আরোগ্য বাংলা
ভেষজ ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 23 মিনিট পড়ুন

গোক্ষুর উপকারিতা, খাওয়ার নিয়ম আর রোদ নিয়ে WHO-র সতর্কতা

গোক্ষুর উপকারিতা কোন দাবিতে প্রমাণ আছে আর কোথায় নেই, গোক্ষুর খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, গোক্ষুরের অপকারিতা কী, আর ইউরোপের নিয়ন্ত্রক কেন মনোগ্রাফ দেয়নি।

অভিজিৎ সাউ
তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

AI-সহায়তায় গবেষণা ও খসড়া; সম্পাদনা, যাচাই ও তথ্যের দায়ভার লেখক অভিজিৎ সাউ-এর। সম্পাদকীয় নীতি গবেষণা পদ্ধতি

মাটিতে ছড়ানো গোক্ষুর গাছে হলুদ ফুল ও কাঁটাযুক্ত ফল, পাশে কাঠের বাটিতে গোক্ষুর চূর্ণ, চারপাশে কিডনি ও মূত্রথলি, পুরুষ-শক্তির প্রতীক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লোগো, চড়া রোদ, গর্ভাবস্থায় নিষেধ আর পায়ে কাঁটা ফোটার সতর্কতা
সূচিপত্র18টি বিভাগ

চাষির চোখে গোক্ষুর একটা আপদ। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা লতানো গাছ, ছোট হলুদ ফুল, আর ফলের গায়ে এমন শক্ত কাঁটা যে খালি পায়ে মাড়ালে ফুটে যায় এবং সাইকেলের টায়ারও রেহাই পায় না। ইংরেজি নামটাই তাই puncture vine। অথচ ঠিক সেই আগাছারই শুকনো ফলের গুঁড়ো এখন বাংলাদেশের অনলাইন দোকানে ১০০ গ্রাম প্রায় ২০০ টাকায় বিকোচ্ছে, আর প্যাকেটের গায়ে ছাপা থাকছে কিডনির পাথর ও পুরুষের হরমোনের প্রতিশ্রুতি।

গোক্ষুর উপকারিতা নিয়ে আসল প্রশ্নটা তাই সোজা, এই দুই ছবির মাঝখানে সত্যিটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। গোক্ষুর হলো Tribulus terrestris L., Zygophyllaceae গোত্রের একটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ, সংস্কৃতে গোক্ষুর ও স্বাদুকণ্টক, বাংলায় গোখরু ও কাটা খুরা। প্রমাণের হিসাব কষলে ছবিটা এরকম দাঁড়ায়, প্রস্রাব ও মূত্রনালীর প্রসঙ্গে গোক্ষুরের পিছনে আছে শাস্ত্রীয় ব্যবহার, টেস্টোস্টেরন বা কিডনির পাথরে মানুষের ওপর প্রমাণ নেই, আর গাছটি সম্পর্কে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত নথিভুক্ত তথ্যটি কোনো উপকার নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রোদ-সতর্কতা।

নিচে ধরে ধরে দেখা হয়েছে বড় গোক্ষুর ও ছোট গোক্ষুরের তফাত কোথায়, ভারতের গাছে গবেষণার মূল যৌগটাই কেন অনুপস্থিত, টেস্টোস্টেরনের দাবিটা কোথায় ভেঙে পড়ে, পাথরের গবেষণাগুলি আসলে কাদের ওপর হয়েছে, গোক্ষুর খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, দাম কেমন, আর কাদের এটি ছোঁয়া উচিত নয়।

গোক্ষুর গাছ কোনটা, আর গোখরু, গোকশুরা, কাটা খুরা কি একই?

গোক্ষুরের বিজ্ঞানসম্মত নাম Tribulus terrestris L., পরিবার Zygophyllaceae, অর্থাৎ ক্যালট্রপ পরিবার। বাংলায় নামটি গোক্ষুর, গোখরু, গোকশুরা ও গোক্ষুরা, চারটি বানানেই লেখা হয়, আর বাংলাদেশে কাটা খুরা নামটিও চলে। পাঁচটিই একই গাছ। সংস্কৃত নামটির অর্থ গরুর খুর, কারণ কাঁটাওয়ালা ফলটি দেখতে অনেকটা খুরের ছাপের মতো।

গাছটি খাড়া নয়, মাটিতে ছড়িয়ে থাকে। কাণ্ড দুই মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, পাতা বিপরীতমুখী জোড়ায় সাজানো, প্রতিটি পাতায় তিন থেকে আটটি জোড়া পত্রক, ফুল হলুদ ও পাঁচ পাপড়ির, ব্যাস মাত্র ৭ থেকে ১৫ মিলিমিটার (EMA/HMPC/886105/2022, Assessment report on Tribulus terrestris L., herba)। ফলটি পাঁচটি কোষে ভাগ, প্রতিটিতে দুই জোড়া শক্ত ধারালো কাঁটা, একজোড়া লম্বা আর একজোড়া ছোট। কাঁটা এতটাই শক্ত যে খালি পা, পাতলা জুতো এমনকি সাইকেলের টায়ারও ফুটো করে দেয়, আর সেখান থেকেই ইংরেজি নাম puncture vine।

এখানে একটা আসল গোলমাল আছে যা কোনো বাংলা লেখা পরিষ্কার করে না। আয়ুর্বেদে গোক্ষুর নামে দুটি আলাদা গাছ চলে। Tribulus terrestris হলো লঘু বা ছোট গোক্ষুর, আর Pedalium murex হলো বৃহৎ বা বড় গোক্ষুর, সম্পূর্ণ আলাদা পরিবারের (Pedaliaceae) উদ্ভিদ। একটি পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, আসল গোক্ষুর ওষুধের উৎস T. terrestris-এর ফল, আর শাস্ত্রে বড় গোক্ষুরকে বিকল্প বলা হলেও বাজারে বাস্তবে সেটি ছোট গোক্ষুরের ভেজাল হিসেবেই ব্যবহৃত হয় (Choudhary ও Kaurav, Asian Journal of Pharmaceutical and Clinical Research. 2021;14(7))। তফাত চেনার সহজ সূত্র আছে। ছোট গোক্ষুরের ফল সামান্য কষা, বড় গোক্ষুরের ফল তুলনায় মিষ্টি, আর আকারে অনেক বড়।

কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ? কারণ এই লেখায় যে গবেষণাগুলির কথা আসবে তার প্রায় সবই T. terrestris-এর ওপর করা। বড় গোক্ষুরের প্যাকেট কিনে ছোট গোক্ষুরের গবেষণা পড়ে ফেলা আর কালমেঘ ও চিরতাকে এক করে ফেলা, দুটো একই ভুল। কেনার সময় প্যাকেটের গায়ে বিজ্ঞানসম্মত নামটা খুঁজবেন।

এক নজরে, গোক্ষুর উপকারিতার দাবির পাশে প্রমাণের মাপ

গোক্ষুরের আট-নয়টি উপকারিতার যে তালিকা বাংলা পাতাগুলিতে ঘোরে, তার প্রতিটি সারির পিছনে প্রমাণের ওজন সম্পূর্ণ আলাদা। নিচের ছকে প্রতিটি দাবির পাশে সেই ওজনটাই বসানো হয়েছে, আজ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে উঁচু স্তরের উৎস ধরে।

