আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ৪ মে, ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 17 মিনিট পড়ুন

শতমূলী (শতাবরী) কি, উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম ও অপকারিতা

শতমূলী বা শতাবরীর উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে দুটি ট্রায়াল কী বলল, হরমোনের দাবিটা কোথায় দাঁড়িয়ে, খাওয়ার নিয়ম, মাত্রা, দাম ও কাদের সতর্ক থাকা দরকার।

অ
অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি ও গবেষণা পদ্ধতি।

শতমূলী লতা, সুতোর মতো সরু পাতা, সাদা ফুল ও মাটির নিচে মাংসল শিকড়, আয়ুর্বেদিক স্ত্রী-ভেষজ

শতমূলী নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কথাটা লেখা হয়, সেটা হলো এটি হরমোনের ভারসাম্য ফেরায়। ২০২৫ সালে একদল গবেষক ঠিক সেটাই মেপে দেখেছিলেন, ১৩৫ জন নারীর রক্ত পরীক্ষা করে, আট সপ্তাহ ধরে। মেনোপজের উপসর্গ নাটকীয়ভাবে কমল। অথচ রক্তে এস্ট্রাডায়োল, FSH, LH বা টেস্টোস্টেরন, কোনোটাই নড়ল না। ফলটা অদ্ভুত শোনায়।

শতমূলী বা শতাবরী হলো Asparagus racemosus, একটি বহুবর্ষজীবী কাঁটাযুক্ত লতা, যার মাটির নিচের মাংসল শিকড়ই আয়ুর্বেদে আসল ওষধি অংশ। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণিত ব্যবহার মেনোপজের উপসর্গ কমানো, যেখানে দুটি আলাদা র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে প্লাসিবোর তুলনায় স্পষ্ট উন্নতি দেখা গেছে। কিন্তু কীভাবে কাজটা হয়, সেই প্রশ্নে প্রমাণ এখনো দ্বিধায়।

বাংলা ইন্টারনেটে শতমূলী নিয়ে যা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই হয় দশ লাইনের তালিকা, নয় পণ্যের বিজ্ঞাপন, আর সংখ্যা প্রায় কোথাওই নেই। আজকের লেখায় থাকছে শতমূলী গাছ চেনার উপায় আর কোন অ্যাসপারাগাসটা এটি নয়, চরক সংহিতা একে আসলে কোথায় রেখেছে, দুটি মেনোপজ ট্রায়াল কী বলল, অশ্বগন্ধার সঙ্গে মিশিয়ে খেলে সত্যিই বেশি কাজ হয় কিনা, বুকের দুধের প্রমাণ কতদূর, খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা, দাম ও মান যাচাই, আর কাদের সতর্ক থাকা দরকার।

শতমূলী গাছ চেনার উপায়, আর কোন অ্যাসপারাগাসটা নয়

শতমূলী হলো Asparagus racemosus, Asparagaceae গোত্রের একটি বহুবর্ষজীবী লতানো ভেষজ। গাছটি কাঁটাযুক্ত, পাতাগুলো সুতোর মতো সরু সবুজ, ফুল ছোট ও সাদা, পাকলে ছোট লাল বেরি ধরে। মাটির নিচে পেঁয়াজ-সদৃশ গুচ্ছ করে থাকে মোটা মাংসল অসংখ্য শিকড়, আর নামেই তার ইঙ্গিত, "শত মূল", মানে বহু শিকড়।

এবার সেই গোলমালটা, যেটা বাংলা ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। বাজারে সবজি হিসেবে বিক্রি হওয়া সবুজ অ্যাসপারাগাস হলো Asparagus officinalis, সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতি, ওষধি শতমূলী নয়। দুটো এক নয়।

বিভ্রান্তিটা কতদূর গেছে তার একটা মাপ আছে। বাংলা উইকিপিডিয়ার "শতমূলী" নিবন্ধটিই আসলে Asparagus officinalis-এর, অর্থাৎ সবজি অ্যাসপারাগাসের, যদিও পাতাটি শতাবরী ও সাতাওয়ার নামগুলিও তালিকাভুক্ত করেছে। শতমূলী খুঁজতে গিয়ে যে বিশ্বকোষে বেশিরভাগ পাঠক পৌঁছবেন, সেখানেই দুটি প্রজাতি মিলে গেছে। কেনার সময় তাই বাংলা নামের বদলে বৈজ্ঞানিক নামটি দেখে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

বাংলাদেশে শতমূলী উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের শালবন ও বনাঞ্চলে জন্মায়, অনেকে বাগানেও চাষ করেন। চাষ হয় মূলত বীজ থেকে, বীজ এক দিন জলে ভিজিয়ে বুনলে দশ থেকে পনেরো দিনে চারা গজায়, আর রোপণের উপযুক্ত সময় এপ্রিল থেকে মে মাস। বাংলায় কোথাও কোথাও একে সাতমূলী বা শতমূল বলা হয়, আর ইউনানি চিকিৎসায় এর নাম সাতাওয়ার।

চরক সংহিতা শতমূলীকে আসলে কোথায় রেখেছে

চরক সংহিতা শতমূলীকে রেখেছে বাজীকরণ প্রকরণে, স্ত্রী রসায়ন নামে কোনো আলাদা বিভাগে নয়। কথাটা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই বহু লেখায় দাবি করা হয় চরক শতমূলীকে "স্ত্রী রসায়ন" বলেছেন। মূল পাঠ খুললে সেটি মেলে না।

