখা উচিত নয়। দাম, বাজারে পাওয়া চারটি আলাদা রূপ আর সেগুলোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলার সাধারণ ভুলটাও আলোচনায় থাকবে।

এক নজরে

  • অর্জুন হলো Combretaceae গোত্রের ২০ থেকে ২৫ মিটার উঁচু পত্রঝরা বৃক্ষ, ব্যবহার্য অংশ প্রধানত কাণ্ডের ছাল।
  • রস কষায়, বীর্য শীতল, প্রধানত কফ ও পিত্ত শামক।
  • সামগ্রিক প্রমাণের মাত্রা সীমিত প্রমাণ। হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতায় ছোট ট্রায়ালে ইতিবাচক ফল, অ্যাঞ্জাইনায় অপর্যাপ্ত প্রমাণ।
  • ট্রায়ালে ব্যবহৃত মাত্রা ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিগ্রাম নির্যাস, দিনে এক থেকে তিন বার, ৪ থেকে ১২ সপ্তাহ।
  • মূল সক্রিয় যৌগ ওলিয়ানেন ট্রাইটারপেনয়েড, বিশেষ করে আর্জুনোলিক অ্যাসিড ও আর্জুনিক অ্যাসিড।
  • ধ্রুপদী প্রস্তুতি ক্ষীরপাক, অর্থাৎ দুধে ফোটানো কাথ্য।
  • রক্ত পাতলা করার ওষুধ চললে, গর্ভাবস্থায় ও স্তন্যদানে এড়িয়ে চলুন। অস্ত্রোপচারের দুই সপ্তাহ আগে বন্ধ।
  • এটি হৃদরোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়, সব ট্রায়ালেই এটি চলেছে নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি।

অর্জুন ছাল আসলে কী

অর্জুন ছাল হলো Terminalia arjuna (Roxb. ex DC.) Wight & Arn. নামের বৃক্ষের কাণ্ড থেকে সংগৃহীত পুরু বাকল, যা Combretaceae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং সংস্কৃতে অর্জুন, ককুভ বা নদীসর্জ নামে পরিচিত। একই গোত্রে হরীতকী ও বহেড়ার আত্মীয়েরাও পড়ে।

গুণের হিসেবটা মনে রাখা সহজ। ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টু অনুযায়ী অর্জুনের রস কষায়, গুণ লঘু ও রুক্ষ, বীর্য শীতল, বিপাক কটু, আর দোষের হিসেবে এটি কফ ও পিত্ত কমায়। মুখে দিলেই বোঝা যায় কেন, শুকনো ছাল চিবোলে জিভ আর তালু টেনে ধরে, ঠিক কাঁচা পেয়ারার মতো। সেই টান ধরার অনুভূতিই কষায় রসের চিহ্ন, আর তার পেছনে আছে ট্যানিন।

দোষের ভাষায় ব্যাখ্যাটা ত্রিদোষের কাঠামো না জানলে ধোঁয়াটে লাগতে পারে, তাই সহজ করে বললে, শাস্ত্র অর্জুনকে সেই দলে ফেলেছে যারা শরীরের বাড়তি তাপ ও আঠালো ভাব কমায় এবং কলাকে বেঁধে রাখে। বাত-প্রধান শুকনো ধাতের মানুষের ক্ষেত্রে এই একই শীতল ও রুক্ষ ধর্ম আবার অসুবিধার কারণ হতে পারে, সেই কথায় পরে আসছি।

একটা জিনিস গোড়াতেই পরিষ্কার করা দরকার। অর্জুন ছাল আর অর্জুনারিষ্ট এক জিনিস নয়। প্রথমটা কাঁচা ভেষজ, দ্বিতীয়টা গাঁজিয়ে তৈরি করা শাস্ত্রীয় যোগ, যাতে গুড় ও অন্য উপাদান মেশানো থাকে। দুটোর মাত্রা আলাদা, ব্যবহারও আলাদা।

অর্জুন ছাল কি সত্যিই হৃদযন্ত্রে কাজ করে?

মানুষের ওপর করা ছোট ছোট কয়েকটি ট্রায়ালে অর্জুন ছালের নির্যাস হৃদযন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা ও কোলেস্টেরলের মাত্রায় অনুকূল পরিবর্তন দেখিয়েছে, কিন্তু গবেষণাগুলো আকারে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি বলে সেগুলোকে প্রমাণিত ফল বলা যায় না। প্রশ্নটা যেহেতু হৃদয় নিয়ে, তাই সংখ্যাগুলো ধরে ধরে দেখা দরকার।

সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত গবেষণাটি International Journal of Cardiology-তে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে (Bharani, Ganguly ও Bhargava)। তীব্র ও ওষুধে সাড়া না দেওয়া হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতায় ভোগা ১২ জন রোগী, যাঁরা NYHA শ্রেণিবিন্যাসে চতুর্থ স্তরে ছিলেন, তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি আট ঘণ্টা অন্তর ৫০০ মিলিগ্রাম অর্জুন ছালের নির্যাস দেওয়া হয়। প্লাসিবোর তুলনায় বাঁ নিলয়ের রক্ত বার করার হার বা LVEF দাঁড়ায় ৩৫.৩৩ শতাংশ, প্লাসিবোতে যা ছিল ৩০.২৪ শতাংশ। মাত্র ১২ জন।

লিপিডের দিকটা এসেছে অন্য একটি গবেষণা থেকে। Journal of the Association of Physicians India-তে ২০০১ সালে প্রকাশিত Gupta ও সহকর্মীদের একটি এলোমেলোকৃত প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে করোনারি হৃদরোগে আক্রান্ত ১০৫ জন রোগীকে ৩৫ জন করে তিন দলে ভাগ করে ৩০ দিন ধরে দৈনিক ৫০০ মিলিগ্রাম অর্জুন ছালের গুঁড়ো দেওয়া হয়েছিল। মোট কোলেস্টেরল কমেছিল ৯.৭ শতাংশ, LDL কোলেস্টেরল ১৫.৮ শতাংশ, দুটিই পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ। ভিটামিন ই ও প্লাসিবো দলে লিপিডে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। খাদ্যাভ্যাস দিয়ে একই সূচকে কী করা যায়, সেটি আলাদা করে দেখা আছে কোলেস্টেরল কমানোর খাবারের আলোচনায়

সবচেয়ে সাম্প্রতিক ভালো মানের কাজটি ২০২২ সালের। Journal of Multidisciplinary Healthcare-এ প্রকাশিত Srivastava, Girandola ও Abedon-এর দ্বৈত-অন্ধ প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৭২ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে আট সপ্তাহ ধরে দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম অর্জুন ছালের একটি নির্দিষ্ট নির্যাস দেওয়া হয়। LVEF বেড়েছিল ৬.২৮ শতাংশ, প্লাসিবো দলে বৃদ্ধি ছিল ০.২৪ শতাংশ। যকৃৎ ও কিডনির সূচকে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ধরা পড়েনি, আর ওষুধজনিত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নথিভুক্ত হয়নি।

এবার উল্টো দিকটা, যেটা বাংলা ইন্টারনেটে প্রায় কেউ লেখে না। Cardiology Research and Practice জার্নালে ২০১৪ সালে প্রকাশিত Kaur ও সহকর্মীদের পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীল অ্যাঞ্জাইনার পাঁচটি গবেষণা, মোট ১৪৭ জন রোগী একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হয়। ব্যায়াম সহনশীলতার ক্ষেত্রে অর্জুন ও তুলনামূলক চিকিৎসার মধ্যে কোনো অর্থবহ পার্থক্য পাওয়া যায়নি। লেখকদের সিদ্ধান্ত অকপট, বর্তমানে অর্জুনের পক্ষে বা বিপক্ষে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ যথেষ্ট নয়।

ফলাফল প্রমাণের মাত্রা যা সত্যিই জানা আছে
হৃদযন্ত্রের পাম্প ক্ষমতা বা LVEF সীমিত প্রমাণ ১৯৯৫ ও ২০২২ সালের দুটি ছোট নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে বৃদ্ধি
মোট ও LDL কোলেস্টেরল সীমিত প্রমাণ ২০০১ সালের ট্রায়ালে ১০৫ জনে ৯.৭ ও ১৫.৮ শতাংশ হ্রাস
দীর্ঘস্থায়ী অ্যাঞ্জাইনা ও ব্যায়াম সহনশীলতা অপর্যাপ্ত প্রমাণ ২০১৪ সালের মেটা-বিশ্লেষণে অর্থবহ পার্থক্য নেই
উচ্চ রক্তচাপ অপর্যাপ্ত প্রমাণ ফল অসঙ্গত, বড় মানের ট্রায়াল নেই
হৃদরোগে ঐতিহ্যগত ব্যবহার ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার ধ্রুপদী গ্রন্থে নথিভুক্ত, কার্যকারিতার প্রমাণ নয়

এই টেবিলের নিচে দুটো শর্ত সবসময় খাটে। এক, উপরের সব ট্রায়ালেই অর্জুন দেওয়া হয়েছিল প্রচলিত হৃদরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি, তার বদলে নয়। দুই, WebMD-র ভেষজ মনোগ্রাফ এই ব্যবহারগুলোর জন্য সরাসরি লিখেছে, পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আমার নিজের পড়া থেকে মনে হয়েছে, সত্যিটা এই দুই প্রান্তের মাঝখানে কোথাও, বাংলা ব্লগের উচ্ছ্বাস আর WebMD-র নিরাসক্তি, দুটোর কোনোটাই গোটা ছবি নয়।

