আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ৩০ জুলাই, ২০২৬ 13 মিনিট পড়ুন

হিং এর উপকারিতা, এক চিমটির বিজ্ঞান ও ভেজাল চেনার উপায়

হিং এর উপকারিতা হজমে কতটা প্রমাণিত, দুটি প্লাসিবো ট্রায়াল কী পেয়েছে, রান্নায় কতটা দেবেন, খাঁটি হিং চেনার ঘরোয়া পরীক্ষা আর কাদের এড়িয়ে চলা দরকার।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

কাঠের বাটিতে হিং গুঁড়ো ও শক্ত হিং খাদার টুকরো, পাশে ঘিয়ের কড়াইয়ে জিরের ফোড়ন
সূচিপত্র11টি বিভাগ

ভারত প্রতি বছর প্রায় ১২০০ টন কাঁচা হিং আমদানি করে, যার দাম প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। CSIR-এর নিজের প্রকাশনায় লেখা আছে, এত ব্যবহার সত্ত্বেও দেশে হিং উৎপাদনই হত না, প্রথম চারা বসেছে ২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর, হিমাচলের লাহুল-স্পিতিতে প্রায় এগারো হাজার ফুট উঁচু ঠান্ডা মরুভূমিতে। যে জিনিসের জন্য এত টাকা আফগানিস্তান, ইরান আর উজবেকিস্তানে চলে যায়, বাঙালি রান্নাঘরে তার ব্যবহার কিন্তু চিমটির হিসাবে।

হিং হলো Ferula গোত্রের কয়েকটি গাছের মূল ও কাণ্ডের গোড়া চিরে বের করা আঠালো রস, রোদে শুকিয়ে যা শক্ত দলা বা গুঁড়োর চেহারা নেয়, সংস্কৃতে যার নাম হিঙু। আয়ুর্বেদ একে দীপন ও পাচন শ্রেণিতে রেখেছে, অর্থাৎ খিদে ও হজম বাড়ানো এবং আটকে থাকা বায়ু নিচের দিকে নামানোর কাজে। আধুনিক দিকে দুটি ছোট প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে হজমের উপসর্গ কমেছে, তবে দুটোই সেই পণ্যের নির্মাতার টাকায় হওয়া গবেষণা, তাই হজমের ক্ষেত্রে হিংয়ের তকমা সীমিত প্রমাণ, প্রমাণিত চিকিৎসা নয়।

এই লেখায় থাকবে হিং আসলে কোন জিনিস, কৌটোয় যেটা কেনেন সেটা কতটা হিং আর কতটা আটা, ভেজাল ধরার সরকারি ঘরোয়া পরীক্ষা, দুটি ট্রায়ালের সংখ্যা ধরে ধরে ফলাফল, শাস্ত্র হিংকে কোথায় বসিয়েছে, রান্নায় ও হিং জলে কতটা দেওয়া চলে, দাম কেমন, আর কাদের এটি ছোঁয়াও উচিত নয়।

এক নজরে

  • হিং একটি ওলিও-গাম-রেজিন, Ferula assa-foetida ও সংশ্লিষ্ট প্রজাতির মূল থেকে সংগ্রহ করা হয়। মশলা হিসেবে এটি আমেরিকার খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার GRAS তালিকাভুক্ত।
  • হজমের অস্বস্তি, পেট ভার, ফাঁপা ভাব ও চোঁয়া ঢেঁকুরে উপকারের পক্ষে প্রমাণ আছে দুটি ছোট প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালের, দুটোরই খরচ দিয়েছে পরীক্ষিত পণ্যের নির্মাতা সংস্থা, তাই তকমা সীমিত প্রমাণ।
  • খিদে বাড়ানো ও বায়ুনাশ ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার।
  • সুগার কমানো, ওজন কমানো ও ক্যানসার প্রতিরোধ নিয়ে যা প্রচারিত হয়, তার প্রমাণ অপর্যাপ্ত, বেশিরভাগই প্রাণী ও কোষ-স্তরের পরীক্ষা।
  • বাজারের বেশিরভাগ প্যাকেট আসলে কম্পাউন্ডেড হিং, যেখানে হিংয়ের সঙ্গে গাম ও ভোজ্য স্টার্চ বা আটা মেশানো থাকে, এবং সেটি লেবেলে লেখা থাকে।
  • গর্ভবতী, স্তন্যদানকারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধ-মাত্রার হিং এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। রক্ত পাতলা করার ওষুধ ও প্রেসারের ওষুধের সঙ্গে এর মধ্যম মাত্রার আন্তঃক্রিয়া নথিবদ্ধ।

