আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 25 মিনিট পড়ুন

থানকুনি পাতার উপকারিতা, ইউরোপ কেন শুধু ক্ষতে অনুমোদন দিল

থানকুনি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, ইউরোপ কেন শুধু ক্ষতে অনুমোদন দিল, স্মৃতি ও ফর্সা হওয়ার দাবি কোথায় ভাঙে, খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

বর্ষার ভেজা মাটিতে ছড়িয়ে থাকা গোল খাঁজকাটা থানকুনি পাতা ও পাশে বাটিতে থানকুনি পাতার রস, থানকুনি পাতার উপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
সূচিপত্র18টি বিভাগ

একটা গাছ, তিনটে নাম, আর তিনটে আলাদা জগৎ। রান্নাঘরে ওটা থানকুনি। বাংলা উইকিপিডিয়া আর বাজারের ভেষজ-দোকানে ওটাকে ব্রাহ্মীও বলা হয়, যদিও ব্রাহ্মী সম্পূর্ণ আলাদা একটা গাছ। আর চরক সংহিতা ওকে ডেকেছে মণ্ডুকপর্ণী বলে, ব্যাঙের থাবার মতো পাতা বলে। নামের এই গোলমালটাই আসলে থানকুনি নিয়ে লেখা স্বাস্থ্যতথ্যের অর্ধেক সমস্যার উৎস।

থানকুনি পাতার উপকারিতা নিয়ে সৎ উত্তরটা একটা লাইনেই ধরা যায়। থানকুনি হলো Centella asiatica, বর্ষায় বাংলার উঠোনের কোণে আর পুকুরপাড়ে আপনিই গজায় এমন একটি শাক-ভেষজ, আর তার যে ব্যবহারটির পিছনে সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ আছে সেটি খাওয়ার নয়, লাগানোর। ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থা EMA থানকুনির জন্য যে একটিমাত্র অনুমোদন দিয়েছে, সেটি ছোট ক্ষতে ত্বকের উপর প্রলেপ হিসেবে, সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের জন্য। স্মৃতি, রক্ত পরিষ্কার, লিভার সুরক্ষা, এই দাবিগুলোর একটিও ওই তালিকায় নেই।

বাংলা ইন্টারনেটে থানকুনি নিয়ে যা লেখা হয় তা প্রায় পুরোটাই উল্টো দিকের। কুড়িটা উপকারিতার তালিকা, রোজ খালি পেটে রস, শিশুদের পেটের অসুখে শিকড় বেটে খাওয়ানো। থানকুনি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা দুটোই এক জায়গায় রাখলে ছবিটা অন্যরকম দাঁড়ায়। এই লেখায় থাকবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথি কী বলছে, স্মৃতির দাবিটা কোথায় ভেঙেছে, যৌবন ধরে রাখা আর ফর্সা হওয়ার দাবি দুটো কোথায় আলাদা, পেটে কী পাওয়া গেছে, লিভারের প্রশ্নটা কেন উল্টো দিকে, আর কাদের এটি ছোঁয়া উচিত নয়।

থানকুনি পাতা আসলে কোন গাছ, নামের গোলমালটা কোথায়

থানকুনি পাতার বৈজ্ঞানিক নাম Centella asiatica (L.) Urb., আর গাছটি একটি ছোট বহুবর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ। নামটি অনুমানের নয়, ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার মনোগ্রাফে ভেষজ-দ্রব্যটির আনুষ্ঠানিক নাম এইভাবেই লেখা, আর সেখানে বলা আছে দ্রব্যটিকে ইউরোপীয় ফার্মাকোপিয়ার ১৪৯৮ নম্বর মান মেনে চলতে হবে (EMA/HMPC/489142/2020)। পুরোনো বিজ্ঞানসম্মত নাম Hydrocotyle asiatica

নামের বাকি হিসাবটাও সেরে রাখা যাক। থানকুনি গাছকে বাংলা উইকিপিডিয়া Mackinlayaceae গোত্রে রেখেছে, যেটিকে অনেকে Apiaceae অর্থাৎ ধনে-জিরের পরিবারের একটি উপগোত্র হিসেবেও ধরেন। থানকুনি পাতার ইংরেজি নাম Indian pennywort, আর আন্তর্জাতিক ভেষজ-বাজারে এটি বিক্রি হয় gotu kola নামে।

থানকুনি পাতার বৈশিষ্ট্য চিনে নেওয়া সহজ। পাতা গোল বা কিডনির আকৃতির, ধার খাঁজকাটা, বোঁটা লম্বা আর পাতার শিরাগুলো মাঝখান থেকে হাতের পাতার মতো ছড়ানো। গাছটি খাড়া হয় না, মাটি ঘেঁষে লতিয়ে ছড়ায়, আর গিঁট থেকে শিকড় নামায়। বাংলাদেশের নয়াকৃষি উদ্ভিদ-নথি অনুযায়ী এটি চাষ করতে হয় না, বর্ষায় উঠোনের কোণে, রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়ে আর ক্ষেতের আলে আপনিই গজায়। ফুল ছোট আর লালচে, চট করে চোখে পড়ে না।

বাংলায় নামের তালিকাটা লম্বা। আদামণি বা আদামনি, আদামালকি, আদাগুনগুনি, টেয়ামানিক, ঢোলামনি, অঞ্চলভেদে সবগুলোই একই গাছ। সমস্যা শুরু হয় একটি নামে, ব্রাহ্মী। বাংলা উইকিপিডিয়ার থানকুনি পাতাতেও প্রতিশব্দ হিসেবে ব্রাহ্মী লেখা আছে।

কিন্তু ব্রাহ্মী আলাদা গাছ। ব্রাহ্মী হলো Bacopa monnieri, ছোট মাংসল পাতা আর সাদা-বেগুনি ফুলের একটি জলজ উদ্ভিদ, যার সক্রিয় যৌগের নাম বাকোসাইড, আর যেটি বাংলার জলা জমিতে জন্মালেও থানকুনির মতো উঠোনের কোণে ছড়িয়ে পড়ে না, পাতার আকারও সম্পূর্ণ আলাদা। থানকুনির সক্রিয় যৌগগুলি সম্পূর্ণ আলাদা, পেন্টাসাইক্লিক ট্রাইটারপিন গোত্রের এশিয়াটিকোসাইড, ম্যাডেকাসোসাইড, এশিয়াটিক অ্যাসিড ও ম্যাডেকাসিক অ্যাসিড। কেন দুটো গুলিয়ে যায় তার বিস্তারিত ব্রাহ্মী শাকের লেখাটিতে আলাদা করে ধরা আছে, আর এখানে শুধু কাজের কথাটা বলি। যে গবেষণা ব্রাহ্মীর উপর হয়েছে, সেটির ফল থানকুনির নামে চালানো যায় না, উল্টোটাও নয়।

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, বাজারে "ব্রাহ্মী" লেখা প্যাকেটে কোন গাছের ছবি থাকে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গোল খাঁজকাটা পাতা, অর্থাৎ থানকুনি। বৈজ্ঞানিক নামটা প্যাকেটের পিছনে খুঁজে নেওয়া ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই।

চরক সংহিতা থানকুনিকে কোথায় বসিয়েছে

চরক সংহিতা মণ্ডুকপর্ণী অর্থাৎ থানকুনিকে চারটি মেধ্য রসায়নের প্রথমটি হিসেবে উল্লেখ করেছে, চিকিৎসাস্থানের রসায়ন অধ্যায়ের তৃতীয় পাদে, করপ্রচিতীয় রসায়ন প্রকরণে, ৩০ থেকে ৩১ সংখ্যক শ্লোকে। বাকি তিনটি হলো যষ্টিমধু চূর্ণ, গুড়ূচী স্বরস আর শঙ্খপুষ্পী কল্ক (Joshi ও সহলেখক, International Journal of Research in Ayurveda and Pharmacy, ২০২৫, DOI 10.7897/2277-4343.16261)।