অর্জুনের ছালে আসলে কী কী আছে

অর্জুন ছালের প্রধান সক্রিয় যৌগগুলো হলো ওলিয়ানেন শ্রেণির ট্রাইটারপেনয়েড, আর ২০২৪ সালে Bioinformation জার্নালে প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী এগুলোই মূলত এর হৃদ্‌সুরক্ষামূলক প্রভাবের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়।

যৌগগুলোকে চারটি দলে ভাগ করলে ছবিটা পরিষ্কার হয়। ট্রাইটারপেনয়েডের মধ্যে আছে আর্জুনোলিক অ্যাসিড, আর্জুনিক অ্যাসিড, আর্জুনজেনিন ও টার্মিনিক অ্যাসিড। গ্লাইকোসাইডের মধ্যে আর্জুনেটিন ও আর্জুনোসাইড। ফ্ল্যাভোনয়েডের ঘরে আর্জুনোলোন, বাইক্যালিন ও লুটিওলিন। আর ট্যানিনের ঘরে পাইরোক্যাটেকল ও পিউনিক্যালাজিন, যেটির নামই এসেছে ডালিম থেকে।

এখানেই সেই ভুল তথ্যটা ধরা পড়ে। বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষার বহু জনপ্রিয় লেখায় দাবি করা হয় অর্জুন ছাল কো-এনজাইম কিউ-১০ সমৃদ্ধ, এবং সেই সূত্রেই নাকি এটি হার্ট অ্যাটাক ঠেকায়। ২০২৪ সালের ওই রাসায়নিক পর্যালোচনার তালিকায় কো-এনজাইম কিউ-১০-এর কোনো উল্লেখ নেই। দাবিটা কোথা থেকে ছড়াল বলা মুশকিল, তবে এক লেখা থেকে আরেক লেখায় টুকতে টুকতে জিনিসটা তথ্য হয়ে বসে গেছে।

কার্যপ্রণালীর দিক থেকে যা বোঝা গেছে তা মূলত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কাজ, কোষের অকালমৃত্যু কমানো, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ ও লিপিড প্রোফাইলে পরিবর্তন। ওই একই পর্যালোচনার লেখকরা শেষে যোগ করেছেন, অর্জুনের নিরাপত্তা-চিত্র, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও অন্য ওষুধের সঙ্গে বিক্রিয়া বুঝতে আরও বড় মাপের ক্লিনিকাল গবেষণা দরকার। ভেষজ পর্যালোচনায় এই ধরনের স্বীকারোক্তি বিরল।

শাস্ত্র কী বলেছে, ক্ষীরপাক থেকে চূর্ণ

ধ্রুপদী আয়ুর্বেদ সাহিত্যে অর্জুন ছাল প্রধানত হৃদ্‌রোগ, প্রমেহ ও ব্রণ বা ক্ষতের প্রসঙ্গে এসেছে, এবং হৃদয়ের সঙ্গে এর যোগসূত্র তুলনামূলকভাবে পরের যুগের সংযোজন। চরক ও সুশ্রুতের কালে অর্জুন পরিচিত ছিল, কিন্তু হৃদরোগের ভেষজ হিসেবে একে স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা দেন সপ্তম শতকের বাগভট।

বাগভটের বর্ণনায় যে প্রস্তুতিটি বারবার ফেরে তার নাম ক্ষীরপাক, অর্থাৎ দুধে ফোটানো কাথ্য। ছালের টুকরো দুধ ও জলের মিশ্রণে জ্বাল দিয়ে জলটুকু উবিয়ে ফেলা হয়, পড়ে থাকে ঘন দুধ। যুক্তিটা রন্ধনবিজ্ঞানের দিক থেকেও কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ ট্যানিন দুধের প্রোটিনের সঙ্গে জুড়ে যায়, ফলে কষা ভাব অনেকটা কমে আর পেটে সহনীয় হয়।

একাদশ শতকের চিকিৎসা-সংকলন চক্রদত্তে অর্জুনের আরও কয়েকটি রূপ পাওয়া যায়, ছালের চূর্ণ মধু বা ঘিয়ের সঙ্গে, আবার দুধের কাথ্য হিসেবেও। পরবর্তীকালের ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টু অর্জুনকে হৃদ্‌রোগের প্রধান ভেষজগুলোর তালিকায় রেখেছে। এই ধারাবাহিকতাটুকু ঐতিহাসিকভাবে সত্যি, সপ্তম শতকের বাগভট থেকে একাদশ শতকের চক্রদত্ত হয়ে ষোড়শ শতকের ভাবপ্রকাশ পর্যন্ত একই ভেষজ একই কারণে ঘুরেফিরে এসেছে, তবু ধ্রুপদী গ্রন্থে নাম থাকা আর কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়া এক জিনিস নয়।