দাবি প্রমাণের মাপ ভিত্তি
ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে উন্নতি সীমিত প্রমাণ ৫টি গবেষণার ৩টিতে উন্নতি, মান দুর্বল
মূত্রনালীর স্বাস্থ্য ও প্রস্রাবের জ্বালা ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার চরক সংহিতার মূত্রবিরেচনীয় গণ
শোথ বা ফোলা কমানো ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার শোথহর মহাকষায়
টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধি অপর্যাপ্ত প্রমাণ ১০টির ৮টি গবেষণায় কোনো পরিবর্তন নেই
কিডনির পাথর গলানো বা প্রতিরোধ অপর্যাপ্ত প্রমাণ শুধু কোষ ও ইঁদুরের গবেষণা
পেশিশক্তি ও ক্রীড়াদক্ষতা অপর্যাপ্ত প্রমাণ ৭টি ট্রায়াল, ১৬৫ জন, ফল অস্পষ্ট
রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ওজন নিয়ন্ত্রণ অপর্যাপ্ত প্রমাণ নিয়ন্ত্রকের ভাষায় প্রমাণ অনুপলব্ধ
শুক্রাণুর মান বৃদ্ধি অপর্যাপ্ত প্রমাণ মূল উদ্ধৃতি দুটি সম্মেলনের সারসংক্ষেপ

দ্বিতীয় কলামের দুটি লেবেল আলাদা করে বুঝে নেওয়া দরকার। ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার লেখা থাকলে বোঝায় শাস্ত্রে ব্যবহারটি নথিভুক্ত, কার্যকারিতা পরীক্ষিত নয়; অপর্যাপ্ত প্রমাণ লেখা থাকলে বোঝায় আধুনিক গবেষণা হয়েছে কিন্তু ফল আসেনি। সমান জিনিস নয়। বাংলা সার্চের শীর্ষে থাকা পাতাগুলি এই দুটিকেই একই বুলেট-চিহ্নের নিচে সাজিয়ে দেয়, ফলে চরক সংহিতার একটি ঔষধ-গণ আর ৪৮৩ জন পুরুষের ওপর ব্যর্থ হওয়া একগুচ্ছ আধুনিক ট্রায়াল পাঠকের চোখে হুবহু একই ওজন পেয়ে যায়।

ভারতের গোক্ষুর আর গবেষণার গোক্ষুর কি একই গাছ?

গোক্ষুর একই প্রজাতির গাছ হলেও তার দুটি আলাদা রাসায়নিক ধরন বা কেমোটাইপ আছে, এবং ক্লিনিকাল গবেষণার প্রায় সবটাই হয়েছে সেই ধরনটির ওপর যেটি ভারতীয় উপমহাদেশে জন্মায় না। এটিই গোক্ষুর নিয়ে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে কম আলোচিত তথ্য।

ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার ৭৮ পাতার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কথাটা সরাসরি লেখা আছে। পূর্ব-দক্ষিণ ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার নমুনায় প্রধান স্যাপোনিন হলো প্রোটোডায়োসিন, সঙ্গে সালফারযুক্ত প্রোটোট্রাইবেস্টিন ও ট্রাইবেস্টিনিন। আর ভারত ও ভিয়েতনামের নমুনায় প্রধান স্যাপোনিন হলো ট্রাইবুলোসিন (EMA/HMPC/886105/2022, ১.১ অধ্যায়, Dinchev ও সহলেখক ২০০৮ উদ্ধৃত করে)। একই প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে, ভারত ও চীনের নমুনার স্যাপোনিনে গ্যালাকটোজ, গ্লুকোজ, র‌্যামনোজ ও জাইলোজ, চার ধরনের শর্করা-একক থাকে, আর বুলগেরিয়ার নমুনায় থাকে কেবল গ্লুকোজ ও র‌্যামনোজ। দুটি একই প্রজাতির গাছ, কিন্তু ভিতরের রসায়ন আলাদা।

এবার সংখ্যাটা দেখুন। ইউরোপের বাজারে গোক্ষুর থেকে তৈরি একটিমাত্র ওষুধ আছে, একটি শুকনো নির্যাস, যেটি ১৯৮১ সাল থেকে বুলগেরিয়ায় অনুমোদিত। তার স্পেসিফিকেশনে লেখা, নির্যাস-অনুপাত ৩৫ থেকে ৪৫ অনুপাত ১, দ্রাবক ৮০ শতাংশ মিথানল, এবং প্রোটোডায়োসিন হিসেবে হিসাব করা ফিউরোস্ট্যানল স্যাপোনিন ৪৫ শতাংশের কম নয়। অর্থাৎ ওষুধটির সংজ্ঞাই দাঁড়িয়ে আছে সেই যৌগটির ওপর, যেটি ভারতীয় কেমোটাইপে প্রধান নয়।

এই একটি তথ্য বাংলা ইন্টারনেটের অনেকগুলো লাইনকে একসঙ্গে নড়িয়ে দেয়। বাজারে যে গোক্ষুর চূর্ণের প্যাকেট পাওয়া যায় তা স্ট্যান্ডার্ডাইজড নয়, তার গায়ে প্রোটোডায়োসিনের পরিমাণ লেখা থাকে না, আর সম্ভবত সেটি অন্য কেমোটাইপের গাছ। তাহলে বুলগেরিয়ার ৪৫ শতাংশ নির্যাস নিয়ে করা কোনো ট্রায়ালের ফল ওই প্যাকেটের গায়ে বসানো যায় কি? আমার মতে যায় না, আর এটাই এই লেখার কেন্দ্রীয় যুক্তি। একই সমস্যা আমরা আলকুশি বীজের লেভোডোপার হিসাবেও দেখেছি, যেখানে এক চামচ গুঁড়োয় সক্রিয় উপাদান কতটা পড়ছে সেটাই অজানা থেকে যায়।

গোক্ষুর কি সত্যিই টেস্টোস্টেরন বাড়ায়?

মানুষের ওপর করা গবেষণায় গোক্ষুর টেস্টোস্টেরন বাড়ায় এমন জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এবং এটি একটি নয়, তিনটি পৃথক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত।

সবচেয়ে সাম্প্রতিক কাজটি ২০২৫ সালের। Nutrients জার্নালে প্রকাশিত একটি সিস্টেমেটিক রিভিউয়ে ১০টি গবেষণা ও মোট ৪৮৩ জন পুরুষের তথ্য একত্র করা হয়, বয়স ১৬ থেকে ৭০ (Vilar Neto JDO ও সহলেখক, Nutrients. 2025;17(7):1275)। লেখকদের ভাষায়, টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১০টির মধ্যে ৮টিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি, আর যে দুটিতে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ng/dL বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল সেই দুটিরই পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল এবং অংশগ্রহণকারীদের আগে থেকেই হরমোনের ঘাটতি ছিল। অন্তর্ভুক্ত গবেষণার অর্ধেক জ্যাডাড স্কেলে ৩ বা তার কম পেয়েছিল, অর্থাৎ মান নিম্ন।

একই ছবি ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রেও। ২০২২ সালের একটি পর্যালোচনায় ৭টি ট্রায়াল ও ১৬৫ জন শারীরিকভাবে সক্রিয় পুরুষের তথ্য দেখা হয়, দৈনিক ৪৫০ থেকে ১,৮৭৫ মিলিগ্রাম, ২ থেকে ১২ সপ্তাহ (Fernández-Lázaro D ও সহলেখক, Int J Environ Res Public Health. 2022;19(15):9533, PMID 35954909)। ফল পরস্পরবিরোধী, দুটি গবেষণায় টেস্টোস্টেরন বেড়েছে আর একটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লেখকদের সিদ্ধান্ত, পেশির ক্ষতির সূচক বা হরমোনের আচরণ, কোনোটিতেই স্পষ্ট উপকারের প্রমাণ নেই। এর আগে ২০১৪ সালে ১১টি গবেষণা মিলিয়ে করা আরেকটি পর্যালোচনাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, মানুষের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন বাড়ানোয় গোক্ষুর কার্যকর নয় এবং বাজারের দাবিগুলি অসমর্থিত (Qureshi A, Naughton DP ও Petroczi A, Journal of Dietary Supplements. 2014;11(1):64-79, PMID 24559105)।

তবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর তথ্যটি কোনো ট্রায়াল নয়, একটি রোগীর নথি। ২১ বছরের এক যুবক ওজন-প্রশিক্ষণের সময় স্টেরয়েডের বিকল্প হিসেবে গোক্ষুরের ট্যাবলেট খাচ্ছিলেন। তাঁর বাম স্তনে গাইনেকোমাস্টিয়া দেখা দেয় এবং অস্ত্রোপচার করে তা বাদ দিতে হয়। হরমোন পরীক্ষায় পাওয়া যায় FSH ০.৫৯ IU/l (স্বাভাবিক ১.০ থেকে ৭.০), LH ০.২৬ (স্বাভাবিক ১.০ থেকে ৮.০) এবং টেস্টোস্টেরন ১.৩ nmol/l, যেখানে স্বাভাবিক পরিসর ১০ থেকে ৫০। গোক্ষুর বন্ধ করার দুই মাস পরে সংখ্যাগুলি ফিরে আসে, FSH ১১, LH ৬.১, টেস্টোস্টেরন ১৫, আর ফোলাটাও মিলিয়ে যায় (EMA/HMPC/886105/2022, ৫.৩ অধ্যায়, Jameel ও সহলেখক ২০০৩ উদ্ধৃত করে)।

মেয়েদের ক্ষেত্রেও দাবিটা একইভাবে বড় করে বলা হয়। বাংলা পাতাগুলি গোক্ষুরকে হরমোনের ভারসাম্য ও পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের সমাধান হিসেবে দেখায়, অথচ ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক নারীদের নিয়ে যে তিনটি প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত গবেষণা পেয়েছিলেন সেগুলি যৌন আকাঙ্ক্ষা ও মেনোপজের উপসর্গ নিয়ে, PCOS নিয়ে নয়, এবং সেগুলিকেও অপর্যাপ্ত বলে রায় দেওয়া হয়েছে। PCOS ও আয়ুর্বেদ নিয়ে আলাদা যে লেখাটি আছে, সেখানে কোন হস্তক্ষেপের পিছনে কতটা প্রমাণ আছে তা ধরে ধরে আলোচনা করা হয়েছে, আর গোক্ষুর সেই তালিকায় নেই।

একটি ঘটনা দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না, আর নিয়ন্ত্রক নিজেও লিখেছেন যে কোন নির্যাস কত মাত্রায় খাওয়া হয়েছিল তা জানা যায়নি। কিন্তু যে গাছটিকে বাংলা ও হিন্দি ইন্টারনেটে প্রাকৃতিক টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধিকারক বলে বিক্রি করা হয়, তার সবচেয়ে বিস্তারিত নথিভুক্ত হরমোন-সংক্রান্ত ঘটনাটি ঠিক উল্টো দিকে গেছে। অশ্বগন্ধাশতমূলী নিয়ে যে লেখাগুলি আছে, সেখানেও হরমোনের দাবি আর প্রমাণের দূরত্ব নিয়ে একই প্রশ্ন উঠেছে।

কিডনির পাথরে গোক্ষুর কতটা কাজ করে?

কিডনির পাথরে গোক্ষুরের কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের ওপর করা কোনো ট্রায়াল নেই, এবং এটি অনুমান নয়, নিয়ন্ত্রকের তালিকা থেকে গোনা যায়।

ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অ্যান্টিইউরোলিথিয়াটিক শিরোনামের নিচে যে গবেষণাগুলি ধরা আছে, সেগুলি হলো Aggarwal ২০১০ (NRK-52E কিডনি-কোষের ওপর, ল্যাবে), Kaushik ২০১৭ (আবার কোষের ওপর, MDCK ও PK 15 সহ), Kaushik ২০১৯ (উইস্টার ইঁদুর) এবং Sangeeta ১৯৯৩ (ছয়টি পুরুষ ইঁদুর)। মূত্রবর্ধক প্রভাবের প্রমাণটিও Al-Ali ২০০৩, যেখানে ইঁদুরকে শরীরের ওজনের প্রতি কেজিতে ৫ গ্রাম নির্যাস খাওয়ানো হয়েছিল (EMA/HMPC/886105/2022, ৩.১.২ অধ্যায়)। একটিও মানুষ নেই।

ল্যাবের ফলাফলগুলি অর্থহীন নয়। কোষের ওপর গোক্ষুরের নির্যাস ক্যালসিয়াম অক্সালেট স্ফটিকের জন্ম ও বৃদ্ধি কমিয়েছে এবং অক্সালেটের আঘাত থেকে কোষকে কিছুটা বাঁচিয়েছে। কিন্তু টেস্টটিউব থেকে মানুষের কিডনি পর্যন্ত রাস্তাটা লম্বা, আর সেই রাস্তায় বহু ভেষজ হারিয়ে গেছে। ইঁদুরের প্রতি কেজিতে ৫ গ্রাম মানে ৬০ কেজির একজন মানুষের জন্য ৩০০ গ্রাম, যা কোনো বাস্তব মাত্রা নয়।

২০২৫ সালে একটি মানব-ট্রায়াল প্রকাশিত হয়েছে ঠিকই, ৫৪ জন রোগী, ১০ মিলিমিটার বা তার ছোট পাথর, এক মাস। কিন্তু সেখানে যা খাওয়ানো হয়েছে তা পাঁচটি ভেষজের মিশ্রণ, গোক্ষুরের সঙ্গে বিছুটি, হংসরাজ, ভুট্টার কেশ ও খরমুজ। মিশ্রণটি প্লাসিবোর চেয়ে ভাল কাজ করেছে, কিন্তু তার কৃতিত্ব গোক্ষুরের ঘাড়ে চাপানো যায় না, কারণ কোন উপাদানটি কাজ করেছে সেই নকশাটাই ওই গবেষণায় ছিল না।

তাহলে বাংলা প্যাকেটের গায়ে লেখা পাথর গলিয়ে দেয় কথাটা কোথা থেকে এল? সম্ভবত শাস্ত্রীয় অশ্মরীঘ্ন ব্যবহার থেকে, যা ঐতিহ্যগত দাবি হিসেবে বৈধ। ঐতিহ্যগত দাবিকে প্রমাণিত ফল বলে উপস্থাপন করাটাই সমস্যা। কামরাঙা ও কিডনির ঝুঁকি নিয়ে লেখাটিতে আমরা দেখেছি, কিডনির প্রসঙ্গে ভেষজের দাবি কত দ্রুত বিপরীত দিকে ঘুরে যেতে পারে।

মূত্রনালীর জ্বালায় গোক্ষুর উপকারিতা আসলে কতটা

মূত্রনালীর প্রসঙ্গেই গোক্ষুরের শাস্ত্রীয় ভিত্তি সবচেয়ে মজবুত, এবং এখানেই এর প্রমাণের সৎ লেবেলটি হলো ঐতিহ্যগত আয়ুর্বেদিক ব্যবহার।

চরক সংহিতার সূত্রস্থানের চতুর্থ অধ্যায়ে যে পঞ্চাশটি মহাকষায় বা ঔষধ-গণ সাজানো আছে, তার পঁয়ত্রিশ নম্বরটি মূত্রবিরেচনীয়, অর্থাৎ মূত্র প্রবাহ বাড়ানোর দশটি ভেষজের দল, এবং গোক্ষুর সেই দলে আছে। একই অধ্যায়ের ক্রিমিঘ্ন ও অনুবাসনোপগ গণেও গোক্ষুরের নাম আছে (Charaka Samhita Sutrasthana 4/9, Gokshura entry, carakasamhitaonline.com)। অর্থাৎ শাস্ত্র গোক্ষুরকে সর্বরোগহর টনিক হিসেবে নয়, একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত কাজে বসিয়েছে, প্রস্রাবের প্রসঙ্গে।

আধুনিক দিক থেকে যা আছে তা হলো ইঁদুরের মূত্রবর্ধক পরীক্ষা, আর তার বেশি কিছু নয়। প্রস্রাবে জ্বালা বা মূত্রনালীর সংক্রমণে গোক্ষুর কাজ করে, এমন কোনো মানব-ট্রায়াল ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকের তালিকাতেও নেই। এটা জানার পরেও কেউ যদি শাস্ত্রীয় ব্যবহারের ভরসায় গোক্ষুর নিতে চান, সেটা তাঁর সিদ্ধান্ত। শুধু একটা সীমারেখা মনে রাখা দরকার। প্রস্রাবে জ্বালার সঙ্গে জ্বর, কোমরের পিছনে ব্যথা বা প্রস্রাবে রক্ত থাকলে সেটা আর ঘরোয়া প্রশ্ন নয়, সেটা কিডনির সংক্রমণ হতে পারে এবং সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়া দেরি করা বিপজ্জনক।