চরক সংহিতার চিকিৎসাস্থানের দ্বিতীয় অধ্যায়, অর্থাৎ বাজীকরণ অধ্যায়ে শতমূলী বারবার আসে। বৃংহণী গুটিকা (শ্লোক ২৫), বৃষ্য ক্ষীর (শ্লোক ১৮), বৃষ্য ঘৃত (শ্লোক ২১), অপত্যকর স্বরস (শ্লোক ১৪), অপত্যকর ঘৃত (শ্লোক ২৮), অপত্যকরী ষষ্টিকাদি গুটিকা (শ্লোক ৫) আর বাজীকরণ ঘৃত (শ্লোক ৩৪), সবকটিতেই এর নাম আছে। রসায়ন অধ্যায়েও এটি আছে, তবে স্বতন্ত্র রসায়ন হিসেবে নয়, ব্রহ্ম রসায়ন ও চ্যবনপ্রাশের একটি উপাদান হিসেবে।

তফাতটা তুচ্ছ নয়। বাজীকরণ মানে প্রজনন-ক্ষমতা ও ওজ বাড়ানোর শাখা, আর অপত্যকর শব্দের অর্থই সন্তান-উৎপাদক। এই প্রস্তুতিগুলি নারী-পুরুষ উভয়ের প্রসঙ্গে বলা, কেবল নারীর নয়। "স্ত্রী রসায়ন" পরিচয়টি এসেছে অনেক পরে, ভাবপ্রকাশের যুগে, ষোড়শ শতকে।

দ্রব্যগুণের হিসাবটাও এখানে বলে রাখা দরকার, কারণ ওটাই ঠিক করে শতমূলী কার শরীরে মানাবে। শাস্ত্রীয় বর্ণনায় শতমূলীর রস মধুর ও তিক্ত, গুণ গুরু ও স্নিগ্ধ, বীর্য শীত, আর বিপাক মধুর (Sushma ও Yadava, World Journal of Advanced Research and Reviews, ২০২২, DOI 10.30574/wjarr.2022.16.2.1028)। শীতবীর্য ও মধুর বিপাকের এই সমন্বয় থেকেই ধরা হয় শতমূলী মূলত বাত ও পিত্ত প্রশমন করে, আর কফপ্রধান বা আম-জমা শরীরে গুরু-স্নিগ্ধ গুণ ভারী পড়তে পারে। ওই একই পর্যালোচনা শতমূলীকে রসায়ন ও বাজীকরণ, দুটি শ্রেণিতেই রেখেছে, যা উপরের পাঠ-অনুসন্ধানের সঙ্গে মেলে।

তাহলে ভুলটা ক্ষতিকর কোথায়? দুই জায়গায়। এক, এটি শতমূলীকে কেবল নারীর ভেষজ বানিয়ে দেয়, অথচ শাস্ত্রীয় ভিত্তি তার চেয়ে চওড়া। দুই, এটি ভেষজটির বয়স বাড়িয়ে দেখায়, কারণ চরকের বয়স আর ভাবপ্রকাশের বয়স প্রায় দেড় হাজার বছরের ব্যবধানে। প্রমাণের স্তর এখানে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার, অর্থাৎ নথিভুক্ত শাস্ত্রীয় ব্যবহার আছে, কার্যকারিতার আধুনিক প্রমাণ সেটি নয়। আয়ুর্বেদের এই শ্রেণিবিভাগগুলি কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে বিস্তারিত আছে আয়ুর্বেদ পরিচিতির লেখায়।

শতমূলীর উপকারিতা, এক নজরে

শতমূলীর দাবিগুলির পিছনে প্রমাণের পরিমাণ এক রকম নয়, তাই সেগুলি এক তালিকায় মিলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। নিচের টেবিলে প্রতিটি দাবির পাশে প্রমাণের স্তর বসানো আছে, আর প্রতিটির সংখ্যা ও উৎস নিচের সংশ্লিষ্ট অংশে নাম ধরে দেওয়া হয়েছে।

দাবি প্রমাণের স্তর কীসের ভিত্তিতে
মেনোপজের উপসর্গ কমানো মাঝারি প্রমাণ দুটি র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়াল, ১৩৫ ও ৭০ জন
হট ফ্ল্যাশ ও রাতে ঘাম মাঝারি প্রমাণ দুটি ট্রায়ালেই আলাদা করে মাপা
ঘুম, উদ্বেগ ও মেজাজ সীমিত প্রমাণ গৌণ ফলাফল হিসেবে মাপা
হরমোনের মাত্রা বদলানো অপর্যাপ্ত প্রমাণ দুটি ট্রায়ালের ফল পরস্পরবিরোধী
বুকের দুধ বৃদ্ধি সীমিত প্রমাণ আটটি গবেষণা, মান অসম, সেরাটি ২১১ জনের
অম্বল ও গ্যাস্ট্রিক আলসার অপর্যাপ্ত প্রমাণ মূলত প্রাণী-গবেষণা
শারীরিক দুর্বলতা ও রসায়ন ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার শাস্ত্রীয় প্রয়োগ, মানব-ট্রায়াল নেই
প্রজনন ও পুরুষস্বাস্থ্য ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার চরকের বাজীকরণ প্রকরণ
রোগ প্রতিরোধ ও প্রদাহ অপর্যাপ্ত প্রমাণ প্রাথমিক ও কোষ-গবেষণা

কোনোটাই জাদু নয়। উপরের তালিকায় যে দুটি সারিতে "মাঝারি প্রমাণ" লেখা, কেবল সেখানেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল আছে, বাকিগুলি এখনো তার নিচে। বয়সের ধাপ অনুযায়ী নারীস্বাস্থ্যের সামগ্রিক ছবিটা কেমন, আর তার কোথায় ভেষজের জায়গা, তা নিয়ে আলাদা করে লেখা আছে নারীস্বাস্থ্যের গাইডে, আর নারী-ভেষজের মধ্যে অশোক ছালের প্রমাণ-চিত্র শতমূলীর থেকে আলাদা।