শাস্ত্রীয় যুক্তিটা মজার। হৃদয়কে আয়ুর্বেদ ধরে রসবহ স্রোতের কেন্দ্র হিসেবে, আর অর্জুনের কষায় রস ও শীতল বীর্য সেই স্রোতের বাড়তি প্রবাহ ও তাপ কমায় বলে ভাবা হয়েছিল। একই কষায় ধর্মের কারণে ছাল ক্ষত শুকানোতেও ব্যবহার হত। যেমন ত্রিফলার তিনটি ফলই কষায়-প্রধান বলে সেগুলোর কাজেও সংগ্রাহী ভাব প্রবল, অর্জুনের বেলাতেও যুক্তির কাঠামোটা এক।

অর্জুন গাছ চেনার উপায় ও ছাল সংগ্রহের নিয়ম

অর্জুন চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চিহ্ন হলো তার কাণ্ড, মসৃণ, ফ্যাকাশে ধূসর-সাদা বাকল যা বড় বড় পাতের মতো খসে পড়ে এবং নিচে হালকা গোলাপি আভা রেখে যায়। ২০ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয় এই পত্রঝরা বৃক্ষ, গুঁড়ির গোড়ায় প্রায়ই ঠেস-মূল বা বাট্রেস তৈরি হয়।

ফুল ফোটে চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠের মধ্যে, ছোট ছোট ফ্যাকাশে হলুদ থোকা। ফল পাকে পৌষ থেকে ফাল্গুনে, আড়াই থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার লম্বা শক্ত আঁশালো ফল, গায়ে সমান পাঁচটি ডানা, আর এই পাঁচ-ডানার গড়নই অর্জুনকে অন্য টার্মিনালিয়া থেকে আলাদা করে চেনায়। গাছটি নদী ও খালের ধার ঘেঁষে জন্মাতে ভালোবাসে, সংস্কৃত নাম নদীসর্জ তাই অকারণে নয়।

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও মহারাষ্ট্রে এটি সাধারণ। বাংলাদেশে রাস্তার দুধারে এবং চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনাঞ্চলে বেশি চোখে পড়ে। কলকাতা ও ঢাকার পুরনো পাড়ায় বড় রাস্তার ছায়াগাছ হিসেবেও অর্জুন আছে, শুধু কেউ তাকিয়ে দেখে না।

সংগ্রহের প্রসঙ্গটা উপকারিতার তালিকায় সচরাচর ওঠে না। গাছের গা ঘিরে গোল করে ছাল তুলে নিলে রসপ্রবাহের পথ কেটে যায়। গাছ মারা পড়ে। এই কারণেই ঐতিহ্যগত নিয়মে ছাল তোলা হত খণ্ড খণ্ড করে, এক দিকের একটুকরো, কয়েক বছর পর অন্য দিকের, বর্ষার পরে যখন নতুন ছাল দ্রুত ফিরে আসে। বাজার থেকে কেনার সময় দেখবেন টুকরোগুলো ভেতরের দিকে হালকা গোলাপি-বাদামি কি না। বাইরের দিকটা ধূসর ও খসখসে, আর টুকরোগুলো পাতের মতো চ্যাপ্টা।

অর্জুন ছাল খাওয়ার নিয়ম কতটা, কখন?

অর্জুন ছালের মাত্রা নির্ভর করে আপনি কোন রূপটি নিচ্ছেন তার ওপর, কারণ কাঁচা ছালের গুঁড়ো আর ঘনীভূত নির্যাসের ওজন এক নয়। বাংলা ইন্টারনেটে "এক চা চামচ" বলে যে সাধারণ পরামর্শটি ঘোরে, সেটি কোনো গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রা নয়, এবং এক চা চামচ গুঁড়ো ওজনে ট্রায়ালের ৫০০ মিলিগ্রাম নির্যাসের চেয়ে অনেক গুণ বেশি।

রূপ গবেষণা বা শাস্ত্রে যেভাবে এসেছে সময় ও সূত্র
ছালের নির্যাস ৫০০ মিলিগ্রাম, দিনে তিন বার ২ সপ্তাহ থেকে ২৪ মাস, Bharani ১৯৯৫
ছালের গুঁড়ো দৈনিক ৫০০ মিলিগ্রাম ৩০ দিন, Gupta ২০০১
নির্দিষ্ট নির্যাস দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম ৮ সপ্তাহ, Srivastava ২০২২
ছালের গুঁড়ো, হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতায় দৈনিক ৪ গ্রাম পর্যালোচনায় উদ্ধৃত, Bioinformation ২০২৪
ক্ষীরপাক বা দুধে ফোটানো কাথ্য ধ্রুপদী প্রস্তুতি, নির্দিষ্ট আধুনিক মাত্রা যাচাই করা যায়নি বাগভট, চক্রদত্ত