হিং আসলে কী, গাছ থেকে কৌটো পর্যন্ত

হিং কোনো বীজ বা পাতা নয়, এটি গাছের ক্ষত থেকে বেরোনো রস শুকিয়ে তৈরি হওয়া রেজিন। গাছটি Apiaceae পরিবারের, অর্থাৎ ধনে, জিরে আর মৌরির আত্মীয়, উচ্চতায় দুই থেকে চার মিটার পর্যন্ত হয়, আর জন্মায় আফগানিস্তান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার শুকনো উঁচু জমিতে। গাজরের মতো মোটা মূলের গলার কাছে চিরে দিলে সেখান থেকে দুধের মতো রস গড়ায়, সেটাই রোদে শুকিয়ে দলা বাঁধে।

গন্ধটাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে। কাঁচা হিংয়ের গন্ধ শুঁকে অনেকে নাক কুঁচকান, কারণ ওতে সালফারযুক্ত যৌগ থাকে। Fitoterapia জার্নালে ২০১৩ সালে শোকুহিনিয়া ও সহকর্মীদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই ঝাঁঝালো দুর্গন্ধের জন্য দায়ী করা হয়েছে ভিনাইল ডাইসালফাইড জাতীয় যৌগকে, আর দেখানো হয়েছে যে ওই যৌগগুলো TRPA1 নামের রিসেপ্টরে কাজ করে, যে রিসেপ্টরটি ঝাঁঝ ও জ্বালার অনুভূতি বয়ে আনে। হিংয়ের সামগ্রিক রাসায়নিক পরিচয়ে আবার Iranian Journal of Pharmaceutical Research-এ ২০১৪ সালে ঘন্নাদি ও সহকর্মীদের কাজে প্রধান উপাদান বলা হয়েছে সেসকুইটারপিন কুমারিন ইথার ও সালফাইড শ্রেণির যৌগকে। গরম ঘিয়ে পড়লে এই তীব্র ভাবটা বদলে গিয়ে পেঁয়াজ-রসুনের মতো একটা মিষ্টি ঝাঁঝ তৈরি হয়, আর সেটাই নিরামিষ রান্নায় হিংয়ের আসল কাজ।

এই লেখাটা তৈরি করতে বসে প্রথমবার কয়েকটি হিংয়ের প্যাকেটের উপাদানের তালিকা মিলিয়ে দেখলাম, আর সেখানেই অস্বস্তিটা শুরু হলো। বহু প্যাকেটে হিংয়ের নামের পাশে ভোজ্য স্টার্চ বা আটার নামও থাকে, আর সেটাই আসলে নিয়ম-মাফিক প্রস্তুতি, লুকোনো ভেজাল নয়। ব্যাপারটা বুঝতে হলে পরের অংশটা দরকার।

খাঁটি হিং, বাঁধনী হিং আর ভেজাল, তফাতটা কোথায়?

কম্পাউন্ডেড হিং বা বাঁধনী হিং হলো এমন প্রস্তুতি যেখানে আসল হিংয়ের সঙ্গে গাম আর ভোজ্য স্টার্চ বা আটা মিশিয়ে তাকে ব্যবহারযোগ্য গুঁড়ো বা দলার চেহারা দেওয়া হয়। এটি লুকিয়ে করা কিছু নয়, লেবেলে ঘোষণা করতে হয়। FSSAI-র ঘরোয়া পরীক্ষার সরকারি তালিকা DART-এ পরিষ্কার লেখা আছে, আয়োডিন টিংচার দিলে নীল রং এলে স্টার্চের উপস্থিতি বোঝা যায়, তবে কম্পাউন্ড হিংয়ে স্টার্চ থাকে এবং তা লেবেলে ঘোষিত, তাই সেই পরীক্ষা কম্পাউন্ড হিংয়ের ক্ষেত্রে খাটে না।