মেনোপজে শতমূলী, দুটো ট্রায়াল কী বলল

মেনোপজের উপসর্গে শতমূলীর পক্ষে এখন দুটি নিয়ন্ত্রিত ট্রায়াল আছে, একটিমাত্র নয়, আর দুটিতেই উপসর্গ প্লাসিবোর তুলনায় স্পষ্টভাবে কমেছে।

প্রথমটি ২০২৫ সালের, Frontiers in Reproductive Health পত্রিকায়। আট সপ্তাহের ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ১৩৫ জন নারীকে তিন দলে ভাগ করা হয়েছিল, দিনে ৩০০ মিগ্রা শতমূলী নির্যাস, শতমূলী ও অশ্বগন্ধার মিশ্রণ, আর প্লাসিবো। আট সপ্তাহে মেনোপজ রেটিং স্কেল শতমূলী দলে কমেছে ১৩.০৭ পয়েন্ট, প্লাসিবো দলে ৩.২৬ পয়েন্ট (Ademola ও সহলেখক, DOI 10.3389/frph.2025.1654503, p < ০.০০০১)। হট ফ্ল্যাশে শতমূলী দলের উন্নতি ছিল সবচেয়ে বেশি।

দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালের, Cureus পত্রিকায়। ৭০ জন নারী, ৬০ দিন, দিনে দুবার ২৫০ মিগ্রা করে ৫ শতাংশ শতাবরিনে প্রমিত নির্যাস। Utian Quality of Life স্কোর ৬০ দিনে বেড়েছে ৩৫.১৩ শতাংশ (Gudise ও সহলেখক, DOI 10.7759/cureus.57879, p < ০.০০০১)। সংখ্যাগুলো আরও স্পষ্ট করে বললে, শেষ পরিদর্শনে হট ফ্ল্যাশ ছিল সক্রিয় দলের ৪ জনের, প্লাসিবো দলের ১৯ জনের, আর রাতে ঘাম ছিল যথাক্রমে ২ ও ১৭ জনের।

দুটি ট্রায়ালেরই সীমা আছে, আর সেগুলি লেখকরা নিজেরাই লিখেছেন। দুটিই আট সপ্তাহ বা ষাট দিনের, তাই দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রভাব নিয়ে কিছু বলা যায় না। নমুনা ছোট, দুটিই ভারতের নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে করা, আর খাদ্য ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়নি। প্রমাণের স্তর তাই মাঝারি প্রমাণ, প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়। মেনোপজ ও আয়ুর্বেদের লেখায় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কথা আলাদা করে আছে।

হরমোন ভারসাম্যের দাবিটা কোথায় দাঁড়িয়ে

শতমূলী হরমোনের ভারসাম্য ফেরায়, এই দাবিটির পক্ষে প্রমাণ এখনো পরস্পরবিরোধী, আর সেটাই এই ভেষজ নিয়ে সবচেয়ে কম আলোচিত তথ্য। দুটি ট্রায়ালেই হরমোন মাপা হয়েছিল, আর দুটিতে দুরকম ফল এসেছে।

Ademola ও সহলেখকদের ২০২৫ সালের ট্রায়ালে আট সপ্তাহ পরে রক্তে এস্ট্রাডায়োল, FSH, LH ও টেস্টোস্টেরন, চারটিরই মাত্রা তিন দলে কার্যত এক ছিল। সংখ্যাগুলি এরকম, এস্ট্রাডায়োলে p = ০.৮৯৪, FSH-এ ০.৬৬০, LH-এ ০.৮৮৮, টেস্টোস্টেরনে ০.৬১৯ (DOI 10.3389/frph.2025.1654503)। অর্থাৎ কোনো অর্থবহ পার্থক্য নেই। অথচ ওই একই ট্রায়ালে উপসর্গ নাটকীয়ভাবে কমেছিল।

Gudise ও সহলেখকদের ২০২৪ সালের ট্রায়ালে ছবিটা উল্টো। সেখানে এস্ট্রাডায়োল ও প্রোজেস্টেরনে সক্রিয় দলের ফল প্লাসিবোর তুলনায় অর্থবহভাবে ভাল ছিল, এস্ট্রাডায়োলে p = ০.০০২৫ আর প্রোজেস্টেরনে p = ০.০০০৫ (DOI 10.7759/cureus.57879)।

তাহলে দাঁড়াল কী? উপসর্গ কমার ব্যাপারটা দুটি ট্রায়ালেই মিলেছে, কিন্তু সেই উপশমটা রক্তে হরমোনের মাত্রা বদলে গিয়ে ঘটছে, নাকি সম্পূর্ণ অন্য কোনো পথে, সেই প্রশ্নের উত্তর দুটি গবেষণা মিলিয়ে এখনো বার করা যাচ্ছে না। বড় ট্রায়ালটিতে হরমোন নড়েনি, ছোটটিতে নড়েছে। এই অবস্থায় "হরমোন ব্যালান্স করে" কথাটা বিজ্ঞাপনের ভাষা, প্রমাণের ভাষা নয়, আর প্রমাণের স্তর এখানে অপর্যাপ্ত প্রমাণ।