শেষ সারিটিতে ইচ্ছে করেই কোনো সংখ্যা নেই। ক্ষীরপাকের একটি প্রামাণিক আধুনিক মাত্রা খুঁজতে গিয়ে আমি ভারতের সরকারি আয়ুর্বেদিক ফার্মাকোপিয়ার মূল নথিটি খুলতে পারিনি, আর বাণিজ্যিক ওয়েবসাইটে যে সংখ্যাগুলো ঘোরে সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে মেলে না। তাই এখানে কোনো সংখ্যা বসাইনি। যেটুকু নিশ্চিত, প্রস্তুতির পদ্ধতিটি হলো ছাল দুধ ও জলে জ্বাল দিয়ে জল উবিয়ে ফেলা।

ব্যবহারিক কয়েকটি কথা, ভেষজ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়ে গেলে যেগুলো কাজে লাগে।

  • গুঁড়ো করার আগে ছালের টুকরো রোদে ভালো করে শুকিয়ে নিন, ভেজা থাকলে দ্রুত ছাতা পড়ে এবং গন্ধ ভ্যাপসা হয়ে যায়।
  • জ্বাল দেওয়ার সময় তরল ফ্যাকাশে গোলাপি থেকে লালচে-বাদামি রঙ ধরে, আর রান্নাঘরে একটা মৃদু কষা-কাঠের গন্ধ ছড়ায়। রঙ ধরলেই বোঝা যায় ট্যানিন নেমেছে।
  • সকালে খালি পেটে নেওয়ার চল বেশি, তবে যাঁদের পেটে অম্লের ধাত আছে তাঁদের ক্ষেত্রে খাবারের পরে নেওয়াই সহনীয়।
  • একটানা তিন মাসের বেশি নয়। WebMD-র মনোগ্রাফে তিন মাস পর্যন্ত সম্ভবত নিরাপদ বলা হলেও সেখানেই চিকিৎসকের নজরদারির শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
  • ঋতুচর্যার হিসেবে শীতের শুষ্ক সময়ে কষায়-প্রধান ভেষজ বেশি হলে ত্বক ও অন্ত্র দুটোই আরও শুকিয়ে যেতে পারে, তাই ওই সময়ে মাত্রা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা যুক্তিসঙ্গত।

আপনি যদি ইতিমধ্যেই হৃদরোগ বা রক্তচাপের ওষুধ খান, তাহলে এই তালিকার একটিও নিজে থেকে শুরু করবেন না। এটি অনুরোধ নয়, নিচের অংশটি পড়লে কারণটা বুঝবেন।

ছাল, চূর্ণ না অরিষ্ট, কোনটা কীসের জন্য

অর্জুন বাজারে অন্তত চারটি চেহারায় পাওয়া যায়, এবং সেগুলোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলাটাই সবচেয়ে সাধারণ ভুল। কাঁচা ছাল, চূর্ণ, ক্ষীরপাক আর অরিষ্ট। প্রতিটির প্রস্তুতি ও ব্যবহারের ধরন আলাদা।

রূপ কী জিনিস কষা ভাব যে কারণে বেছে নেওয়া হয়
কাঁচা ছাল শুকনো বাকলের টুকরো তীব্র নিজে জ্বাল দিয়ে কাথ্য বানানোর জন্য
চূর্ণ মিহি গুঁড়ো তীব্র মাত্রা মাপা সহজ, দুধ বা জলে মেশে
ক্ষীরপাক দুধে ফোটানো কাথ্য মৃদু পেটে সহনীয়, ধ্রুপদী হৃদ্‌রোগের প্রস্তুতি
অরিষ্ট গাঁজানো তরল যোগ, গুড় মেশানো মৃদু, মিষ্টি দীর্ঘ সংরক্ষণ, শাস্ত্রীয় মিশ্র যোগ

অরিষ্টের ব্যাপারে দুটি কথা আলাদা করে জেনে রাখা ভালো। এতে গাঁজন প্রক্রিয়ার ফলে সামান্য অ্যালকোহল থাকে এবং গুড় থাকায় শর্করার পরিমাণও নগণ্য নয়, তাই ডায়াবেটিস থাকলে এটি কাঁচা ছালের সমতুল্য ধরে নেওয়া চলে না। মেদ ও লিপিড নিয়ে কাজ করে এমন অন্য ভেষজের সঙ্গে তুলনা করতে চাইলে গুগ্গুলের আলোচনাটি পাশে রেখে পড়লে পার্থক্যগুলো স্পষ্ট হয়।

দামের প্রসঙ্গটাও এখানেই সেরে নেওয়া যাক, কারণ প্রশ্নটা প্রায়ই ওঠে।

বাজার যা দেখা গেছে
বাংলাদেশ, খুচরা ২০০ গ্রাম গুঁড়ো প্রায় ৳৫০০
ভারত, পাইকারি তালিকা কেজিপ্রতি ₹২৫ থেকে ₹৭০