তাহলে ভেজাল ধরার উপায় কী? DART দুটি সহজ পরীক্ষা দেয়। প্রথমটি পোড়ানোর পরীক্ষা, স্টেনলেস স্টিলের চামচে অল্প হিং পোড়ালে খাঁটি হিং কর্পূরের মতো জ্বলে, আর বাইরের রেজিন মেশানো থাকলে সেই উজ্জ্বল শিখা আসে না (কর্পূরের মতো জ্বলবে, এই তুলনাটা প্রথমে আমার অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল, কিন্তু কথাটা FSSAI-র নিজের নথিতেই লেখা)। দ্বিতীয়টি জলের পরীক্ষা, এক গ্রাম হিং গুঁড়ো কাচের পাত্রে নিয়ে এক চা চামচ জল দিয়ে ভালো করে ঝাঁকালে খাঁটি হলে দুধের মতো সাদা দ্রবণ হবে, নিচে তলানি জমবে না। সাবানপাথর বা মাটি মেশানো থাকলে সেটা তলায় বসে যায়।

একটা কথা বাংলা লেখায় প্রায় কেউ বলে না। গমের আটা দিয়ে বাঁধা হিং গ্লুটেন-মুক্ত নয়, তাই সিলিয়াক রোগ বা গ্লুটেন সংবেদনশীলতা থাকলে লেবেল দেখে চালের আটায় বাঁধা প্যাকেট বেছে নেওয়া দরকার।

ধরন আনুমানিক দাম
কম্পাউন্ডেড হিং গুঁড়ো, ৫০ গ্রাম (ভারত) ₹৬০ থেকে ₹২০০
খাঁটি হিং গুঁড়ো, ৫০ গ্রাম (ভারত) ₹৩৫০ থেকে ₹৫০০
কম্পাউন্ডেড গুঁড়ো, প্রতি কেজি (ভারত) ₹১,৫০০ থেকে ₹৬,০০০
কাঁচা হিং রেজিন, প্রতি কেজি (ভারত) ₹৬০,০০০ থেকে ₹৮০,০০০
৫০ গ্রাম হিং গুঁড়ো, একটি বাংলাদেশি অনলাইন দোকানে দেখা দাম ৳৩২৫

এখানে দেওয়া দাম শুধু তথ্যের জন্য, জুলাই ২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক পরিসর, বিক্রেতা ও সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে যাচাই করে নেবেন। কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা মানে আমরা সেটির প্রচার বা সুপারিশ করছি, তা নয়।

গবেষণা হিং নিয়ে ঠিক কী পেয়েছে

হজমের অস্বস্তি নিয়ে হিংয়ের উপর মানুষের উপর করা প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল দুটি, আর দুটোই ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া নিয়ে, অর্থাৎ যাকে বাংলায় আমরা বলি খাওয়ার পর পেট ভার হয়ে থাকা, অল্প খেয়েই ভরে যাওয়া, চোঁয়া ঢেঁকুর। প্রথমটি ২০১৮ সালে Evidence-Based Complementary and Alternative Medicine জার্নালে প্রকাশিত, মালা ও সহকর্মীদের কাজ, ৪৩ জন অংশগ্রহণকারী, মাত্রা ২৫০ মিগ্রা দিনে দুইবার, ৩০ দিন ধরে। ওই ট্রায়ালে হিং পাওয়া দলে গ্যাস্ট্রোইনটেসটাইনাল উপসর্গের স্কোর প্লাসিবোর তুলনায় ৫১.৬ শতাংশ কমেছিল, আর শেষে ৬৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী উপসর্গমুক্ত ছিলেন, কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নথিবদ্ধ হয়নি।