অনেক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক অবশ্য এখানে যুক্তিসঙ্গতভাবেই আপত্তি তুলবেন, কারণ আয়ুর্বেদ দোষের ভারসাম্যের কথা বলে, রক্তে মাপা হরমোনের কথা নয়, আর সেই কাঠামোয় হরমোন না নড়াটা ব্যর্থতা নয়। আপত্তিটা ন্যায্য। তবে সমস্যা হলো বাজারে পণ্যটি বিক্রিই হয় আধুনিক ভাষায়, হরমোন ব্যালান্সের দাবি দিয়ে, তাই আধুনিক মাপকাঠিতেই তার হিসাব চাওয়া হবে।

আমার নিজের পড়া থেকে যেটা মনে হয়, এই দুর্বলতাটা আসলে ভেষজটির বিরুদ্ধে যায় না। উপসর্গ কমা রোগীর কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই, আর কোন পথে কমছে তা এখনো খোলা প্রশ্ন। সমস্যাটা তখনই শুরু হয় যখন বিক্রেতা ওই খোলা প্রশ্নটাকে প্রমাণিত দাবি বানিয়ে ফেলেন। হরমোন-সংক্রান্ত সমস্যায় পিসিওএস ব্যবস্থাপনার লেখা আর মাসিকের অনিয়মের লেখাটি মিলিয়ে পড়লে ছবিটা পরিষ্কার হবে।

শতাবরী আর অশ্বগন্ধা একসঙ্গে খেলে কি বেশি কাজ হয়?

না, অন্তত মেনোপজের উপসর্গে দুটি একসঙ্গে খেলে বাড়তি কোনো লাভ পাওয়া যায়নি। Ademola ও সহলেখকদের ২০২৫ সালের ট্রায়ালটি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই তিন দলে সাজানো হয়েছিল, একটি দল শুধু শতমূলী, একটি দল শতমূলী ও অশ্বগন্ধা একসঙ্গে, আর একটি প্লাসিবো।

ফলাফলটা বাজারের প্রচারের সঙ্গে মেলে না। আট সপ্তাহে মেনোপজ রেটিং স্কেলে মিশ্রণ দল কমেছিল ১৩.০৮ পয়েন্ট আর শুধু শতমূলী দল ১৩.০৭ পয়েন্ট, দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কার্যত শূন্য (Ademola ও সহলেখক, ২০২৫, p = ১.০০০)। হট ফ্ল্যাশে তো শুধু শতমূলী দলই বেশি ভালো করেছে, ৯.০৭ পয়েন্ট বনাম মিশ্রণ দলের ৬.১৮।

একটা জায়গায় অবশ্য মিশ্রণ এগিয়ে ছিল, মানসিক চাপের স্কোরে। সেখানে মিশ্রণ দল কমেছিল ৯.৫৮ পয়েন্ট আর শুধু শতমূলী দল ৪.১২। তাই কথাটা এই নয় যে অশ্বগন্ধা অকেজো, বরং এই যে মেনোপজের নিজস্ব উপসর্গে ওটি বাড়তি কিছু যোগ করেনি। অশ্বগন্ধার নিজের লেখায় তার আলাদা প্রমাণ ও লিভার-সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত আছে, আর দুটি ভেষজ একসঙ্গে খাওয়ার আগে সেটি পড়ে নেওয়া দরকার। স্ত্রী-প্রস্তুতিতে শতমূলীর সঙ্গে ব্রাহ্মীও মেশানো হয়, তবে সেই সংমিশ্রণ নিয়ে তুলনামূলক কোনো ট্রায়াল প্রকাশিত হয়নি।

বুকের দুধ বাড়াতে শতমূলী, প্রমাণ কতদূর

বুকের দুধ বাড়াতে শতমূলীর ব্যবহার ভারতে এতটাই পুরোনো যে আয়ুর্বেদীয় ফার্মাকোপিয়াতেও এই কাজের জন্য এটি তালিকাভুক্ত, কিন্তু ক্লিনিকাল গবেষণার ফল মিশ্র। আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থ্য গ্রন্থাগারের LactMed তথ্যভাণ্ডার, যেটি স্তন্যদানকালে ওষুধ ও ভেষজের নিরাপত্তা নথিভুক্ত করে, এই বিষয়ে আটটি গবেষণা একত্রে পর্যালোচনা করেছে (সর্বশেষ হালনাগাদ ১৫ জুলাই ২০২৬)।

গবেষণাগুলির মান এক নয়, আর সেখানেই আসল কথা। বেশ কয়েকটিতে প্লাসিবো বা নিয়ন্ত্রণ-দল ছিলই না, ফলে উন্নতিটা ভেষজের কারণে কিনা বলার উপায় নেই। ২০১১ সালের যে ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালটি বাংলা লেখায় সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয়, সেখানে ৬০ জন মায়ের মধ্যে প্রোল্যাক্টিন বেড়েছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ, প্লাসিবো দলে ১০ শতাংশ (Gupta ও Shaw, PMCID PMC3869575)। LactMed অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে, ওই গবেষণায় মায়েদের সমস্যাগুলি এক রকম ছিল না, তাই ফলটি সীমাবদ্ধ।

সবচেয়ে ভালো নকশার গবেষণাটি অন্য। ২১১ জন মাকে নিয়ে করা একটি র‍্যান্ডমাইজড ডাবল-ব্লাইন্ড ট্রায়ালে ছয় মাসের মাথায় সক্রিয় দলের ৭০ শতাংশ শিশু শুধুমাত্র বুকের দুধ পাচ্ছিল, প্লাসিবো দলে ৪৫ শতাংশ, আর দিনে অন্তত ২০ গ্রাম ওজন বেড়েছিল সক্রিয় দলের ৭৭ শতাংশ শিশুর, প্লাসিবো দলে ৪১.৮ শতাংশের। পার্থক্যগুলি পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ, আর গুরুতর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নথিভুক্ত হয়নি। তবে এখানে ২২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী গবেষণা শেষ করেননি।