এখানে দেওয়া দাম শুধু তথ্যের জন্য, জুলাই ২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক পরিসর, বিক্রেতা ও সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে যাচাই করে নেবেন। কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা মানে আমরা সেটির প্রচার বা সুপারিশ করছি, তা নয়।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

অর্জুন ছালের যে ধর্মগুলোকে উপকার বলে ধরা হয়, ঠিক সেগুলোই কিছু পরিস্থিতিতে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন হৃদরোগের ওষুধ ইতিমধ্যেই চলছে। নিচের প্রতিটি বিন্দু আলাদা করে পড়ে নেওয়া দরকার।

  • রক্ত পাতলা করার বা অণুচক্রিকা-রোধী ওষুধ, যেমন ওয়ারফারিন, অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল চললে অর্জুন এড়িয়ে চলুন। Platelets জার্নালে প্রকাশিত ২০০৯ সালের একটি গবেষণায় (Malik, Dhawan, Bahl ও Kaul, ২০ জন করোনারি রোগী ও ২০ জন সুস্থ ব্যক্তি) অর্জুন ছালের নির্যাস অণুচক্রিকার জমাট বাঁধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছিল এবং CD62P প্রোটিনের প্রকাশ হ্রাস করেছিল। একসঙ্গে চললে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • অস্ত্রোপচারের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে অর্জুন বন্ধ করে দিন, একই রক্তক্ষরণজনিত কারণে। WebMD-র মনোগ্রাফে এই পরামর্শটি স্পষ্ট করে দেওয়া আছে।
  • গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় ব্যবহার করবেন না। WebMD-র ভেষজ মনোগ্রাফে বলা হয়েছে, এই দুই অবস্থায় অর্জুন নিরাপদ কি না তা জানার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্যই নেই, তাই এড়িয়ে যাওয়াই নিরাপদ পথ।
  • যকৃতে প্রক্রিয়াকৃত ওষুধ চললে সাবধান। Toxicology Reports জার্নালে প্রকাশিত ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় (Varghese, Savai, Pandita ও Gaud) মানুষের যকৃৎ-মাইক্রোজোমে অর্জুন ছালের অ্যালকোহলিক ও জলীয় নির্যাস CYP3A4, CYP2D6 ও CYP2C9 এই তিনটি এনজাইমকেই দমন করেছিল। লেখকদের সুপারিশ স্পষ্ট, এই এনজাইমগুলোর মাধ্যমে ভাঙা ওষুধের সঙ্গে অর্জুন একসঙ্গে দেওয়ার আগে সতর্কতা দরকার।
  • রক্তচাপ কম থাকলে বা রক্তচাপ কমানোর ওষুধ চললে যোগ-প্রভাবে চাপ বেশি নেমে যেতে পারে, তাই উচ্চ রক্তচাপে খাদ্য ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মতোই এটিও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়ার বিষয়।
  • বাত-প্রধান শুকনো ধাতে, অর্থাৎ যাঁদের ত্বক ও চুল রুক্ষ, গাঁটে কটকট শব্দ হয়, কষায় ও শীতল ভেষজ বেশি হলে শাস্ত্র অনুযায়ী বাত আরও বাড়তে পারে।
  • পেটের দিকের অস্বস্তিই সবচেয়ে বেশি নথিভুক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। Ayu জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের একটি ফার্মাকোভিজিল্যান্স গবেষণায় (Dwivedi, Chopra ও Bhandari) দিনে তিন বার ৫০০ মিলিগ্রাম মাত্রায় ৯ মাস থেকে প্রায় ৪ বছর ৯ মাস পর্যন্ত অর্জুন নেওয়া রোগীদের মধ্যে গ্যাস্ট্রাইটিস ধরা পড়ে ২ জনের এবং কোষ্ঠকাঠিন্য ১ জনের, এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নথিভুক্ত হয়নি এবং রক্ত, যকৃৎ ও কিডনির পরীক্ষায় শুরু ও শেষের মধ্যে অর্থবহ পার্থক্য পাওয়া যায়নি। কম মাত্রায় শুরু করাই যুক্তিসঙ্গত।
  • শিশুদের অর্জুন চূর্ণ নিজে থেকে দেবেন না, এবং কোনো বয়সেই এটিকে হৃদরোগের নির্ধারিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ভাববেন না।