এখানে একটা খুঁটিনাটি গুরুত্বপূর্ণ। মণ্ডুকপর্ণীর জন্য শাস্ত্রে নির্দিষ্ট করে যে রূপটি বলা হয়েছে সেটি স্বরস, অর্থাৎ পাতা বেটে ছেঁকে নেওয়া টাটকা রস। গুঁড়ো নয়, ক্বাথ নয়। বাংলা ঘরে থানকুনি পাতার রস খাওয়ার যে চলটা আছে, শাস্ত্রীয় দিক থেকে সেটি নির্ভুল, ভুলটা কেবল ভরসার পরিমাণে।

চরক সংহিতায় মণ্ডুকপর্ণীর দ্বিতীয় একটি ঠিকানাও আছে, আর সেটি কম আলোচিত। সূত্রস্থানের চতুর্থ অধ্যায়ে পঞ্চাশটি মহাকষায়ের তালিকা দেওয়া আছে, আর তার একেবারে শেষটি, পঞ্চাশতম শ্লোকে বর্ণিত বয়ঃস্থাপন মহাকষায়, অর্থাৎ বয়স ধরে রাখে বলে বিবেচিত দশটি দ্রব্যের দল। মণ্ডুকপর্ণী সেই দশজনের একজন, বাকিরা হলো অমৃতা, অভয়া, ধাত্রী, মুক্তা, শ্বেতা, জীবন্তী, অতিরসা, স্থিরা ও পুনর্নবা। পঞ্চাশটি দলের আর কোনোটিতে মণ্ডুকপর্ণীর নাম নেই।

দোষের হিসাবটা কী? ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টুর গুড়ূচ্যাদি বর্গে মণ্ডুকপর্ণীকে তিক্ত ও কষায় রস, লঘু গুণ আর মধুর বিপাকের দ্রব্য বলা হয়েছে, আর দোষের দিক থেকে ত্রিদোষশামক, বিশেষ করে কফ ও পিত্তে। একটি জায়গায় অবশ্য সংকলনগুলি একমত নয়। ভাবপ্রকাশের শ্লোকটিতে বীর্য উষ্ণ বলা আছে, অথচ পরবর্তী বহু নিঘণ্টু ও আধুনিক সংকলন একে শীতবীর্য হিসেবেই লেখে। যেটুকু সব জায়গায় এক, তা হলো মেধ্য ও ত্বগ্‌দোষনাশক পরিচয়।

প্রমাণের স্তর এখানে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার। এর মানে দুই হাজার বছরের নথিভুক্ত ব্যবহার আছে, কার্যকারিতার আধুনিক প্রমাণ আছে এমন নয়। শব্দ দুটি এক নয়, আর এই লেখার বাকি অংশটা মূলত সেই পার্থক্যের গল্প। মেধ্য রসায়নের বাকি সদস্যদের নিয়েও আলাদা লেখা আছে, যষ্টিমধু আর গুড়ূচী বা গিলয়, দুটিরই প্রমাণের ছবি আলাদা।

থানকুনি পাতা কি সত্যিই স্মৃতি বাড়ায়?

থানকুনি স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, মানুষের উপর করা র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়ালগুলিতে এই দাবির কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ দাবিটি এখনো প্রমাণিত নয়। ২০১৭ সালে Scientific Reports পত্রিকায় Puttarak ও সহলেখকদের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়, যেখানে ১১টি র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল একত্র করা হয়েছিল, পাঁচটি শুধু থানকুনির আর ছয়টি মিশ্র পণ্যের (DOI 10.1038/s41598-017-09823-9)।

ফলাফলটা স্পষ্ট। সামগ্রিক জ্ঞানীয় অবস্থা, মনোযোগ ও একাগ্রতা, নির্বাহী কার্যক্ষমতা, কার্যকরী স্মৃতি, তথ্য-প্রক্রিয়াকরণের গতি, ভাষা, মৌখিক স্মৃতি, স্থানিক দক্ষতা আর দৃশ্য-স্মৃতি, একটিতেও প্লাসিবোর তুলনায় পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ পার্থক্য মেলেনি।

তাহলে কিছুই কি পাওয়া যায়নি? পাওয়া গেছে, তবে অন্য জায়গায়। সতর্কতার স্কোর বেড়েছে (SMD ০.৭১, ৯৫% আস্থার পরিসর ০.০১ থেকে ১.৪১, p=০.০৪৬) আর এক ঘণ্টা পরে বিরক্তির স্কোর কমেছে (SMD −০.৮১, ৯৫% আস্থার পরিসর −১.৫১ থেকে −০.০৯, p=০.০২৬)। অর্থাৎ প্রভাবটা মেজাজের দিকে, মেধার দিকে নয়। প্রমাণের স্তর মেধা ও স্মৃতির ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত প্রমাণ, আর মেজাজের ক্ষেত্রে সীমিত প্রমাণ

পর্যালোচকদের নিজেদের ব্যাখ্যাটাও পড়ার মতো। ট্রায়ালগুলিতে মাত্রা ঘুরেছে দিনে ৪০ মিলিগ্রাম থেকে ১২,০০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত, আর মাত্র ২৭ শতাংশ গবেষণা জানিয়েছে তারা নির্যাস কীভাবে প্রমিত করেছে। এত অসম উপাদান দিয়ে একটা পরিষ্কার উত্তর বেরোনো কঠিন। তাঁদের নিজেদের ভাষায়, জ্ঞানীয় ক্ষমতা বাড়ানোর প্রভাব নিশ্চিত করার মতো জোরালো প্রমাণ এখনো নেই।

আমেরিকার Alzheimer's Drug Discovery Foundation-এর Cognitive Vitality পাতাটিও একই জায়গায় পৌঁছেছে, আর তাদের পাতাটি সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল। তারা আরও একটি গবেষণার কথা যোগ করেছে, ২০১৬ সালে স্ট্রোক-পরবর্তী জ্ঞানীয় দুর্বলতায় থানকুনি ফলিক অ্যাসিডের তুলনায় সামগ্রিক জ্ঞানীয় ক্ষমতায় কোনো উন্নতি আনেনি, কেবল বিলম্বিত স্মরণে সামান্য পার্থক্য দেখা গেছে।

ইউরোপ থানকুনিকে ঠিক কীসের জন্য অনুমোদন দিয়েছে

ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার ভেষজ কমিটি HMPC থানকুনির জন্য একটিমাত্র ব্যবহার অনুমোদন করেছে, ছোট ক্ষত সারাতে সাহায্য করা, আর সেটি ত্বকের উপর লাগানোর জন্য। নথিটির নম্বর EMA/HMPC/489142/2020, গৃহীত হয়েছে ২০২২ সালের ৩০ মার্চ।

মনোগ্রাফের গঠনটা নিজেই একটা তথ্য। নথিটিতে দুটি কলাম থাকে, একটি "well-established use" অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত কার্যকারিতা, আর একটি "traditional use" অর্থাৎ কেবল দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ভিত্তিতে স্বীকৃতি। থানকুনির নথিতে প্রথম কলামটি গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত ফাঁকা। প্রতিটি ঘর ভরা আছে কেবল দ্বিতীয় কলামে।

মনোগ্রাফ ঠিক কী বলছে আর বাংলা ইন্টারনেট কী বলছে, দুটো পাশাপাশি রাখলে ফারাকটা চোখে পড়ে।

বিষয় EMA মনোগ্রাফ ২০২২ যা বলছে বাংলা ইন্টারনেটে যা প্রচলিত
প্রয়োগের পথ কেবল ত্বকে, খাওয়ার অনুমোদন নেই রোজ খালি পেটে রস
ইঙ্গিত ছোট ক্ষত সারাতে সহায়তা স্মৃতি, লিভার, রক্ত, ঘুম, বাত
মাত্রা একবারে ০.৬ গ্রাম, দিনে তিনবার, মোট ১.৮ গ্রাম ১ থেকে ৪ চামচ রস, নির্দিষ্ট নয়
সময়সীমা এক সপ্তাহের বেশি নয় মাসের পর মাস
১৮ বছরের কম বয়স পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে সুপারিশ নয় শিশুদের পেটের অসুখে নিয়মিত
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদান নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত নয়, সুপারিশ নয় গর্ভাবস্থায় উপকারী বলে আলাদা লেখা
প্রতিনির্দেশ Apiaceae গোত্রের গাছে অ্যালার্জি থাকলে নয় উল্লেখ নেই