ইউরোপের নিয়ন্ত্রক গোক্ষুর নিয়ে কী বলেছে

ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার ভেষজ কমিটি গোক্ষুরের কোনো মনোগ্রাফ দিতে পারেনি, এবং তারা কারণগুলি লিখিতভাবে জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর HMPC একটি চূড়ান্ত পাবলিক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করে, মনোগ্রাফ নয় (EMA/HMPC/308436/2023, Public statement on Tribulus terrestris L., herba)।

সিদ্ধান্তের অংশে দুটি শর্তের কথা আছে, এবং দুটিই অপূর্ণ। নির্দেশিকা 2001/83/EC-র ১০ক ধারার শর্ত, অর্থাৎ স্বীকৃত কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্য নিরাপত্তা, পূরণ হয়নি। আর ১৬ক(১)(ঘ) ধারার ঐতিহ্যগত ব্যবহারের শর্তও পূরণ হয়নি। বুলগেরিয়ার নির্যাসটি বাজারে ৩০ বছরের বেশি থাকলেও কমিটি সেটিকে সুনির্দিষ্ট বা specific বলে গণ্য করেছে, কারণ এর নিষ্কাশন-প্রযুক্তি প্রকাশ্য নয় এবং ফিউরোস্ট্যানল স্যাপোনিনের মাত্রা কৃত্রিমভাবে উঁচু করা, ফলে সেটি গোটা প্রজাতির হয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে না।

নথির ভিতরে একটি বাক্য আছে যেটি বাংলা পাঠকের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, অথচ যেটির অনুবাদ কোথাও চোখে পড়ে না। কমিটি লিখেছে, অ-ইউরোপীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে গোক্ষুরের ব্যবহারও এই অপর্যাপ্ততার মধ্যেই পড়ে। অর্থাৎ আয়ুর্বেদিক ঐতিহ্যটি বিবেচনা করা হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট ইঙ্গিত, শক্তি ও মাত্রাসহ দীর্ঘকালীন নিরাপদ ব্যবহারের নথি হিসেবে তাকে যথেষ্ট মনে করা হয়নি।

আরেকটি ছোট তথ্য বলে রাখা ভাল। জনসাধারণের মতামতের জন্য নথিটি ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত খোলা ছিল এবং একটিও মন্তব্য জমা পড়েনি। বিশ্বজুড়ে যে ভেষজটি কোটি টাকার সাপ্লিমেন্ট বাজার চালায়, তার পক্ষে তথ্য জমা দিতে কেউ এগিয়ে আসেনি।

রোদ, ভেড়া আর একটি পুরোনো সতর্কতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোগ্রাফে গোক্ষুর নিয়ে যে সতর্কতাটি লেখা আছে, সেটি সম্ভবত এই গাছ সম্পর্কে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত তথ্য, এবং কোনো বাংলা পাতায় এটি নেই।

WHO-র মনোগ্রাফ সংকলনের চতুর্থ খণ্ডে Fructus Tribuli অধ্যায়ে সতর্কতা অংশে লেখা আছে, ফোটোটক্সিক প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনার কারণে গোক্ষুর ফল ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত রোদ এড়ানো উচিত এবং ওষুধটি চলাকালীন উচ্চ সান প্রোটেকশন ফ্যাক্টরের, অর্থাৎ ৩০-এর বেশি SPF-যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত (WHO monographs on selected medicinal plants, Volume 4, 2009, Fructus Tribuli, পৃ. ৩২৩ থেকে ৩৩২)। একটি ভেষজের পাশে সানস্ক্রিনের পরামর্শ সচরাচর চোখে পড়ে না।

কারণটা ভেড়ার পালে। গোক্ষুর চরে খাওয়া ভেড়ার মধ্যে লিভার-জনিত আলোক-সংবেদনশীলতা বহুবার নথিভুক্ত হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় যার নাম গেলডিকপ। ১৯৮২ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের দুটি প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের হার ছিল ২১ ও ৩৭ শতাংশ, আর মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল; প্রধান লক্ষণ ছিল জন্ডিস ও আলোক-সংবেদনশীলতা (EMA/HMPC/886105/2022, ৩.৩.৭ অধ্যায়, Glastonbury ও সহলেখক ১৯৮৪ উদ্ধৃত করে)।

ব্যাখ্যাটা রসায়নের, এবং এখানেই ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। গোক্ষুরের স্টেরয়েডাল স্যাপোনিন, অর্থাৎ ঠিক যে যৌগগুলির জন্য গাছটিকে ওষুধ বলা হয়, হজমের পরে এপিস্যাপোজেনিন গ্লুকুরোনাইডে বদলায়, আর ক্যালসিয়ামের উপস্থিতিতে সেগুলি স্ফটিক হয়ে পিত্তনালীর ভিতরে জমে যায়। ওই স্ফটিকই পিত্তপ্রবাহ আটকে দেয় এবং ত্বক আলোয় পুড়তে শুরু করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় কাঁচা স্টেরয়েডাল স্যাপোনিন খাইয়ে পরীক্ষাগারে রোগটি তৈরি করে দেখানো হয়েছে।

এখানে সততার খাতিরে সীমাটা বলে রাখা দরকার। ভেড়া রুমিন্যান্ট, তাদের পরিপাক মানুষের মতো নয়, তারা সারাদিন গাছটা চরে খায়, আর মানুষের ক্ষেত্রে গেলডিকপের মতো কোনো ঘটনা নথিভুক্ত নেই। তাই এটি ভয় দেখানোর তথ্য নয়। কিন্তু WHO যখন সানস্ক্রিনের কথা লেখে, তখন সেটি কল্পনা থেকে লেখে না, আর গরমের দিনে টানা গোক্ষুর খেয়ে চড়া রোদে কাজ করলে ত্বকে অস্বাভাবিক জ্বালা বা লালচে ভাব দেখা দিলে কারণটা অন্তত মাথায় রাখা যায়।

মাত্রার গোলমাল, এক চামচ গুঁড়োয় আসলে কতটা

গোক্ষুরের মাত্রা নিয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংখ্যাটি WHO-র, দৈনিক ৩ থেকে ৬ গ্রাম ফলচূর্ণ ক্বাথ হিসেবে, আর WHO নিজে এই সংখ্যাটি নিয়েছে ভারতের আয়ুর্বেদীয় ফার্মাকোপিয়ার প্রথম খণ্ড থেকে। চীনা ফার্মাকোপিয়া অনুযায়ী বিভক্ত মাত্রায় দৈনিক ৬ থেকে ৯ গ্রাম। চরক সংহিতার প্রসঙ্গেও ফলচূর্ণের মাত্রা ৩ থেকে ৬ গ্রাম, ক্বাথের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম।

এবার এর পাশে বাংলা ও ইংরেজি সার্চের ফলাফলে যা চলছে তা বসিয়ে দেখুন।

উৎস বলা মাত্রা ৬ গ্রামের তুলনায়
WHO মনোগ্রাফ, ভারতীয় ফার্মাকোপিয়া উদ্ধৃত করে দৈনিক ৩ থেকে ৬ গ্রাম চূর্ণ মানদণ্ড
চীনা ফার্মাকোপিয়া দৈনিক ৬ থেকে ৯ গ্রাম চূর্ণ সামান্য বেশি
metropolisindia.com দৈনিক ৫০০ থেকে ১,৫০০ মিলিগ্রাম নির্যাস অনেক কম, তবে নির্যাস বলে আলাদা
zeelabpharmacy.com দৈনিক ১ থেকে ৩ গ্রাম কম
salihatfood.com ৩ থেকে ৫ গ্রাম, টানা ৯০ দিন মাত্রা ঠিক, সময়কাল অসমর্থিত
ayurcentralonline.com দিনে দুবার ১ থেকে ২ ট্যাবলেট সংখ্যাহীন
bajajfinservhealth.in দিনে দুবার ২৫০ গ্রাম প্রায় ৮৩ গুণ বেশি