একটা কথা জোর দিয়ে বলা দরকার, যেটি বাংলা লেখাগুলোয় প্রায় অনুপস্থিত। অনেক হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ভেষজ সম্পূরকের ব্যাপারে সতর্ক করেন, আর তাঁদের আপত্তিটা যুক্তিহীন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৩১ জুলাই ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত তথ্যপত্র অনুযায়ী ২০২২ সালে হৃদ্‌ ও রক্তনালীর রোগে মারা গেছেন আনুমানিক ১ কোটি ৯৮ লক্ষ মানুষ, যা পৃথিবীর মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ, আর তার ৮৫ শতাংশই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকজনিত। এই মৃত্যুর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে, অর্থাৎ আমাদের মতো জায়গায়। ওষুধ ছেড়ে ভেষজে ভরসা করলে হৃদযন্ত্রের অকার্যকারিতা বা করোনারি রোগে যে সময়টুকু নষ্ট হয়, সেটা ফিরে পাওয়া যায় না। উপরের যে গবেষণাগুলোর কথা বললাম, তার একটিতেও ওষুধ বন্ধ করা হয়নি।

বুকে ব্যথা, চাপ ধরা, শ্বাসকষ্ট, বাঁ হাতে বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা, ঘাম বা হঠাৎ ভীষণ ক্লান্তি, এসবের কোনোটি হলে সেটি ঘরোয়া ভেষজের প্রশ্নই নয়। সরাসরি জরুরি চিকিৎসা।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

অর্জুন নিয়ে পড়তে বসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর লেগেছিল হাতে-গোনা রোগীর সংখ্যাগুলো। যে ট্রায়ালটি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়, বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে যেটির উল্লেখ শতবার চোখে পড়েছে, তাতে রোগী ছিলেন বারো জন। বারো। অথচ যেভাবে দাবিটা ঘোরে, শুনে মনে হয় হাজার মানুষের ওপর পরীক্ষা হয়ে গেছে।

সংখ্যাটা ছোট বলে গবেষণাটা ভুল, তা নয়। ১৯৯৫ সালে ওই রোগীদের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে বড় দল জোগাড় করা কঠিন। কিন্তু বারো জনের ফল আর প্রমাণিত চিকিৎসা, এই দুটোর মাঝখানে যে বিরাট ফাঁকটা রয়ে গেছে, সেটা বাংলা ইন্টারনেটে কোথাও লেখা নেই, বরং প্রতিটি লেখায় সংখ্যাটা বাদ দিয়ে শুধু ফলাফলটুকু তুলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবিটা ক্রমশ আরও জোরালো শোনাতে শুরু করেছে। (আমি নিজেও প্রথমে সংখ্যাটা দুবার পড়েছিলাম, ভেবেছিলাম ভুল দেখছি।) গাছটা আমাদের রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে আছে, দাবিগুলো তার চেয়ে অনেক বেশি জোরে হাঁটছে।

উপসংহার

অর্জুন ছাল হৃদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্তত চোদ্দোশো বছর ধরে, বাগভটের ক্ষীরপাক থেকে চক্রদত্তের চূর্ণ হয়ে আজকের প্যাকেটবন্দি গুঁড়ো পর্যন্ত। আধুনিক প্রমাণ সেই ঐতিহ্যকে পুরোপুরি উড়িয়েও দেয়নি, আবার সমর্থনও করেনি। ছোট ট্রায়ালে LVEF আর কোলেস্টেরলে যে পরিবর্তন দেখা গেছে সেটি বাস্তব, আর ২০১৪ সালের মেটা-বিশ্লেষণের সিদ্ধান্তও সমান বাস্তব, নিশ্চিত কিছু বলার মতো প্রমাণ এখনো জমা হয়নি। সীমিত প্রমাণ মানে সম্ভাবনা, প্রতিশ্রুতি নয়।

তাই একটি নির্দিষ্ট সতর্কতা মাথায় রেখে এই লেখাটা শেষ করি। বাড়িতে যদি কেউ ইতিমধ্যেই হৃদরোগ বা রক্তচাপের ওষুধ খান, আর কেউ তাঁকে অর্জুন ছালের গুঁড়ো এনে দেন, তাহলে ওষুধের বাক্সটা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে একটাই প্রশ্ন করবেন, এর সঙ্গে রক্তপাতের ঝুঁকি আছে কি না। প্রশ্নটা ছোট, উত্তরটা জরুরি। আর যদি কেবল কৌতূহল থেকে গাছটা চিনে রাখতে চান, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পাড়ার বড় রাস্তায় খুঁজে দেখুন সেই মসৃণ ধূসর কাণ্ডটা, যার ছাল পাতের মতো খসে পড়ে। অন্য ভেষজগুলোর প্রমাণ-চিত্র দেখতে চাইলে ভেষজ বিভাগের পাতায় ঘুরে আসতে পারেন, আর মানসিক চাপ যে হৃদযন্ত্রেও ছাপ ফেলে সেই দিকটি নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে মানসিক চাপ কমানোর আলোচনায়