মনোগ্রাফের প্রস্তুতপ্রণালীটাও নির্দিষ্ট। শুকনো গুঁড়ো করা পাতা অল্প ফুটন্ত জলে ভিজিয়ে সেই উষ্ণ ক্বাথে কাপড় ভিজিয়ে ক্ষতের উপর বাঁধা, অথবা গুঁড়ো সরাসরি ক্ষতস্থানে ছড়িয়ে দেওয়া। আর একটি বাক্য নথিটির একেবারে শেষ দিকে আছে যা বাংলা বা ইংরেজি কোনো জনপ্রিয় লেখাতেই সচরাচর কেউ উদ্ধৃত করে না, জিনগত ক্ষতি ও ক্যান্সার-ঝুঁকি নিয়ে থানকুনির উপর পর্যাপ্ত পরীক্ষা আজও করা হয়নি।

বারো বছর কেন কোনো মনোগ্রাফ ছিল না

২০২২ সালের আগে থানকুনির কোনো ইউরোপীয় মনোগ্রাফ ছিল না, আর তার কারণটি এই ভেষজ নিয়ে সবচেয়ে জরুরি অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত তথ্য। ২০১০ সালের ২৫ নভেম্বর HMPC একটি জনবিবৃতি প্রকাশ করে (EMA/HMPC/579663/2009), যেখানে তারা ব্যাখ্যা করে কেন তারা কোনো মনোগ্রাফ প্রস্তাব করতে পারছে না।

ব্যাপারটা এই। ইউরোপে থানকুনি নিয়ে যে ওষুধগুলি ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলি বেলজিয়াম, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনে অনুমোদিত, আর সেগুলির ভিত্তি একটি নির্যাস যার বহু নাম, TECA, TTFCA, TTF, ETCA, CATTF, বাণিজ্যিক নামে Madecassol বা Centellase বা Blastoestimulina। সাহিত্যে যত ক্লিনিকাল গবেষণা আছে, প্রায় সবই এই জিনিসটা নিয়ে।

কিন্তু এই নির্যাসে এশিয়াটিকোসাইড থাকে প্রায় ৪০ শতাংশ আর এশিয়াটিক ও ম্যাডেকাসিক অ্যাসিড মিলে প্রায় ৬০ শতাংশ। HMPC-এর নিজের ভাষায়, বিশোধনের ধাপগুলি এতটাই চরম যে গাছের মূল কাঠামোটাই সরে যায়, আর উপাদানগুলির স্বাভাবিক অনুপাত আর থাকে না। তাদের সিদ্ধান্ত, TECA-কে ভেষজ প্রস্তুতি হিসেবেই গণ্য করা যায় না।

ফলাফলটা যুক্তির দিক থেকে অনিবার্য ছিল। নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার তথ্য থাকা সত্ত্বেও কমিটি লিখেছে, কোনো মনোগ্রাফ প্রস্তাব করা সম্ভব নয়, কারণ সব তথ্যই এমন একটি জিনিসের যেটি ভেষজ প্রস্তুতি নয়। আর প্রকৃত ভেষজ প্রস্তুতি নিয়ে যেটুকু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, সেটিকে তারা পর্যাপ্ত বা সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করেননি।

এই জায়গাটায় আমার নিজের অবস্থান স্পষ্ট। থানকুনি নিয়ে যে গবেষণাগুলির কথা বাংলা লেখায় ঘুরেফিরে আসে, সেগুলির বেশিরভাগ আসলে বাটিতে রাখা পাতার রস নিয়ে নয়, ল্যাবরেটরিতে বিশোধিত একটি রাসায়নিক ভগ্নাংশ নিয়ে। একটিকে অন্যটির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা, আর কমলালেবু খেয়ে ভিটামিন সি ইঞ্জেকশনের ফল দাবি করা, দুটো একই ভুল।

ক্ষত ও ত্বকে থানকুনি, প্রমাণ কতদূর গেছে

ক্ষত সারানো থানকুনির সবচেয়ে ভালো প্রমাণিত ব্যবহার, তবে প্রমাণের পরিমাণ এখনো ছোট। ২০২২ সালে International Journal of Environmental Research and Public Health পত্রিকায় প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় পুরো সাহিত্য ঘেঁটে মাত্র চারটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল যোগ্য বলে পাওয়া গেছে, মোট ৩৭৩ জন অংশগ্রহণকারী (Arribas-López ও সহলেখক, DOI 10.3390/ijerph19063266)।

ব্যবহৃত রূপগুলি ছিল মিশ্র। খাওয়ার ক্ষেত্রে দিনে ৩০০ মিলিগ্রাম এশিয়াটিকোসাইড, ৫০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুল দিনে তিনবার। ত্বকে লাগানোর ক্ষেত্রে ০.০৫ শতাংশ প্রমিত নির্যাস, ৩ শতাংশ ক্রিম, আর ০.২ ও ০.৪ শতাংশ এশিয়াটিকোসাইড।

উন্নতি দেখা গেছে ক্ষত সংকোচন ও গ্র্যানুলেশনে, রক্তপাত ও নিরাময়ের সময়ে, নতুন চামড়া গঠনের গতিতে, ব্যথার স্কোরে আর ত্বকের লালচেভাবে। লেখকদের ব্যাখ্যা, সম্ভবত রক্তনালি গঠন ও প্রদাহ কমার মধ্য দিয়ে কাজটা হয়। তাঁদের নিজেদের স্বীকারোক্তিও আছে, মাত্র চারটি গবেষণা আর তাদের ফলাফল এতটাই অসম যে মেটা-বিশ্লেষণ করাই যায়নি। প্রমাণের স্তর সীমিত প্রমাণ

ব্রণের ক্ষেত্রে ছবিটা একটু ভালো। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ১০টি গবেষণা, সাতটি র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়াল ও তিনটি পর্যবেক্ষণমূলক, মোট ৮৭৫ জন অংশগ্রহণকারী নিয়ে দেখা গেছে ব্রণের সংখ্যায় গড় পার্থক্য −০.৫৪ (৯৫% আস্থার পরিসর −০.৬৭ থেকে −০.৪১) (Utami ও সহলেখক, Biomedical Journal of Scientific and Technical Research, ২০২৪)। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু, ত্বকে জ্বালা ও লালচেভাব। এখানেও আমি স্তরটা সীমিত প্রমাণ রাখছি, কারণ গবেষণাগুলির মধ্যে বৈষম্য মাঝারি, নমুনা ছোট, আর পত্রিকাটি শীর্ষসারির নয়। ব্রণ নিয়ে ঘরোয়া উপায়ের লেখাটিতে বাকি বিকল্পগুলির সঙ্গে এটিকে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

চুল পড়া কমানোর দাবিটা নিয়ে আলাদা করে বলা দরকার। প্রথম আলোর রূপচর্চার লেখাটি সহ একাধিক জায়গায় থানকুনিকে চুল পড়ার সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে, অথচ মানুষের উপর করা কোনো ট্রায়াল আমি পাইনি। এখানে প্রমাণের স্তর অপর্যাপ্ত প্রমাণ, আর ত্বকের যত্নের মতো বিষয়ে এটিকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখাই সৎ।

যৌবন ধরে রাখতে থানকুনি পাতা কতটা কাজে লাগে

থানকুনির বার্ধক্য-বিরোধী দাবির পিছনে সত্যিকারের মানব-গবেষণা আছে, কিন্তু সেগুলি প্রায় সবই ত্বকে লাগানোর, খাওয়ার নয়। ২০২৫ সালে Pharmacia পত্রিকায় Handayani ও সহলেখকদের একটি পর্যালোচনা থানকুনির চর্মরোগ ও প্রসাধনী-সংক্রান্ত ক্লিনিকাল গবেষণাগুলি এক টেবিলে সাজিয়েছে, আর সেই টেবিলের প্রতিটি বার্ধক্য-বিরোধী গবেষণাই প্রলেপের (DOI 10.3897/pharmacia.72.e167217)।