শেষ সারিটা ছাপার ভুল নয়, পাতাটিতে সত্যিই লেখা আছে দিনে দুবার ২৫০ গ্রাম স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। দৈনিক ৫০০ গ্রাম। এটি WHO-র সর্বোচ্চ মাত্রার প্রায় তিরাশি গুণ, আর কোনো ভেষজের জন্যই এটি বাস্তব সংখ্যা নয়। পাতাটি একটি বড় আর্থিক-স্বাস্থ্য সংস্থার, চিকিৎসক-পর্যালোচিত বলে চিহ্নিত, এবং বাংলা ও ইংরেজি দুই সার্চেই উপরের দিকে আসে।

আরেকটি ফাঁক আছে যা এই ছকে ধরা পড়ে না। চূর্ণ আর নির্যাস এক জিনিস নয়। ৩৫ থেকে ৪৫ অনুপাত ১ নির্যাসের ৫০০ মিলিগ্রাম মানে প্রায় ১৭ থেকে ২২ গ্রাম কাঁচা ভেষজের সমতুল্য, ফলে মিলিগ্রামের সংখ্যা ছোট দেখালেই মাত্রা কম, এমন নয়। প্যাকেটে নির্যাস-অনুপাত বা প্রোটোডায়োসিনের শতাংশ ছাপা না থাকলে ভিতরের সক্রিয় উপাদানের পরিমাণ ক্রেতার কাছে কার্যত অদৃশ্য থেকে যায়।

গোক্ষুর খাওয়ার নিয়ম ও ব্যবহার

গোক্ষুর খাওয়ার নিয়মের কেন্দ্রীয় শর্তটি সময়ের, পরিমাণের নয়। শাস্ত্র গাছটিকে একটি নির্দিষ্ট তন্ত্রের ওষুধ হিসেবে দেখেছে, আর আধুনিক নিরাপত্তা-তথ্য দীর্ঘ ব্যবহারের পক্ষে কিছুই বলে না, তাই সংক্ষিপ্ত ও কারণ-নির্দিষ্ট ব্যবহারই একমাত্র রক্ষণযোগ্য অবস্থান। আপনার বাড়িতে গোক্ষুর কি রোজের কৌটোয় উঠে এসেছে, নাকি কোনো একটা নির্দিষ্ট সমস্যায় ওঠে? নিচের পাঁচটি বিন্দু তাঁদের জন্য যাঁরা সিদ্ধান্তটা আগেই নিয়ে ফেলেছেন এবং এখন ভুলের জায়গাগুলো চিনে নিতে চাইছেন।

  1. চূর্ণের ক্ষেত্রে দৈনিক ৩ থেকে ৬ গ্রামের মধ্যে থাকুন, সাধারণত দুই ভাগে, খাবারের আগে ঈষদুষ্ণ জলের সঙ্গে। রান্নাঘরের মাপে ৩ গ্রাম মানে মোটামুটি আধ চা চামচ ভরা।
  2. গুঁড়ো কেনার সময় রং ও গন্ধ দেখে নিন। আসল গোক্ষুর চূর্ণ ফ্যাকাশে বাদামি-সবুজ, হাতে ঘষলে খসখসে দানা টের পাওয়া যায় কারণ শক্ত কাঁটার অংশও গুঁড়োয় থাকে, আর গন্ধটা কড়া নয়, শুকনো খড়ের মতো মৃদু। ঝাঁঝালো বা মিষ্টি গন্ধ পেলে সন্দেহ করার কারণ আছে।
  3. মূত্রবর্ধক প্রভাবের কারণে জল বেশি খান। ইঁদুরের গবেষণায় গোক্ষুরের ডাইইউরেটিক প্রভাব ফিউরোসেমাইডের চেয়েও সামান্য বেশি পাওয়া গিয়েছিল, তাই জল কম পড়লে শরীর শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  4. এক মাসের বেশি টানা না চালানোই বুদ্ধিমানের কাজ, আর তার বেশি দরকার মনে হলে সিদ্ধান্তটা চিকিৎসকের হাতে ছাড়ুন। বাংলা সার্চে যে ৯০ দিন টানা খাওয়ার পরামর্শটি ঘোরে তার পিছনে একটিও নিরাপত্তা-গবেষণা নেই, আর উপরে বর্ণিত লিভার বিকলতার ঘটনাটিতে ব্যবহারের সময়কাল ছিল ঠিক দুই থেকে তিন মাস।
  5. টানা গরমে বা চড়া রোদে বেশি কাজ করলে WHO-র রোদের সতর্কতাটি মাথায় রাখুন, বিশেষ করে ত্বকে অস্বাভাবিক জ্বালা বা লালচে ভাব দেখা দিলে।

এই পাঁচটি বিন্দু মেনে চললেও গোক্ষুর প্রমাণিত ওষুধ হয়ে ওঠে না। শুধু ভুলের জায়গাগুলো কমে।

গোক্ষুরাদি গুগ্গুলু আর গোক্ষুর চূর্ণ, তফাতটা কোথায়

গোক্ষুর চূর্ণ হলো শুধু গোক্ষুর ফলের গুঁড়ো, আর গোক্ষুরাদি গুগ্গুলু হলো একটি যৌগিক আয়ুর্বেদিক প্রস্তুতি যেখানে গোক্ষুরের সঙ্গে শোধিত গুগ্গুল রজন ও ত্রিকটু জাতীয় উপাদান মেশানো থাকে। দুটি এক জিনিস নয়, আর একটির হিসাব অন্যটির গায়ে বসে না।

তফাতটা ব্যবহারিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। গুগ্গুল নিজে থাইরয়েড হরমোন ও কয়েকটি ওষুধের বিপাকে প্রভাব ফেলতে পারে, ফলে গোক্ষুরাদি গুগ্গুলুর সতর্কতার তালিকা গোক্ষুর চূর্ণের চেয়ে লম্বা। গুগ্গুল নিয়ে আলাদা লেখাটিতে সেই ঝুঁকিগুলি ও শোধিত গুগ্গুল চেনার উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা আছে, আর সেখানে গোক্ষুরাদি গুগ্গুলুর সারিটিও রয়েছে। বাংলা দোকানে দুটি প্রায়ই পাশাপাশি সাজানো থাকে এবং নামের মিল দেখে অনেকে একটির জায়গায় অন্যটি কিনে ফেলেন।

নথিভুক্ত ক্ষতির ঘটনাগুলি, যা কোনো বাংলা পাতায় নেই

গোক্ষুরের অপকারিতা নিয়ে বাংলা পাতাগুলি সাধারণত পেট ফাঁপা ও হালকা গ্যাস্ট্রিকের কথা লেখে। নিয়ন্ত্রকের নথিতে যা আছে তা এর চেয়ে গুরুতর, এবং সংখ্যাগুলি ছোট হলেও ঘটনাগুলি নির্দিষ্ট।

ইউরোপীয় ওষুধ সংস্থার নিরাপত্তা অধ্যায়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Vigilyze তথ্যভাণ্ডার থেকে ২০টি প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার ঘটনা তালিকাভুক্ত, যার দুটি মৃত্যুতে শেষ হয়েছে। নিয়ন্ত্রক নিজেই লিখেছেন যে ওই দুটি ক্ষেত্রে গোক্ষুরের সঙ্গে যথাক্রমে ২১টি ও ৯টি অন্য ওষুধ চলছিল, তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বাকি ঘটনাগুলির মধ্যে আছে ফোলা, আমবাত, পেশিব্যথা, লিভার ফাংশন টেস্ট বেড়ে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ।