সূত্র / Sources

  • World Health Organization. Cardiovascular diseases (CVDs), fact sheet, ৩১ জুলাই ২০২৫, who.int
  • Kaur N, Shafiq N, Negi H, Pandey A, Reddy S, Kaur H, Chadha N, Malhotra S. Terminalia arjuna in Chronic Stable Angina, Systematic Review and Meta-Analysis. Cardiology Research and Practice, 2014, PMC3926224
  • Gupta R, Singhal S, Goyle A, Sharma VN. Antioxidant and hypocholesterolaemic effects of Terminalia arjuna tree-bark powder, a randomised placebo-controlled trial. Journal of the Association of Physicians India, 2001, 49:231-235, PMID 11225136
  • Bharani A, Ganguly A, Bhargava KD. Salutary effect of Terminalia Arjuna in patients with severe refractory heart failure. International Journal of Cardiology, 1995, 49(3):191-199, PMID 7649665
  • Srivastava S, Girandola RN, Abedon B. Effect of E-OJ-01 on Left Ventricular Ejection Fraction and Myocardial Oxygen Consumption, A Randomized, Double-Blind, Placebo-Controlled Study. Journal of Multidisciplinary Healthcare, 2022, PMC9637339
  • Malik N, Dhawan V, Bahl A, Kaul D. Inhibitory effects of Terminalia arjuna on platelet activation in vitro in healthy subjects and patients with coronary artery disease. Platelets, 2009, 20(3):183-190, PMID 19437336
  • Dwivedi S, Chopra D, Bhandari B. Role of Terminalia arjuna Wight and Arn. in the treatment of chronic coronary artery disease from pharmacovigilance point of view. Ayu, 2020, PMC7210819
  • Varghese A, Savai J, Pandita N, Gaud R. In vitro modulatory effects of Terminalia arjuna, arjunic acid, arjunetin and arjungenin on CYP3A4, CYP2D6 and CYP2C9 enzyme activity in human liver microsomes. Toxicology Reports, 2015, PMID 28962416
  • Rajaram S ও সহকর্মীরা. Terminalia arjuna, An overview of its magical properties. Bioinformation, 2024, PMC11993416
  • Terminalia arjuna, Uses, Side Effects, Interactions, Dosing. WebMD Vitamins and Supplements monograph, webmd.com

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

টানা তিন মাসের বেশি নয়, এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া নয়। WebMD-র ভেষজ মনোগ্রাফ অনুযায়ী অর্জুন মুখে খাওয়া তিন মাস পর্যন্ত সম্ভবত নিরাপদ, তবে সেখানেই স্পষ্ট করে বলা আছে যে চিকিৎসকের নজরদারি ছাড়া এটি নেওয়া উচিত নয়, কারণ হৃদযন্ত্রে এর প্রভাব তুচ্ছ নয়। যেসব ট্রায়ালে দীর্ঘ সময় ধরে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে রোগীরা হৃদরোগের নিয়মিত চিকিৎসার অধীনেই ছিলেন।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
সাদা ও কালো সরষে বীজ, বাঙালি রান্নাঘরের ফোড়ন ও আয়ুর্বেদের সর্ষপ, সরষে বীজের উপকারিতা ও ব্যবহারের পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

সরষে বীজের উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও তেলের আসল ঝুঁকি

সরষে বীজের উপকারিতা হজম, কাশি ও বাত-ব্যথায়, সাদা ও কালো সরষের পার্থক্য, খাওয়ার সঠিক নিয়ম, আর সরষের তেলের ইরুসিক অ্যাসিড ঝুঁকি নিয়ে বাংলায় সৎ গাইড।

২২ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
রাধুনি মশলার ছোট বাদামি বীজ, বাঙালি রান্নার পাঁচফোড়নে ব্যবহৃত অজমোদা বা Trachyspermum roxburghianum ভেষজের পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

রাধুনি মশলার উপকারিতা, আর জোয়ানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ভুল

রাধুনি মশলার উপকারিতা কী, রাধুনি আর জোয়ান বা সেলারি সিড কেন এক নয়, আয়ুর্বেদে অজমোদার পরিচয়, খাওয়ার মাত্রা আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার, প্রমাণভিত্তিক গাইড।

১৭ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
ভুঁই আমলা বা Phyllanthus niruri গাছের পাতার নিচে সারি সারি বীজ, লিভার ও জন্ডিসে ব্যবহৃত আয়ুর্বেদিক ভেষজ ভুঁই আমলার পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

ভুঁই আমলা কি সত্যিই লিভারের জন্য ভালো? উপকার, নিয়ম ও সতর্কতা

ভুঁই আমলা বা Phyllanthus niruri লিভার ও জন্ডিসে কতটা কাজ করে, গবেষণা কী বলে, খাওয়ার নিয়ম, আমলকীর সঙ্গে পার্থক্য আর কাদের এড়ানো উচিত, বাংলায় সৎ গাইড।

১৬ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