দ্বিতীয়টি অনেক নতুন, ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর Medicine (Baltimore) জার্নালে প্রকাশিত, ৬২ জনের উপর ১৪ দিনের ডাবল-ব্লাইন্ড প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, দৈনিক মাত্রা ২৫০ মিগ্রা। এখানে হিংয়ের দলে পেট ফাঁপা কমার কথা জানিয়েছেন ৮১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী, উপরপেটে ব্যথা কমেছে ৭৫ শতাংশের, আর চোঁয়া ঢেঁকুর বা হার্টবার্ন কমেছে ৭৯ শতাংশের ক্ষেত্রে। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ফার্মিকিউটস ও ব্যাক্টেরয়ডেটিস অনুপাত ৭১.৯ শতাংশ কমেছিল, প্লাসিবো দলে যা প্রায় অপরিবর্তিত থেকেছে।

সংখ্যাগুলো দেখতে ভালো, আর ঠিক এখানেই সতর্ক হওয়া দরকার। দুটি ট্রায়ালেই পরীক্ষা করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট পেটেন্ট প্রস্তুতি, যেখানে হিংকে মেথি থেকে পাওয়া আঁশে মুড়ে দেওয়া হয়, এবং দুটি গবেষণারই টাকা দিয়েছে সেই প্রস্তুতির নির্মাতা সংস্থা। মানে রান্নাঘরের কৌটোর হিং আর ওই ক্যাপসুল এক জিনিস নয়। অন্য একটি রোগে অবশ্য ছবিটা কিছুটা আলাদা। ২০২০ সালে Complementary Therapies in Medicine জার্নালে হরিলাক ও সহকর্মীদের ৩৩টি ট্রায়াল নিয়ে করা পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে হিং ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোমের সামগ্রিক উপসর্গ কমাতে কার্যকারিতা দেখিয়েছে, আর লেখকরা জানিয়েছেন যে পুদিনা তেল, অ্যালোভেরা ও হিং, এই তিনটি বাদে বাকি ভেষজগুলোর ইতিবাচক ট্রায়ালের কোনো পুনরাবৃত্তি হয়নি। অর্থাৎ পুনরাবৃত্তির হিসাবে হিং বরং সুবিধাজনক দিকেই আছে। তবে ওই পর্যালোচনা IBS নিয়ে আর উপরের দুটি ট্রায়াল ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া নিয়ে, দুটো আলাদা সমস্যা, তাই একটির ফল অন্যটিতে টেনে আনা চলে না। আধুনিক চিকিৎসকদের অনেকে নির্মাতার টাকায় হওয়া ছোট ট্রায়ালের ভিত্তিতে হিংকে ওষুধের তালিকায় তুলতে রাজি নন, এবং সেই সংশয়ের ভিত্তি আছে।

আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, এতগুলো শতাংশ যেখানে আছে সেখানে বিষয়টা প্রায় প্রমাণিত। ভুল ভেবেছিলাম। ৪৩ আর ৬২ জনের দুটি অধ্যয়ন, নির্মাতার অর্থে, ১৪ থেকে ৩০ দিনের, এর বেশি ওজন এই প্রমাণ বইতে পারে না।

শাস্ত্র হিংকে কোথায় বসিয়েছে

আয়ুর্বেদে হিঙু একটি দীপন-পাচন দ্রব্য, অর্থাৎ যে ভেষজ খিদে জাগায় ও হজম করায়, আর সঙ্গে বাতানুলোমন, মানে বাত বা বায়ুকে তার স্বাভাবিক নিচের দিকের পথে ফিরিয়ে দেয়। গুণে এটি তীক্ষ্ণ ও উষ্ণ, তাই বাত ও কফ কমায়, আর পিত্ত বাড়ায়। এই কারণেই শাস্ত্রীয় প্রয়োগে হিং এসেছে আধ্মান বা পেট ফুলে থাকা, অগ্নিমান্দ্য বা হজমের দুর্বলতা আর শূল বা পেটের কামড়ানো ব্যথার প্রসঙ্গে। এই সব ব্যবহারের তকমা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, কারণ শাস্ত্রীয় ব্যবহার মানে নথিবদ্ধ প্রাচীন প্রয়োগ, প্রমাণিত কার্যকারিতা নয়।