আলাদা করে নথিভুক্ত তিনটি ঘটনা এখানে তুলে ধরা দরকার, কারণ তিনটিই বাংলা পাঠকের চেনা পরিস্থিতিতে ঘটেছে (EMA/HMPC/886105/2022, ৫.৩ অধ্যায়)।

  • ২৮ বছরের এক ইরানি যুবক কিডনিতে পাথর ঠেকানোর জন্য মুদির দোকান থেকে কেনা গোক্ষুরের জল দুদিনে দুই লিটার খান। তাঁর খিঁচুনি হয়, লিভারের এনজাইম ও ক্রিয়েটিনিন প্রবলভাবে বেড়ে যায়, অর্থাৎ একসঙ্গে লিভার, কিডনি ও স্নায়ুর ক্ষতি। খাওয়া বন্ধ করার পরে উপসর্গ কমে এবং এনজাইম স্বাভাবিক হয় (Talasaz AH ও সহলেখক, Nephrology Dialysis Transplantation. 2010;25(11):3792-3793)।
  • ৩১ বছরের এক ইরানি নারী ওজন কমানোর জন্য দুই থেকে তিন মাস ধরে দিনে কয়েকবার গোক্ষুরের চা খাচ্ছিলেন। তিনি জন্ডিস, দুর্বলতা ও বমিভাব নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, ট্রান্সঅ্যামিনেজ, PT ও INR বেড়ে যায়, আর ভাইরাল বা অটোইমিউন হেপাটাইটিস বাদ দেওয়ার পরে একমাত্র সম্ভাব্য নির্ণয় দাঁড়ায় বিষ-জনিত লিভার বিকলতা। ভেষজ থেকে লিভারের ক্ষতি কেন বিরল নয় এবং কোন ভেষজের কী মাত্রার গ্রেডিং আছে, তা নিয়ে ভুঁই আমলা ও লিভার প্রসঙ্গে আলাদা আলোচনা আছে।
  • ৩৬ বছরের এক ব্যক্তি ইরেক্টাইল ডিসফাংশনের জন্য গোক্ষুরভিত্তিক সাপ্লিমেন্ট দিনে দুটি করে ১৫ দিন খাওয়ার পরে ৭২ ঘণ্টার প্রায়াপিজমে আক্রান্ত হন, যেখানে উত্থান নিজে থেকে নামে না। অস্ত্রোপচার করে শান্ট বসাতে হয় এবং তারপরেও যৌনক্ষমতার ক্ষতি থেকে যায়।

নিয়ন্ত্রকের নিজের মূল্যায়ন এই ঘটনাগুলি সম্পর্কে সংযত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন অংশ, কোন নির্যাস, কত মাত্রা তা অজানা, অতিরিক্ত মাত্রার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যায় না, আর সরাসরি কার্যকারণ প্রমাণিত নয়। আমি সেই সংযমটুকু হুবহু রাখতে চাই। কিন্তু বাংলা পাতাগুলি যেখানে লিখছে সাধারণত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, সেখানে এই তিনটি ঘটনার অস্তিত্বটুকু অন্তত পাঠকের জানা দরকার। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের একটি বিশ্লেষণে ২৭টি বাণিজ্যিক গোক্ষুর সাপ্লিমেন্ট পরীক্ষা করে পাঁচটিতে অঘোষিত উপাদান পাওয়া গেছে, মূলত গ্রিন টি ও সাইট্রাস নির্যাস, তবে কোনো নমুনাতেই অ্যানাবলিক স্টেরয়েড মেলেনি (Gođevac D ও সহলেখক, Food Chemistry: X. 2025;27:102476, PMID 40290465)। এটুকু স্বস্তির খবর, এবং সেটাও বলা উচিত।

গোক্ষুর পাউডারের দাম কত

গোক্ষুর চূর্ণ বাংলাদেশ ও ভারতে সহজলভ্য এবং তুলনায় সস্তা, তবে ফর্ম বদলালে দামও অনেকটা বদলে যায়। নিচের পরিসরগুলি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে অনলাইন বিক্রেতাদের তালিকাভুক্ত দাম থেকে নেওয়া।

ফর্ম বাংলাদেশ ভারত
গোক্ষুর চূর্ণ, ১০০ গ্রাম ১৫০ থেকে ২৩০ টাকা ৮৫ থেকে ১০০ রুপি
গোক্ষুর গোটা ফল, ২৫০ গ্রাম ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা তথ্য অনিশ্চিত
গোক্ষুরাদি চূর্ণ (যৌগিক), ১০০ গ্রাম তথ্য অনিশ্চিত ১৩০ থেকে ১৫০ রুপি
ব্র্যান্ডেড ট্যাবলেট, ৬০টি তথ্য অনিশ্চিত ২২০ থেকে ২৭৫ রুপি

এখানে দেওয়া দাম শুধু তথ্যের জন্য, সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুযায়ী আনুমানিক পরিসর, বিক্রেতা ও সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই কেনার আগে যাচাই করে নেবেন। কোনো ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ করা মানে আমরা সেটির প্রচার বা সুপারিশ করছি, তা নয়।

দাম দেখে একটা কথা মনে রাখা দরকার। সস্তা মানে নিরাপদ নয়। দামি মানে স্ট্যান্ডার্ডাইজডও নয়, কারণ উপরের কোনো পণ্যের গায়েই প্রোটোডায়োসিনের শতাংশ বা নির্যাস-অনুপাত লেখা থাকে না, ফলে আপনি যে দামটা দিচ্ছেন আর প্যাকেটের ভিতরে যে সক্রিয় উপাদানটা আছে, এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটা ক্রেতার পক্ষে যাচাই করাই সম্ভব নয়।

শাস্ত্রে গোক্ষুর কোন নামে আছে, আর গুণগুলি কী

শাস্ত্রীয় দ্রব্যগুণের ভাষায় গোক্ষুরের রস মধুর, বীর্য শীতল, বিপাক মধুর, আর গুণ গুরু ও স্নিগ্ধ। দোষের ওপর এর কাজ বাত ও পিত্ত শমন (Charaka Samhita, Gokshura entry, carakasamhitaonline.com)। ভাবপ্রকাশ নিঘণ্টুতে একে ত্রিদোষশমক বলা হয়েছে, অর্থাৎ উৎসভেদে সামান্য মতপার্থক্য আছে, আর সেটুকু চেপে না যাওয়াই ভাল।

মাত্রার ক্ষেত্রেও শাস্ত্র অংশ ধরে আলাদা করে বলেছে। ফলচূর্ণ ৩ থেকে ৬ গ্রাম, ফলের ক্বাথ ২০ থেকে ৩০ গ্রাম, আর মূলের ক্বাথও ২০ থেকে ৩০ গ্রাম। বাজারে সাধারণত ফলের গুঁড়োই বিক্রি হয়, তাই প্রথম সংখ্যাটিই বেশিরভাগ পাঠকের কাজে লাগবে।

মধুর রস ও শীতল বীর্যের সমন্বয়টা এখানে অর্থবহ। আয়ুর্বেদ গোক্ষুরকে ঠান্ডা ও পুষ্টিকর শ্রেণিতে রেখেছে, তীক্ষ্ণ বা উষ্ণ শ্রেণিতে নয়, আর মূত্রবিরেচনীয় গণে বসিয়ে প্রস্রাবের প্রসঙ্গটিকেই এর প্রধান কাজ বলে চিহ্নিত করেছে, অর্থাৎ শাস্ত্র নিজেই গাছটির পরিধিকে একটি নির্দিষ্ট তন্ত্রের মধ্যে বেঁধে রেখেছিল এবং তাকে সর্বরোগহর শক্তিবর্ধকের মর্যাদা কখনো দেয়নি। আধুনিক বিপণন গোক্ষুরকে যে শক্তিবর্ধক ও উত্তেজক চেহারায় হাজির করে, সেটি শাস্ত্রীয় বর্ণনার সঙ্গে ঠিক মেলে না। সপ্তধাতু নিয়ে লেখাটিতে দেখানো হয়েছে, কোন ধাতুতে কোন ভেষজ, এই ধরনের ছক অনেক জায়গায় চললেও তার ফলাফল-ভিত্তিক প্রমাণ নেই, আর গোক্ষুরের ক্ষেত্রেও কথাটা খাটে।