সংখ্যাগুলো দেখা যাক। ১০৪ জন পেরি ও পোস্ট-মেনোপজ নারীর একটি ওপেন-লেবেল ট্রায়ালে প্রতিদিন এশিয়াটিকোসাইড-ভিত্তিক সিরাম ব্যবহারে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ২২ শতাংশ আর আর্দ্রতা ১৮ শতাংশ বেড়েছে (Korkina ও সহলেখক, ২০২৪)। ৬০ জনের একটি ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালে ৩ শতাংশ থানকুনি ইমালশন ব্যবহারে বলিরেখার গভীরতা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কমেছে, ত্বক আঁটসাঁট হয়েছে, আর কোনো জ্বালা দেখা যায়নি (Poomanee ও সহলেখক, ২০২৩)। ক্ষতচিহ্নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় গবেষণাটি ২৮০ জন অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীর, যেখানে দিনে দুবার ১ শতাংশ থানকুনি ক্রিম লাগানোয় Vancouver Scar Scale স্কোর ২.১ পয়েন্ট কমেছে, আর তুলনামূলক দলে কমেছে ০.৮ পয়েন্ট (Balevi ও Balevi, ২০২৩, p < ০.০১)।

কাজটা কীভাবে হয় তারও একটা ব্যাখ্যা আছে। ম্যাডেকাসোসাইড ও এশিয়াটিকোসাইড ত্বকের ফাইব্রোব্লাস্ট কোষকে উস্কে কোলাজেন তৈরি বাড়ায়, আর MMP-1 ও MMP-9 নামের যে এনজাইমগুলি কোলাজেন ভাঙে সেগুলিকে চেপে রাখে। এটুকুই যথেষ্ট।

মজার ব্যাপার হলো, শাস্ত্র এই জায়গাটায় আধুনিক গবেষণার আগেই পৌঁছেছিল। উপরে যেমন লিখেছি, চরক সংহিতা মণ্ডুকপর্ণীকে বয়ঃস্থাপন মহাকষায়ে রেখেছে, অর্থাৎ বয়স ধরে রাখার দলে, আর সেটি করেছে দুই হাজার বছর আগে। তবে শাস্ত্র সেখানে দলটির নাম দিয়েছে, মাত্রা বা প্রয়োগের পথ নয়। দুটোকে এক করে ফেলার দরকার নেই।

তাহলে থানকুনি খেলে কি যৌবন ধরে থাকে? এখানে সৎ উত্তরটা হলো, খাওয়ার পক্ষে প্রমাণ অনেক পাতলা। মুখে খাওয়া নির্যাস নিয়ে সাম্প্রতিক ট্রায়াল শুরু হয়েছে বটে, তবে প্রকাশিত পর্যালোচনায় যে বার্ধক্য-বিরোধী গবেষণাগুলি জায়গা পেয়েছে সেগুলির সবকটিই ক্রিম, সিরাম বা ইমালশন নিয়ে। ত্বকে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রমাণের স্তর সীমিত প্রমাণ, আর খেয়ে যৌবন ধরে রাখার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত প্রমাণআমলকীর মতো রসায়ন ভেষজের ক্ষেত্রেও ছবিটা প্রায় একই, দাবি বড়, মানব-প্রমাণ ছোট।

থানকুনি পাতা খেলে কি ফর্সা হয়?

না, থানকুনি পাতা খেলে গায়ের রং ফরসা হয়, এমন কোনো মানব-গবেষণা নেই। এই দাবিটি বাংলা ইন্টারনেটে যতটা ঘোরে, প্রমাণের জগতে তার ভিত্তি ততটাই পাতলা, আর যেটুকু আছে তা পুরোপুরি পরীক্ষাগারের।

গবেষণাটা ঠিক কোথায় আটকে আছে সেটা বোঝা দরকার। থানকুনির নির্যাস টাইরোসিনেজ নামের এনজাইমকে বাধা দেয়, আর এই এনজাইমটিই ত্বকে মেলানিন তৈরির ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে। Handayani ও সহলেখকদের ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় এই কাজটি করে বলে চিহ্নিত হয়েছে গাছের ডাই-ও-ক্যাফিওয়েলকুইনিক অ্যাসিড নামের যৌগগুলি। কিন্তু জায়গাটা লক্ষ্য করুন।

কথাটা ওই পর্যালোচনার কার্যপ্রণালীর টেবিলে আছে, ক্লিনিকাল গবেষণার টেবিলে নেই। ওই দ্বিতীয় টেবিলটিতে ক্ষত, ক্ষতচিহ্ন, বলিরেখা, আর্দ্রতা ও অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস নিয়ে মানুষের গবেষণা সাজানো আছে, অথচ ত্বক ফরসা হওয়া নিয়ে একটি এন্ট্রিও নেই। অর্থাৎ প্রমাণটা কোষ ও এনজাইমের স্তরে থেমে আছে, মানুষের ত্বকে পৌঁছয়নি।

দুটো আলাদা জিনিস গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে এখানে। ব্রণের পরে থেকে যাওয়া কালচে দাগ হালকা হওয়া এক ব্যাপার, আর গায়ের স্বাভাবিক রং বদলে যাওয়া অন্য ব্যাপার। প্রথমটির পক্ষে অল্প কিছু প্রমাণ আছে, দ্বিতীয়টির পক্ষে কিছুই নেই, আর কোনো খাবার বা পাতার রস মানুষের ত্বকের জিনগতভাবে নির্ধারিত রং পাল্টাতে পারে এমন প্রমাণ আজ পর্যন্ত কোথাও নথিভুক্ত হয়নি। প্রমাণের স্তর অপর্যাপ্ত প্রমাণ। দাগ ও পিগমেন্টেশনের প্রশ্নটা আলাদা, সেটি নিয়ে বিস্তারিত আছে মুখের দাগ ও পিগমেন্টেশনের লেখাটিতে

পায়ের শিরা ও রক্তসঞ্চালনে কী পাওয়া গেছে

রক্ত পরিষ্কার করার যে দাবিটি বাংলা লেখায় প্রায় সর্বত্র আছে, তার সবচেয়ে কাছাকাছি প্রকৃত গবেষণাটি রক্ত নিয়ে নয়, শিরা নিয়ে। ২০১৩ সালে Chong ও Aziz একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দীর্ঘমেয়াদি শিরার দুর্বলতা বা chronic venous insufficiency নিয়ে আটটি র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়াল ও ৪৮২ জন রোগীর তথ্য একত্র করেন (Evidence-Based Complementary and Alternative Medicine, DOI 10.1155/2013/627182)।

মাত্রা ছিল দিনে ৩০ থেকে ১২০ মিলিগ্রাম TTFCA, সময়কাল ২৮ থেকে ৬০ দিন। ত্বকের নিচে অক্সিজেনের চাপ গড়ে ৬.৬৩ মিলিমিটার পারদ বেড়েছে, কার্বন ডাই অক্সাইডের চাপ ৭.৫০ কমেছে, গোড়ালি ফোলার হার কমেছে, আর শিরা-ধমনির প্রতিক্রিয়া উন্নত হয়েছে। পায়ের ভারী ভাব, ব্যথা ও ফোলা কমার কথা তিনটি গবেষণায় লেখা আছে, তবে সংখ্যা ছাড়া।

তবু লেখকরা নিজেরাই সাবধান করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী ফলাফলটি সতর্কভাবে পড়া দরকার, কারণ গবেষণাগুলির রিপোর্টিং অপর্যাপ্ত আর পক্ষপাতের ঝুঁকি অস্পষ্ট, আর যেসব সূক্ষ্ম রক্তসঞ্চালন-মাপকাঠির উন্নতি দেখা গেছে সেগুলির স্বাভাবিক মান নির্ধারিত না থাকায় পরিসংখ্যানগত পার্থক্য মানেই চিকিৎসাগত পার্থক্য নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এখানেও যা পরীক্ষা হয়েছে তা সেই বিশোধিত TTFCA, বাটির রস নয়। প্রমাণের স্তর সীমিত প্রমাণ, আর সেটিও কেবল নির্যাসের জন্য।