শাস্ত্রীয় যোগগুলোতেও হিংয়ের নাম আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হিংবষ্টক চূর্ণ, যেখানে হিংয়ের সঙ্গে কয়েকটি উষ্ণ মশলা ও সৈন্ধব লবণ মিশিয়ে বায়ু ও পেট ভার ভাবের জন্য ব্যবহার করা হয়। বাংলার হেঁশেলে অবশ্য এত জটিলতা লাগেনি। ভাত, ঘি আর এক চিমটি হিং, প্রবীণদের অনেকে এই মিলটাকেই পেট ভালো রাখার দাওয়াই বলতেন। আয়ুর্বেদের ভাষায় বললে, এটা অগ্নি বা পাচকশক্তি চাগানোর সবচেয়ে সরল ঘরোয়া চেষ্টা, আর হজম না হওয়া খাবার থেকে আম বা বিষাক্ত অবশেষ জমার আগেই তাকে থামানোর ভাবনা।

রান্নায় ও হিং জলে কতটা দেবেন, কখন?

হিংয়ের ঘরোয়া মাত্রা এক চিমটি, ওজনে আধ গ্রামের কম, এবং এটি প্রায় সব সময়ই গরম ঘি বা তেলে ফোড়ন হিসেবে যায়, সরাসরি কাঁচা অবস্থায় নয়। ফোড়নে হিং দেওয়ার সঠিক সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। তেল বা ঘি গরম হওয়ার পর জিরে ছেড়ে দিন, দানা ফুটতে শুরু করলে হিং দিন, দুই থেকে তিন সেকেন্ড, ব্যস। এক মুহূর্ত বেশি হলে গুঁড়ো কালচে হয়ে গিয়ে তরকারিতে তেতো ভাব চলে আসে, আর কম হলে সেই কাঁচা ঝাঁঝালো গন্ধটাই থেকে যায়। ছোলার ডাল, নিরামিষ আলুর দম, শুক্তো বা কচুর লতিতে এই তিন সেকেন্ডের হিসেবটাই স্বাদের পুরো চেহারা বদলে দেয়।

হিং জল নিয়ে বাংলা ইন্টারনেটে প্রচার প্রচুর, তার বেশিরভাগই বাড়িয়ে বলা। কুসুম গরম ২৫০ মিলি জলে এক চিমটি হিং গুলে খাওয়ার অভ্যাস ঘরোয়া টোটকা হিসেবে চলে, বিশেষত ভারী খাবারের পর পেট ভার লাগলে। ওজন কমা বা সুগার নিয়ন্ত্রণের যে দাবিগুলো এর সঙ্গে জোড়া হয়, সেগুলোর পিছনে মানুষের উপর করা গবেষণা নেই, তাই ওই দুই দাবিকে অপর্যাপ্ত প্রমাণ ধরে নেওয়াই সঠিক।

প্রয়োগ পরিমাণ কীভাবে
রান্নার ফোড়ন এক চিমটি, আধ গ্রামের কম গরম ঘি বা তেলে জিরের পরে, ২ থেকে ৩ সেকেন্ড
হিং জল এক চিমটি, ২৫০ মিলি কুসুম গরম জলে ভারী খাবারের পর, দিনে একবার
ডাল ও নিরামিষ তরকারি এক চিমটি, চার জনের রান্নায় ফোড়নে, পেঁয়াজ-রসুনের বদলে
ট্রায়ালে ব্যবহৃত মাত্রা ২৫০ মিগ্রা, দিনে ১ থেকে ২ বার ক্যাপসুল আকারে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়

কৌটোর হিং শক্ত পাথরের মতো জমে গেলে ফেলে দেওয়ার দরকার নেই, শুকনো কড়াইয়ে অল্প নেড়ে নিলে বা এক ফোঁটা ঘি মিশিয়ে গুঁড়ো করে নিলেই আবার ব্যবহারযোগ্য হয়। আর কৌটোটা বায়ুরোধী হওয়া দরকার, নয়তো ওই জেদি গন্ধ গোটা মশলার তাকে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি পাশের এলাচ বা দারুচিনির কৌটোতেও।