তাহলে ভারসাম্যটা কোথায়? প্রমাণ আছে, কিন্তু অসম, আর LactMed নিজেই লিখেছে শতমূলীর নিরাপত্তা কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়নি, যদিও ছোট গবেষণাগুলিতে মা বা শিশুর ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি। প্রমাণের স্তর সীমিত প্রমাণ।

LactMed-এর সবচেয়ে জরুরি বাক্যটি অবশ্য ভেষজ নিয়ে নয়। তারা স্পষ্ট করে লিখেছে, স্তন্যবর্ধক কোনো কিছুই দুধ কম হওয়ার সংশোধনযোগ্য কারণগুলি খুঁজে দেখা ও পরামর্শের বিকল্প নয়। কথাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুধ কম হওয়ার পিছনে ল্যাচিং, খাওয়ানোর ফ্রিকোয়েন্সি বা থাইরয়েডের মতো কারণ থাকতে পারে, যেগুলি কোনো ভেষজে সারবে না। শিশুর যত্নের অন্য দিকগুলি নিয়ে শিশুর তেল মালিশের লেখাটিতে আলাদা আলোচনা আছে।

শতমূল পাউডার কীভাবে ও কতটা খাবেন?

শতমূল সাধারণত গুঁড়ো, ঘৃত বা ক্যাপসুল, এই তিন রূপে খাওয়া হয়, আর কোন রূপে কতটা নেবেন তা নির্ভর করে উদ্দেশ্য ও সহনশীলতার ওপর। সবচেয়ে প্রচলিত হলো চূর্ণ বা পাউডার।

রূপ মাত্রা কীভাবে
চূর্ণ বা পাউডার আধ থেকে ১ চা চামচ (২ থেকে ৪ গ্রাম) গরম দুধ বা জলে, দিনে ১ থেকে ২ বার
শতাবরী ঘৃত আধ থেকে ১ চা চামচ সকালে খালি পেটে
প্রমিত নির্যাস (ট্রায়ালের মাত্রা) ৩০০ মিগ্রা দিনে একবার, বা ২৫০ মিগ্রা দিনে দুবার খাবারের সঙ্গে
সংমিশ্রণ চিকিৎসকের পরামর্শে অশ্বগন্ধা বা ব্রাহ্মীর সঙ্গে

একটা তফাত এখানে খেয়াল করার মতো। চূর্ণের যে ২ থেকে ৪ গ্রাম মাত্রা প্রচলিত, সেটি ঐতিহ্যগত, আর নির্যাসের যে ৩০০ বা ৫০০ মিগ্রা মাত্রা ট্রায়ালে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি প্রমিত ও ঘনীভূত। দুটি সংখ্যা সরাসরি তুলনীয় নয়, কারণ Ademola ও সহলেখকদের ২০২৫ সালের ট্রায়ালের নির্যাসটি ছিল ১৩ঃ১ অনুপাতে ঘনীভূত এবং ১০ শতাংশের বেশি শতাবরিনে প্রমিত। কেউ যদি চূর্ণ খেয়ে ট্রায়ালের ফল আশা করেন, ধরে নেওয়াটা ভুল হবে।

পাউডার খাওয়ার সহজ নিয়মটা এমন। রাতে শোবার আগে এক কাপ গরম দুধে আধ চা চামচ শতমূল চূর্ণ গুলে নিন, স্বাদ অপ্রিয় লাগলে এক চিমটি এলাচ মেশান, আর সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন খেয়ে মাঝে এক-দুদিন বিরতি দিন। গুঁড়োর রং হালকা ক্রিম, গন্ধ মৃদু মিষ্টি, আর দুধে গুললে সামান্য পিছল ভাব আসে।

শাস্ত্রীয় প্রস্তুতিতে তাজা শিকড়ের রসও চলে, দুর্বলতা বা স্তন্যদানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিলি রস এক কাপ দুধ ও সামান্য চিনি মিশিয়ে সকাল-সন্ধ্যা খাওয়ার চল আছে। তবে তাজা শিকড় শহরে পাওয়া কঠিন, তাই বেশিরভাগ মানুষ চূর্ণ বা ক্যাপসুলেই থিতু হন। টানা কতদিন? প্রকাশিত ট্রায়ালগুলি আট সপ্তাহ বা ষাট দিনের বেশি চলেনি, তাই তার বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশিত তথ্য নেই।

পুরুষের জন্য শতমূলী, শাস্ত্র আসলে কী বলে

পুরুষের ক্ষেত্রে শতমূলীর শাস্ত্রীয় ভিত্তি অনেকের ধারণার চেয়ে শক্ত, কারণ চরক সংহিতা একে রেখেছে বাজীকরণ অধ্যায়েই। উপরে যে প্রস্তুতিগুলির নাম দেওয়া হয়েছে, বৃষ্য ক্ষীর, বৃষ্য ঘৃত, অপত্যকর স্বরস ও অপত্যকর ঘৃত, সেগুলি প্রজনন-ক্ষমতা ও ওজ বাড়ানোর প্রসঙ্গে বলা, এবং সেই প্রসঙ্গ কেবল নারীর নয়।

প্রচলিত মাত্রা শাস্ত্রীয় ধারায় দিনে ৫ থেকে ১০ গ্রাম চূর্ণ এক কাপ দুধের সঙ্গে। প্রমাণের স্তর এখানে ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার।