পেটের সমস্যায় থানকুনি পাতা কতটা কাজ করে

পেটের সমস্যায় থানকুনি পাতা বাংলার সবচেয়ে পুরোনো ও সবচেয়ে প্রচলিত প্রয়োগ, কিন্তু আধুনিক প্রমাণ এখানে প্রায় শূন্য। আয়ুর্বেদে মণ্ডুকপর্ণীর প্রধান ব্যবহারই আমাশয় ও অন্ত্রের গোলমালে, আর নয়াকৃষি উদ্ভিদ-নথিতেও পেটের অসুখে শিকড় বেটে খাওয়ানোর প্রয়োগ লিপিবদ্ধ আছে। প্রমাণের স্তর এখানে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার

আধুনিক দিকটা কেমন? একটিমাত্র সাম্প্রতিক ক্লিনিকাল গবেষণা আছে, আর সেটির নকশাই বলে দেয় কেন এটিকে প্রমাণ বলা যায় না। ২০২৫ সালে JGH Open পত্রিকায় প্রকাশিত একটি একবাহু ওপেন-লেবেল গবেষণায় মৃদু আলসারেটিভ কোলাইটিসে ভোগা ১০ জন রোগীকে ১২ সপ্তাহ ধরে দিনে ৫০০ মিলিগ্রাম থানকুনি নির্যাস দেওয়া হয়েছিল (Guo ও সহলেখক, DOI 10.1002/jgh3.70258)।

সমস্যাটা ফলাফলে নয়, শুরুতে। গবেষণা শুরুর আগেই ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের রোগ-সক্রিয়তার স্কোর ছিল শূন্য, অর্থাৎ তাঁরা আগে থেকেই উপশমে ছিলেন, ফলে উন্নতি দেখানোর মতো জায়গাই বাকি ছিল না। শেষ পর্যন্ত একজনের স্কোর ১ থেকে ০ হয়েছে, আটজনের ০-তেই থেকে গেছে, একজন তৃতীয় সপ্তাহে রোগ বেড়ে যাওয়ায় বেরিয়ে গেছেন। প্রদাহের রক্ত-সূচক CRP, LRG বা ESR-তে অর্থবহ কোনো পরিবর্তন হয়নি। লেখকরা নিজেরাই উপসংহারে লিখেছেন, গবেষণাটি নিরাপত্তার কথা বলে, কার্যকারিতার নয়, আর তার জন্য বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, পেটের গোলমালে থানকুনির পক্ষে যা আছে তা হাজার বছরের ব্যবহার, ক্লিনিকাল প্রমাণ নয়। এটা দাবিটাকে মিথ্যা প্রমাণ করে না, শুধু জানায় কেউ এখনো ঠিকভাবে পরীক্ষা করেনি। পেটের গ্যাস ও অস্বস্তির ঘরোয়া উপায়গুলির অনেকের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

এক নজরে, কোন দাবির পিছনে কতটা প্রমাণ

গোটা লেখাটির হিসাব এক জায়গায় রাখা যাক। কোন দাবির পিছনে কী আছে আর কোন রূপে, নিচের টেবিলটি সেটাই ধরে। প্রতিটি সারির সংখ্যা ও উৎস উপরের সংশ্লিষ্ট অংশে নাম ধরে দেওয়া আছে, আর পুরো তালিকা রয়েছে লেখার শেষে সূত্র অংশে।

দাবি প্রমাণের স্তর কোন রূপে পরীক্ষা হয়েছে
ছোট ক্ষত সারাতে সহায়তা সীমিত প্রমাণ, সঙ্গে ঐতিহ্যগত ব্যবহার ত্বকে প্রলেপ, ৪টি ট্রায়াল, ৩৭৩ জন
ক্ষতচিহ্ন হালকা করা সীমিত প্রমাণ ১ শতাংশ ক্রিম, ২৮০ জনের ট্রায়াল
ব্রণ কমানো সীমিত প্রমাণ ক্রিম ও জেল, ১০টি গবেষণা, ৮৭৫ জন
বলিরেখা ও ত্বকের টান, যৌবন ধরে রাখা সীমিত প্রমাণ সিরাম ও ইমালশন, ত্বকে লাগিয়ে
খেয়ে যৌবন ধরে রাখা অপর্যাপ্ত প্রমাণ প্রকাশিত পর্যালোচনায় সবই প্রলেপের
পায়ের শিরার দুর্বলতা সীমিত প্রমাণ বিশোধিত TTFCA নির্যাস, ৮টি ট্রায়াল
মেজাজ ও সতর্কতা সীমিত প্রমাণ মুখে, প্রভাব সাময়িক
স্মৃতি ও মেধা অপর্যাপ্ত প্রমাণ ১১টি ট্রায়ালে প্লাসিবোর সমান
আমাশয় ও পেটের গোলমাল ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার একমাত্র ট্রায়ালে ১০ জন, ৮ জন আগেই সুস্থ
খেয়ে ফরসা হওয়া অপর্যাপ্ত প্রমাণ কেবল টেস্ট টিউব ও কোষ-গবেষণা
রক্ত বিশুদ্ধ করা অপর্যাপ্ত প্রমাণ মাপার মতো কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠিই নেই
লিভার সুরক্ষা অপর্যাপ্ত প্রমাণ উল্টে লিভার-ক্ষতির নথি আছে
চুল পড়া কমানো অপর্যাপ্ত প্রমাণ মানুষের ট্রায়াল নেই

রক্ত বিশুদ্ধ করার ঘরটিতে একটু থামা দরকার। কারণটা সহজ। রক্ত পরিষ্কার হওয়া বলতে আধুনিক চিকিৎসায় রক্তে মাপা যায় এমন কোনো নির্দিষ্ট সূচক নেই, তাই দাবিটা সত্যি না মিথ্যা সেই প্রশ্নেরই কোনো পরীক্ষাগত উত্তর হয় না, প্রমাণও করা যায় না, খণ্ডনও নয়। ঐতিহ্যে কথাটার একটা অর্থ আছে, পরীক্ষাগারে নেই।

থানকুনি পাতা খাওয়ার নিয়ম, কিভাবে খেতে হয় আর কতটা

থানকুনি পাতা খাওয়ার কোনো ক্লিনিকালি নির্ধারিত মাত্রা নেই, যা আছে তা নথিভুক্ত লোকজ প্রথা। বাংলাদেশের নয়াকৃষি আন্দোলনের উদ্ভিদ-নথিতে থানকুনির যে প্রয়োগগুলি লিপিবদ্ধ আছে সেগুলি বেশ নির্দিষ্ট।

জ্বরে ১ টেবিল চামচ থানকুনির রসের সঙ্গে ১ টেবিল চামচ শিউলি পাতার রস, সকালে। রক্ত পরিষ্কারের জন্য ৪ চা চামচ রসের সঙ্গে ১ চা চামচ মধু, সাত দিন। জেদি কাশিতে ২ টেবিল চামচ রস চিনি দিয়ে, এক সপ্তাহ। গ্যাসের সমস্যায় আধ কেজি দুধে থানকুনির রস ও চিনি মিশিয়ে সাত দিন।

সংখ্যাগুলো পড়ে একটা জিনিস চোখে পড়ে। প্রতিটি প্রয়োগেরই একটা শেষ তারিখ আছে, সাত দিন বা এক সপ্তাহ। রোজ সারা বছর নয়। EMA-র এক সপ্তাহের সীমার সঙ্গে এই মিলটা কাকতালীয় হতে পারে, তবু লক্ষ্য করার মতো।

রান্নাঘরে থানকুনির চেহারাটা অন্যরকম, আর সেখানেই এটি সবচেয়ে নিরাপদ। ভর্তা বানানোর সময় পাতাগুলো ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিলে হাতে একটা সামান্য পিছল ভাব লাগে, আর বাটার সময় গন্ধটা ঠিক ধনেপাতার মতো নয়, কিছুটা ঘাসের মতো কাঁচা, সামান্য তেতো। রসুন, কাঁচা লঙ্কা, একটু সরষের তেল আর নুন দিয়ে বাটলে রংটা গাঢ় শ্যাওলা-সবুজ হয়। বড়ার ক্ষেত্রে বেসনে ডুবিয়ে ভাজলে ধারগুলো মুচমুচে হয় আর কাঁচা গন্ধটা প্রায় চলে যায়। ভাতের পাতে দুই থেকে তিন চামচ ভর্তা, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন, এটুকুই বাঙালি ঘরে চলে আসছে, আর শাক হিসেবে এই পরিমাণ নিয়ে কোনো উদ্বেগের নথি নেই।