হিং বনাম জোয়ান বনাম মৌরি, কোনটা কখন

হিং, জোয়ান আর মৌরি তিনটিই বায়ুনাশক মশলা, তবে কাজের ধরন ও দোষের উপর প্রভাব আলাদা। গুলিয়ে ফেলা সহজ। নিচের তুলনাটা মাথায় থাকলে ঘরোয়া প্রয়োগে গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা কমে।

মশলা মূল ব্যবহার গুণ সাবধানতা
হিং পেট ভার, বায়ু, নিরামিষ রান্নার স্বাদ তীক্ষ্ণ, উষ্ণ, পিত্তবর্ধক গর্ভাবস্থা, শিশু ও রক্ত পাতলা করার ওষুধে নিষেধ
জোয়ান পেট ফাঁপা, বদহজম, কাশি উষ্ণ, দীপন অম্লের ধাত থাকলে বেশি নয়
মৌরি খাওয়ার পর হজম, শিশুর পেট ফাঁপা শীতল, পিত্তশামক সাধারণত সহনীয়, তবে পরিমিত

যাঁদের গ্যাস বা অম্ল নিয়েই মূল সমস্যা, তাঁদের জন্য আলাদা করে লেখা আছে পেটের গ্যাস কমানোর উপায় আর কোষ্ঠকাঠিন্যের আয়ুর্বেদিক দিক, আর মশলার হিসেব মেলাতে চাইলে রাধুনিজিরে জলের লেখা দুটোও কাজে লাগবে।

বাঙালি রান্নাঘরে হিং কীভাবে ঢুকল

হিং বাংলার নিজের ফসল নয়, এটি এসেছে বাণিজ্যপথ ধরে, আফগানিস্তান ও ইরানের শুকনো পাহাড় থেকে। বাংলা ভাষার নথিতে কাবুলিওয়ালাদের হাত ধরে হিং বিক্রির কথা আসে, আর খাদ্য-ইতিহাসের আলোচনায় বলা হয়, আলেকজান্ডারের বাহিনী হিন্দুকুশ থেকে এই আঠা সিন্ধু অঞ্চলে নিয়ে আসে, গ্রিক ও রোমানরা এটিকে সিলফিয়ামের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিল।

বাংলায় এর আসল জায়গা তৈরি হয়েছে নিরামিষ রান্নায়। কারণটা সোজা। যে হেঁশেলে পেঁয়াজ-রসুন ঢোকে না, সেখানে ঝাঁঝ আর গভীরতা আনার কাজটা হিংই করে, তাই হিঙের কচুরি, ছোলার ডাল, নিরামিষ মাংসের বিকল্প পদ, সবেতেই এক চিমটির উপস্থিতি। আপনার বাড়িতেও কি হিংয়ের কৌটোটা মশলার তাকের সবচেয়ে পিছনে পড়ে থাকে, বছরে দু-তিনবার মাত্র বেরোয়? বাংলার বহু হেঁশেলে তা-ই হয়, অথচ জিনিসটার আসল কাজ প্রতিদিনের ডালে।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

হিংয়ের নিরাপত্তার হিসাব দুটি ভাগে ভাগ করে দেখা দরকার, রান্নার চিমটি এক জিনিস আর ওষুধ-মাত্রার ক্যাপসুল আরেক জিনিস। মশলা হিসেবে হিং আমেরিকার খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার GRAS তালিকায় আছে, ২১ CFR ১৮২.২০ ধারায় Ferula assa-foetida L. ও সংশ্লিষ্ট প্রজাতির নাম করে। কিন্তু ওষুধ হিসেবে ব্যবহারে WebMD-র ভেষজ মনোগ্রাফে বেশ কিছু স্পষ্ট নিষেধ আছে। তালিকাটা ছোট নয়।