কে ব্যবহার করবেন না বা সতর্ক থাকবেন

গোক্ষুরের অপকারিতার সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য রূপ হলো একটি বাদ-দেওয়ার তালিকা, অর্থাৎ কাদের হাতে এটি পৌঁছানোই উচিত নয়। নিচের প্রতিটি সারির উৎস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোগ্রাফ বা ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কোনোটিই আমার অনুমান নয়।

  • গর্ভবতী মায়েরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোগ্রাফ সরাসরি বলেছে, নিরাপত্তা-তথ্যের অভাবে গর্ভাবস্থায় এই ভেষজ ব্যবহার করা উচিত নয়। ইউরোপীয় মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও প্রজনন ও বিকাশ-সংক্রান্ত বিষক্রিয়ার অধ্যায়ে লেখা আছে, কোনো তথ্য নেই। এটি প্রমাণিত ক্ষতির ভিত্তিতে নয়, তথ্যের শূন্যতার ভিত্তিতে সতর্কতা।
  • স্তন্যদাত্রী মায়েরা, একই কারণে। EMA লিখেছে, স্তন্যদান-সংক্রান্ত কোনো ক্লিনিকাল তথ্য পাওয়া যায়নি।
  • ১২ বছরের কম বয়সী শিশুরা। WHO-র মনোগ্রাফে পেডিয়াট্রিক ব্যবহারের অংশে স্পষ্ট লেখা, নিরাপত্তা-তথ্যের অভাবে ১২ বছরের নিচে ব্যবহার সুপারিশ করা হয় না।
  • যাঁদের গোক্ষুরে বা এই পরিবারের গাছে আগে অতিসংবেদনশীলতা হয়েছে। EMA-র নথিতে একমাত্র নথিভুক্ত প্রতিনির্দেশই এটি।
  • লিভারের রোগ আছে বা লিভারের এনজাইম আগে থেকেই বেশি, এমন ব্যক্তিরা, উপরে বর্ণিত নথিভুক্ত ঘটনাগুলির বিবেচনায়।
  • কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে এমন ব্যক্তিরা। মূত্রবর্ধক ভেষজ ও দুর্বল কিডনি ভাল সঙ্গী নয়, আর নথিভুক্ত ঘটনাটিতে কিডনি বিকল হয়েছিল আগে থেকে সুস্থ একজন মানুষের।
  • রক্তচাপের ওষুধ বা ডাইইউরেটিক চলছে এমন ব্যক্তিরা, কারণ দুটি মূত্রবর্ধক একসঙ্গে পড়লে শরীরের জল ও লবণের ভারসাম্য বেশি নেমে যেতে পারে। উচ্চ রক্তচাপে কী খাবেন নিয়ে লেখাটিতে এই ধরনের যোগফলের কথা আলাদা করে আলোচনা করা হয়েছে।
  • হরমোন-সংবেদনশীল অবস্থা যেমন প্রোস্টেটের সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিরা, গাইনেকোমাস্টিয়ার নথিভুক্ত ঘটনাটির বিবেচনায়।
  • যাঁদের অস্ত্রোপচারের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে, তাঁদের অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে গোক্ষুর বন্ধ রাখাই নিরাপদ, তরল ও রক্তচাপের ওপর এর প্রভাব বিবেচনায়।

এখানে একটা মতভেদ চেপে যাওয়া অসৎ হবে। বাংলা সার্চের শীর্ষে থাকা metropolisindia লিখেছে গোক্ষুর স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ ধরে রাখতে সাহায্য করে, আর একই সার্চে থাকা ayurcentralonline লিখেছে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের এটি দূরে রাখা উচিত। দুটি পরস্পরবিরোধী পরামর্শ, দুটিই চিকিৎসক-স্বাক্ষরিত, দুটিই একই পাতায় র‌্যাঙ্ক করছে। ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক এই প্রসঙ্গে যা লিখেছে তা হলো, সাহিত্যে কোনো বিশেষ সতর্কতা বা সাবধানতা চিহ্নিত করা যায়নি, অর্থাৎ প্রশ্নটার মীমাংসাই হয়নি। রক্তচাপের ওষুধ চললে তাই সিদ্ধান্তটা নিজে না নিয়ে চিকিৎসকের কাছে রাখাই নিরাপদ।

সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া বন্ধ করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে যদি চোখ বা ত্বক হলদে হয়, প্রস্রাব গাঢ় হয়, ডান পাঁজরের নিচে ব্যথা হয়, প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যায়, বা ত্বকে রোদ লেগে অস্বাভাবিক জ্বালা ও ফোসকা পড়ে। এগুলি লিভার ও কিডনির সতর্কসংকেত।

একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ

ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকের নথিটা পড়তে পড়তে একটা জায়গায় এসে আমাকে থামতে হয়েছিল। ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকের নথিতে লেখা ছিল, অ-ইউরোপীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে ব্যবহারও এর মধ্যে পড়ে। মানে আয়ুর্বেদের হাজার বছরের ব্যবহারটা তাঁরা দেখেননি এমন নয়, দেখেছেন, এবং নির্দিষ্ট মাত্রা ও ইঙ্গিতসহ নথি হিসেবে সেটিকে যথেষ্ট মনে করেননি।

প্রথমে ব্যাপারটা আমার কাছে অবিচার মনে হয়েছিল। (আমি এখনো নিশ্চিত নই ইউরোপীয় মানদণ্ডটাই সব ঐতিহ্যের জন্য ন্যায্য কি না, আর অনেক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এই ধরনের সিদ্ধান্তকে সংস্কৃতিগত পক্ষপাত বলেই মনে করেন।) তারপর কেমোটাইপের অংশটা পড়ে অস্বস্তিটা জায়গা বদলাল। ভারতের গাছে প্রধান যৌগটাই আলাদা, বাজারের প্যাকেটে সেই যৌগের পরিমাণ তো দূরের কথা বিজ্ঞানসম্মত নামটুকুও প্রায়ই লেখা থাকে না, আর একই ইন্টারনেটে একই গাছের দৈনিক মাত্রা দৈনিক ৫০০ মিলিগ্রাম থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে বিনা প্রশ্নে। এর কোনোটাই ইউরোপের দোষ নয়। ফাঁকটা আমাদের নিজেদের ঘরের।

সংক্ষেপে ও উপসংহার

সব মিলিয়ে গোক্ষুরের অবস্থানটা এক বাক্যে ধরা যায়, এটি প্রস্রাব ও মূত্রনালীর প্রসঙ্গে একটি শাস্ত্রসম্মত ভেষজ, টেস্টোস্টেরনের ওষুধ নয়, কিডনির পাথর গলানোর প্রমাণিত সমাধানও নয়। ৪৮৩ জন পুরুষের তথ্য মিলিয়ে করা ২০২৫ সালের পর্যালোচনা টেস্টোস্টেরনের দাবিটিকে সমর্থন করেনি। পাথরের পক্ষে যে গবেষণাগুলি আছে তার একটিও মানুষের ওপর নয়। ইউরোপের নিয়ন্ত্রক মনোগ্রাফ দিতে পারেনি। আর WHO যে সতর্কতাটি লিখেছে তা কোনো বাংলা পাতায় নেই, রোদ এড়ান এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।