অনেকে জানতে চান থানকুনি পাতা চিবিয়ে খেলে কি হয়, কাঁচা দুই তিনটি পাতা ধুয়ে সকালে চিবিয়ে নেওয়ার চলটা বেশ প্রচলিত। সৎ উত্তরটা হলো, কাঁচা চিবিয়ে খাওয়া আর রস করে খাওয়া, দুটোর মধ্যে শরীর কোনটা কতটা শুষে নেয় তার তুলনামূলক কোনো গবেষণা প্রকাশিত হয়নি। স্বাদে তফাত আছে, কাঁচা পাতা চিবোলে প্রথমে ঘাসের মতো কাঁচা স্বাদ আর তারপর হালকা তেতো রেশ থেকে যায়। ঝুঁকির দিক থেকে বরং কাঁচা খাওয়ায় আলাদা একটা প্রশ্ন থাকে, কারণ থানকুনি নোংরা জলের ধারে জন্মায় বলে ভালো করে না ধুলে জীবাণুর আশঙ্কা থেকে যায়।

তাহলে থানকুনি পাতা খেলে কি হয়, সংক্ষেপে? শাকের পরিমাণে খেলে সাধারণত কিছুই বিশেষ হয় না, এটি অন্য যেকোনো সবুজ শাকের মতোই একটি খাবার, আর সেটাই এর সবচেয়ে নিরাপদ ব্যবহার। থানকুনি পাতার ব্যবহার ওষুধের জায়গায় গেলে তখনই প্রশ্নগুলো শুরু হয়, কারণ তখন মাত্রা বাড়ে আর সময়ও লম্বা হয়।

তফাতটা এখানেই। শাক হিসেবে মাঝেমধ্যে খাওয়া আর রোজ খালি পেটে ঘনীভূত রস খাওয়া, এই দুটো আলাদা জিনিস। হজম শক্তি বাড়ানোর জন্য থানকুনি ভর্তা ভাতের সঙ্গে খাওয়া যেতেই পারে, ঠিক যেমন কুলেখাড়া শাক খাওয়া হয়। ওষুধের বিকল্প হিসেবে রোজের রস আলাদা প্রশ্ন, আর সেটা পরের অংশে।

রোজ খালি পেটে রস খেলে কী হয়, লিভারের প্রশ্নটা

থানকুনি লিভারের ক্ষতির একটি বিরল কিন্তু নথিভুক্ত কারণ, আর এটি বাংলা লেখাগুলিতে ঠিক উল্টো করে বলা হয়। আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের LiverTox তথ্যভাণ্ডারে Centella asiatica-র নিজস্ব একটি অধ্যায় আছে, যা সর্বশেষ হালনাগাদ হয়েছে ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল, আর সেখানে ভেষজটির সম্ভাব্যতা-স্কোর দেওয়া হয়েছে C, অর্থাৎ চিকিৎসাগতভাবে স্পষ্ট লিভার-ক্ষতির একটি সম্ভাব্য বিরল কারণ।

ঘটনাগুলি পড়া দরকার। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা থেকে তিনজন নারীর একটি বিবরণ প্রকাশিত হয় (Jorge ও Jorge)। এঁদের মধ্যে প্রথমজন ৬১ বছর বয়সী, ওজন কমানোর জন্য থানকুনির ট্যাবলেট খাচ্ছিলেন।

৩০ দিন পর তাঁর পেটে ব্যথা, গাঢ় প্রস্রাব আর জন্ডিস শুরু হয়। রক্তে ALT ও AST স্বাভাবিকের ঊর্ধ্বসীমার ২৬ থেকে ৩০ গুণ, সঙ্গে অটোঅ্যান্টিবডি (SMA ১:১৬০, AMA ১:৩২০)। লিভার বায়োপসিতে গ্র্যানুলোমা সহ তীব্র হেপাটাইটিস।

তারপরের অংশটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ বন্ধ করার পর তিনি এক থেকে দুই মাসে সেরে ওঠেন, কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে আবার শুরু করায় হুবহু একই অসুখ ফিরে আসে, বায়োপসিতে একই চেহারা। ওষুধের ক্ষতি প্রমাণ করার সবচেয়ে কড়া মাপকাঠি এটাই, বন্ধ করলে সারে আর ফের শুরু করলে ফিরে আসে। বাকি দুই আর্জেন্টাইন রোগীও ওষুধ বন্ধের এক থেকে দুই মাসে সেরে ওঠেন। ২০১১ সালে আরেকটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, একটি ১৫ বছরের কিশোরী ব্রণের জন্য থানকুনি খাচ্ছিল, আর ভেষজটি বন্ধ করার পর সে পুরোপুরি সেরে ওঠে।

LiverTox-এর নির্দেশটা সরাসরি, ব্যবহারের সময় লিভার-ক্ষতির স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে ভেষজটি দ্রুত বন্ধ করা দরকার, আর আবার শুরু করা এড়ানো উচিত। মাত্রার প্রসঙ্গে ওই একই অধ্যায় জানাচ্ছে, বাজারে প্রচলিত মাত্রা বিশোধিত নির্যাসের ক্ষেত্রে দিনে ৬০ থেকে ১২০ মিলিগ্রাম, আর শুকনো পাতার গুঁড়ো বা ক্যাপসুলের ক্ষেত্রে দিনে ৬০০ থেকে ১৮০০ মিলিগ্রাম।

অনেক চিকিৎসক অবশ্য এখানে যুক্তিসঙ্গতভাবেই মনে করিয়ে দেবেন যে ঘটনাগুলি বিরল, আর প্রায় সবগুলিই ঘটেছে ঘনীভূত ট্যাবলেট বা নির্যাসে, শাক খেয়ে নয়। কথাটা ঠিক। তবু লক্ষণীয় যে সময়ের হিসাবটা ২০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ ঠিক সেই সময়সীমা যেটা বাংলা লেখাগুলি রোজ রস খাওয়ার জন্য সুপারিশ করে। আগে থেকে ফ্যাটি লিভার বা লিভারের অন্য সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকিটা আলাদা করে ভাবার মতো।

গর্ভাবস্থা, শিশু ও ওষুধের সঙ্গে থানকুনি

গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান ও ১৮ বছরের কম বয়সে থানকুনির নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত নয়, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান এখানে দ্ব্যর্থহীন। EMA-র ২০২২ সালের মনোগ্রাফে লেখা আছে, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানের সময় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে এই সময়ে ব্যবহার সুপারিশ করা হয় না, উর্বরতা সংক্রান্ত কোনো তথ্যও নেই। ১৮ বছরের কম বয়সের ক্ষেত্রেও একই কারণ, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব।

অথচ বাংলা ইন্টারনেটে "গর্ভাবস্থায় থানকুনি পাতা খাওয়ার উপকারিতা" একটি আলাদা অনুসন্ধান-গুচ্ছ, যার পিছনে একাধিক ব্লগ লেখা হয়েছে। এই লেখাগুলির একটিরও ভিত্তিতে কোনো মানব-গবেষণা নেই। প্রমাণ না থাকা আর নিরাপদ হওয়া এক জিনিস নয়। গর্ভাবস্থার আয়ুর্বেদিক যত্নে নিরাপদ বিকল্পের তালিকা যথেষ্ট লম্বা, ঝুঁকি নেওয়ার দরকার পড়ে না।