  • গর্ভাবস্থায় হিং মুখে খাওয়াকে অনিরাপদ বলা হয়েছে, কারণ এতে গর্ভপাতের আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ওষুধ-মাত্রার হিং বা হিং-ক্যাপসুল এই সময়ে চলবে না।
  • স্তন্যদানের সময়ও এটি অনিরাপদ ধরা হয়, কারণ হিংয়ের রাসায়নিক উপাদান বুকের দুধে গিয়ে শিশুর রক্তের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
  • শিশু ও নবজাতকের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ানো অনিরাপদ। Saudi Journal of Medicine and Medical Sciences-এ ২০২০ সালে প্রকাশিত আল-কাহতানি ও সহকর্মীদের কেস রিপোর্টে হিং সেবনের পর এক শিশুর গুরুতর মিথেমোগ্লোবিনেমিয়া হয়েছিল, নীলচে চামড়া ও তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি করতে হয়, চিকিৎসা করতে হয় উচ্চমাত্রার অক্সিজেনে। লেখকরা সোজাসুজি লিখেছেন, শিশুদের ঘরোয়া টোটকায় হিং ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত।
  • বাংলা প্যারেন্টিং সাইটে শিশুর পেট ব্যথায় নাভির চারপাশে হিং লেপার পরামর্শ প্রায়ই দেখা যায়। উপরের কেস রিপোর্টের পাশে রাখলে এই পরামর্শটি নির্বিচারে অনুসরণ করা ঠিক নয়, শিশুর পেট ব্যথা দীর্ঘ হলে শিশুরোগ চিকিৎসকই ভরসা।
  • রক্তক্ষরণের প্রবণতা বা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা থাকলে সতর্কতা দরকার, কারণ হিং রক্ত জমাট বাঁধা ধীর করতে পারে। ওয়ারফারিন, অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেলের মতো ওষুধের সঙ্গে এর মধ্যম মাত্রার আন্তঃক্রিয়া নথিবদ্ধ, একসঙ্গে চললে কালশিটে ও রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
  • প্রেসারের ওষুধ চললে খেয়াল রাখা দরকার, হিং রক্তচাপ কমাতে পারে, ফলে চাপ বেশি নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • অস্ত্রোপচারের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে ওষুধ-মাত্রার হিং বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
  • খিঁচুনি বা মৃগীর ইতিহাস থাকলে, এবং অন্ত্রের প্রদাহ বা সংক্রমণ চললে হিং এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।
  • বেশি মাত্রায় খেলে ঠোঁট ফুলে যাওয়া, ঢেঁকুর, গ্যাস, পাতলা পায়খানা ও মাথাব্যথা হতে পারে।
  • গমের আটায় বাঁধা হিং গ্লুটেন-মুক্ত নয়, সিলিয়াক রোগে লেবেল দেখে নেওয়া জরুরি।

উপসংহার

হিং সেই বিরল মশলাগুলোর একটা, যার ঐতিহ্যগত পরিচয় বিশাল আর আধুনিক প্রমাণ ছোট, হজমের ক্ষেত্রে দুটো প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল আর সাকুল্যে ১০৫ জন অংশগ্রহণকারী। হজমের অস্বস্তিতে সীমিত প্রমাণ আছে, বায়ুনাশে ঐতিহ্যগত ব্যবহার আছে, আর সুগার বা ওজনের দাবিতে কিছুই নেই।

আজ রাতে একটা কাজ করুন। মশলার তাক থেকে হিংয়ের কৌটোটা নামিয়ে উপাদানের তালিকাটা পড়ুন, দেখুন হিংয়ের আগে গমের আটা বা স্টার্চের নাম আছে কি না, আর ওজনে হিংয়ের শতকরা হিসাব লেখা আছে কি না। আগ্রহ থাকলে এক গ্রাম গুঁড়ো এক চামচ জলে ঝাঁকিয়ে DART-এর পরীক্ষাটাও করে ফেলতে পারেন, দুধের মতো সাদা দ্রবণ হচ্ছে কি না দেখুন। তারপর কাল দুপুরের ছোলার ডালে ঘিয়ে জিরে ফুটলে ঠিক তিন সেকেন্ডের জন্য এক চিমটি দিন, তার বেশি নয়।