আধুনিক দিকটা কিন্তু ফাঁকা। পুরুষের টেস্টোস্টেরন, শুক্রাণু বা প্রজনন-ক্ষমতা নিয়ে শতমূলীর কোনো বড় মানব-ট্রায়াল প্রকাশিত হয়নি, তাই এই দাবিগুলো শাস্ত্রীয় ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক থেকে গেছে। কেউ দুর্বলতা বা যৌন-স্বাস্থ্যের সমস্যায় ভুগলে ভেষজে ভরসা করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো, কারণ এর পেছনে চিকিৎসাযোগ্য কোনো কারণ থাকতে পারে যা শুধু ভেষজে ঠিক হবে না।

একই প্রশ্নে যে ভেষজটির নাম সবচেয়ে বেশি ওঠে, সেটি শতমূলী নয়, গোক্ষুর। সেখানে মানব-ট্রায়াল হয়েছে, কিন্তু ফলটা যা ভাবা হয় তা নয়। গোক্ষুরের টেস্টোস্টেরন-দাবি নিয়ে দশটি গবেষণার আটটিতেই কোনো পরিবর্তন পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ পরীক্ষা না হওয়া আর পরীক্ষায় উতরোতে না পারা, দুটি আলাদা অবস্থা, আর এই দুই ভেষজ ঠিক সেই দুই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।

শতমূলীর অপকারিতা ও কে সতর্ক থাকবেন

শতমূলী নিয়ন্ত্রিত ট্রায়ালে সাধারণত নিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু কিছু অবস্থায় এটি এড়িয়ে চলা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দুটি ট্রায়ালেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মৃদু, মূলত মাথা ঘোরা, পেট ফাঁপা, বমিভাব ও পাতলা পায়খানা, আর কেউ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ওষুধ বন্ধ করেননি (Ademola ২০২৫; Gudise ২০২৪)।

রক্তপরীক্ষার দিকটাও আশ্বস্ত করার মতো। Ademola ও সহলেখকদের ২০২৫ সালের ট্রায়ালে আট সপ্তাহ পরে লিভারের এনজাইম (ALT p = ০.৩১৯, AST p = ০.৬৩২), কিডনির ক্রিয়েটিনিন (p = ০.৭৪৬) ও থাইরয়েডের TSH (p = ০.১৬৯), কোনোটিতেই অর্থবহ পরিবর্তন হয়নি (DOI 10.3389/frph.2025.1654503)। তবে এটি আট সপ্তাহের হিসাব, তার বেশি নয়।

কাদের সতর্কতা কারণ
এস্ট্রোজেন-সংবেদনশীল অসুখ ফাইটোএস্ট্রোজেন প্রভাব, যেমন কিছু স্তন টিউমার, এন্ডোমেট্রিওসিস
গর্ভাবস্থা, বিশেষত প্রথম তিন মাস পর্যাপ্ত নিরাপত্তা-তথ্য নেই, চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
ডায়াবেটিসের ওষুধ রক্তে শর্করায় প্রভাব পড়তে পারে
কিডনির সমস্যা ও শরীরে জল জমা হালকা মূত্রবর্ধক প্রভাব
লিথিয়াম চিকিৎসা মূত্রবর্ধক প্রভাবে লিথিয়াম শরীর থেকে কম বেরোতে পারে, ফলে মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি
অন্য মূত্রবর্ধক ওষুধ প্রভাব যোগ হয়ে জল ও লবণের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে
অ্যাসপারাগাসে অ্যালার্জি সরাসরি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া

লিথিয়ামের সারিটি আলাদা করে পড়া দরকার। লিথিয়াম এমন একটি ওষুধ যার নিরাপদ ও বিষাক্ত মাত্রার ব্যবধান খুব সরু, তাই শরীর থেকে বেরোনোর গতি সামান্য কমলেও রক্তে তার মাত্রা বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছতে পারে।

গর্ভাবস্থার সারিটি নিয়েও একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। প্রকাশিত দুটি ট্রায়ালেরই অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন মেনোপজ-বয়সী নারী, অর্থাৎ গর্ভবতী নারীদের উপর শতমূলীর নিরাপত্তা কোথাও পরীক্ষা করা হয়নি। প্রমাণ না থাকা আর নিরাপদ হওয়া এক জিনিস নয়। গর্ভাবস্থার আয়ুর্বেদিক যত্নে কোনগুলি নিরাপদ বলে ধরা হয় তার তালিকা আলাদা।

ঝুঁকিটা একদম ছোট নয়। বিশেষত আপনি যদি জন্মনিরোধক বড়ি, হরমোন থেরাপি বা ডায়াবেটিসের ওষুধ নেন, তবে শতমূলী শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। অম্বলের জন্য খেলেও অ্যাসিডিটির অন্য ঘরোয়া উপায় মাথায় রাখুন, কারণ শতমূলীর আলসার-সংক্রান্ত প্রমাণ এখনো মূলত প্রাণী-গবেষণায় আটকে।

শতমূলী পাউডারের দাম ও ভাল মানের চেনার উপায়

শতমূলী পাউডারের দাম ব্র্যান্ড, বিশুদ্ধতা ও পরিমাণভেদে বদলায়, আর দাম দিয়ে মান বিচার করা যায় না। বাংলাদেশে সাধারণ মানের শতমূল চূর্ণ ১০০ গ্রামের আনুমানিক পরিসর ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, আর স্ট্যান্ডার্ডাইজড নির্যাস বা ক্যাপসুলের দাম এর চেয়ে বেশি। বাজারভেদে এই পরিসর বদলায়।

এখানে দেওয়া দাম শুধু তথ্যের জন্য, সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক পরিসর, বিক্রেতা ও সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে যাচাই করে নেবেন। কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা মানে আমরা সেটির প্রচার বা সুপারিশ করছি, তা নয়।