শিশুদের প্রসঙ্গটা আরও ছড়ানো। বাচ্চাদের থানকুনি পাতা খাওয়ার নিয়ম নিয়ে বাংলায় প্রচুর লেখা আছে, প্রায় প্রতিটিতেই পেটের অসুখে রস বা শিকড় বেটে খাওয়ানোর কথা, অথচ কোনোটিতেই বয়স বা মাত্রা নির্দিষ্ট নয়। শাক হিসেবে রান্নায় বাচ্চার পাতে থানকুনি পড়া আর ওষুধ হিসেবে রস খাওয়ানো, এখানেও তফাতটা সেই একই। শিশুদের আয়ুর্বেদিক যত্নের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়মটাই এখানে খাটে, শিশুর শরীরে ভেষজের বিপাক প্রাপ্তবয়স্কের মতো নয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত প্রয়োগ যুক্তিসঙ্গত নয়।

ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার প্রশ্নটি বাংলা লেখায় প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আমেরিকার Memorial Sloan Kettering Cancer Center-এর ভেষজ-তথ্যপাতা অনুযায়ী থানকুনি পরীক্ষাগারে CYP450 এনজাইম পরিবারের 1A2, 2C9, 2C19, 2D6 ও 3A4-কে বাধা দেয়, যা এই এনজাইমগুলির মাধ্যমে বিপাক হওয়া ওষুধের কোষ-অভ্যন্তরীণ ঘনত্ব বদলে দিতে পারে। পাতাটি নিজেই স্বীকার করেছে, এর চিকিৎসাগত তাৎপর্য এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে যতদিন না হচ্ছে ততদিন ওই ওষুধগুলির সঙ্গে একসাথে ব্যবহার এড়ানোই সাবধানতা। ঘুমের ওষুধ বা স্নায়ু-শিথিলকারী ওষুধের সঙ্গে অতিরিক্ত ঝিমুনির আশঙ্কার কথাও একাধিক জায়গায় উল্লেখ আছে, আর উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যায় যাঁরা ইতিমধ্যে ওষুধ খাচ্ছেন তাঁদের এটি জানা দরকার।

থানকুনি পাতার অপকারিতা, কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

থানকুনি পাতার অপকারিতা মূলত মাত্রা ও রূপের প্রশ্ন, শাক হিসেবে এটি বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ, কিন্তু ঘনীভূত রস, গুঁড়ো বা ক্যাপসুল হিসেবে কয়েকটি দলের জন্য এটি এড়িয়ে চলার জিনিস। নিচের হিসাবটি উপরে উল্লিখিত নথিগুলি থেকেই সংকলিত।

কারা কী করবেন কেন
লিভারের রোগ বা লিভার এনজাইম বেশি এড়িয়ে চলুন LiverTox-এ সম্ভাব্যতা-স্কোর C, নথিভুক্ত হেপাটাইটিস
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী এড়িয়ে চলুন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত নয়, EMA সুপারিশ করে না
১৮ বছরের কম বয়স চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয় পর্যাপ্ত তথ্য নেই
ধনে, জিরে, গাজর বা মৌরিতে অ্যালার্জি ব্যবহার করবেন না Apiaceae গোত্রে সংবেদনশীলতা, EMA-র প্রতিনির্দেশ
CYP450-নির্ভর ওষুধ চলছে চিকিৎসককে জানান পরীক্ষাগারে এনজাইম-বাধা নথিভুক্ত
ঘুমের বা স্নায়ু-শিথিলকারী ওষুধ সতর্ক থাকুন অতিরিক্ত ঝিমুনির আশঙ্কা
অস্ত্রোপচার নির্ধারিত আছে দুই সপ্তাহ আগে বন্ধ করুন অ্যানেস্থেশিয়ার সঙ্গে ঝিমুনি বাড়তে পারে
ওজন কমানোর ট্যাবলেট হিসেবে ব্যবহার করবেন না নথিভুক্ত লিভার-ক্ষতির প্রথম ঘটনাটিই এই ব্যবহারে

তালিকার শেষ সারিটিতে আলাদা করে জোর দেওয়া দরকার। ২০০৫ সালের যে ৬১ বছর বয়সী রোগীর কথা উপরে লেখা হয়েছে, তিনি থানকুনি খাচ্ছিলেন ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে। ওজন কমানোর জন্য থানকুনির কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই, অথচ নথিভুক্ত সবচেয়ে গুরুতর লিভার-ক্ষতির ঘটনাটি ঘটেছে ঠিক সেই ব্যবহারেই, অর্থাৎ যে কাজের জন্য উপকারের প্রমাণ শূন্য সেই কাজেই ক্ষতির প্রমাণ সবচেয়ে জোরালো। ভারসাম্যটা এখানে স্পষ্টভাবে বিপক্ষে।

আর একটি সাধারণ সতর্কতা। থানকুনি প্রায়ই নর্দমা, পুকুরপাড় বা মাঠের ধারে জন্মায়, যেখানে জল দূষিত হতে পারে। Alzheimer's Drug Discovery Foundation তাদের পাতায় কীটনাশক ও ভারী ধাতুর দূষণকে থানকুনির একটি আলাদা উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বুনো জায়গা থেকে তুলে আনলে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই, আর দাঁড়ানো নোংরা জলের ধারের গাছ না তোলাই ভালো।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

থানকুনি নিয়ে পড়তে গিয়ে সবচেয়ে থমকে যাওয়া মুহূর্তটা এসেছিল EMA-র মনোগ্রাফের PDF-টা খোলার পর। নথিটার প্রতিটি পাতায় দুটো কলাম, বাঁদিকে প্রতিষ্ঠিত কার্যকারিতা আর ডানদিকে ঐতিহ্যগত ব্যবহার। আমি পাতা উল্টে যাচ্ছিলাম আর বাঁদিকের কলামটা একের পর এক ফাঁকা যাচ্ছিল। ইঙ্গিত ফাঁকা, মাত্রা ফাঁকা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ফাঁকা।

প্রথমে ভেবেছিলাম PDF-টা ঠিকমতো খোলেনি (এটা স্বীকার করতে একটু লজ্জা লাগে, কিন্তু সত্যি)। দ্বিতীয়বার পড়ে বুঝলাম, ফাঁকা থাকাটাই তথ্য। বারো বছর ধরে ইউরোপ এই গাছটার জন্য কোনো মনোগ্রাফ লিখতে পারেনি, আর যখন লিখল তখন কেবল একটাই ঘর ভরল, ত্বকে লাগানোর ঘরটা।

তার পর থেকে থানকুনি নিয়ে যত বাংলা লেখা পড়েছি, প্রতিটাতে একই জিনিসটাই খুঁজেছি, দাবিটা খাওয়া নিয়ে না লাগানো নিয়ে, আর প্রায় প্রতিবারই দেখেছি লেখাটা খাওয়ার কথা বলছে অথচ যে গবেষণার নাম করছে সেটা লাগানোর। এটা থানকুনির দোষ নয়। গাছটা যা করে তা ভালোই করে, আমরা শুধু ওকে ভুল কাজের বরাত দিয়ে বসে আছি।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

থানকুনি পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা পাশাপাশি রাখলে একটা নকশা বেরিয়ে আসে, উপকারের প্রমাণ প্রায় সবটাই ত্বকের উপর আর ক্ষতির নথি প্রায় সবটাই খাওয়ার দিকে। ভেষজটির সবচেয়ে ভালো প্রমাণিত কাজ ছোট ক্ষত, ক্ষতচিহ্ন, ব্রণ আর বলিরেখায়, সবই লাগানোর, আর ইউরোপ ঠিক ওই একটি ব্যবহারকেই ২০২২ সালে অনুমোদন দিয়েছে, তাও এক সপ্তাহের সীমা বেঁধে। স্মৃতি বাড়ানোর যে দাবিটা প্রায় প্রতিটি বাংলা লেখা দিয়ে শুরু হয়, ১১টি ট্রায়ালের মেটা-বিশ্লেষণে সেটি প্লাসিবোর সঙ্গে সমান হয়ে গেছে। খেয়ে ফরসা হওয়ার দাবির পিছনে মানুষের উপর করা একটিও গবেষণা নেই। আর লিভার ভালো রাখার দাবিটা কেবল অপ্রমাণিত নয়, নথিভুক্ত ঘটনাগুলি ঠিক উল্টো দিকে যায়।