সূত্র / Sources

  • Syam Das S, ও সহকর্মীরা (২০২৫). Ferula asafoetida oleo-gum resin alleviates dyspepsia symptoms through modulation of microbiome-gut-brain axis, Medicine (Baltimore), 104(40). PMC12499811
  • Mala KN, ও সহকর্মীরা (২০১৮). Safety and Efficacy of Ferula asafoetida in Functional Dyspepsia, Evidence-Based Complementary and Alternative Medicine. PMC6129344
  • Hawrelak JA, ও সহকর্মীরা (২০২০). Western herbal medicines in the treatment of irritable bowel syndrome, Complementary Therapies in Medicine, 48:102233. PMID 31987249
  • Al-Qahtani S, Abusham S, Alhelali I (২০২০). Severe Methemoglobinemia Secondary to Ferula asafoetida Ingestion in an Infant, Saudi Journal of Medicine and Medical Sciences, 8(1):56-59. PMID 31929780
  • Shokoohinia Y, ও সহকর্মীরা (২০১৩). Some like it pungent and vile. TRPA1 as a molecular target for the malodorous vinyl disulfides from asafoetida, Fitoterapia, 90:247-51. PMID 23954176
  • Ghannadi A, ও সহকর্মীরা (২০১৪). Anti-Viral Evaluation of Sesquiterpene Coumarins from Ferula assa-foetida against HSV-1, Iranian Journal of Pharmaceutical Research. PMC4157027
  • FSSAI, Detect Adulteration with Rapid Test (DART), হিংয়ের ঘরোয়া পরীক্ষা. eatrightindia.gov.in/dart
  • CSIR News, CSIR-IHBT introduces Asafoetida (Heeng) for Cultivation for the First Time in India. csirnews.niscpr.res.in
  • US FDA, 21 CFR 182.20, Essential oils, oleoresins and natural extractives (GRAS), asafetida entry. law.cornell.edu
  • WebMD, Asafoetida monograph, precautions ও drug interactions. webmd.com

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

রান্নায় এক চিমটি, অর্থাৎ আধ গ্রামের কম, সাধারণ ঘরোয়া মাত্রা এবং খাদ্য হিসেবে এটাই স্বাভাবিক ব্যবহার। যে দুটি ক্লিনিকাল ট্রায়ালে উপকার পাওয়া গেছে, সেখানে মাত্রা ছিল ২৫০ মিগ্রা, দিনে এক থেকে দুইবার, ক্যাপসুল আকারে। ওই ওষুধ-মাত্রা নিজে থেকে শুরু করার জিনিস নয়, কারণ হিং রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তচাপে প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
অর্জুন গাছের ছাল ও অর্জুন ছালের গুঁড়ো, পাশে দুধে ফোটানো ক্ষীরপাকের মাটির পাত্র
ভেষজ16 মিনিট

অর্জুন ছাল কি সত্যিই হার্টের বন্ধু, গবেষণা যা বলে ও যা বলে না

অর্জুন ছাল হৃদযন্ত্রে কতটা কাজ করে, ক্লিনিকাল ট্রায়াল কী বলে, খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, কোন ওষুধের সঙ্গে ঝুঁকি আছে, কাদের এড়িয়ে চলা দরকার, প্রমাণসহ আলোচনা।

২৯ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
সাদা ও কালো সরষে বীজ, বাঙালি রান্নাঘরের ফোড়ন ও আয়ুর্বেদের সর্ষপ, সরষে বীজের উপকারিতা ও ব্যবহারের পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

সরষে বীজের উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও তেলের আসল ঝুঁকি

সরষে বীজের উপকারিতা হজম, কাশি ও বাত-ব্যথায়, সাদা ও কালো সরষের পার্থক্য, খাওয়ার সঠিক নিয়ম, আর সরষের তেলের ইরুসিক অ্যাসিড ঝুঁকি নিয়ে বাংলায় সৎ গাইড।

২২ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
রাধুনি মশলার ছোট বাদামি বীজ, বাঙালি রান্নার পাঁচফোড়নে ব্যবহৃত অজমোদা বা Trachyspermum roxburghianum ভেষজের পরিচিতি
ভেষজ11 মিনিট

রাধুনি মশলার উপকারিতা, আর জোয়ানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ভুল

রাধুনি মশলার উপকারিতা কী, রাধুনি আর জোয়ান বা সেলারি সিড কেন এক নয়, আয়ুর্বেদে অজমোদার পরিচয়, খাওয়ার মাত্রা আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার, প্রমাণভিত্তিক গাইড।

১৭ জুলাই, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