আপনার বাড়িতে যে প্যাকেটটা আছে, সেটার গায়ে কি শতাবরিনের শতকরা মাত্রা লেখা আছে? মান যাচাইয়ের সবচেয়ে কাজের সূত্রটি রং বা গন্ধ নয়, ওই একটি সংখ্যা। প্যাকেটে শতাবরিনের শতকরা মাত্রা লেখা আছে কিনা দেখুন। প্রকাশিত ট্রায়ালগুলিতে ব্যবহৃত নির্যাস ছিল ৫ শতাংশ শতাবরিনে প্রমিত (Gudise ২০২৪) বা ১০ শতাংশের বেশি শতাবরিনে প্রমিত, ১৩ঃ১ ঘনত্বে (Ademola ২০২৫)। যে প্যাকেটে এই সংখ্যাটাই নেই, সেটিতে কত সক্রিয় উপাদান আছে তা কেউ জানে না, বিক্রেতাও নন।

  • প্যাকেটে শতাবরিনের শতকরা মাত্রা বা স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন লেখা আছে কিনা দেখুন
  • বৈজ্ঞানিক নাম Asparagus racemosus লেখা আছে কিনা দেখুন, শুধু "Asparagus" যথেষ্ট নয়
  • প্রস্তুতকারকের AYUSH নিবন্ধন ও ব্যাচ নম্বর দেখে নিন
  • রং হালকা সাদা থেকে ক্রিম, গন্ধ মৃদু ও মিষ্টি, তেতো বা বোঁটকা গন্ধ মানে নষ্ট

বৈজ্ঞানিক নামের সারিটি বাড়তি গুরুত্বপূর্ণ। ফাইটোএস্ট্রোজেনের চাহিদা বাড়ার পর থেকে Asparagus racemosus ভুল লেবেলের একটি পরিচিত লক্ষ্যবস্তু, আর একই গণের অন্য প্রজাতিগুলি দেখতে প্রায় একই রকম বলে খালি চোখে ধরা কঠিন। খোলা বাজারে নাম-হীন গুঁড়ো তাই এড়িয়ে চলাই ভাল।

একটি ছোট ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

শীতের সকালে ঠাকুমার হাতে একটা কাচের শিশি দেখতাম, ভেতরে হালকা ক্রিম রঙের গুঁড়ো। বলতেন এটা "সাতমূলী", মেয়েদের শরীরের জন্য ভালো (ছোটবেলায় গন্ধটা আমার ভালো লাগত না, তাই এড়িয়েই যেতাম)। অনেক পরে জেনেছি বইয়ের ভাষায় ওটাই শতমূলী।

এই লেখাটা তৈরি করতে গিয়ে সবচেয়ে অস্বস্তির মুহূর্তটা এসেছিল চরক সংহিতার পাতা খুলে। বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষার অসংখ্য লেখায় একই বাক্য ঘোরে, চরক শতমূলীকে "স্ত্রী রসায়ন" বলেছেন। মূল পাঠে কথাটা নেই। যা আছে তা বাজীকরণ প্রকরণে, অন্য প্রসঙ্গে।

ভুলটা কারও বদমতলবের নয়, বহু বছর ধরে একজন আরেকজনের থেকে টুকতে টুকতে দাঁড়িয়ে গেছে। তবু ঠিক করে নেওয়াটা দরকার ছিল, কারণ ওই একটা শব্দের উপর ভর দিয়েই শতমূলীকে কেবল মেয়েদের ভেষজ বানিয়ে ফেলা হয়েছে, আর তাতে শাস্ত্রটাকেই ছোট করা হয়েছে।

উপসংহার

শতমূলী বা শতাবরী আয়ুর্বেদের একটি প্রাচীন ও বহু-ব্যবহৃত ভেষজ, আর আধুনিক প্রমাণ এখন তার একটি নির্দিষ্ট দাবিকে সমর্থন করছে, মেনোপজের উপসর্গ কমানো, যেখানে দুটি র‍্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে প্লাসিবোর তুলনায় স্পষ্ট উন্নতি দেখা গেছে। বাকি দাবিগুলি হয় ছোট ট্রায়ালে, নয় প্রাণী-গবেষণায়, নয় কেবল শাস্ত্রে দাঁড়িয়ে আছে।

দুটো কথা ধরে রাখার মতো। এক, হরমোন ভারসাম্যের দাবিটা এখনো প্রমাণিত নয়, বড় ট্রায়ালটিতে হরমোন নড়েইনি। দুই, অশ্বগন্ধার সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলি মেনোপজের উপসর্গে শুধু শতমূলীর চেয়ে ভালো কিছু করেনি।

পরের বার শতমূলীর প্যাকেট হাতে নিলে একটা জিনিস দেখে নেবেন, শতাবরিনের শতকরা মাত্রা লেখা আছে কিনা আর বৈজ্ঞানিক নামটা Asparagus racemosus কিনা। ওই দুটো তথ্য না থাকলে প্যাকেটের ভেতরে কী আছে তা যাচাই করার আর কোনো উপায় থাকে না। আর শুরু করার সিদ্ধান্তটা, বিশেষত হরমোন-সংক্রান্ত অসুখ বা নিয়মিত ওষুধ থাকলে, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত।