শাক হিসেবে থানকুনি খান, নিশ্চিন্তে খান। ভর্তা, বড়া বা ভাজি, সপ্তাহে দুই তিন দিন, ভাতের পাতে। এটা বাংলার নিজস্ব খাবার, আর এই পরিমাণে ঝুঁকির কোনো নথি নেই।

আর একটা কাজ করে দেখতে পারেন। থানকুনি নিয়ে পরের যে লেখাটা পড়বেন, সেখানে গবেষণার কথা এলে খুঁজে দেখুন কোন জিনিসটা পরীক্ষা করা হয়েছে, তাজা পাতা না TECA নামের বিশোধিত নির্যাস। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লেখাটাই সেটা বলতে পারবে না, আর সেই না-বলাটাই আপনাকে জানিয়ে দেবে লেখাটা কতটা যাচাই করা। এই এক অভ্যাস থানকুনি ছাড়াও বাকি সব ভেষজের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।

সূত্র / Sources

  • Committee on Herbal Medicinal Products (HMPC). "European Union herbal monograph on Centella asiatica (L.) Urb., herba." European Medicines Agency, EMA/HMPC/489142/2020, 30 March 2022. ema.europa.eu
  • Committee on Herbal Medicinal Products (HMPC). "Public statement on Centella asiatica (L.) Urban, herba." European Medicines Agency, EMA/HMPC/579663/2009, 25 November 2010. ema.europa.eu
  • "Centella asiatica." LiverTox. Clinical and Research Information on Drug-Induced Liver Injury. National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases, Bethesda, updated 24 April 2024. NCBI Bookshelf NBK603561
  • Puttarak P, Dilokthornsakul P, Saokaew S, Dhippayom T, Kongkaew C, Sruamsiri R, Chuthaputti A, Chaiyakunapruk N. "Effects of Centella asiatica (L.) Urb. on cognitive function and mood related outcomes. A Systematic Review and Meta-analysis." Scientific Reports, 2017;7:10646. DOI 10.1038/s41598-017-09823-9. PMC5587720
  • Chong NJ, Aziz Z. "A Systematic Review of the Efficacy of Centella asiatica for Improvement of the Signs and Symptoms of Chronic Venous Insufficiency." Evidence-Based Complementary and Alternative Medicine, 2013;2013:627182. DOI 10.1155/2013/627182. PMC3594936
  • Arribas-López E, Zand N, Ojo O, Snowden MJ, Kochhar T. "A Systematic Review of the Effect of Centella asiatica on Wound Healing." International Journal of Environmental Research and Public Health, 2022;19(6):3266. DOI 10.3390/ijerph19063266. PMC8956065
  • Utami AT, Muzaahim A, Harrats AH, Aali Imroon M. "Systematic Review and Meta-Analysis. Efficacy of Centella Asiatica in Treating Acne Vulgaris." Biomedical Journal of Scientific and Technical Research, 2024;58(2). biomedres.us. ব্রণে সংখ্যাসহ একত্রিত ক্লিনিকাল হিসাব এই একটিমাত্র জায়গাতেই পাওয়া গেছে, তবে পত্রিকাটি শীর্ষসারির নয়, তাই লেখায় প্রমাণের স্তর সীমিত রাখা হয়েছে।
  • Handayani R, Nurhasanah, Sriwidodo, Chaerunisaa AY. "Centella asiatica (L.) Urb. in skin health and cosmeceuticals. Mechanisms, clinical evidence, and advanced delivery systems." Pharmacia, 2025;72:1-13. DOI 10.3897/pharmacia.72.e167217. pharmacia.pensoft.net
  • Guo X, Suzuki H, Sawafuji T, et al. "A Clinical Trial to Evaluate the Safety and Efficacy of Centella asiatica for Ulcerative Colitis." JGH Open, 2025;9(8):e70258. DOI 10.1002/jgh3.70258. PMC12358806
  • "Gotu Kola." About Herbs, Memorial Sloan Kettering Cancer Center, Integrative Medicine, updated 23 February 2022. mskcc.org
  • "Centella asiatica." Cognitive Vitality, Alzheimer's Drug Discovery Foundation, updated 30 April 2026. alzdiscovery.org
  • Joshi S, Mitra S, Sharma U, Sharma KC. "Relevance of Charakokta Medhya Rasayana for Prevention and Management of Dementia. A Review." International Journal of Research in Ayurveda and Pharmacy, 2025;16(2):150-155. DOI 10.7897/2277-4343.16261. dx.doi.org
  • চরক সংহিতা, চিকিৎসাস্থান, রসায়ন অধ্যায়, করপ্রচিতীয় রসায়ন পাদ, শ্লোক ৩০ থেকে ৩১, মেধ্য রসায়ন প্রকরণ (শাস্ত্রীয় সূত্র)
  • চরক সংহিতা, সূত্রস্থান, ষড্‌বিরেচনশতাশ্রিতীয় অধ্যায় ৪, শ্লোক ৫০, বয়ঃস্থাপন মহাকষায় (শাস্ত্রীয় সূত্র)। carakasamhitaonline.com
  • ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টু, গুড়ূচ্যাদি বর্গ, মণ্ডুকপর্ণী প্রকরণ, রস-গুণ-বীর্য-বিপাক ও দোষঘ্নতার শাস্ত্রীয় বিবরণ (শাস্ত্রীয় সূত্র)

নিচের দুটি চিকিৎসা-প্রমাণের সূত্র নয়, উদ্ভিদ চেনা ও লোকজ প্রয়োগের নথি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো স্বাস্থ্য-দাবির ভিত্তি হিসেবে এদের ব্যবহার করা হয়নি।

  • "থানকুনি।" বাংলা উইকিপিডিয়া, কেবল আঞ্চলিক বাংলা নাম ও গোত্র-বিন্যাসের জন্য। bn.wikipedia.org
  • নয়াকৃষি আন্দোলন উদ্ভিদ-নথি, থানকুনি, বাংলাদেশের লোকজ প্রয়োগ ও প্রচলিত পরিমাণের নৃ-উদ্ভিদতাত্ত্বিক নথি হিসেবে। UBINIG, বাংলাদেশ। ubinig.org

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

না, রোজ খাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ মাত্রা নির্ধারিত নেই, তাই টানা রোজ খাওয়ার অভ্যাসটি যুক্তিসঙ্গত নয়। ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থা EMA থানকুনির যে একটিমাত্র ব্যবহার অনুমোদন করেছে সেটি ত্বকে লাগানোর, আর সেখানেও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এক সপ্তাহ (EMA/HMPC/489142/2020, ২০২২)। শাক হিসেবে মাঝেমধ্যে রান্নায় খাওয়া আর রোজ খালি পেটে ঘনীভূত রস খাওয়া এক জিনিস নয়। দ্বিতীয়টির সঙ্গে লিভারের ক্ষতির নথিভুক্ত ঘটনা জড়িত।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
কাঠের বাটিতে পাকা কালো জাম ও কাটা জামের বেগুনি শাঁস, জাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ16 মিনিট

জাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা, হজমের দাবিটা শাস্ত্রের উল্টো

জাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে সংখ্যাগুলো কী বলে, আয়রনের হিসাবটা মেলে কিনা, গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কোথা থেকে এল, আর চরক সংহিতা জামকে আসলে কী বলেছে দেখুন।

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
শুকনো জামের বিচি ও বিচির গুঁড়ো বাটিতে, পাশে কয়েকটি গোটা কালো জাম, জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ13 মিনিট

জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা, ডায়াবেটিসে মাপের গোলমাল

জামের বিচির উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, এক চা চামচ আর দশ গ্রামের ফারাক কোথায়, কোন ট্রায়ালটা পাতার আর কোনটা বিচির, কাদের সতর্ক থাকা দরকার।

২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
ঝুড়িতে গোটা হলুদ কামরাঙা ও কাটা তারার আকৃতির ফালি, পাশে কিডনির চিত্র, কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ18 মিনিট

কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা, কিডনি ভালো থাকলে কতটা নিরাপদ

কামরাঙার উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে প্রমাণ কতদূর যায়, কতটা খেলে কিডনির ঝুঁকি শুরু হয়, হেঁচকি কেন বিপদের লক্ষণ, ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া আর কাদের এড়ানো দরকার।

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