সবচেয়ে কাজের পদক্ষেপটি তাই একটি সংশোধনের। আপনার বাড়িতে যদি গোক্ষুরের প্যাকেট থাকে, আজ সেটি হাতে নিয়ে গায়ে বিজ্ঞানসম্মত নামটা খুঁজুন। Tribulus terrestris লেখা না থাকলে আপনি হয়তো বড় গোক্ষুর, অর্থাৎ Pedalium murex কিনেছেন, আর তখন এই লেখার একটি সংখ্যাও আপনার প্যাকেটে খাটবে না। আর কিডনিতে পাথরের ব্যথা নিয়ে যদি কেউ ভেষজের ভরসায় দিন কাটাচ্ছেন, সেই সময়টা আল্ট্রাসোনোগ্রাফির রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ায় খরচ করা অনেক বেশি কাজে দেবে। অক্সালেট ও কিডনির সম্পর্ক নিয়ে আরও পড়তে চাইলে পালং শাক নিয়ে লেখাটি দেখতে পারেন, আর নারীস্বাস্থ্যের ভেষজ প্রসঙ্গে গোক্ষুরের জায়গাটিও সেখানে ছোট করে আলোচিত হয়েছে। গর্ভাবস্থার আয়ুর্বেদিক যত্ন নিয়ে লেখাটিতে যে সপ্তম মাসের ছকটি আছে, সেখানে গোক্ষুরের পাশে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান শব্দটি কেন বসানো, এই লেখার পরে সেটি আরও পরিষ্কার হবে।

সূত্র / Sources

  • European Medicines Agency, Committee on Herbal Medicinal Products. Public statement on Tribulus terrestris L., herba. EMA/HMPC/308436/2023, গৃহীত ২০ নভেম্বর ২০২৪. ema.europa.eu
  • European Medicines Agency, Committee on Herbal Medicinal Products. Assessment report on Tribulus terrestris L., herba. EMA/HMPC/886105/2022, ২০ নভেম্বর ২০২৪. ema.europa.eu
  • World Health Organization. Fructus Tribuli. In: WHO monographs on selected medicinal plants, Volume 4. Geneva, 2009, পৃ. ৩২৩ থেকে ৩৩২. ISBN 978 92 4 154705 5. iris.who.int
  • Vilar Neto JDO, de Moraes WMAM, Pinto DV, et al. Effects of Tribulus (Tribulus terrestris L.) supplementation on erectile dysfunction and testosterone levels in men, a systematic review of clinical trials. Nutrients. 2025;17(7):1275. PMID 40219032. pmc.ncbi.nlm.nih.gov
  • Fernández-Lázaro D, Fernandez-Lazaro CI, Seco-Calvo J, et al. Effects of Tribulus terrestris L. on sport and health biomarkers in physically active adult males, a systematic review. International Journal of Environmental Research and Public Health. 2022;19(15):9533. PMID 35954909. pmc.ncbi.nlm.nih.gov
  • Qureshi A, Naughton DP, Petroczi A. A systematic review on the herbal extract Tribulus terrestris and the roots of its putative aphrodisiac and performance enhancing effect. Journal of Dietary Supplements. 2014;11(1):64-79. PMID 24559105. doi.org
  • Talasaz AH, Abbasi MR, Abkhiz S, Dashti-Khavidaki S. Tribulus terrestris-induced severe nephrotoxicity in a young healthy male. Nephrology Dialysis Transplantation. 2010;25(11):3792-3793. PMID 20667992. academic.oup.com
  • Gođevac D, Stanković Jeremić J, Cvetković M, et al. LC-MS-based metabolomics for detecting adulteration in Tribulus terrestris-derived dietary supplements. Food Chemistry: X. 2025;27:102476. PMID 40290465. pmc.ncbi.nlm.nih.gov
  • Choudhary P, Kaurav H, Chaudhary G. Gokhru (Tribulus terrestris and Pedalium murex), medicinal importance of chota gokhru and bada gokhru in Ayurveda and modern science. Asian Journal of Pharmaceutical and Clinical Research. 2021;14(7). journals.innovareacademics.in
  • Charaka Samhita, Sutrasthana 4/9, Gokshura entry (মূত্রবিরেচনীয়, ক্রিমিঘ্ন ও অনুবাসনোপগ মহাকষায়). Charak Samhita Online, Charak Samhita Research, Training and Skill Development Centre. carakasamhitaonline.com

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র তথ্যমূলক উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। যেকোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। এটি চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মনোগ্রাফ অনুযায়ী গোক্ষুর ফলের চূর্ণের দৈনিক মাত্রা ৩ থেকে ৬ গ্রাম, ক্বাথ হিসেবে। এটি চরক সংহিতার ফলচূর্ণের মাত্রার সঙ্গেও মেলে। অনির্দিষ্ট কালের টনিক হিসেবে রোজ খাওয়ার পক্ষে কোনো নিরাপত্তা-গবেষণা নেই, আর নথিভুক্ত লিভার ও কিডনির ঘটনাগুলির বেশিরভাগই দীর্ঘ বা অতিরিক্ত ব্যবহারের পরে হয়েছে।
অভিজিৎ সাউ

লেখক সম্পর্কে

অভিজিৎ সাউ

তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক লেখক

তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরত একজন প্রকৌশলী। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলা ভাষায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ ও প্রাকৃতিক জীবনযাত্রার বিশ্বস্ত তথ্য সহজভাবে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতিটি নিবন্ধের পেছনে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, AYUSH মন্ত্রকের নির্দেশিকা ও প্রকাশিত গবেষণাপত্র যাচাই করি।

এই নিবন্ধটি প্রকাশের আগে প্রাথমিক উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই ও সম্পাদনা করা হয়েছে। আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

আরও পড়ুন
সাদা ফুলে ভরা কালমেঘ গাছ, পাশে কাঠের বাটিতে শুকনো কালমেঘ পাতা, চারপাশে সর্দি, লিভার, রক্তে শর্করা পরীক্ষা, ত্বকের র‌্যাশ ও গর্ভাবস্থায় নিষেধের ছবি
ভেষজ20 মিনিট

কালমেঘ পাতার উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম, অব্যর্থ ওষুধ নয়

কালমেঘ পাতার উপকারিতা কোন রোগে সত্যি আর কোথায় নয়, খাওয়ার নিয়ম ও মাত্রা কত, কালমেঘ পাতার অপকারিতা কী, আর এলার্জি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিয়ন্ত্রক কী বলছে।

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
দড়ি দিয়ে বাঁধা জলের ফোঁটাসহ তাজা পালং শাকের আঁটি, নিচে কাঠের বাটিতে রান্না করা শাক, মাঝে ফুটন্ত পাত্র থেকে ঝাঁঝরি চামচে জল ঝরতে থাকা সেদ্ধ পাতা ও স্টিলের ছাঁকনি, ডান পাশে কিডনির ছবি, Fe চিহ্ন, লোহিত রক্তকণিকা, ক্যাপসুল ও লেবু-গাজর, পালং শাকের উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ28 মিনিট

পালং শাকের উপকারিতা, কোন ভিটামিন থাকে, এলার্জি ও খাওয়ার নিয়ম

পালং শাকের উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ, পালং শাকে কোন ভিটামিন থাকে, আয়রনের সংখ্যাটা আসলে কত, এলার্জি ও অপকারিতা, জুস কতটা নিরাপদ, আর পালং শাক খাওয়ার সঠিক নিয়ম।

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ
বাঁশের ঝুড়িতে টকটকে লাল ডাঁটা ও সবুজ-লাল পাতাসহ তাজা লাল শাক, পাশে কড়াইয়ে সেদ্ধ হওয়া গোলাপি জল ও ছেঁকে ফেলার ছাঁকনি, ডান পাশে কিডনি ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রতীক, লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে লেখার প্রচ্ছদ
ভেষজ20 মিনিট

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, যে সংখ্যাগুলো কেউ বলে না

লাল শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা, লাল শাকে কি রক্ত বাড়ে, পুষ্টিগুণ সংখ্যায়, অক্সালেট ও নাইট্রেটের হিসাব, বাসি শাকের ভয়, শিশু ও গর্ভাবস্থায় খাওয়ার নিয়ম।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · অভিজিৎ সাউ