সূত্র / Sources

  • Ademola J, Ajgaonkar A, Debnath T, Debnath K, Langade J. "Efficacy and safety of Shatavari root extract (Asparagus racemosus) for menopausal symptoms. A randomized, double-blind, three-arm, placebo-controlled study." Frontiers in Reproductive Health, 2025;7:1654503. DOI 10.3389/frph.2025.1654503. PMC12695842
  • Gudise VS, Dasari MP, Kuricheti SSK. "Efficacy and Safety of Shatavari Root Extract for the Management of Menopausal Symptoms. A Double-Blind, Multicenter, Randomized Controlled Trial." Cureus, 2024;16(4):e57879. DOI 10.7759/cureus.57879. PMC11079574
  • Gupta M, Shaw B. "A Double-Blind Randomized Clinical Trial for Evaluation of Galactogogue Activity of Asparagus racemosus Willd." Iranian Journal of Pharmaceutical Research, 2011;10(1):167-172. PMC3869575
  • "Wild Asparagus." Drugs and Lactation Database (LactMed), National Institute of Child Health and Human Development, National Library of Medicine, Bethesda, সর্বশেষ হালনাগাদ ১৫ জুলাই ২০২৬। NCBI Bookshelf NBK501813
  • Sushma, Yadava LP. "Shatavari (Asparagus racemosus Willd). A herbal boon to women reproductive health and an overview of current research." World Journal of Advanced Research and Reviews, 2022;16(02):032-038. DOI 10.30574/wjarr.2022.16.2.1028. wjarr.com
  • চরক সংহিতা, চিকিৎসাস্থান, বাজীকরণ অধ্যায়, বৃংহণী গুটিকা শ্লোক ২৫, বৃষ্য ক্ষীর শ্লোক ১৮, বৃষ্য ঘৃত শ্লোক ২১, অপত্যকর স্বরস শ্লোক ১৪ ও অপত্যকর ঘৃত শ্লোক ২৮ (শাস্ত্রীয় সূত্র)। carakasamhitaonline.com
  • চরক সংহিতা, চিকিৎসাস্থান, রসায়ন অধ্যায়, ব্রহ্ম রসায়ন ও চ্যবনপ্রাশ প্রকরণে শতমূলীর উপাদান-উল্লেখ (শাস্ত্রীয় সূত্র)। carakasamhitaonline.com

নিচের সূত্রটি চিকিৎসা-প্রমাণের নয়, উদ্ভিদ-পরিচিতি ও নামের বিভ্রান্তি দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

  • "শতমূলী।" বাংলা উইকিপিডিয়া, নিবন্ধটি Asparagus officinalis সম্পর্কিত, প্রজাতি-বিভ্রান্তির উদাহরণ হিসেবে। bn.wikipedia.org

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

সাধারণত আধ থেকে এক চা চামচ (২ থেকে ৪ গ্রাম) শতমূল চূর্ণ এক কাপ গরম দুধ বা জলে, দিনে এক থেকে দু'বার। শুরুতে অর্ধেক মাত্রায় শুরু করে সহনশীলতা দেখে বাড়ানো ভাল। নির্যাসের ক্ষেত্রে ট্রায়ালে ব্যবহৃত মাত্রা ছিল দিনে ৩০০ মিগ্রা (Ademola ও সহলেখক, ২০২৫) অথবা ২৫০ মিগ্রা দিনে দুবার (Gudise ও সহলেখক, ২০২৪), আর সেটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো নথিভুক্ত মাত্রা।
শতমূলীশতাবরীমহিলাদের স্বাস্থ্যহরমোনভেষজ
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি।

আরও পড়ুন
বেল খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা বোঝাতে কাঠের টেবিলে আস্ত সবুজ বেল ফল, মাঝখান থেকে কাটা পাকা বেলের কমলা-হলুদ শাঁস ও বীজ, এক গ্লাস বেলের শরবত, বাটিতে শুকনো বেল শুঁঠ আর বেল পাতা, পেছনে গাছে ঝুলন্ত বেল
ভেষজ22 মিনিট

বেল খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা, কাঁচা আর পাকা বেলের আসল ফারাক

বেল খাওয়ার উপকারিতা কতটা প্রমাণিত, কাঁচা ও পাকা বেলের ফারাক, পাকা বেল খাওয়ার অপকারিতা, ডায়াবেটিসে বেল, বেল পাতার রস খেলে কী হয় আর খাওয়ার সঠিক সময়।

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
পান পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা বোঝাতে কাঠের টেবিলে জলের ফোঁটা লাগা সবুজ পান পাতার স্তূপ, মাটির বাটিতে কাটা সুপারি, চুন ও খয়ের, মৌরি ছড়ানো একটি খোলা খিলি পান, আর কোণে লতায় ঝোলা হৃদয়াকৃতি পাতার ছোট গোল ছবি
ভেষজ19 মিনিট

খালি পান খেলে কি হয়? পান পাতার উপকারিতা ও অপকারিতার প্রমাণ

পান পাতার উপকারিতা কতটা প্রমাণিত, খালি পান খেলে কি হয়, পান খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতায় সুপারি-জর্দার দায়, মিষ্টি পান, পান খাওয়ার নিয়ম ও সতর্কতা।

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
পেয়ারা পাতার উপকারিতা বোঝাতে সবুজ পেয়ারা পাতা, কাটা সাদা ও গোলাপি শাঁসের পেয়ারা, কাচের কাপে পেয়ারা পাতার চা, কাঠের বাটিতে শুকনো পাতা, আর পেটব্যথা, সুগার মাপা ও সুরক্ষার তিনটি ছোট গোল ছবি
ভেষজ20 মিনিট

পেয়ারা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা, ১৪টি পাতার ট্রায়াল যা বলছে

পেয়ারা পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা কোন ট্রায়ালে প্রমাণিত, পেয়ারা পাতা খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা, খালি পেটে পাতা খাওয়া আর পাতার চা ও রস নিয়ে যা জানা আছে।

১২ অক্টোবর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